
এম.জিয়াবুল হক,চকরিয়া :: পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর শোষন আর শৃঙ্খলা থেকে মুক্ত হয়ে সম্ভাবনার বাংলাদেশ একটি লাল সবুজের পতাকা অর্জনের মাধ্যমে স্বাধীনতা পেয়েছে ৫৪বছর আগে।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষ অনেকে সম্মুখযুদ্ধে বাংলাদেশের জন্য আত্মাহুতি দেন হাজারো বীর সেনানী। তাদের মধ্যে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বাসিন্দা ৬জন বীর মুক্তিযোদ্ধা অন্যতম।
জাতির এই সূর্য সন্তানরা যুদ্ধ করে মাতৃভুমির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে শহীদ হলেও স্বাধীনতার ৫৪বছর পরও সেই বীর সেনানীর সম্মানে দৃশ্যমান কোন স্মৃতি নেই আপন জম্মস্থানে।
ফলে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে চকরিয়া উপজেলাবাসীর কি পরিমান অবদান ছিল সেই সম্পর্কে কিছুই জানেন না নতুন প্রজন্ম। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে চকরিয়া উপজেলার শহীদ ৭ বীরের বীরত্বগাঁথা অবদান সম্পর্কে ওয়াকিবহালও নন এই প্রজম্মের হাজার হাজার শিক্ষার্থীরা।
মহান মুক্তিযুদ্ধে চকরিয়ার যাদের আত্মত্যাগঃ
তথ্য সুত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ আনুষ্টানিক ভাবে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙ্গালী জাতির সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হলে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ৭ জন কৃতি সন্তান প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ওই সময় যুদ্ধকালীন সময়ে তারা দেশের জন্য জীবন দেন পাক হানাদার বাহিনীর হাতে।
যাদের রক্তের বিনিময়ে চকরিয়া আজ গৌরবোজ্জ্বল তারা হলেন, চকরিয়া উপজেলার বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের শহীদ আবদুল হামিদ, চকরিয়া পৌরসভার বাটাখালী গ্রামের শহীদ হাবিলদার আবুল কালাম, তাঁর ছোট ভাই শহীদ আবুল হোছাইন, উপজেলার কেয়ারবিল ইউনিয়নের শহীদ এনামূল হক, খিলছাদক গ্রামের শহীদ সিপাই আকতার হোসেন, চিরিংগা ইউনিয়নের পালাকাটা গ্রামের শহীদ গোলাম কাদের ও হারবাং ইউনিয়নের কালা সিকদার পাড়া গ্রামের শহীদ গোলাম সাত্তার।
জানা গেছে, শহীদ আবদুল হামিদ মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্রগ্রাম সরকারী বাণিজ্য মহাবিদ্যালয়ে ছাত্র থাকা অবস্থায় দেশ মাতৃকার টানে লেখাপড়া গুটিয়ে ভারত থেকে গেরিলা প্রশিক্ষন নিয়ে দেশে এসে পার্বত্য লামা আলীকদম ও লোহাগাড়ার পুটিবিলা এলাকায় যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন।
১৯৭১ সালের ৪ নভেন্বর র্বামা সীমান্তে ফুরুইক্যা বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে ককসবাজার অবস্থানরত পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন রিজভীর হাতে সোর্পদ্দ করে। সেখানে টান ১৫ দিন পাকবাহিনী তার উপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে ১৯ নভেম্বর টেকনাফে নিয়ে গিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে।
শহীদ হাবিলদার আবুল কালাম ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক। তিনিও দেশ মাতৃকার টানে সেসময় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ১ নম্বর সেক্টরে। র্পাবত্য চট্রগ্রামের কেরানী পাড়ায় তিনি পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হন।
শহীদ এনামূল হক ছিলেন সেনা বাহিনীর ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য। তিনি সরকারী চাকুরী ছেড়ে দেশের টানে অংশ নেন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে।
