মঙ্গলবার ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

মঙ্গলবার ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ভুটান : কার্বন নিগেটিভ সুখী মানুষের দেশ

শনিবার, ১৩ জুন ২০২০
35 ভিউ
ভুটান : কার্বন নিগেটিভ সুখী মানুষের দেশ

কক্সবাংলা ডটকম(১৩ জুন) :: ডিসেম্বরের শেষে কনকনে শীতে যখন ঢাকাতেই কাবু হওয়ার উপক্রম, সেই সময়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম ভুটানের পথে। দেশটিতে নাকি তখন রাতে মাইনাস ১০ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা নেমে আসে। শীতের ভয় উপেক্ষা করে ভুটান গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই অন্যরকম ভালো লাগা শুরু হলো।

আমরা চলেছি থিম্পুর পথে। রাস্তার পাশে প্রচুর ভাসমান কমলালেবুর দোকান। ভুটানে ঘুরতে গিয়ে এই কমলালেবুর স্বাদ না নেওয়া বোকামি।

খাঁড়া পাহাড় কেটে বানানো রাস্তা। পাশেই কয়েকশ’ ফুট গভীরে নদী। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ এতটাই ভয়ঙ্কর যে, চালক একটু অসাবধান হলেই মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

গভীর রাতে হোটেলে পৌঁছালাম। থিম্পু শহর থেকে বেশ বাইরে নদীর পাশে কটেজটি অসাধারণ। তার চেয়েও দারুণ এর মালিক। এখানে আসার পর থেকেই ভুটানিজদের নম্র, ভদ্র ও বিনয়ী ব্যবহার দেখেছি। আমাদের ট্যুরের একেবারে শেষ পর্যন্ত এটা অব্যাহত ছিল।

কটেজ মালিক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং বাংলা পারেন। আমরা একই পেশার লোক হওয়ায় গল্প জমলো বেশ। গভীর রাতে তিনি ফিশ ফ্রাই করে ভুটানের গল্প শোনাতে বসলেন।

একটা দেশ কতটা উন্নতি করছে তার মাপকাঠি হলো জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন)। সারা পৃথিবী এই মাপকাঠিতেই বিচার করে কোন দেশ কতটা এগিয়ে। ভুটানে মাপকাঠিটা হলো জিএনএইচ (মোট জাতীয় সুখ)।

.ভুটানে বুদ্ধ পয়েন্ট

পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, অফিস-আদালতের নকশায় নিজস্ব সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ, প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ ইত্যাদি কারণে ভুটান অন্য সব দেশের তুলনায় স্বকীয় অবস্থানে রয়েছে। প্রকৃতিকে তারা দেবতার মতোই শ্রদ্ধায় আগলে রাখে।মাত্র সাড়ে ৭ লাখ মানুষের বসবাস ভুটানে। চারপাশে ঘন বন থাকার পরও ২০১৫ সালে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ সংখ্যক বৃক্ষরোপণ করে গিনেস রেকর্ড বইয়ে নাম লিখিয়েছে দেশটি। ফলে ভুটান এখন কার্বন নিগেটিভ দেশ হিসেবে স্বীকৃত। পুরো ভুটানকে জড়িয়ে রেখেছে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি নদী। ভুটান সরকার প্রতি মাসে একবার করে নদী পরিষ্কার করে, যাতে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ঠিক থাকে। সারা ভুটানে পানির চাহিদা পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখে এখানকার নদী ও পাহাড়ি ঝরনা।

ভুটানে সকাল শুরু

সকালে ঘুম থেকে উঠে হোটেলের ব্যালকনিতে যেতেই দুটি জিনিস মুগ্ধ করলো। একটি হলো একই আদলে বানানো ভুটানিজ বাড়ি। এছাড়া রাস্তার ওপরের পানির পাইপলাইন থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়া পানির জমাট বেঁধে নকশা হওয়া অপূর্ব। মনে হচ্ছিল, ‘ফ্রোজেন’ ছবির কোনও দৃশ্য দেখছি! রাতে থিম্পুর তাপমাত্রা মাইনাসে নেমে আসে, এ কারণে পানির লাইনের পাইপ ফুটো হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়া পানি জমাট বেঁধে ফুলঝুড়ির মতো হয়েছে।

ইচ্ছে ছিল অনুমতি নিয়ে পুনাখা যাবো। ক্লক টাওয়ার থেকে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু অনুমতি পেতে দেরি হওয়ায় ভ্রমণের পরিকল্পনা বদলে থিম্পু শহর ঘুরতে বের হলাম আমরা। পুরো শহর সুন্দর আর সাজানো গোছানো। আশেপাশে নজরে পড়া সব ভবনই যেন ক্যানভাসে আঁকা ছবি! ভুটানিজরা ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিটি বাড়ি নিজস্ব আদলে নকশা করে।

