শনিবার ৩১শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

শনিবার ৩১শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

নিউইয়র্কে এই দিনগুলো

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০
155 ভিউ
নিউইয়র্কে এই দিনগুলো

স্বপন চক্রবর্ত্তী,নিউইয়র্ক,যুক্তরাষ্ট্র থেকে(৭ এপ্রিল) :: প্রায় সমস্তরাত বিছানায় একা চুপচাপ বসেছিলাম গতকাল । রাস্তার পাশেই আমার ছোট্ট রুমটি। মধ্যরাতে কোন দুর্বৃত্ত বিকট শব্দে চলে গেল মোটর সাইকেল চালিয়ে ! দুর্বৃত্ত বললাম কেন ! কে গেছে তা’তো আমি জানি না, চিনিও না, দেখিওনি ! তবু কেন এই শব্দটাই বেরিয়ে এলো কলমের মুখে !

এই মধ্যরাতে আর সবাই তো আমার মত জানলার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁচের আয়নার ওপারে নিস্পত্র বৃক্ষের শাখা ও নিঝুম বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে নেই। সকলেই হয়তো গভীর ঘুমে। তার মধ্যে কে জানে কতজন আছেন অসুস্থ বা বয়োবৃদ্ধ মানুষ ! এমন ইচ্ছাকৃত বিকট শব্দ তুলে মধ্যরাতে সবার ঘুম ভাঙিয়ে দেবার মত নীচু মন যার- সে দুর্বৃত্ত ছাড়া আর কি! কোন দুর্বৃত্ত মানুষের সম্পদ কেড়ে নেয়, কোন দুর্বৃত্ত কেড়ে নেয় তারও অধিক, কারও সম্ভ্রম। কোন দুর্বৃত্ত কেড়ে নেয় মানুষের ন্যায্য প্রাপ্যটি! আর এই দুর্বৃত্ত কেড়ে নিল নিরীহ কিছু মানুষের বহুমূল্য ঘুম !

নিউইয়র্ক এখন মৃত্যুনগরী নামে খ্যাত। মৃত্যুর মিছিল চলছে এখানে, এই নিউইয়র্কে; যমদেবের মহোৎসব যেন ! কী যে ভয়াবহ এই সময়টি তা’ঠিক লিখে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। কাল রাতে যখন শুয়েই পড়েছি, তখনই নিউইয়র্কের ব্রংকসবাসী এক স্বজন, ছোটভাই কল করলেন । আমি সারাজীবন কিছু নিয়ম মেনে চলেছি জীবনে! ঠিক সময়ে খাওয়া ও শুতে যাওয়া তার মধ্যে একটি। আর শুয়ে পড়লে আমি আর কখনও ফোন তুলি না, ফোন তখন অফ করাই থাকে ।

কিন্তু বিগত ক’দিন ফোন অফ করা হচ্ছে না -কি এক আতংকে যেন । ফোন তুলে কথা বললাম, তিনি পারিবারিক কর্তব্যবোধেই ফোন করেছেন জানতে, আমরা সবাই কেমন আছি । কথা বলতে বলতে তাঁর কাছে জানা গেল- তাঁর এলাকার সংবাদ। জানলাম, কিছু চেনা জনের মৃত্যুসংবাদ ও কারও কারও হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করার কথা! ফোন রেখে ম্যাসেজ দিলাম- আরেক স্নেহভাজন ছোট ভাইকে, যে কদিন আগেই করোনা পজিটিভ হয়েছিল ও বেশ সাহস নিয়ে মোকাবিলা করে এখন প্রায় সুস্থ হয়ে উঠছে, যা এতো খারাপ খবরের মধ্যে একটা খুশির খবর। সে জানাল, তার স্ত্রীর শরীরে এখন করোনার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে । মনটা আবার খারাপ হলো। মেয়েটি আমার সহোদরা ছোটবোনের মত। নিউইয়র্কের সংস্কৃতি অঙ্গণে বেশ চেনা মুখ – অসাধারণ গান করে সে, খুব ঈশ্বরানুরক্ত ওরা দু’জনেই !

