১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং যখন চাঁদের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছিলেন তখন থেকেই মানুষের অসীম তৃষ্ণা মহাকাশের অজানাকে জানার জন্য যা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে আমাদের সামনে সুযোগ এখন আগের থেকে অনেক বেশি। আমরা আসলে এখন আছি মহাকাশ অভিযানের এক যুগ সন্ধিক্ষণে। আজ আমরা জানব, বিপুল রহস্যের গন্ধ নিয়ে আমাদের সামনে কি কি অভিযান অপেক্ষা করছে।

মার্স ২০২০

চলুন শুরু করি আমরা মোটামুটি জানি এমন এক অভিযানের গল্প দিয়ে। নাসার মঙ্গল অভিযান প্রোগ্রামের পরবর্তী অভিযান মার্স ২০২০ রোভার মিশন। সাধারণত মহাকাশ অভিযানগুলো এক উদ্দেশ্যে শুরু হলেও পরে এর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, ব্যাপ্তি বদলে যায়। সেই তুলনায় রোভার মিশন ২০২০ এ আমরা মোটামুটি নিশ্চিত ভাবে জানি এই অভিযান কিভাবে হবে আর কি উদ্দেশ্য এই অভিযানের। এই অভিযানের উদ্দেশ্য আমাদের মনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা, তার মধ্যে অবশ্যই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, এই লাল গ্রহে জীবনের সম্ভাবনা খুঁজে বের করা।

মার্স রোভার ওই গ্রহে জীবন ধারণের জন্য উপযোগী উপাদান আছে কিনা তা খুঁজে দেখবে, দূর অতীতে সেখানে জীবনের কোন চিহ্ন ছিল কিনা তা যাচাই করবে আর অতীতে সেখানে কোন অতিক্ষুদ্র জীব ছিল কিনা তা খুঁজবে। যেহেতু ভবিষ্যতে লাল গ্রহে মনুষ্য অভিযানের সম্ভাবনা আছে তাই মার্স রোভার মিশন ২০২০ এর গুরুত্ব অপরিসীম। এই মিশন মঙ্গল থেকে নানা রকম নমুনা সংগ্রহ করে আনবে যার বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা প্রাপ্ত ফলাফলের উপরে নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ অভিযান সমূহ। ২০২০ সালের গ্রীষ্মে এই অভিযান শুরু করার কথা।

মার্স ২০২০ এর কাজ মঙ্গলে জীবনের সম্ভাবনা খুঁজে বের করা; Image Source: Space.com

এক্সমার্স ২০২০

নাসাকে টেক্কা দিতে ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সি ও রাশিয়ান রোকসমস যৌথ উদ্যোগে মঙ্গল অভিযানের পরিকল্পনা করেছে। যদিও নাসার সাথে তাদের কোন শত্রুতা নেই তবুও কাকতলীয় ভাবে এই অভিযানও হবে ২০২০ সালে। এই অভিযানে ল্যান্ডিং প্লাটফর্মের সাথে একটি রোভার যান থাকবে যেটি এক বছর ধরে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠ পরীক্ষা করে দেখবে। এই অভিযানে রোভার যান বহু আগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া জৈব অনু বা যেকোন জৈব চিন্হ বা সম্ভব হলে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে দেখবে। অবাক করা বিষয় হল নাসার মার্স প্রোগ্রামের মত এই অভিযানও শুরু হবে ২০২০ সালের গ্রীষ্মে।

এই মিশনের উদ্দেশ্যও এক; Image Source: aircosmosinternational.com

এস্টেরয়েড রিডিরেক্ট রোবোটিক মিশন (ARRM)

এই অভিযানের কথা শুনলে ১৯৯৮ সালের ক্লাসিক সাইন্স ফিকশন মুভি ‘আর্মাগেডন’ ভক্তদের খুশি হবার কথা। নাসা পরিকল্পনা করেছে ওই মুভির মতোই স্পেসশীপ নিয়ে উড়ে যেয়ে একটি গ্রহাণুর উপরে অবতরণ করা আর সেখান থেকে নানা জিনিস সংগ্রহ করে এই শৈলখণ্ডটির মুখ ঘুরিয়ে দেয়া যেন এটি চাঁদের কক্ষপথে গিয়ে ঘুরতে থাকে। তখন মহাকাশচারীদের পক্ষে চাঁদ অব্দি উড়ে যেয়ে গ্রহাণুর উপরে আরও বিস্তারিত গবেষণা করা সহজ হবে। এই অভিযানটিতে মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান ব্যবহৃত হবে।

গ্রহানু নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর দেবে এই অভিযান; Image Source: JPL – NASA

অবাক করা বিষয় হলো পৃথিবীর চারপাশে যে বিপুল সংখ্যক গ্রহাণু প্রতিবছর শনাক্ত হয় তার মাঝে খুব সামান্য পরিমাণ গ্রহাণুতে এই অভিযান চালানো যেতে পারে। আরও সঠিক করে বললে ১০০০ গ্রহাণুর মাঝে মাত্র চারটিতে এমন অভিযান চালানো সম্ভব। আশার কথা হচ্ছে এর মাঝে নাসা কয়েকটি সম্ভাব্য গ্রহাণু খুঁজে পেয়েছে যাদের কোনো একটিতে অভিযান চালিয়ে ২০২০ সাল নাগাদ চাঁদের কক্ষপথের দিকে ঘুরিয়ে দেয়া যাবে।

প্রস্পেক্টর-১

এর সাথে ‘আর্মাগেডন’ মুভির যেমন মিল আছে তেমনি জেমস ক্যামেরনের ‘এভাটার’ মুভিরও খানিকটা ছায়া আছে। প্রস্পেক্টর-১ হতে যাচ্ছে পৃথিবীর প্রথম আন্তঃগ্রহ খনি অভিযান। এই প্রস্তাবনা এসেছে ‘ডিপ স্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামক ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত আমেরিকান মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে। একদম নতুন ধরনের এই মহাকাশ ভ্রমণের উদ্দেশ্য পৃথিবীর কাছাকাছি কোন গ্রহাণুতে উড়ে গিয়ে সেখানে সরাসরি খনন কাজ না করে শুধু ওই গ্রহাণুতে আমাদের জন্য মূল্যবান কিছু আছে কিনা তা খুঁজে দেখা।

গ্রহাণু হতে পারে খনিজের উতস্য; Image SOurce: MINING.com

যদিও ২০১৭ সালেই প্রস্পেক্টর-১ এর পূর্বসূরি হিসেবে প্রস্পেক্টর-এক্স এর পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের কথা ছিল তবে কোন এক কারণে সেটা হয়নি। এখন বলা হচ্ছে এই দশকের শেষের দিকে প্রস্পেক্টর-১ মহাকাশে যাত্রা করবে। যদিও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তাদের এখনো অনেক কাজ বাকি রয়ে গিয়েছে তবুও যদি এই মহাকাশযান আকাশে ওড়ে তাহলে সেটি আমাদের জন্য অনেক উত্তেজনাপূর্ণ হবে।

নক্ষত্রের বুহ্যভেদ

আমাদের এই তালিকার দিকে একটু মনোযোগ দিয়ে তাকালে বুঝতে পারবেন আমরা একটু একটু করে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো করে চিন্তা ভাবনা করছি। তাহলে এবার আমরা আরেকটু সাহসী হই, আমরা এবার দুই তারকার মধ্যবর্তী অসম্ভব বিশাল দূরত্ব অতিক্রমের দুঃসাহস দেখাই।

একটি গবেষণা প্রজেক্টের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, এখানে ছোট্ট প্রোবের একটি বহর আলোর গতির প্রায় ২০ শতাংশ গতিতে চলে ৪.৩ আলোকবর্ষ দূরে সূর্যের পর পৃথিবীর সব থেকে কাছের নক্ষত্র আলফা সেন্টারাইতে পৌঁছাবে। এই বহরের সেখানে পৌঁছাতে ২০ থেকে ৩০ বছর লাগবে আর সেখান থেকে বার্তা আরও ৫ বছর পরে পৃথিবীতে এসে পৌঁছাবে।

মানুষ পৌঁছে যেতে চায় নক্ষত্রান্তরে; Image Source: Ars Technica

এই প্রজেক্টের অংশ হিসেবে ২০১৭ সালে ৩.৫ সে.মি. X ৩.৫ সে.মি. আকারের ও চার গ্রাম ওজনের সৌরশক্তি চালিত ছোট্ট কিছু প্রোবকে সফলভাবে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হয়। তারপরও হয়তো এই মিশন শুরু করতে আরো ২০ বছর পেরিয়ে যাবে।

মহাকাশ নিয়ে আমাদের স্বপ্ন, কল্পনার কোন সীমা পরিসীমা নেই, এর মাঝে অনেকগুলো হয়তো কখনোই বাস্তব হবেনা তবে আমরা হয়তো একদিন অন্য কোন গ্রহে ঠিকই পৌঁছে যাবো।