একাত্তর সালের ২৫ মার্চ পাকবাহিনী এনামুল হকসহ ১২ মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার উদ্যেশে নিয়ে যাবার পথে তারা গাড়ী চালককে হত্যা করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে ৯ ডিসেম্বর র্পাবত্য চট্রগ্রামের কেরানী পাড়ায় পাকবাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন এনামুল হক।
১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ রাতে পাক বাহিনীর সদস্যরা আমেরিকা থেকে সমুদ্র পথে সোয়াথ জাহাজ যোগে মুক্তিকামী বাঙ্গালী নিধনের জন্য অস্ত্রের চালান তুলছিলেন চট্রগ্রাম বন্দরে। ওই সময় অস্ত্র নামানো পতিহত করতে চেষ্টাকালে গুলিতে শহীদ হন হারবাং ইউনিয়নের কালা সিকদারপাড়া গ্রামের সূর্য সন্তান গোলাম সাত্তার।
২৫ মার্চ যুদ্ধের প্রথম দিকে শহীদ হয়েছেন চকরিয়া উপজেলার চিরিঙ্গা ইউনিয়নের পালাকাটা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম কাদের। একইভাবে সিপাই আকতার হোসেন পাক বাহিনীর নিমর্ম নারকীয়তায় শহীদ হন একইসময়ে।
একইসময়ে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে চকরিয়া পৌরসভার ফুলতলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডাকবাংলোর সামনে পাকবাহিনীর সদস্যরা গুলি করে হত্যা করে শহীদ হাবিলদার আবুল কালামের ছোট ভাই শহীদ আবুল হোছাইনকে। তাঁর রক্তমাখা জামা এখনো পরিবারের কাছে সংরক্ষিত আছে।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ উপজেলার জাতির সূর্য সন্তান ৭ বীরের অবদান অনস্বীকার্য বলে স্বরন করেছেন চকরিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার হাজী আবু মো.বশিরুল আলম। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে শোষনহীন ও সমৃদ্ধশালী হিসেবে প্রতিষ্টায় বীর শহীদদের আত্মত্যাগ বতর্মান প্রজম্মকে অবশ্যই জানানো উচিত। তবে এ ব্যাপারে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে।
সরকারের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থানীয় প্রশাসন চাইলে এই ৭ বীর শহীদদের স্মৃতি প্রতিষ্টা করে তাদের অবদান ও আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি দেশ ও জাতির কাছে তুলে ধরতে পারে। এতে করে বর্তমান প্রজম্মের তরুন, যবুক, শিক্ষার্থীরা চকরিয়া উপজেলার শহীদ ৭ বীর সেনানীর সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবে।
চকরিয়ায় মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিঃ
জানা গেছে, একাত্তর সালে মাতৃভূমি রক্ষার আন্দোলনে চকরিয়াবাসীর অংশগ্রহন স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ১০ই মার্চ দেশপ্রেমিক চকরিয়াবাসী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ সুগম করার লক্ষে “স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ” এবং “স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম চকরিয়া থানা “গঠন করে।
তথ্য উপাত্ত অনুসারে জানা যায়, সর্বপ্রথম এস কে শামসুল হুদাকে সভাপতি ও প্রাক্তন সংসদ সদস্য ডা.শামসুদ্দিন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের কার্যকরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। যেই তিনজন ব্যাক্তি সংগ্রাম পরিষদের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন তারা হচ্ছেন আলহাজ্ব আনোয়র হোসেন, শামসুল হুদা বিএসসি, হাজী আবু তাহের। পরিষদে মফজল আহমদ ও মাষ্টার আব্দুল মালেক কোষাধ্যক্ষ ও সহ- কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সংগ্রাম পরিষদের কমিটিতে জমির উদ্দীন সাংগঠনিক ও তাহের আহমদ দপ্তর সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে আনোয়ারুল ইসলাম বাবু মিয়া, মাষ্টার আব্দুল মালেক, মফজল আহমদ, মোজাম্মেল হক বিএ, অধ্যাপক মমতাজ আহমদ চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন বাঙ্গালী, হাবিলদার গোলাম কাদের, হাবিলদার আবুল কালাম, মৌলানা নজির আহমদ, হাজী বশিরুল আলম প্রমুখ সংগ্রাম পরিষদের তত্তাবধানে ছিলেন।
