রবিবার ১৫ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ ফাল্গুন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভূমিধস সতর্কতা ও আগাম প্রস্তুতির উপর কক্সবাজারে জাতীয় পর্যায়ের কর্মশালা অনুষ্ঠিত

🗓 বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৫

👁️ ১১৩ বার দেখা হয়েছে

🗓 বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৫

👁️ ১১৩ বার দেখা হয়েছে

জাবেদ আবেদীন শাহীন :: ভূমিধস বিপর্যয় মোকাবিলায় সচেতনতা ও আগাম প্রস্তুতি জোরদার করতে কারিতাস বাংলাদেশের উদ্যোগে কমিউনিটি-ভিত্তিক সাড়া-প্রদান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে দিনব্যাপী এক জাতীয় পর্যায়ের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার সি গাল হোটেলের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে আগত প্রায় ২০০ জন স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় প্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থা এবং সরকারি বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন।

‘ভূমিধস সতর্কতা ও আগাম প্রস্তুতি সহায়তা প্রকল্প’ এর আওতায় আয়োজিত এই কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আব্দুল ওয়াদুদ। সভাপতিত্ব করেন কারিতাস বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রধান আলেকজান্ডার ত্রিপুরা।

অধিবেশনে স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থাপনা মডেল ও মক ড্রিল স্ক্রিপ্ট উপস্থাপন মূল প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন মাযহারুল ইসলাম,এসআর প্রোগ্রাম অফিসার।

তিনি জানান, আমাদের মক ড্রিল স্ক্রিপ্ট মাঠের বাস্তবতা বিবেচনায় তৈরি।

এই স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করলে যে কোনো কমিউনিটি নিজস্বভাবে দ্রুত সাড়া দিতে পারবে, এবং ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপকভাবে কমবে। এটি শুধু স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য নয় বরং সাধারণ মানুষ কীভাবে সতর্কবার্তা পাবে এবং নিরাপদে সরে যেতে পারবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি অতিরিক্ত সচিব কে এম আব্দুল ওয়াদুদ তার বক্তব্যে বলেন, ভূমিধস একটি নীরব ঘাতক। আগাম সতর্কবার্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় ভূমিকাই পারে অসংখ্য প্রাণ বাঁচাতে। এই জনগণকেন্দ্রিক মডেল আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। সরকার এ ধরনের উদ্যোগে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে।

তিনি আরো বলেন, ভূমিধসের মতো দুর্যোগে প্রথম ৩০ মিনিটই জীবন বাঁচানোর সোনালি সময়। এই সময়টি কাজে লাগাতে হলে মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী স্বেচ্ছাসেবক দল অত্যন্ত জরুরি। আজকের এই কর্মশালা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে এক ধাপ এগিয়ে নিল। জলবায়ু পরিবর্তন পাহাড়ধসকে আরও অনিয়মিত ও বিপজ্জনক করে তুলেছে। তাই শুধু উদ্ধার নয়, আগাম সতর্কতা টেকসই করতে প্রযুক্তি, মানবসম্পদ এবং সমন্বয়—এই তিনটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে আলেকজান্ডার ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে হলে তাদেরকেই প্রথম সারির প্রতিরক্ষা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের এই স্বেচ্ছাসেবক মডেল স্থানীয় জনগণকে ক্ষমতায়িত করবে এবং দুর্যোগের সময় তারা নিজেরাই নেতৃত্ব দিতে পারবে। কারিতাস বাংলাদেশ আগামী এক বছরে কমিউনিটিগুলোতে আরও প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা কর্মসূচি চালাবে।

অধিবেশনের অন্যান্য বক্তরা বলেন, পাহাড়কাটা, বৃষ্টিপাতের ঘনত্ব বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত বসতি এবং সতর্কবার্তা না বোঝার কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। ভূমিধস কোনো স্বাভাবিক দুর্যোগ নয়, এটি মানুষের অসচেতনতার ফলেও ভয়াবহ হয়। এখনকার ভাবনা হচ্ছে ঝুঁকির সময় কে কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে, এবং কে কোন দায়িত্ব পালন করবে তা যেন সবাই জানে। এখানে যে প্রোটোকল তৈরি করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ জনগণকেন্দ্রিক।

এটি বাস্তবে প্রয়োগ করলে পাহাড়ি জনপদ অনেকটাই নিরাপদ হবে। ২০০ স্বেচ্ছাসেবকের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে মানুষ নিজ এলাকা রক্ষায় কতটা আগ্রহী। স্বেচ্ছাসেবকরা দেশের শক্তি। তাদের প্রশিক্ষণ যত বাড়বে, দুর্যোগে প্রাণহানি তত কমবে।

বিকেলে কর্মশালার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল বিকেলে অনুষ্ঠিত মক ড্রিল বা সিমুলেশন মহড়া। ভূমিধস পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতার এই প্রদর্শনীতে স্বেচ্ছাসেবকরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জীবন রক্ষাকারী কৌশল প্রদর্শন করেন। উপস্থিত সবাই এই বাস্তবসম্মত মহড়ায় মুগ্ধ হন।

লামা থেকে আগত স্বেচ্ছাসেবক রাজীব চাকমা বলেন, এই প্রশিক্ষণ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। এখন আমরা জানি কীভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের জীবন বাঁচাতে হয়।

বান্দরবানের স্বেচ্ছাসেবক ফাতেমা বেগম জানান, মহিলা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এই প্রশিক্ষণ আমাকে সাহস যুগিয়েছে। আমাদের এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি বেশি, এখন আমরা সংকেত বুঝে দ্রুত মানুষকে সতর্ক করতে পারব।

টেকনাফের আবদুর ছবুর বলেন, এই মক ড্রিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ছিল। আমরা হাতে-কলমে শিখেছি কীভাবে আহতদের নিরাপদে উদ্ধার করতে হয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত কর্মশালায় উপস্থাপিত সিমুলেশন মডেলে স্থানীয় সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, জরুরি যোগাযোগ প্রণালী, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র চিহ্নিতকরণ এবং দ্রুত সাড়া প্রদান পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অনুষ্ঠানে কর্মশালায় সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, প্রযুক্তি নির্ভর সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়। উপস্থিত সবাই এই উদ্যোগকে ভূমিধস ঝুঁকি হ্রাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর