বুধবার ৪ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ ফাল্গুন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুরু হলো বিজয়ের মাস : রণাঙ্গনে তীব্র লড়াই, তৎপর কূটনীতিও

🗓 Monday, 1 December 2025

👁️ ১১২ বার দেখা হয়েছে

🗓 Monday, 1 December 2025

👁️ ১১২ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১ ডিসেম্বর) :: ডিসেম্বরের প্রথম দিন আজ।শুরু হলো আমাদের বিজয়ের মাস। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে এ মাসেই জাতির চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। ধরা দেয় হাজার বছরের স্বপ্নের স্বাধীনতা।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে এ জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবের অধ্যায় রচিত হয়।

বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ভাষার ভিত্তিতে যে জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছিল, এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিজয়ের মাধ্যমে ঘোষিত স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়।

এ মাসেই পূরণ হয় বাঙালি জাতির হাজার বছরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বপ্নসাধ। বছর ঘুরে আবার এসেছে সেই বিজয়ের মাস।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ডাক দিয়েছিলেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ঐতিহাসিক সেই ভাষণে উদ্দীপ্ত জাতি প্রস্তুতি নিতে স্বাধীনতা অর্জনে লড়াই শুরুর। ২৫ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক বাহ

িনী এ দেশের নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, অপারেশন সার্চ লাইটের নামে শুরু করে গণহত্যা। পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় বেঘোরে প্রাণ হারায় অসংখ্য মানুষ ।আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হানাদারদের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে জাতি। দেশজুড়ে তৈরি হয় ভয়াবহ অরাজকতা ও রাজনৈতিক শূন্যতা।

বাঙালির এই দুঃসময়ে জীবনবাজি রেখে এগিয়ে আসেন অচেনা ও অখ্যাত এক মেজর। চট্টগ্রামে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত মেজর জিয়াউর রহমানা স্বাধীনতার ঘোষণায় উদ্বেলিত জনগণ সাহসের সঙ্গে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

জন্মভূমিকে বাঁচানোর যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের শহীদ হওয়া এবং দুই লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালি জাতি দেখা পায় তার পরম আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।

তবে সেই আনন্দের ক্ষণেই ঘনিয়ে ওঠে এক অভুতপূর্ব শোক। এ দেশীয় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সহায়তায় চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে পাকিস্তানি সেনারা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে লেখক, শিক্ষক, শিল্পীসহ জাতির শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের অনেককে। ডিসেম্বর তাই বাঙালি জাতির জন্য যুগপৎ অশ্রুও উৎসবের মাস।

রণাঙ্গনে তীব্র লড়াই, তৎপর কূটনীতিও

১ ডিসেম্বর ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর পেরিয়ে গেছে আট মাস। এরই মধ্যে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) প্রবেশ করেছে ভারতীয় বাহিনী। রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ের পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমানতালে চলছিল কূটনৈতিক তৎপরতা।

নভেম্বরের শেষ ও ডিসেম্বরের শুরুতে ওই তৎপরতার দুটি দিক সামনে আসে। একটি পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক বাহিনী পাঠানোর প্রস্তাব এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন। অপরটি পূর্ব পাকিস্তানে বাহিনী পাঠানোয় ভারতকে বৈদেশিক সহায়তা বন্ধের হুমকি।

একাত্তরের ২ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক ও আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যবেক্ষক বাহিনী পাঠানো নিয়ে ২৮ নভেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। পরদিনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের একটি চিঠি নিয়ে হাজির হন রাষ্ট্রদূত কেনেথ বার্নার্ড কিটিং।

চিঠিতে কী ছিল সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বলে রাখা দরকার, মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মূলত পর্যবেক্ষক বাহিনী মোতায়েনের পক্ষে অবস্থান নেয়। ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র চার্লস ব্রের ব্রিফিংয়ে সেটি স্পষ্ট হয়। ইয়াহিয়া খানের প্রস্তাবকে স্বাগত জানান তিনি। সাংবাদিকদের বলেন, উত্তেজনা প্রশমন কিংবা সৈন্য প্রত্যাহারে সহায়তা করতে পারে এমন যে কোনো ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্র ফলপ্রসূ পন্থা বলে মনে করে (ইত্তেফাক, ২ ডিসেম্বর)।

চার্লস ব্রের ব্রিফিংয়ের পর একটি বিবৃতি দেন ইন্দিরা গান্ধী, যা নিয়ে আন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, যে বিষয়টি নয়াদিল্লির ক্ষোভের কারণ হয়েছে সেটি হলো, বৈদেশিক সহায়তা বন্ধের হুমকি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের মীমাংসার যতটুকু সুযোগ ছিল, নিক্সনের চিঠির পর সেটির আরও অবনতি হয়েছে। কারণ, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো ওই চিঠি ইসলামাবাদকে সমঝোতা না করতে আরও ইন্ধন দেবে।