.ভুটানে বুদ্ধ পয়েন্ট

দূর থেকে স্টেডিয়াম, আর্চারি গ্রাউন্ড, ভুটানের রয়্যাল প্রাসাদ দেখে সবশেষে গেলাম বুদ্ধ পয়েন্টে। ভুটানের চতুর্থ রাজার ৬০তম জন্মদিনে ১৬৯ ফুট (প্রায় ১৭ তলার সমান) উচ্চতার এই স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে একটা বুদ্ধের মূর্তি দেখা গেলেও মূলত ১ লাখ ২৫ হাজার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বুদ্ধের সমন্বয়ে এটি গঠিত। পাহাড়ের চূড়ায় বানানো ব্রোঞ্জের বুদ্ধের সামনে দাঁড়ালে থিম্পু শহরের অনেকাংশই চোখে পড়ে।

পারোর পথে যাত্রা

থিম্পু থেকে পারো যাওয়ার পথে জানালা থেকে চোখ সরাতে পারলাম না। পাহাড়ের কোলঘেঁষে রাস্তা। একপাশে পাহাড়, অন্যপাশে নদী। নদীর ওপাশেও পাহাড়। সেই পাহাড় একেক সময় একেক রূপে হাজির হচ্ছে চোখের সামনে। কখনও বিশাল গাছপালা বুকে ধারণ করছে তো কখনোবা লাল রঙের পাথর।

পারোতে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেলো। শহরে প্রবেশের মুখেই অসাধারণ দৃশ্য দেখে আমরা মুগ্ধ। ভুটানের জাতীয় জাদুঘরে মনোরম আলোকসজ্জা, দূর থেকে যেন মনে হচ্ছে ওপর থেকে আলোর ফোয়ারা নেমে আসছে! পরিকল্পনা ছাড়াই পারোতে আসায় হোটেলে উঠতে কিছুটা বেগ পেতে হলো। পরদিন চেলালা পাস যাবো বলে রাতের খাবার শেষ করে দ্রুত বিছানায় গেলাম।

ভুটানে চেলেলা পাস

চেলেলা পাসের চূড়া ছোঁয়ার স্বপ্ন

পারো থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ চেলেলা পাস। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার মিটার ওপরে। পারো বিমানবন্দরকে পাশ কাটিয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠতে হয় প্রায় ২৩ কিলোমিটার। ঘন পাইন বনের মাঝখান দিয়ে পুরোটা পথ। যেতে যেতে চোখে পড়লো নানান রঙের ফুল আর সবুজ উপত্যকা ও পাহাড়ি ঝরনা। যত ওপরে যাচ্ছিলাম ততই তাপমাত্রা কমছিল।

একসময় দেখা মিললো বরফের। কোথাও কোথাও পাহাড় বেয়ে নেমে আসা ঝরনার পানি জমাট বেঁধেছে। বুঝে গেলাম চেলেলা পাস আসতে আর দেরি নেই। চেলেলা পাসে নামার পর মনে হলো বুঝি মেঘের রাজ্যে চলে এসেছি। চোখের সামনে দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়। নজরে পড়া সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টা আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছিল যেন!

আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ট্রেকিং করে পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত যাবো। এর আগেও অনেকেই পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত যাওয়ায় পায়ে হাঁটা একটা পথ তৈরি হয়েছে। অল্প কিছুদূর যেতেই আমাদের সঙ্গে যোগ দিলো একটা পাহাড়ি কুকুর। দ্রুতবেগে সামনে এগিয়ে আমাদের পথ দেখিয়ে চলল সে। কী অবলীলায় হেঁটে যাচ্ছে দেখে ঈর্ষা হচ্ছিল! আমরা বিশ্রাম নিতে বসলে সেও বসে, আমরা হাঁটলে সেও হাঁটে।

হাঁটা পথ শেষ হলে একটা উপত্যকার মতো জায়গায় পৌঁছালাম আমরা। ছোট ছোট গুল্ম পুরো জায়গাটাকে ঢেকে রেখেছে। চারপাশ কী ভয়ানক সুন্দর! বিশ্রাম নিতে বসে পড়লাম আমরা। যতদূর দৃষ্টি যায় পাহাড় আর মেঘের ছড়াছড়ি। কয়েক হাজার ফুট নিচে দুই পাহাড়ের কোলঘেঁষে পাইন গাছের সারি। সেই গাছের মাথা ছুঁয়েছে কুয়াশার মতো মেঘ।

আমরা লক্ষ্যের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি। পাহাড়ের মাথায় ছোট একটা মন্দিরের মতো দেখা যাচ্ছিল। সেখানে যেতে হলে খাড়া পথ পাড়ি দিতে হবে। অল্প কিছু সময়েই সেখানে পৌঁছানো গেলো। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বৌদ্ধ পুরোহিতরা পাহাড়ের দুর্গম জায়গাটাকেই তাদের প্রার্থনার জায়গা হিসেবে পছন্দ করে! এত ওপরে কীভাবে মন্দির বানানো হলো তা ভেবে অবাক হচ্ছিলাম। অবশ্য টাইগারনেস্টে যাওয়ার পর এই আশ্চর্যভাব চলে গিয়েছিল।