সংগ্রাম কমিটি গঠনের পরে আনোয়ারুল হাকিম দুলালকে আহবায়ক, সাংবাদিক এসএম সিরাজুল হক, এনামুল হক, সাহাবুদ্দিন, রেজাউল করিম চৌধুরী, খায়রুল আলম, আনোয়ার হোসাইন, শিব্বির আহমদ, গিয়াস উদ্দিন, আবু তাহের এবং শামসুল আলমকে সদস্য করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এই কমিটির সার্বিক তত্বাবধানে ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও কক্সবাজার জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এ এইচ সালাহ্উদ্দিন মাহমুদ, নুরুল আবচার এবং নাছির উদ্দিন।
তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ চকরিয়া বিমান বন্দরের সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রবীনদের ভাষ্যমতে তখনকার সময়ে দশহাজারের অধিক লোকের সমাগম হয়েছিল। মূলত জনসভার পর থেকে চকরিয়া বাসী স্বাধীনতা উত্তাল স্বপ্নের ব্যাকুল হয়ে গভীর সংকল্পের ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে বলিয়ান হয়ে উঠে। স্বাধীন বাংলা বিনির্মাণেরর দীপ্ত শপথে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে তাদের মন ও মনন।
জনসভার দুইদিন পর ২৫ মার্চ কালো রাতে সিপাহী এনামুল হক সঙ্গী ১২জন বাঙালী সিপাহীসহ পাক বাহিনীর হাতে বন্দী হন। ২৬ মার্চ তাদেরকে হত্যা করার জন্য ট্রাকযোগে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ নিয়ে যাবার পথে সুকৌশলে ট্রাক ড্রাইভারকে হত্যা করে তাঁরা ট্রাকসহ সুদূর টেকনাফে চলে যান।
পরে কেরানী পাড়ার যুদ্ধে পাক বাহিনীর ঘাটি ধ্বংসের অভিযানের সময় সিপাহী এনামুল হক শহীদের মিছিলে শামিল হন।
চকরিয়ার পালাকাটা গ্রামের শহীদ সিপাহী গোলাম কাদেরকে ২৫ মার্চ গভীর রাতে কুমিল্লার ময়নামতি সেনা নিবাসে গুলি করে হত্যা করা হয়। চট্রগ্রাম বন্দরে ভারী অস্ত্র নামানোর বিষয়ে অগ্নিঝরা প্রতিবাদকারীদের অন্যতম ছিলেন চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়নের সূর্য সন্তান শহীদ গোলাম সত্তার।
একাত্তর সালের ২৮ মার্চ সংগ্রাম কমিটির সিদ্ধান্তে শহীদ হাবিলদার আবুল কালাম, নায়েক বদিউল আলম, নায়েক আশরাফ, হাবিলদার গোলাম কাদের, মোজাম্মেল হক, শামশুল হুদা, শের আলম, শাহনেওয়াজ, আলহাজ আনোয়ার হোসেন বাঙ্গালী, খলিলুর রহমান, আবুল কাশেম প্রমুখ যোদ্ধারা চকরিয়া থানায় এক সাহসী হামলা চালিয়ে ১১টি ৩০৩ রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জোগান দেন।
দুইদিন পর ৩০ মার্চ চকরিয়া থেকে সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ৫ ট্রাক খাদ্যশস্য চট্রগ্রাম রেস্ট হাউজ, পটিয়া, কালুরঘাটসহ কয়েকটি এলাকায় অবস্থানরত মুক্তিযুদ্ধের জন্য সাহায্য হিসাবে পাঠানো হয়।
এরপর ১৮ এপ্রিল মোজাম্মেল হক বিএ এর নেতৃত্বে আরেকটি দল মুক্তিবাহিনীর একটি সাদা টয়োটা কারসহ চারজন সশস্ত্র লোককে গ্রেপ্তার করেন। তাদের মধ্যে দুজনকেই চকরিয়ার বাস স্টেশন চিরিঙ্গা এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় এবং বাকী দুজনকেই ফাঁসিয়াখালী ঢালায় গুলি করে আহত করা হয়।
২৭ এপ্রিল পাকহানাদার বাহিনীর একটি দল প্রতিরোধ দুর্গ ভেঙ্গে চকরিয়ায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। স্থানীয় জনগণ ও ট্রেনিংপ্রাপ্ত গেরিলাদের সক্রিয় সংগ্রামে ওই পাকহানাদার বাহিনীকে দীর্ঘ একমাসের বেশি সময় কোনঠাসা করে রাখে চকরিয়াবাসী।