১ ডিসেম্বর পর্যবেক্ষক বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি এটিকে চক্রান্ত উল্লেখ করে বলেন, বিজয়ের মুহূর্তে পর্যবেক্ষক হয়ে যিনিই আসুন না কেন, তার ভাগ্যে খারাপ কিছু ঘটলে সেটির জন্য প্রস্তাবের উদ্যোক্তারাই দায়ী থাকবেন।

আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন তাজউদ্দীন আহমদ আরও বলেন, ইয়াহিয়ার হানাদার বাহিনীর চালানো গণহত্যার সময় যারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল, তারাই এখন পর্যবেক্ষক বাহিনী পাঠানোর নাম করে জঙ্গি শাসকচক্রকে রক্ষায় উদ্যোগী হয়েছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে সংগ্রামের মুখে কোনো রকম হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না।

শমশেরনগর, দর্শনা দখলের লড়াই

নিউইয়র্ক টাইমসের তৎকালীন যুদ্ধবিষয়ক সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গ তাঁর বই ‘ডেটলাইন বাংলাদেশ: নাইন্টিন সেভেন্টিওয়ান’-এ লিখেছেন, ভারতীয় বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করে নভেম্বরের শেষ দিকে। ২৪ নভেম্বর ভারত প্রথমবারের সেনা প্রবেশের কথা স্বীকার করে।

১ ডিসেম্বরের যে ঘটনা নিউইয়র্ক টাইমস গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে সেটি ছিল, দিনাজপুরের হিলিতে ভারতীয় বাহিনীর রেললাইন কেটে দেওয়া নিয়ে। যেটির উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের রসদ সরবরাহের পথ বন্ধ করা। একই দিন ধরলা নদী পার হয়ে কুড়িগ্রাম দখলের জন্য মরণপণ লড়াই করছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। কয়েকশ কিলোমিটার দূরে সিলেটের (তৎকালীন শ্রীহট্ট) শমশেরনগর শহরও সেদিন দখলে আসে। সামরিক বিমানঘাঁটি থেকে হটিয়ে দেওয়া হয় পাকিস্তানি সেনাদের।

আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কানাইঘাটে সেদিনের লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত হয় ৩০ পাকিস্তানি সেনা ও বেশ কয়েকজন রাজাকার। অবস্থা বেগতিক দেখে জুড়ী, বড়লেখা এবং আশপাশের এলাকা থেকে কামান সরিয়ে নেয়। মুক্তিবাহিনীর তাড়া খেয়ে সিলেট শহর থেকে প্রায় ৩২ মাইল দূরে কুলাউড়ায় আশ্রয় নেয় হানাদার বাহিনী। লড়াই চলে কুষ্টিয়ার দর্শনায় (বর্তমানে চুয়াডাঙ্গার অংশ)।

পত্রিকাটির আলাদা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার ঘোষণা দিয়েছে, সিলেট ছাড়াও রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, রাজশাহী, যশোর জেলার ৬২টি থানা ও নোয়াখালীর সব চরে অসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীর কবলমুক্ত হয়েছে ৫৪ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চল।

এসব ঘটনার পাকিস্তানি বয়ানও উঠে আসে গণমাধ্যমে। পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনালের (পিপিআই) বরাত দিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল– ‘পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাকর: দর্শনা ও শমশেরনগরও আক্রান্ত’। এতে বলা হয়, ভারতীয় বাহিনী দর্শনা ও শমশেরনগরে আক্রমণ চালিয়েছে। উভয় আক্রমণই পর্যুদস্ত করে দেওয়া হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারতীয়রা দুই দিনে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন ফ্রন্টে আক্রমণের তীব্রতা অব্যাহত রাখে। পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে প্রচণ্ডভাবে মারও খায়। কোনো স্থানেই ‘শত্রুরা’ আর অগ্রসর হতে পারেনি। দিনাজপুরের হিলি ও ময়মনসিংহের কমলপুর থেকে তাদের হটিয়ে দেওয়া হয়েছে। চারটি স্থানে নিহত হয় ১৩০ ভারতীয় সৈন্য।

তবে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাঙালি গেরিলা বাহিনী ও ভারতীয় সেনারা যৌথভাবে অন্তত এক ডজন স্থানে সীমান্ত অতিক্রম করে অভিযান চালিয়েছে। পাকিস্তানি সেনারা এর অর্ধেক স্থানেও আক্রমণ প্রতিহতের চেষ্টা করতে পারেনি। যৌথ বাহিনী ধীরে ধীরে অগ্রসর হলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাকিস্তানি সেনারা শুরুতে প্রতিরোধ গড়লেও পরে পিছিয়ে যায়।

 

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর