মঙ্গলবার ২০শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

মঙ্গলবার ২০শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

নারী জীবনের পূর্ণতা কি শুধুই মাতৃত্বে?

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
186 ভিউ
নারী জীবনের পূর্ণতা কি শুধুই মাতৃত্বে?

কক্সবাংলা ডটকম(২৪ সেপ্টেম্বর) :: আমাদের সমাজে নারীর জীবন স্বামী ও সন্তান ছাড়া অসম্পূর্ণ মনে করা হয়। মনে করা হয় নারীর জীবন বৃথা সন্তান ছাড়া। মাতৃত্বের স্বাদ না পেলে নারী হয়ে জন্মানোর সার্থকতা কোথায়! আমাদের উপমহাদেশের সমাজ এভাবেই নারীকে ভাবে।

বিবাহিত নারীর সামাজিক অবস্থানে তার নিজ পরিচয় যাই হোক না কেন, সেই নারী যদি সন্তান জন্ম দিতে না পারে, তবে হোক সে গ্রামের একজন সাধারণ বধূ বা হোক সে একজন উচ্চ পদের সফল নারী, তার পরিচয় তখন বন্ধ্যা নারী হিসেবেই হয়ে থাকে আমাদের সমাজে। তার অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় পরিচয় গৌণ হয়ে যায় সন্তানহীন হওয়ার কারণে।

আমাদের সমাজে উত্তরাধিকার রক্ষায় একমাত্র প্রক্রিয়া মনে করা হয় নারীর গর্ভধারণ অর্থাৎ সন্তান জন্মদান। অথচ এটা একটা জৈবিক প্রক্রিয়া যেটাকে উত্তরাধিকার রক্ষার দোহাই দিয়ে মা হওয়াকে এত মহান করে দেখানো হয়।

মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্ত সব শ্রেণীতেই এই ধ্যান- ধারনা রয়েছে। শুধু আমাদের সমাজ নয়, নারী নিজেও তার জীবনের সার্থকতা মা হওয়াকেই মনে করে। সে তার পরিবার থেকে, সমাজ থেকে এই মানসিকতা নিয়েই বড় হতে হতে এটাকেই জীবনের স্লোগান ভেবে নেয়।

প্রতিষ্ঠিত স্বামী পাওয়া, সন্তানের মা হওয়াকেই বিবাহিত নারীর জীবন সফল, সুখের ও সার্থক মনে করা হয়। অবশ্যই মাতৃত্ব খুব সুন্দর একটি অনুভূতি। সন্তান হওয়ার পর একজন নারী নারী থেকে একজন মা হয়ে ওঠে। তখন তার জীবনটাই পাল্টে যায়। কিন্তু মা হওয়াটাই কি সবকিছু?

গর্ভে ধারণ না করেও কি মা হওয়া যায় না? পৃথিবীর সমস্ত সন্তানরাই তখন সন্তানহীন নারীর সন্তান হয়ে যায় না? মাতৃত্বই নারী জীবনের সফলতার মাপকাঠি নয় একেবারেই। কিন্তু কেন এমন মানসিকতা আমাদের সমাজে?

একজন নারী একজন মা হওয়ার আগে একজন মানুষ। মাতৃত্বই জীবনের কেন্দবিন্দু নয়, হওয়া উচিতও নয়। স্বামীর, পরিবারের, সমাজের ভুলে গেলে হবে না যে, মা হওয়াই তার জীবনের একমাত্র সত্য নয়। খুবই হতাশার কথা- এই কথা পরিবার, সমাজ তো ভুলে যায়, নারী নিজেও ভুলে যায়।

কারণ মা না হতে পারাকে একমাত্র নারীরই দোষ মনে করা হয়। সন্তান হওয়া বা না হওয়ার জন্য নারীর একার কোনো ভূমিকা নেই আমরা খুব ভালো করে জানি। তা সত্বেও আমাদের সমাজে পুরুষের অক্ষমতাকে একদমই এড়িয়ে যাওয়া হয়। আর একারণেই নিঃসন্তান নারীকে আজীবন বন্ধ্যা শব্দটি শুনতে হয়। আমরা ভুলে যাই, সৃষ্টিকর্তা না চাইলে সন্তানের মা বাবা হওয়া যায় না। মানুষ চাইলেই সন্তানের মা বাবা হয়ে যেতে পারে না।

