রবিবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

রবিবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

টেকনাফে ভয়ংকর অপরাধের ভাবমূর্তি গড়ে তুলে প্রদীপ

শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২০
5 ভিউ
টেকনাফে ভয়ংকর অপরাধের ভাবমূর্তি গড়ে তুলে প্রদীপ

কক্সবাংলা ডটকম(৬ আগস্ট) :: ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর প্রদীপকে মহেশখালী থানা থেকে টেকনাফের ওসি হিসেবে বদলি করা হয়। বিভিন্ন অভিযোগে আগেই প্রত্যাহার-বরখাস্ত হওয়া প্রদীপের মতো বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাকে রোহিঙ্গা, মাদক, মানবপাচারসহ জাতীয়-আন্তর্জাতিক ইস্যুর কারণে গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্বভার দেওয়ায় তখনও ব্যাপক সমালোচনা হয়।

টেকনাফে যোগদানের পর ইয়াবা কারবারিদের নির্মূল করা হবে ঘোষণা দেন ওসি প্রদীপ। শুরু হয় ক্রসফায়ারে মৃত্যু। তাঁর আমলে নিহত ১৬১ জনের মধ্যে কয়েকজন মাত্র শীর্ষ ইয়াবা কারবারি। তাঁর মধ্যস্থতায় শীর্ষ ইয়াবা কারবারিদের কয়েকজন আত্মসমর্পণ করেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, ইয়াবা সম্রাটদের দমন করার নামে ওসি প্রদীপ লোকজনকে টর্চারে মেতে ওঠেন।

টেকনাফের সমালোচিত সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির ভাই মৌলভি মজিবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন তালিকাভুক্ত ইয়াবা গডফাদার তাঁর শেল্টারে প্রকাশ্যেই এলাকায় ঘুরছেন। গত সংসদ নির্বাচনের আগে বদির ভাগ্নে নিপু, খালাতো ভাই মংমং সেন, ভাই শফিকসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ তালিকাভুক্ত গডফাদার প্রকাশ্যে এলাকায় ফেরেন। এর দুই মাস পর ফেব্রুয়ারিতে তাঁরা আত্মসমর্পণ করেন। বড় ইয়াবা কারবারিদের ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে আখের গুছিয়ে পালিয়ে যেতে এবং আত্মসমর্পণ করতে সহায়তা করেন প্রদীপ।

গত দেড় বছরে পলাতক দেড় শ ব্যক্তির বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভেঙে দেয় পুলিশ। ক্রসফায়ার ও বাড়িতে হামলার কারণে অনেক গডফাদার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করে সমঝোতা করেন। যাঁরা সমঝোতা করেননি তাঁদের সহযোগীদের ধরে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করা হয়েছে। এই সমঝোতার মাধ্যমে প্রদীপ শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের এজাহার মিয়াকে গত ২২ জানুয়ারি বাসা থেকে ডেকে নেন এই থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। অভিযোগ, এজাহার মিয়া মাদক কারবারে জড়িত। তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে ওসি তার কাছ থেকে চার লাখ টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা নিলেও এজাহারে দুই হাজার পিস ইয়াবাসহ আদালতে চালান দেওয়া হয়।

একইভাবে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য হাম জালালকে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়ার দু’দিন পর ইয়াবাসহ চালান দেওয়া হয়েছিল। ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকেও ছয় লাখ ৬০ হাজার টাকা আদায় করা হয়।
টেকনাফকে বলা হয় ‘ইয়াবার স্বর্গ’। এই ইয়াবা ঘিরেই নানা ধরনের অনৈতিক বাণিজ্য চালানোর অভিযোগ রয়েছে প্রদীপের বিরুদ্ধে। শুধু ইয়াবা নয়, মিয়ানমার থেকে গরু পাচার ও কাঠের ব্যবসা ঘিরেও লাখ লাখ টাকা বাণিজ্যের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে।

জানা গেছে, দুই বছর টেকনাফের ওসি থাকাকালে অনেক অঘটনের জন্ম দিয়েছেন প্রদীপ। মাদকের সঙ্গে সংশ্নিষ্টতার অভিযোগে তার আমলে টেকনাফে দেড় শতাধিক মানুষ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। এলাকায় প্রদীপ এমন ভয়ংকর ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন যে, টেকনাফের কোনো সন্তান খেতে না চাইলে তাদের মা-বাবা ওসি প্রদীপের ভয় দেখিয়ে খাওয়াতেন বলে জনশ্রুতি আছে। এলাকার মানুষ তাকে বলছেন, প্রদীপের নিচে অন্ধকার।