এরই মধ্যে ২৭ এপ্রিল প্রত্যুষে চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতুতে পাকবাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লে.শামসুল মুমিন আহত অবস্থায় হানাদার বাহিনীর হাতে ধৃত হয় এবং ক্যাপ্টেন হারুন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হানাদার বাহিনীর বন্দিদশা থেকে সহযোগীদের সহায়তায় পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। এদিন দুপুরে আহত ক্যাপ্টেনকে ডা.শামসুদ্দিন ও আনোয়ার হোসেন বাঙ্গালি প্রথমে পটিয়া হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে স্থায়ী চিকিৎসার জন্য চকরিয়াস্থ মালুমঘাট খৃষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।
এ অবস্থায় পাক বাহিনী কতৃক চকরিয়া আয়ত্তে আসার পর তাঁরা চকরিয়া কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে সেখানে একটি মিনি ক্যান্টনমেন্ট গড়ে তুলে। এরপর পাক সেনারা প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে চিরিঙ্গার হিন্দুপাড়া আক্রমন করে সমুদয় ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। হানাদার বাহিনী তুচ্ছ কারণে সাধারণ লোকের উপর অকথ্য অত্যাচার এবং সহায় সম্পদ লুট করে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে থাকে।
এমন প্রেক্ষাপটে চকরিয়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহ বিশেষ করে চিরিঙ্গা, বরইতলী, হারবাং, লক্ষ্যারচর, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ইউনিয়নের প্রভৃতি এলাকা পাক বাহিনীর লুটপাটের প্রধান লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়।
পাকসেনারা মেজর জামানের সহযোগিতা ও মদদে ১৯৭১ সালের ১২ মে তারিখে চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের স্বনামধন্য মহাজন পিয়ারে মোহন দে’কে চকরিয়া থানায় ধরে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন চালানোর পর ফাঁসিয়াখালীর ঢালায় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। পরে তাঁর বাড়িতে লুটপাট চালিয়ে আড়াইমন স্বর্ণ, ২২মন রৌপ্য এবং নগদ সাড়ে ৪লক্ষ টাকা লুটে নিয়ে যায়।
পাকবাহিনী কতৃক চকরিয়া উপজেলাবাসির উপর দমন নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে সেসময় মাতৃভূমি রক্ষার টানে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান, আব্দুল হামিদ, জহিরুল ইসলাম, নজির আহমদ ও আনোয়ার হোসেন বাঙ্গালীসহ সাতজনের একটিদল সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে চলে যায়।
এরইমধ্যে পাকবাহিনীর সদস্যরা ১৯৭১ সালের ৪ নবেম্বর গভীর রাতে আব্দুল হামিদ ও তার ভাই এবং ভগ্নিপতিকে আটক করে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে আব্দুল হামিদকে কক্সবাজার নিয়ে গিয়ে পাকবাহিনীর ক্যাপ্টেন আসিফ রিজভীর কাছে সোপর্দ করা হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে চকরিয়ার মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে গোপনতথ্য বের করার জন্য আব্দুল হামিদের উপর অকথ্য নির্যাতন চলাতে থাকে। পাশবিক নির্যাতনের মাধ্যমে পাকহানাদারেরা তাঁর শরীরকে খান খান করে দেয়।
এ অবস্থায় ১৯ নবেম্বর টেকনাফের বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে আব্দুল হামিদকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আব্দুল হামিদের এই মৃত্যু মুক্তিযুদ্ধাদের সম্মিলিত শক্তিকে মৃত্যুঞ্জয়ী করে তুলে। রক্তের ফোয়ারায় জ্বলে উঠে মুক্তিযুদ্ধাদের আপন তেজ। তেজীয়ান হয়ে মুক্তিযুদ্ধারা বান্দরবানের লামায় আক্রমণ চালায়। আক্রমণের একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা ১৭টি রাইফেল ও ৩৭০০ রাউন্ড গুলি আয়ত্তে আনতে সক্ষম হয়।
