
কক্সবাংলা ডটকম(৮ জানুয়ারি) :: ভূমিকা গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক—এই দুটি নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হলেই সামনে ভেসে ওঠে একটি জটিল ঐতিহাসিক সম্পর্ক, উপনিবেশিক উত্তরাধিকার, আধুনিক স্বায়ত্তশাসন এবং আর্কটিক অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব।
একদিকে ডেনমার্ক, ইউরোপের একটি ছোট কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র , অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড—পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ, বরফে মোড়া অথচ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এই লেখায় গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সম্পর্ককে ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক কৌশলগত প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে।
ভৌগোলিক পরিচয়ঃ
ডেনমার্ক উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলে অবস্থিত। দেশটির মূল ভূখণ্ড ছাড়াও বহু দ্বীপ রয়েছে, যার মধ্যে জিল্যান্ড ও ফুনেন উল্লেখযোগ্য। উত্তর সাগর ও বাল্টিক সাগরের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে ডেনমার্ক দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপীয় বাণিজ্য ও নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
গ্রিনল্যান্ড ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অংশ হলেও রাজনৈতিকভাবে এটি ডেনমার্ক রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। এর প্রায় ৮০ শতাংশ অঞ্চল স্থায়ী বরফে ঢাকা । আর্কটিক সার্কেলের ভেতরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে সূর্যহীন রাত ও দীর্ঘ দিনের মতো চরম প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
ঐতিহাসিক পটভূমি ডেনমার্কের ইতিহাসঃ
শুরু হয় ভাইকিং যুগ থেকে । নবম থেকে একাদশ শতাব্দীতে ডেনিশ ভাইকিংরা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চালানোর পাশাপাশি উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। দশম শতাব্দীতে ভাইকিং অভিযাত্রী এরিক দ্য রেড গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় বসতির সূচনা করেন।
মধ্যযুগে ডেনমার্ক ও নরওয়ের যৌথ রাজ্যের অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ড শাসিত হয়। ১৮১৪ সালে নরওয়ে আলাদা হলেও গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনে থেকে যায়। উনিশ শতকে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে উপনিবেশ ঘোষণা করে, যা ইনুইট জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় গভীর পরিবর্তন আনে।
শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সম্পর্কঃ
ডেনমার্ক একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র । এখানে রাজা বা রানি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও প্রকৃত ক্ষমতা সংসদ ও নির্বাচিত সরকারের হাতে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন ডেনমার্কের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি।
গ্রিনল্যান্ড ১৯৭৯ সালে হোম রুল এবং ২০০৯ সালে সেল্ফ রুল আইন লাভ করে। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব সংসদ ও সরকার রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয়। তবে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও মুদ্রানীতি এখনো ডেনমার্কের হাতে।
স্বাধীনতা প্রশ্ন গ্রিনল্যান্ডের রাজনীতিতে স্বাধীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। অনেক গ্রিনল্যান্ডবাসী পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এই পথকে জটিল করে তুলেছে। ডেনমার্ক প্রতিবছর গ্রিনল্যান্ডকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক অনুদান প্রদান করে, যা দেশটির অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।
জনসংখ্যা ও সমাজঃ
ডেনমার্কের জনসংখ্যা প্রায় ছয় মিলিয়ন । দেশটি উচ্চ মানব উন্নয়ন সূচক, শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও বিনামূল্যের শিক্ষার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সামাজিক সমতা ও কল্যাণ রাষ্ট্র ব্যবস্থা ডেনিশ সমাজের মূল বৈশিষ্ট্য।গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা মাত্র ৫৬ হাজারের মতো। অধিকাংশ মানুষ ইনুইট বংশোদ্ভূত। ছোট ছোট উপকূলীয় শহর ও গ্রামে তাদের বসবাস। কঠোর জলবায়ু সত্ত্বেও তারা প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে জীবনযাপন করে।
ভাষা ও সংস্কৃতিঃ
ডেনমার্কের রাষ্ট্রভাষা ডেনিশ। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, স্থাপত্য ও আধুনিক ডিজাইনে ডেনমার্ক বিশ্বে বিশেষ স্থান দখল করে আছে ।গ্রিনল্যান্ডে কালাল্লিসুত বা গ্রিনল্যান্ডিক ভাষা প্রধান। এটি ইনুইট ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ঐতিহ্যবাহী শিকার, নৌকা চালনা, লোকগান ও শিল্পকলার মাধ্যমে ইনুইট সংস্কৃতি আজও জীবন্ত ।
অর্থনীতিঃ
ডেনমার্ক একটি উন্নত ও বহুমুখী অর্থনীতি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি , ওষুধ শিল্প, প্রযুক্তি ও জাহাজ নির্মাণ খাতে দেশটি অগ্রণী।গ্রিনল্যান্ডের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে সীমিত। মাছ ধরা শিল্প এখানকার প্রধান আয়ের উৎস। এছাড়া খনিজ সম্পদ, বিরল ধাতু, তেল ও গ্যাস ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার খাত হিসেবে বিবেচিত।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনঃ
গ্রিনল্যান্ড জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাবভুক্ত অঞ্চলগুলোর একটি। বরফ গলার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে । এটি শুধু গ্রিনল্যান্ড নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।ডেনমার্ক পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু নীতিতে বিশ্বনেতা হিসেবে পরিচিত। গ্রিনল্যান্ডের পরিবেশ সুরক্ষায়ও ডেনমার্কের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বঃ
আর্কটিক অঞ্চলে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান একে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলো এই অঞ্চলের সম্পদ ও নৌপথ নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে ।গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যা ন্যাটো ও ডেনমার্কের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ। ঠান্ডা যুদ্ধ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডের সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম।
ভবিষ্যৎ সম্পর্ক
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে স্বাধীনতার প্রশ্ন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বৈশ্বিক রাজনীতির ওপর। সহযোগিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই এই সম্পর্ক এগোবে বলে ধারণা করা হয়।
উপসংহার
গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সম্পর্ক কেবল অতীতের উপনিবেশিক ইতিহাস নয়; এটি আধুনিক বিশ্বের রাজনীতি, পরিবেশ ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও এই দুই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ আজও গভীরভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িত।

Posted ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬
coxbangla.com | Chanchal Das Gupta