প্রদীপের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে বৃহস্পতিবার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল বশর। তিনি বলেন, প্রথম এক বছর ওসি প্রদীপের কর্মকাণ্ডকে তারা সমর্থন করেছিলেন। সরকার যে উদ্দেশ্যে তাকে দায়িত্ব দিয়েছিল, পরে তা থেকে তিনি সরে আসেন। তার কর্মকাণ্ডে নানা বিচ্যুতি দেখা যায়। নিরীহ অনেককে ধরে নিয়ে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে দিতেন তিনি। অনেকের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা দিয়ে টাকা আদায় করেছেন।

নুরুল বশর আরও জানান, একজনকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ দিয়ে ১৫-২০ জনকে আসামি করতেন প্রদীপ। এভাবে তার মামলার জালে অনেকে আটকে যেত। মামলার ভয়ে অনেকে দেশও ছেড়েছে। তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একাধিকবার প্রদীপের এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। অনেকে তা আমলে নিত না। কারণ স্থানীয় এমপি ওসি প্রদীপের সব কাজকে সমর্থন দিতেন। তাকে টেকনাফে রাখার জন্য একাধিক ডিও লেটারও দিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের নিহতের ঘটনা সামনে না এলে প্রদীপের দুঃশাসন থেকে কবে মুক্তি মিলত কেউ জানে না।

টেকনাফের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রদীপের টাকা উপার্জনের আরেকটি পথ ছিল মিয়ানমারের গরু পাচার। স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে প্রদীপের গভীর সখ্য ছিল। তাদের মাধ্যমে হাজার হাজার গরু মিয়ানমার থেকে এনে প্রদীপ লাখ লাখ টাকা কামাতেন।

আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল বশর বলেন, স্থানীয় গরু ব্যবসায়ী আবু সৈয়দ, মো. শরীফ ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী সজলকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই বেরিয়ে আসবে দুই বছরে কত টাকা টেকনাফ থেকে কামিয়ে নিয়ে গেছেন প্রদীপ। আবু সৈয়দ ছিল ওসির ক্যাশিয়ার। মিয়ানমার থেকে শত শত গরু এনে চট্টগ্রামে বিক্রি করতেন তারা। এ ছাড়া কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লাভবান হয়েছেন প্রদীপ।

প্রদীপের নির্যাতনের শিকার হাম জালাল ফোনে জানান, ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি গভীর রাতে হঠাৎ তার বাসার দরজায় নক করা হয়। এ সময় তিনি দেখেন, জানালার থাই গ্লাস ভেঙে ঘরে অস্ত্র ঢোকানো হচ্ছে। তিনি তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা পুলিশ বলে জানান। বাইরে থেকে বলা হয়, দরজা দ্রুত না খুললে বড় বিপদ আছে। ভয়ে দরজা খোলার পরপরই জালালকে বলা হয়, তিনি তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। ২০ লাখ টাকা দেওয়া হলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অভিযানকারীরা ওসি প্রদীপকে ফোন করেন। ওসির নির্দেশে রাতেই তাকে থানায় ধরে নেওয়া হয়।

জালাল আরও জানান, ওসির রুমে ঢোকার জন্য পৃথক দুটি দরজা আছে। যাদের টার্গেট করা হয়, তাদের ছোট দরজা দিয়ে ওসির কক্ষে ঢোকানো হয়। যাতে সিসিটিভির ফুটেজে কোনো আলামত না থাকে। ওই রাতেই জালালকে বলা হয়, বাঁচতে হলে তাকে টাকা দিতেই হবে। একপর্যায়ে ১৫ লাখে নেমে আসেন তারা। টাকা জোগাড়ের চেষ্টায় দু’দিন পার হয়ে যায়। পুলিশ হেফাজতে থাকাকালে ২৫ জানুয়ারি রাতে হঠাৎ জালালকে বলা হয়, ‘টাকা তো দিতে পারলেন না। এখন কালেমা পড়েন। আপনাকে মেরিন ড্রাইভে নেওয়া হবে।’

এটা শোনার পর ভয় পেয়ে যান জালাল। তিনি বলেন, তিনি এমন কিছু করেননি যে, তাকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা হবে। পরে ছয় লাখ ৬০ হাজার টাকা তাদের দিয়েছেন তিনি। কিন্তু মিথ্যা মামলা থেকে রক্ষা পাননি। মাদকসহ মামলা দিয়ে চালান দেওয়ার পর চার মাস জেল খেটে জামিনে বেরিয়ে আসেন জালাল।