আমরা বই-পুস্তকে ও সাহিত্যে দেখেছি বিভিন্নভাবে নারীর জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ওসব শুধু কেতাবি। বাস্তব জীবনে এর বিপরীত ধ্যান-ধারনা ও চিত্র দেখি। আমরা যা দেখি- নারী জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে বিয়ে করে স্বামী-সংসার ও সন্তান জন্মদান। নিঃসন্তান নারীর মেধা আর পরিশ্রমকে কখনো কখনো মূল্যায়ন করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবমূল্যায়ন করা হয়। তাদের মেধা আর পরিশ্রমকে ধর্তব্যের মধ্যেই ফেলা হয় না। অথচ তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দোষ ত্রুটিকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে বড় করে দেখতে খুব পারদর্শী আমরা।

নারীর তুলনায় পুরুষের পিতৃত্বে বন্ধ্যা শব্দটি খুব একটা প্রভাব ফেলে না। পান থেকে চুন খসলেই যেখানে আমরা নারীরাই আরেকজন নারীকে সব দোষ দেই, আর যদি হয় নিঃসন্তান তবে তা যেন হয়ে যায় আগুনে ঘি ঢালার মতো। সন্তানহীন নারীকে মানুষ বলেই মনে করা হয় না। খুবই দুঃখজনক। নিজের মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন এমন অনেক নিঃসন্তান নারী আছেন যাদেরকে বন্ধ্যা পরিচয়টি তাদের অবস্থান থেকে টলাতে পারেনি।

বলা হয় নারী মায়ের জাত। মায়ের জাত বলে তাকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়- তার কাজ মা হওয়া। মা হওয়া ছাড়া তার কোনো অস্তিত্ব নেই। কোনো পরিচয় নেই। আর তাই সন্তান না হলে বা হতে দেরি হলে তাকে নিয়ে আড়ালে ও প্রকাশ্যে চলে আলোচনা-সমালোচনা। নানান লোকের নানান কথা শুনতে হয় এবং নানান অদ্ভুত প্রশ্নের জবাব দিতে হয়।

খুবই দুঃখ ও হতাশার কথা যে, সন্তান না হওয়ায় অনেক দম্পতির বিবাহ বিচ্ছেদও ঘটে। সন্তান জন্ম দিয়ে নারীকে প্রমাণ দিতে হয় যে তার মন ও শরীর ঠিক আছে। এমন ঘুণ ধরা সমাজ আমাদের! সন্তানহীন বিবাহিত নারীর দিকে সমাজের অধিকাংশ মানুষের দৃষ্টিতে মিশে থাকে সহানুভূতি, করুণা এবং থাকে পরিতৃপ্তি ও অহংকার। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে, তুমি যা পাচ্ছ না, আমি তা পাচ্ছি।

আমরা এতটাই সংকীর্ণ মানসিকতার যে, নিঃসন্তান নারীর কাছে অনেক মায়েরা তাদের বাচ্চাকে ঘেষতে দেয় না, বাচ্চার মুখ দেখাতে চায় না এমনকি ছবিও দেখাতে চায় না। কী অদ্ভুত মানসিকতা!

উপমহাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় এরকম সংকীর্ণ মানসিকতা দেখা যায়। সামাজিক বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে নারীর প্রবেশের অনুমতি থাকলেও অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয় না সন্তানহীন হওয়ার কারণে। তাদেরকে বিড়ম্বনা হিসেবে দেখা হয়। অথচ এই বিড়ম্বনা দিচ্ছেন কারা? সমাজের তথাকথিত সব আছে সুখি টাইপ মানুষরাই নিঃসন্তান নারীদের বিড়ম্বনার কারণ হচ্ছেন। বাঁজা, অপয়া শব্দগুলো তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে তাদেরকে আলাদা করে ফেলা হয়। যেন তাদেরকে দেখা নিষেধ, ছোঁয়া নিষেধ।

সমাজের এমনতর আচরণ ও মানসিকতার কারণেই বিবাহিত নারী মা হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। সংসার টিকবে তো! স্বামী তোমায় ভালোবাসবে তো আজীবন এমনি করে! আরেকটি বিয়ে করে ফেললে কী হবে তোমার! স্বামীর সম্পত্তি পাবে তো তুমি! ইত্যাদি নানান হতাশার কথা নিঃসন্তান নারীকে শুনতে হয়।

