পুরো মৌসুমেই ভোক্তাকে ভুগিয়ে যাচ্ছে প্রধান খাদ্যশস্য চাল। জ্বালানি তেলের নতুন দর চালের বাড়তি এই দামের আগুনে যেন ঘি ঢেলেছে। গেল চার দিনে পাইকারিতে সব ধরনের ৫০ কেজি চালের বস্তা ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। খুচরায় প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে তিন থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত। শুধু কি চাল! বেড়েছে পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ অন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। বাজারের এই অস্থির পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ক্রেতারা।

রাজধানীর মহাখালী, কারওয়ান বাজার, তেজকুনীপাড়াসহ কয়েকটি বাজারে সোমবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোটা চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৪ থেকে ৫৫ টাকায়। বিআর-২৮ জাতীয় চাল ৫৮ থেকে ৬০, মিনিকেট ৭০ থেকে ৭৫ এবং নাজিরশাইল চাল ৭৫ থেকে ৯০ টাকায় কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

তেজকুনীপাড়া এলাকা থেকে ৫০ কেজির এক বস্তা চাল কিনে বাসার দিকে রওনা হয়েছেন বেসরকারি চাকরিজীবী গফুর আহমেদ। চালের দামের বিষয়ে জানতে চাইলে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এক বস্তা চালে ২৫০ টাকা বেশি গুনতে হয়েছে। শুধু চাল নয়, সবকিছুর দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

বেশ কয়েকটি কারণে চালের দাম বাড়ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, বন্যার কারণে এ বছর হাওরে ধান উৎপাদন কম হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী চাল আমদানির উদ্যোগ নিলেও ডলারের দাম বাড়ার কারণে আমদানি করছে না। এ কারণে চালের বাজার আগে থেকেই অস্থির।

তবে এখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে প্রতি ট্রাকে ভাড়া বেড়েছে চার থেকে ছয় হাজার টাকা। অন্যদিকে বেড়েছে চালকলগুলোর খরচও। এসব কারণে মিলগেট ও পাইকারি উভয় পর্যায়ে দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী জালাল আহমেদ বলেন, এ বছর বন্যায় ফলন কম হয়েছে। এ কারণে মৌসুমেও দাম বেড়েছে। তবে ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে এখন মিলগেটেই প্রতি ৫০ কেজি বস্তায় দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। দিনাজপুর থেকে ঢাকায় ট্রাক ভাড়া বাবদ আগে খরচ হতো ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা। এখন প্রায় ৫০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাক মালিকরা। ফলে এখন খরচ পড়ছে ২২ থেকে ২৪ হাজার টাকা। ভাড়া এবং মিলগেটে চালের দাম বাড়ার এই চাপ পড়েছে খুচরা বাজারে।

সেগুনবাগিচা কাঁচা বাজারের সেলিম রাইস এজেন্সির বিক্রয়কর্মী জামাল হাওলাদার বলেন, পাইকাররা প্রতি ৫০ কেজি বস্তার চালে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মতো দাম বাড়িয়েছেন। এ কারণে খুচরা বাজারে চালের দাম বাড়তি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বাজারে চালের সরবরাহ বাড়াতে আমদানির অনুমতি দিয়েছিল সরকার। গত ৩০ জুন থেকে এ পর্যন্ত ১০ লাখ টনের বেশি চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে ডলারের দাম বাড়ার কারণে এখন আমদানিতে ধীর গতি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ হাজার ৫৫০ টন চাল আমদানি হয়েছে।

দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে ভোজ্যতেলের বাজারে ‘ব্যস্ততা’ :

আবার লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ভোজ্যতেলের আমদানি ও পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। গত রোববার বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনে এই প্রস্তাব দেওয়ার পরই বাজারে ব্যবসায়ীদের অন্যরকম ‘ব্যস্ততা’ দেখা গেছে। বেশি করে কিনবেন কিনা, তা নিয়ে ভাবছেন খুচরা ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ। কয়েকজন খুচরা ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, আগের মতোই দাম বাড়ানোর খবরে ডিলাররা বোতলের মোড়কে লেখা থাকা দামে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে তেল বিক্রি করছেন। চাহিদা অনুযায়ী তেল দিচ্ছে না।

মহাখালী কাঁচা বাজারের মাসুমা স্টোরের স্বত্বাধিকার আল আমীন বলেন, এতদিন সেধে সেধে তেল দিয়ে যেতেন ডিলাররা। গতকাল থেকে চাইলেও পরিমাণে কম দিচ্ছেন তাঁরা। তিন কার্টন চাইলে, দিচ্ছেন এক কার্টন।
দাম বাড়ার তালিকায় পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ :দু’দিনের ব্যবধানে আরও বেড়েছে আদা ও রসুনের দাম। কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে আমদানি করা আদার দাম। এ মানের আদা বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। রসুনের দাম বেড়েছে ২০ টাকা পর্যন্ত। দেশি রসুন ৭০ থেকে ৭৫, আমদানি করা রসুন ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এক দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজ কেজিতে পাইকারি পর্যায়ে বেড়েছে পাঁচ থেকে ছয় টাকা। আর খুচরায় বেড়েছে ১০ টাকা পর্যন্ত। খুচরা পর্যায়ে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা দরে। আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে। এতদিন ৩২ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হলেও কেজিতে তিন টাকা বেড়ে লবণের কেজি বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩৮ টাকা দরে।

ক্রেতারা চিন্তিত, কিনছেনও বেশি : গতকাল কয়েকটি বাজারে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে সয়াবিন তেলের ক্রেতা বেশি। কারওয়ান বাজারে প্রায় প্রতিটি বড় মুদি দোকানে ভোজ্যতেলের ক্রেতা দেখা গেছে। এ বাজারের শাহ মিরান জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. মামুন জানান, অন্যদিনের চেয়ে গতকাল ভোজ্যতেল বিক্রি হয়েছে তুলনামূলক বেশি।

তেজকুনীপাড়া এলাকার মাঈন উদ্দিন ট্রেডার্সের বিক্রয়কর্মী জানান, হঠাৎ করে বিক্রি বেড়ে গেছে। গত দু’দিনে তাঁর প্রায় ৩০ বস্তা চাল বিক্রি হয়েছে। পূর্ব রাজাবাজার এলাকা থেকে কারওয়ান বাজারে সদাই কিনতে এসেছেন সেলিনা বেগম নামের একজন ক্রেতা। তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বাড়বে খবরে দেখেছি। দাম বাড়লে মাঝেমধ্যে পাওয়া যায় না। এ কারণে ৫ লিটারের দুটি বোতল কিনেছি।’