জানা গেছে, মাদক কারবারিদের বাড়ি, যানবাহন, দোকানপাট, মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকায় অগ্নিসংযোগের অভিযোগও রয়েছে প্রদীপের বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা জানান, অনৈতিক বাণিজ্য করতে ওসির সিভিল টিম ছিল। অনেক দাগি মাদক কারবারিকে না ধরে চুনোপুঁটি ও মাঝারি কারবারিদের ধরার নামে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা হতো। ২০১৮ সালের ১৯ অক্টোবর টেকনাফ মডেল থানায় যোগ দেন ওসি প্রদীপ কুমার।

সম্প্রতি প্রদীপের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন, ‘টেকনাফের প্রতিটি গ্রামে ইয়াবা কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হবে। যাদের পাওয়া যাবে না, তাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট, যানবাহন সমূলে উৎপাটন করা হবে। তাদের বাড়িতে গায়েবি হামলা হবে। কোনো কোনো বাড়ি ও গাড়িতে গায়েবি অগ্নিসংযোগও হতে পারে।’

২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ এলাকার ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা হাবিব উল্লাহ (৩০)। তাকে মাদক ব্যবসায়ী দাবি করে তার কাছ থেকে দুটি দেশীয় অস্ত্র ও ছয় হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করেছিলেন ওসি প্রদীপ।

হাবিব উল্লাহর পরিবার দাবি করেছে, বৃক্ষপ্রেমিক হিসেবে চ্যানেল আই পুরস্কার পেয়েছিলেন হাবিব। কিন্তু স্থানীয় এক পুলিশ ও এনজিও কর্মকর্তার সঙ্গে বিরোধের জেরে ওসি প্রদীপ হাবিবকে আটক করে শত্রুদের হাতে তুলে দেন। এরপর শত্রুপক্ষের লোকজন তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই মামলায় ওসি এমন একজনকে আসামি করেন, যিনি হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস আগে থেকে জেলে ছিলেন।

ওসি প্রদীপ থেকে রেহাই পাননি ৭০ বছরের এক শিক্ষকও। গত ২৪ জুন ঝিমংখালীর এই শিক্ষককে মাদক মামলার কথা বলে ধরে নিয়ে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে ৩ লাখ টাকা আদায় করেন। টাকা দেওয়ার পরও একটি মাদক মামলায় তাকে চালান দেওয়া হয়। এ ছাড়া ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে স্থানীয় আবদুল করিম মেম্বারের কাছ থেকে ২০ লাখ, আবদুল আজিজের কাছ থেকে ১৫ লাখ, আমান উল্লাহর কাছ থেকে ছয় লাখ এবং হাসিমের কাছ থেকে সাত লাখ, সরোয়ারের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা আদায় করে তাদের কারাগারে পাঠানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদীপ কুমারকে ২০১৯ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ বা বিপিএম দেওয়া হয়। পদক পাওয়ার জন্য তিনি যে ছয়টি অভিযানের কথা উল্লেখ করেন, তার সবক’টিতেই আসামি নিহত হয়েছিল। ২৫ বছরের চাকরি জীবনের বেশিরভাগ সময় প্রদীপ কাটিয়েছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এর আগে চট্টগ্রামে বাড়ি দখলের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় তাকে সাসপেন্ডও করা হয়।

২০১৮ সালের ৩০ নভেম্বর হাবিব উল্লাহ ওরফে হাবিবকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক করে পুলিশ। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাবিবের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী কক্সবাজার আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সারোয়ার কাবেরী ফেসবুকে একটি ভিডিওবার্তা দেন। সেখানে তিনি বলেন, তার স্বামীকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এর বিচার দাবি করেন। নাজনীন এবার ওসির অবৈধ সম্পদের তদন্তের দাবি জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন।

5 ভিউ

Posted ৪:১৬ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২০

coxbangla.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Archive Calendar

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  

Editor & Publisher

Chanchal Dash Gupta

Member : coxsbazar press club & coxsbazar journalist union (cbuj)
cell: 01558-310550 or 01736-202922
mail: chanchalcox@gmail.com
Office : coxsbazar press club building(1st floor),shaheed sharanee road,cox’sbazar municipalty
coxsbazar-4700
Bangladesh
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ABOUT US :

coxbangla.com is a dedicated 24x7 news website which is published 2010 in coxbazar city. coxbangla is the news plus right and true information. Be informed be truthful are the only right way. Because you have the right. So coxbangla always offiers the latest news coxbazar, national and international news on current offers, politics, economic, entertainment, sports, health, science, defence & technology, space, history, lifestyle, tourism, food etc in Bengali.