সেসময় চকরিয়া উপজেলার সূর্য সন্তান হাবিলদার আবুল কালামের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি টিম পার্বত্য অঞ্চলে সফলতার সাথে যুদ্ধ করে শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হন।
মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছিলঃ
১৯৭১ সালে চকরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেসব সূর্য সন্তান স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মদ আলী (হারবাং) এনামুল হক (বরইতলী) খলিলুর রহমান (ফাঁসিয়াখালী), নুরুল আবচার হেলালী (খুটাখালী) মাষ্টার নুরুল আলম (ডুলহাজারা)৷ মাষ্টার নুরুল ইসলাম (বিনামারা), কে.এম.জলিল চৌধুরী (কৈয়ারবিল), আবু তাহের প্রকাশ জিন তাহের (কৈয়ারবিল), মাষ্টার সালামত উল্লাহ (কৈয়ারবিল), আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন কন্ট্রাক্টর (কাকারা), হাকিম ওয়াজেদ আলী (কাকারা), দেলোয়ার হোসেন (হালকাকারা), মৌলানা নুরুল হোসাইন (ভরামহুরী), আব্দুল হান্নান বিএ ও জোবায়ের আহমদ বিএসসি (বদরখালী)।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চকরিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধারা এলাকার জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁরা কাজ করেছে কক্সবাজার, বান্দরবান পার্বত্য এলাকার মুক্তিকামী মানুষের জন্যও। এভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধে চকরিয়াবাসির অবদান সারাদেশ ব্যাপি বিস্তৃতি ছিল।
এভাবে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে চকরিয়া উপজেলার যেকজন সূর্য সন্তান রক্তের বিনিময়ে জীবন দিয়ে নিজ মাতৃভূমিকে চিরঋণী করে রেখেছেন তাদের মধ্যে শহীদ হাবিলদার আবুল কালাম, শহীদ আব্দুল হামিদ, শহীদ এনামুল হক,শহীদ গোলাম কাদের, শহীদ আক্তার হোসেন, শহীদ সুবেদার গোলাম সত্তার ও শহীদ আবুল হোছাইন অন্যতম।
শহীদের স্বরণে কিছুটা অবদানঃ
জানা গেছে, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে ৫৪ বছর আগে। কিন্তু চকরিয়া উপজেলা প্রশাসন কিংবা রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকরা চকরিয়ার শহীদ ৭ বীর সেনানীর মর্যাদা প্রতিষ্টায় কিছু করতে না পারলেও আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি জাফর আলম চকরিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র থাকাকালে অনুকম্পা দেখিয়েছেন এক বীর শহীদের স্মৃতির প্রতি।
২০০৯ সালে চকরিয়া পৌরশহরে নবনির্মিত পৌরবাস র্টামিনালকে শহীদ আবদুল হামিদ পৌরবাস র্টামিনাল নামে ঘোষানা করে একটি দায়বদ্ধতা পূরণ করেছেন সাবেক এমপি জাফর আলম।
একইভাবে চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল করিম বমুবিলছড়িতে শহীদ আবদুল হামিদের নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্টা করে দিয়েছেন।
একইভাবে শহীদ হাবিলদার আবুল কালামের নামে একটি স্মৃতি পাঠাগার এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা এসকে সামসুল হুদার নামে একটি সড়কের নামকরন করে দিয়েছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, এসব নামকরণ এখনো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবে কোনটার প্রতিফলন খুঁজে পাচ্ছে না চকরিয়া উপজেলাবাসি।

Posted ৩:০৬ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
coxbangla.com | Chanchal Das Gupta