ফোনটা রেখে পায়ে পায়ে জানলার পাশে এসে দাঁড়ালাম। টিভির সংবাদ এখন আর দেখছি না। প্রতি মুহূর্তেই লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা । একসপ্তাহ আগে যা ছিল ১০০০ তা’ এখন ১০০০০ পেরিয়ে গেছে। বেশ কিছু চেনা মানুষের মৃত্যু সংবাদ পেয়েছি । চোখের ঘুম টুটে গেছে। এখন আর শুলেও ঘুম হবে না। নিঝুম হয়ে আছে সমস্ত পাড়া ! কোথাও কেউ জেগে নেই! দিনেও এমনই নিঝুম । কেউই তো বেরুচ্ছে না ঘর থেকে।

বিশ্বমারীর এই ভয়াবহ সময়ের সাক্ষী এখন সারা বিশ্বের মানুষ! রাতারাতি সারাপৃথিবীকেই বদলে দিলো এই ভাইরাসটি। পুরো মানব সভ্যতাকেই ঝাঁঝরা করে দিলো যেন ! বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে করোনার প্রাদুর্ভাবে সরকারী পদক্ষেপে প্রচুর শিথিলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাজারে এখনও প্রচুর মানুষের ভিড় ! ঢাকায় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী খোলার সংবাদে সহস্র মানুষের ঢাকার ফেরার মিছিল দেখলে আতংকিত হতেই হয় । সরকারের কি কোন ক্ষমতাই নেই এইসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করার !

সেই সাথে নিতে হবে কিছু সরকারী ও সামাজিক উদ্যোগ । যেসব নেতারা একদিন হাত পেতে ভোট খুঁজেছেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে -তাদের এখন সাহায্যের হাত বাড়ানোর সময় – সেই মানুষদেরই প্রয়োজনে ! কিন্তু কতজন তেমন করে মাঠে নেমেছে? দিনে এনে দিনে খাওয়া দরিদ্র মানুষগুলো যে না খেতে পেয়েই মরে যাবে, করোনায় ধরবার আগেই ! তাদের কথা সরকার কি ভেবেছেন ! নেতারা কি উদ্যোগ নিয়েছেন ? কিছু তরুণ তুর্কীদল নিজেরাই চাঁদা তুলে নীরবে কিছু কাজ করছে জানি। তারা তাদের এই ভালো কাজগুলো নিভৃতেই করছে। ছবি তুলে পত্রিকায় দিচ্ছে না বা আধসের চাউল বা একটি কলা হাতে ধরিয়ে দিয়ে অসভ্যের মত ফেসবুকে পোষ্ট দিচ্ছে না দাঁত কেলিয়ে।

এই নিউইয়র্কেও প্রচুর গৃহহীন সহায়হীন মানুষ আছেন ! সারা আমেরিকাতেই আছে। তাদের সেবার জন্যে প্রচুর শেল্টারও আছে। কিন্তু অনেকেই শেল্টারে থাকতেই চায় না। পথে ঘাটে পরে থাকে নিজস্ব স্বাধীনতার জন্যে । যে আমেরিকা সারা পৃথিবীতে অকারণ পুলিশীগিরি করে বেড়ায় তার নিজের ঘরেই কত সহস্র অভুক্ত মানুষ আছে তার ইয়ত্তা নেই।

তেমনই একজন, নিকারাগুয়ার কার্লোস । না, কোন বৈধ কাগজপত্র নেই, কখন কিভাবে আমেরিকায় এসেছিল এখন আর মনেই নেই। বয়সও অনুমান করা সহজ নয়। চল্লিশও হতে পারে, আবার ষাটও হতে পারে। মানসিক বৈকল্যও কিছুটা গ্রাস করেছে ওকে। পথের পাশে বসে থাকে । কারও কাছে হাত পাতে না। কিছু চায়ও না। তবুও কেউ দয়া পরবশ হয়ে হাতে কিছু দিলে চুপচাপ নেয়। অস্ফুটে বলে – থ্যাংক ইউ ! যে বাড়িটির সামনে সে বসে থাকে সারাদিন- তার মালিক এক অশিতীপর শ্বেতাঙ্গিনী বৃদ্ধা মহিলা, সিলভিয়া। পুরো বিল্ডিং তাঁর ভাড়া দেয়া, নিজের এপার্টমেন্টটি ছাড়া। তিনি নিজে থেকেই দু’বেলা খাবার যোগান কার্লোসের । কখন কার উপরে কেন যে মায়া লেগে যায় কে জানে !

