
সরওয়ার কামাল,মহেশখালী :: শীত ও পর্যটন মৌসুর শুরুর সাথে সাথে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপে আবারো বেপরোয়া গতিতে গড়ে উঠছে অনুমতিবিহীন পরিবেশ বিধ্বংসী অবৈধ কটেজ ও স্থাপনা। এতে মারাত্বক হুমকির মুখে পড়েছে দ্বীপের প্রাণ-প্রকৃতি ও জীব-বৈচিত্র।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, একসময় এই দ্বীপে ছিল ৫৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৫২ প্রজাতির শামুক, ২১ প্রজাতির কাঁকড়া, ৯ প্রজাতির চিংড়ি, ২০৭ প্রজাতির মাছ, ১২ প্রজাতির উভচর, ১৯ প্রজাতির সরীসৃপ ও ২০৬ প্রজাতির পাখির অভয়ারণ্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন কটেজ ও অস্থায়ী অবকাঠামো গড়ে উঠছে।
এই সব নির্মাণে নির্বিচারে ব্যবহার করা হচ্ছে ঝাউগাছের কাঠ।
অনেক জায়গায় পুরোপুরি কেটে ফেলা হচ্ছে ঝাউবনের সেই প্রাকৃতিক বেষ্টনী, যা দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপটিকে জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রথম আঘাত থেকে রক্ষা করে আসছে।
পরিবেশবিদদের মতে,অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত কচ্ছপের ডিম পাড়ার মৌসুম। গত মৌসুমে সৈকত থেকে ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল তিন হাজার ৫০০। ২০২০ সাল পর্যন্ত কচ্ছপ বছরে ১০ হাজারের বেশি ডিম পাড়ত। কিন্তু চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ডিম দিতে কোনো কচ্ছপ সৈকতে আসেনি। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যাচ্ছে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপের সংকটাপন্ন পরিবেশের কথা।
স্থানীয় লোকজন জানান, সোনাদিয়া দ্বীপে গত এক মাসে ঝাউগাছ কেটে এবং বন বিভাগের জমি দখল করে অন্তত ১৫টি কটেজ ও রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। আরও কয়েকটির নির্মাণকাজ চলছে। তারা জানান, গভীর রাত পর্যন্ত দ্বীপে আলোকসজ্জা, লোকজনের হইচই ও বিকট শব্দে গানবাজনার কারণে ডিম পাড়তে আসতে পারছে না মা কচ্ছপ।
সোনাদিয়ায় কাজ করা নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (নেকম) কক্সবাজারের ব্যবস্থাপক আবদুল কাইয়ুম জানান, নির্জন এই দ্বীপে পর্যটকের আনাগোনা, সৈকতে রাতে আলোকসজ্জা, উচ্চ শব্দে বাদ্যযন্ত্র বাজানো, নির্বিচারে ঝাউগাছ কেটে কটেজ ও রিসোর্ট বানানো এবং রাত যাপনের কারণে পরিবেশের এমন দুরবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
সেভ দ্যা মহেশখালী আইল্যান্ডের রুহুল আমিন বলেন, প্রতিবছর শীতের শুরুতেই পর্যটক মৌসুমকে টার্গেট করে এসব স্থাপনা নির্মাণ করে আসছে তারা।
আমরা চাই এসব রাঘববোয়ালদের হাত থেকে সোনাদিয়াকে রক্ষা করতে।
ঝাউবন ধ্বংস হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে মহেশখালী দ্বীপের উপকূলীয় অংশ।
সাগরের ঢেউ প্রতিরোধে ঝাউবন একটি প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। অথচ কটেজ নির্মাণের নামে সেই সুরক্ষা বলয় ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের চোখের সামনে এমন অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
বরং প্রভাবশালী মহল নিজেদের স্বার্থে দ্বীপের পরিবেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
যদি এখনই এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও ঝাউবন রক্ষায় শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে নিকট ভবিষ্যতে বড় কোনো ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে সোনাদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় রয়েছে দ্বীপের সাধারণ মানুষ।
অবিলম্বে দৃষ্টি না দিলে অতীতের বহু সতর্কবার্তা ও লোকদেখানো নামেমাত্র অভিযানের মতো এ সতর্কবার্তাও হয়তো শুধু কাগজেই থেকে যাবে, আর বিলীন হয়ে যাবে মূল্যবান ঝাউবন ও দ্বীপের প্রাণপ্রকৃতি।

Posted ৬:৪৯ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
coxbangla.com | Chanchal Das Gupta