মঙ্গলবার ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

মঙ্গলবার ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটায় দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন শুরু

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০
13 ভিউ
স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটায় দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন শুরু

কক্সবাংলা ডটকম(৪ জুন) :: বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটায় দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন শুরু হয়েছে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় মাস্ক, পিপিইসহ সুরক্ষা সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো সমকালকে জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও তদন্ত করে কেনাকাটায় দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপরই জড়িতদের ধাপে ধাপে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরই অংশ হিসেবে গত ২২ মে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার স্থলে বাংলাদেশ জাতীয় ইউনেস্কো কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) আবু হেনা মোরশেদ জামানকে পদায়ন করা হয়। সিএমএসডির পরিচালকের বদলির পর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার গুঞ্জন ওঠে।

গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ওই গুঞ্জন সত্যি হলো। তার স্থানে সচিব করা হয়েছে ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নানকে।

সরকারি সূত্রমতে, করোনার এই দুর্যোগে যেসব কর্মকর্তা কেনাকাটায় দুর্নীতি করেছেন, তাদের কেউ ছাড় পাবেন না। সরকার এদের বিষয়ে কঠোর। ধাপে ধাপে দুর্নীতিবাজদের সরিয়ে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের দিয়ে স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতে চায় সরকার। সূত্রমতে, আগামীতে স্বাস্থ্য খাতে আরও রদবদল হতে পারে।

যেভাবে দুর্নীতির শুরু :এন-৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রথমে স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটার দুর্নীতির বিষয়টি সামনে আসে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এন-৯৫-এর মোড়কে করে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করে সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানানোয় খুলনার পরিচালককে পাবনা মানসিক হাসপাতালে বদলি এবং মুগদার পরিচালককে ওএসডি করা হয়। সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ দাবি করে, তারা এন-৯৫ মাস্কের কোনো কার্যাদেশ জেএমআইকে দেয়নি। অথচ সিএমএসডি থেকে ওই সব প্রতিষ্ঠানে পাঠানো সামগ্রীর তালিকায় জেএমআইর এন-৯৫ মাস্কের কথা উল্লেখ করা হয়। সমকালে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়।

পরে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিষয়টি তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি এক মাসেরও বেশি সময় আগে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এর মধ্যেই গত ২২ মে সিএমএসডির পরিচালকে সরিয়ে দেওয়া হয়। গুঞ্জন ওঠে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের সরিয়ে দেওয়া হতে পারে।

জনপ্রশাসনের সচিবকে চিঠি সিএমএসডির বিদায়ী পরিচালকের :কেনাকাটার বিস্তারিত তুলে ধরে সিএমএসডি পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদউল্লাহ গত ৩০ মে জনপ্রশাসন সচিবের কাছে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে তিনি বলেন, করোনা মোকাবিলায় কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং সিএমএসডি কী কী কেনাকাটা করবে, সে সম্পর্কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কখনোই সঠিক কোনো পরিকল্পনা করেনি।

এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে পরিচালক সিডিসির সঙ্গে সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ আলাপ করে। সিডিসি কর্তৃপক্ষের অনুরোধে সিএমএসডি নিজস্ব উদ্যোগে পিপিইসহ অন্যান্য সামগ্রী মজুদ করতে থাকে। পরে ১০ মার্চ সিডিসি পরিচালক সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবিলায় ১৫ কোটি টাকার একটি চাহিদা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এর আগে মার্চের প্রথম সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে পিপিই, মাস্কসহ অন্যান্য সামগ্রী পাঠাতে নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ওই সময় এরিস্টোক্রেট, এসিআই, আএফএল, গেটওয়েল ও জেএমআই ছাড়া আরও কেউ এসব পণ্য উৎপাদন করত না। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আরও কিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠান এসব পণ্য উপাদন শুরু করে। এর মধ্যেই লকডাউন শুরু হয়। ক্রয় প্রক্রিয়া কীভাবে অনুসরণ করা হবে, অর্থের সংস্থান আছে কিনা, স্পেসিফিকেশন কী হবে, কী পরিমাণ সামগ্রী ক্রয় করতে হবে- এ সংক্রান্ত কোনো দিকনির্দেশনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় সিএমএসডি মৌখিকভাবে বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয় করে তা হাসপাতালগুলোতে পৌঁছে দেয়।

পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদউল্লাহ দাবি করেন, তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। ১৫ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের (বাজেট) মৌখিক নির্দেশনায় সিএমএসডি সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়বাবদ ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। মার্চ মাসের দিকে এই টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর ডিপিএম পদ্ধতি অনুসরণ করে সমস্ত ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

আনুমানিক ৯০০ কোটি টাকার কেনাকাটার কথা উল্লেখ করে পরিচালক আরও বলেন, এ পর্যন্ত আনুমানিক ৯০০ কোটি টাকার কেনাকাটা হলেও মাত্র ১০০ কোটি টাকার সংস্থান করা হয়েছে। বারবার বাকি অর্থের চাহিদার কথা জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হলেও অর্থছাড় করা হয়নি। এ কারণে সরবরাহকারীদের বিল পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে শহীদউল্লাহ চিঠিতে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পিএস তাকে মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তার ছেলের ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে বলে তাকে জানান ওই দুই কর্মকর্তা।

ওই প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য খাতের আলোচিত ঠিকাদার মিঠুর উল্লেখ করে পরিচালক বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওই দুই কর্মকর্তা মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেডসহ তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখে। ওই কোম্পানির পাঠানো তালিকা ও মূল্য অনুযায়ী দ্রব্যাদি কেনাকাটা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তিনি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং ক্রয় তালিকায় সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করেননি। এতে মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেডসহ সহযোগী ঠিকাদাররা ক্ষুব্ধ হন।

পরিচালক বলেন, সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কভিড হাসপাতালের আইসিইউর জন্য ডিপিএম পদ্ধতিতে কিছু চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়ের চাহিদা দেয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তারা মৌখিকভাবে মেডিটেক ইমেজিংয়ের কাছ থেকে ওইসব সামগ্রী ক্রয়ের নির্দেশ দেন। কিন্তু মেডিটেক ইমেজিংয়ের যন্ত্রপাতি ছিল নিম্নমানের এবং দাম বেশি। ফলে তারা বাদ পড়ে। এতে মিঠু বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

পরিচালকের এই অভিযোগের জবাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল) সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিদায়ী পরিচালক অর্বাচীনের মতো কথা বলছেন। মন্ত্রণালয়ের প্রধান ব্যক্তি মন্ত্রী। কোনো কাজের জন্য তার কাউকে সুপারিশ করতে হয় না। মন্ত্রী আদেশ দিলেই যথেষ্ট। কারও তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোনো কিছু চাইলে তাকে সুপারিশ করতে হবে কেন? তিনি সরাসরি নির্দেশ দিতে পারতেন।

সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী যদি সুপারিশও করে থাকেন, পরিচালক তো তা রাখেননি। তিনি কাকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন? যাকে কাজ দিয়েছেন, সেটি কার নির্দেশে দিয়েছেন, এসব প্রশ্ন আসবে। দুর্নীতির প্রমাণ সাপেক্ষে বদলি করার পর তিনি এখন প্রলাপ বকছেন। তার এসব বক্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই।

কেনাকাটায় সিন্ডিকেট :

সিএমএসডির ৯০০ কোটি টাকার কেনাকাটার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন সামগ্রী কেনাকাটা নিয়ে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় হয়ে মাঠে নামে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিপ্তরের দুটি গ্রুপ নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে ক্রয়-সংক্রান্ত আদেশ দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এ বিরোধে সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় পিপিই, মাস্কসহ সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয়ে দেরি হয়।

পরে দুই গ্রুপ এক হয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিবি ল্যাপ্রোসি ও এসটিডি এইডস কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. সামিউল ইসলাম এবং পরিচালক (পরিকল্পনা) অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবিরকে ক্রয় প্রক্রিয়ার সার্বিক বিষয় দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সামিউল ইসলামকে করোনা-সংক্রান্ত সিএমএসডি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ক্রয় প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব করা হয়। তবে তিনিই ছিলেন মূল সমন্বয়কারীর ভূমিকায়।

একাধিক সূত্র বলছে, ডা. রিজওয়ানুল হক শামীম নামে এনসিডিসি কর্মসূচির একজন প্রোগ্রাম ম্যানেজারও সামিউল ইসলামের সঙ্গী হিসেবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবার কাছেও এই কর্মকর্তার নাম আলোচিত। আর ডা. ইকবাল কবিরকে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও এডিবির দুটি প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই দুই কর্মকর্তাই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বিদায়ী সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।

নামে প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, সিএমএসডিকেন্দ্রিক কেনাকাটা নিয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেপথ্যের নির্দেশনায় পুরো ৯০০ কোটি টাকার ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ডা. সামিউল ইসলামের ঠিক করে দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোই সিংহভাগ কাজ পায়। এতে করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেটটি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তবে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে অধিদপ্তরের এই সিন্ডিকেটের সখ্য ছিল। তাদের মাধ্যমেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি পণ্যের দাম ৫ থেকে ১০ গুণ বাড়তি দেখানো হয়েছে।

একসেট এক্সামিনেশন হ্যান্ড গ্লাভসের দাম দেখানো হয়েছে ৩৬ টাকা। অথচ ৫০ জোড়া এ ধরনের গ্লাভসের বাজারমূল্য মাত্র ১৮০ টাকা। ১২০ থেকে ২৫০ টাকা মূল্যের রেইনকোর্ট জাতীয় পণ্য কিনে পিপিই বলে হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়েছে। পিসিআর মেশিন ক্রয় করা হয়েছে পুরোনো ২০০৯ সালের মডেলের। ওই মেশিনের মান নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে দুটি হাসপাতালের পরিচালকও অভিযোগ করেছেন। একধিক সূত্র বলছে, ৯০০ কোটি টাকা কেনাকাটার কথা বলা হলেও তার অর্ধেক পরিমাণ টাকার সামগ্রীও কেনা হয়নি। বাড়তি মূল্য দেখিয়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে জোগসাজশে টাকা লোপাট করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. সামিউল ইসলাম বলেন, ক্রয় প্রক্রিয়ায় সমন্বয়কারী কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কমিটি পণ্যের মান নিরূপণ করার দায়িত্বে ছিল। এর বাইরে কী ক্রয় করা হবে, কীভাবে করা হবে- এসব বিষয় সিএমএসডি সম্পন্ন করেছে। ক্রয় প্রক্রিয়ায় নিজের ভূমিকার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

দাতাগোষ্ঠীর অর্থ লোপাটের ছক :

করোনা মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বড় ধরনের আর্থিক ঋণ দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক দিচ্ছে ৮৫০ কোটি টাকা, আর সরকার দিচ্ছে ২৭৭ কোটি টাকা। এডিবির অর্থায়নে অপর একটি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবি ৮৫০ কোটি টাকা আর সরকার বাকি ৫১৫ কোটি টাকা দেবে। এই প্রকল্প দুটি ইতোমধ্যে একনেকে অনুমোদন হয়েছে। কেনাকাটার প্রক্রিয়াও শুরু হতে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জরুরি সহায়তা’ শীর্ষক প্রকল্পটির আওতায় এক লাখ সাত হাজার ৬০০ পিপিই ক্রয় করা হবে। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। প্রত্যেকটি পিপিই ক্রয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ৭০০ টাকা। এক লাখ সেফটি গগলস ক্রয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। প্রতিটি গগলসের দাম পড়বে পাঁচ হাজার টাকা করে। ৭৬ হাজার ৬০০ জোড়া বুট ক্রয়ের জন্য ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এতে প্রত্যেকটির দাম পড়বে এক হাজার ৫০০ টাকা করে। সংশ্নিষ্টরা বলেছেন, প্রত্যেকটি পণ্যের দাম দুই থেকে পাঁচগুণ বাড়তি দেখানো হয়েছে।

গবেষণার জন্য ব্যয় হবে ২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ইনোভেশন খাতে ৩৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। ভ্রমণ ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ টাকা। মাত্র ৩০টা অডিও-ভিডিও ফিল্ম তৈরির ব্যয় দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ৮০টি সেমিনার ও কনফারেন্স করে খরচ করা হবে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা। মাত্র চারটি ওয়েবসাইট উন্নয়ন করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হবে। পাঁচটি ডাটাবেস তৈরিতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাঁচটি কম্পিউটার সফটওয়্যার কেনায় খরচ ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ৩০টি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জন্য ব্যয় হবে আরও ৪৫ কোটি টাকা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের আনা-নেওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩৭ কোটি টাকা। অনাবাসিক ভবন নির্মাণে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৯০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, এ মুহূর্তে মানুষের সেবার জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ প্রয়োজন। দ্রুতগতিতে আইসিইউ, ভেন্টিলেটরসহ করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল তৈরি না করে এসব সামগ্রীর পেছনে অর্থ ব্যয়ের কোনো মানে হয় না। অথচ অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয়ের দিকে সংশ্নিষ্টদের মনোযোগ বেশি।

এ বিষয়ে জানতে ডা. ইকবাল কবিরকে কয়েক দফা ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ  বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে অনেক বিষয়ে জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। সিএমএসডির পরিচালককে ক্রয় প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছিলাম। পরিচালক সবসময় তাকে আশ্বস্ত করেছেন, তিনি সঠিকভাবে ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন এবং তার মাধ্যমে অন্যায় কিছু হবে না। এ ছাড়া চলমান পরিস্থিতিতে আমাকে সার্বিক বিষয়ে দেখভাল করতে হয়েছে। এতে বিভিন্ন দপ্তর থেকে আসা ফাইলপত্রও যথাযথভাবে দেখা সম্ভব হয়নি। এ জন্য ফাইলের ওপর সংশ্নিষ্ট শাখার বিভাগীয় প্রধানসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা লিখে দিয়েছি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনা-সংক্রান্ত লজিস্টিক কমিটি গঠনের বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, করোনা পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে অনেক ব্যবসায়ী গ্রুপ গড়ে উঠেছিল। অনেকের পণ্যসামগ্রীর কোনো মান ছিল না। পণ্যসামগ্রীর মান যাচাইয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি মান নিশ্চিত করার পরই পণ্যটি ক্রয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতো।

কমিটির যাচাইয়ের পরও মানহীন সামগ্রী সরবরাহের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে অনেক সময় ঠিকাদারদের সরবরাহ করা সামগ্রী সঠিকভাবে বুঝে নেওয়া যায়নি। এ কারণে দু-একটি ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা হয়েছিল দ্রুত তা সমাধান করা হয়েছে।

দাতা সংস্থার ঋণে দুটি প্রকল্পে পণ্যসামগ্রীর সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ওই প্রকল্পের প্রস্তাবনা তৈরি করেনি। আমার পক্ষে ওই প্রকল্প তৈরিতে সময় দেওয়াও সম্ভব হয়নি। মন্ত্রণালয় ও আমাদের প্লানিং শাখা থেকে করা হয়েছে। তবে আমি বলে দিয়েছি, বিশ্ব ব্যাংক ও এডিবির মাধ্যমে যেন ক্রয় প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়। অতিরিক্ত কোনো মূল্য ধরা হলে তা যেন যাচাই-বাছাই করা হয়। আবার এই প্রকল্পের প্রধান শর্ত হলো- দাতা সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী ক্রয় প্রক্রিয়া হতে হবে। কিছু কিছু সামগ্রী তারাই আন্তর্জাতিকভাবে ক্রয় করে দেবেন। এতে ব্যয় কিছুটা বেশি পড়ে। এ ছাড়া এটি একনেকে পাস হয়েছে। তাই পরিবর্তন করতে গেলে আবারও একনেকে যেতে হবে। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয়।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থতার কারণে মহাপরিচালকের পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে- এমন গুঞ্জনের জবাবে তিনি বলেন, ওইসব গুঞ্জনে কান দেওয়ার সময় পাই না। তাছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ওইসব গুঞ্জনে কান না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। করোনা মোকাবিলায় সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো সংকট নেই। আবার সারাজীবন আমাকে এই পদে থাকতে হবে- বিষয়টি এমন নয়।

সরকারি হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে সিএমএইচে নিজের চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, আমি করোনা আক্রান্ত হই। এটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অবগত। উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে আমি সেখানে ভর্তি হয়েছিলাম। সুতরাং এটি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই।

13 ভিউ

Posted ৩:১৩ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০

coxbangla.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

Archive Calendar

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  

Editor & Publisher

Chanchal Dash Gupta

Member : coxsbazar press club & coxsbazar journalist union (cbuj)
cell: 01558-310550 or 01736-202922
mail: chanchalcox@gmail.com
Office : coxsbazar press club building(1st floor),shaheed sharanee road,cox’sbazar municipalty
coxsbazar-4700
Bangladesh
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ABOUT US :

coxbangla.com is a dedicated 24x7 news website which is published 2010 in coxbazar city. coxbangla is the news plus right and true information. Be informed be truthful are the only right way. Because you have the right. So coxbangla always offiers the latest news coxbazar, national and international news on current offers, politics, economic, entertainment, sports, health, science, defence & technology, space, history, lifestyle, tourism, food etc in Bengali.