এবার ফেরার পালা। নামতে গিয়ে টের পেলাম দু’পাশ ভীষণ ঢালু। পাহাড়ের মাথায় চড়ার স্বপ্নটা দুঃস্বপ্ন হতে বেশি সময় নিলো না। একবার পা পিছলালে কয়েক হাজার ফুট নিচে গহীন পাইন বনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হবে। হাড়গোড় কিছুই খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনিতে প্রচণ্ড শীতে টেকা দায়, সেইসঙ্গে ঝড়ো বাতাস, তার ওপর হাতমোজা নেই। এমন অবস্থায় হাড়ে কাঁপুনি ধরার মতো অবস্থা। প্রতিটা ধাপ মেপে ফেলতে হচ্ছে। মনে হচ্ছিল এই বুঝি পা পিছলালো! বিপজ্জনক পথটুকু নামতেই আধাঘণ্টার মতো লেগে গেলো।

হাঁটাপথে ফিরতেই কলিজায় পানি ফিরে এলো যেন! যাক, মনে হলো আর চিন্তা নেই। বাকি পথটা লম্বা হলেও বিপদ কেটে গেছে। গাড়ির কাছে ফিরে দেখি একটা ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে। আগুনের সামনে গিয়ে মেলে ধরলাম প্রায় অবশ হয়ে যাওয়া হাত।

.ভুটানে টাইগার নেস্ট

টাইগার নেস্ট— বাঘের নীড়ের গল্প

ভুটান মানেই আমাদের চোখের সামনে টাইগার নেস্টের ছবি ভাসে। খাড়া পাহাড়ের কিনারায় বানানো বৌদ্ধদের এই মন্দির নিয়ে অনেক পৌরাণিক গল্প প্রচলিত আছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় মিথ হলো— গুরু রিনপোচে নামের একজন পুরোহিত তিব্বত থেকে বাঘের পিঠে চড়ে এখানে এসে ধ্যানে বসেন। সেজন্য এই জায়গার নাম হয় ‘টাইগার নেস্ট’। গল্পটার চেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো খাড়া পাহাড়ের ভাঁজে ১৬৯২ সালে নির্মাণ করা এই মন্দির। পায়ে হেঁটে মন্দির অব্দি পৌঁছাতেই ৩-৪ ঘণ্টা লাগে। ওই দুর্গম পাহাড়ে কীভাবে নির্মাণ হলো এমন স্থাপনা, সেটা ভাবতে গেলে মাথা গুলিয়ে যায়!

ট্রেকিংয়ের প্রস্তুতি নিয়েই বের হয়েছিলাম। শুরুতে তুমুল উৎসাহে হাঁটা শুরু করলেও পথ যেন শেষই হচ্ছিল না। ওপর থেকে ফিরে আসা কাউকে কতটুকু পথ বাকি আছে জিজ্ঞেস করলে একই উত্তর পাওয়া যায়— অর্ধেকও নাকি উঠতে পারিনি! পুরো হাঁটাপথে মনোবল টিকিয়ে রেখেছিল ভুটানি বুড়ো মানুষ আর ছোট বাচ্চারা। দোতলায় সিঁড়ি বেয়ে ওঠার মতো তারা নাচতে নাচতে নেমে আসছিল। টানা সাড়ে তিন ঘণ্টা পাহাড় বেয়ে নাগাল পেলাম টাইগার নেস্টের। এত উচ্চতায় এমন অপূর্ব সৃষ্টি দেখে বাঘের পিঠে চড়ে উড়ে আসা পৌরাণিক গল্পকে মনে হচ্ছিল সত্যি!

দরকারি তথ্য

বাংলাদেশ থেকে ভুটানে যেতে দূতাবাস থেকে কোনও ভিসা নিতে হয় না। যদি সড়কপথে যেতে চান তাহলে ভারতের ট্রানজিট ভিসা লাগবে। চ্যাংড়াবান্ধা থেকে জয়গাঁও গেলে মাইক্রোবাস ভাড়া পাওয়া যায়। জয়গাঁও হলো ভারত-ভুটান সীমান্ত। সেখানে গিয়ে তাৎক্ষণিক ভুটানের ভিসা নিলেই কেল্লাফতে! ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাছেই ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি ভাড়া নিয়ে চলে যেতে পারবেন থিম্পু, পুনাখা কিংবা পারো।

35 ভিউ

Posted ১:৩৭ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৩ জুন ২০২০

coxbangla.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

Archive Calendar

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  

Editor & Publisher

Chanchal Dash Gupta

Member : coxsbazar press club & coxsbazar journalist union (cbuj)
cell: 01558-310550 or 01736-202922
mail: chanchalcox@gmail.com
Office : coxsbazar press club building(1st floor),shaheed sharanee road,cox’sbazar municipalty
coxsbazar-4700
Bangladesh
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ABOUT US :

coxbangla.com is a dedicated 24x7 news website which is published 2010 in coxbazar city. coxbangla is the news plus right and true information. Be informed be truthful are the only right way. Because you have the right. So coxbangla always offiers the latest news coxbazar, national and international news on current offers, politics, economic, entertainment, sports, health, science, defence & technology, space, history, lifestyle, tourism, food etc in Bengali.