এই বৃদ্ধার জীবনের ইতিহাসও কেউ জানে না। এলাকার সবাই তাঁকে চিরকাল একাই দেখে অভ্যস্ত। প্রতি রবিবার খুব সেজেগুঁজে মৃদুপায়ে হেঁটে হেঁটে পরের ব্লকের চার্চে যান । আধেকদিন সেখানে কাটান । এ ছাড়া তাঁকে আর কিছুই করতে দেখা যায় না। তিনি এলাকায় সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন হঠাৎ! কারণ, তিনি করোনার জন্যে তাঁর ভাড়াটিয়াদের ভাড়ার টাকা মওকুফ করে দিয়েছেন দুইমাসের।

গত কদিন ঘর থেকে বেরই হইনি- সরকারী নির্দেশ মেনে। ঘর থেকেই অফিসের কাজ করছি। কাল সকালে শুনি মায়ের পান ফুরিয়ে গেছে। ভাত না হলেও মায়ের দিব্যি চলে যাবে – কিন্তু পান না হলে তো চলবে না, তা’ আশৈশব জানি। মা’কে বললাম – মা পান নিয়ে আসি – যাব আর আসব। মা বললেন – ‘খবরদার, বেরুবি না; আমি সুপুরী খেয়ে থাকব। পান লাগবে না’! কি আর করি ! দুপুরের খাবার পরে মা একটু শুয়েছেন, মেয়েরা নিজেদের লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত । এই ফাঁকে মনে মনে মা’কে বললাম – ক্ষমা করো মা, পানটা নিয়েই আসি । নইলে আমার যে বড্ড অস্বস্তিতে কাটবে সারাদিন। কথাগুলো জপতে জপতেই চুপটি করে বেরিয়ে গেলাম । একটা ঘুরপথে গিয়ে কাছের বাঙালি দোকান থেকে পান, খৈ, আরও কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে ফিরছি !

দেখি, সিলভিয়ার বাড়ির সামনে কার্লোস নেই । সিলভিয়া নিজে একটি মোমবাতি জ্বালাচ্ছে ও একটি ফুলের স্তবক রেখে দিয়েছে সেখানে ! মানেটা কি ! দাঁড়িয়ে সিলভিয়াকে জিজ্ঞেস করতেই দেখি- মাতৃস্নেহাতুর বৃদ্ধার চোখে অশ্রুধারা ॥ কার্লোস আর নেই! দুদিন আগে জ্বরের ঘোরের মধ্যে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল অ্যাম্বুলেন্স ডেকে। আজ টেলিফোন এসেছে, কার্লোস আর নেই – করোনার হাতে বলি হয়েছে সে । মনটা ভারী বেদনাতুর হয়ে গেল । সিলভিয়াকে সান্ত্বনা দিতে পারি অমন ভাষার শক্তি তো আমার নেই । বাড়ি ফিরে চুপচাপ মায়ের পানের বাটায় পানগুলো রেখে, কাপড়চোপড় পাল্টে হাতমুখ ধুয়ে গভীর বিষণ্ণ মনে বসে রইলাম মায়ের পাশে। মা ঘুমুচ্ছেন – আমি শুধু চেয়ে আছি মায়ের শান্ত, স্নিগ্ধ, আলোকিত, ঘুমন্ত মুখের দিকে । আমার জন্মদাত্রী মা – আমার সাক্ষাৎ ঈশ্বর !

লেখক : স্বপন চক্রবর্ত্তী,নিউইয়র্ক,যুক্তরাষ্ট্র থেকে (কক্সবাজারের রামু প্রবাসী)

 

155 ভিউ

Posted ৪:২২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০

coxbangla.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

Archive Calendar

Editor & Publisher

Chanchal Dash Gupta

Member : coxsbazar press club & coxsbazar journalist union (cbuj)
cell: 01558-310550 or 01736-202922
mail: chanchalcox@gmail.com
Office : coxsbazar press club building(1st floor),shaheed sharanee road,cox’sbazar municipalty
coxsbazar-4700
Bangladesh
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ABOUT US :

coxbangla.com is a dedicated 24x7 news website which is published 2010 in coxbazar city. coxbangla is the news plus right and true information. Be informed be truthful are the only right way. Because you have the right. So coxbangla always offiers the latest news coxbazar, national and international news on current offers, politics, economic, entertainment, sports, health, science, defence & technology, space, history, lifestyle, tourism, food etc in Bengali.

design and development by : webnewsdesign.com