ফলে সে নিজের জীবনকে অনিরাপদ মনে করে পরিবারে ও সমাজে। সর্বোচ্চ দিয়ে সে চেষ্টা চালিয়ে যায় মা হওয়ার জন্য; তা বয়স যতই হোক আর তার শারীরিক সুস্থতা থাকুক বা না থাকুক। সমাজের এই চাপিয়ে দেয়া মা হওয়াতে নারীর মনে আনন্দের চেয়ে বেশি কাজ করে ভয়।

আমরা সমাজ পরিবর্তন নিয়ে এত কথা বলি অথচ মাতৃত্ব বা মা হতেই হবে, এই পুরনো ধ্যান-ধারনা নিয়ে কিছুই বলি না, ভাবি না। এ থেকে বের হতে পারি না। নারী কেন শুধু কোনো জাত হবে? জীবনে নারীকে বিভিন্ন সম্পর্কের নারী হতে হয়। কিন্তু আলাদা করে সে শুধুই মায়ের জাত নয়। একজন মানুষ। একজন নারী।

আমাদের দায়িত্ব বিবাহিত নিঃসন্তান নারীকে মানসিক সাপোর্ট দেয়া। তাকে এমন সাপোর্ট দেয়া যেন সে নিজেকে ছোট বা বঞ্চিত মনে না করেন। হতাশা বা দুঃখবোধ যেন তাকে স্পর্শ করতে না পারে। এই মহান দায়িত্ব স্বামীর পাশাপাশি পরিবারের সব সদস্যদের, সাথে অবশ্যই সমাজের মানুষেরও।

সন্তান জন্মদান মানুষের হাতে নেই। গর্ভধারণ করে সন্তানের মা হওয়া আনন্দের বিষয়, কিন্তু কোনো গর্বের বিষয় নয়। আর সন্তান জন্মদান করতে না পারাটাও দুঃখ বা হতাশার বিষয় নয় বলেই আমি বিশ্বাস করি। অনেক নেয়ামতের মধ্যে আল্লাহর তরফ থেকে এটি একটি নেয়ামত। যেই নেয়ামত দ্বারা আমরা জীবনে সুখি হতে পারি কিংবা দুখি।

সুতরাং মাতৃত্বই সমস্ত সাফল্যের মূল এমন ভাবা বন্ধ করা না হলে নারী নিজেকে মানুষ বলে ভাবতে পারবে না। নারীর জীবনের এক এবং শেষ কথা যেন মাতৃত্ব না হয়। মা হতে হবেই এই ভারে নারী যেন তার জীবনের স্বপ্নগুলো হারিয়ে না ফেলে এবং মানুষ হিসেবে তার প্রাপ্য সম্মান থেকে যেন বঞ্চিত না হয়। শরীরের ভার, যন্ত্রণা, কষ্ট সহ্য করে সন্তান আনার স্বপ্ন ও ইচ্ছে তার নিজের বুক থেকে উঠে আসে, তাই এটার বাস্তবায়ন না হলে নারীর জীবনকে ব্যর্থ ভাবা মোটেই মানবিক বৈশিষ্ট্য নয়।

লেখক:রেহানা রহমান রেনু, শিক্ষক ও কলামিস্ট

186 ভিউ

Posted ৩:৫৮ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

coxbangla.com |

এ বিভাগের আরও খবর

Archive Calendar

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১

Editor & Publisher

Chanchal Dash Gupta

Member : coxsbazar press club & coxsbazar journalist union (cbuj)
cell: 01558-310550 or 01736-202922
mail: chanchalcox@gmail.com
Office : coxsbazar press club building(1st floor),shaheed sharanee road,cox’sbazar municipalty
coxsbazar-4700
Bangladesh
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ABOUT US :

coxbangla.com is a dedicated 24x7 news website which is published 2010 in coxbazar city. coxbangla is the news plus right and true information. Be informed be truthful are the only right way. Because you have the right. So coxbangla always offiers the latest news coxbazar, national and international news on current offers, politics, economic, entertainment, sports, health, science, defence & technology, space, history, lifestyle, tourism, food etc in Bengali.

design and development by : webnewsdesign.com