মঙ্গলবার ২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

মঙ্গলবার ২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

শনিবার, ১০ জুলাই ২০২১
53 ভিউ

কক্সবাংলা ডটকম(১০ জুলাই) :: অকাল প্রয়াত কবি মাসউদ শাফির ৩৫তম জন্মদিন। স্কুল জীবনের শুরু থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে তাকে সকলেই জানেন। কেননা তিনি স্কুল জীবন পেরিয়েছেন ফাস্ট বয় হিসেবে। স্কুল জীবনে সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডে তিনি নিজের নাম লেখিয়েছেন। আর ওই সূত্রে তিনি প্রতিবন্ধকতার বিপরীতে নিজকে ভেঙে নতুন করে পরিচয় লাভ করেন। ফলে একজন শফিউল আলম মাসউদ হয়ে যান মাসউদ শাফি। এ মাসউদ শাফি আমাদের কাছে বাংলা সাহিত্যের শূন্য দশকের অন্যতম শক্তিমান কবি ও বামপন্থী ছাত্রনেতা। উখিয়ার পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে যান। ফলে পালং উচ্চ বিদ্যালয় সংসদের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি থেকে তিনি জেলা সংসদের সহ-সভাপতি পর্যন্ত পদে দায়িত্ব পান। কিছু আশা অপূর্ণতায় শেষ করে গেছেন তিনি মাসউদ শাফি। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন ২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর ভোর সাড়ে ৫টায়। মৃত্যুর আগে লিভার জন্ডিস রোগে আক্রান্ত হয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তিও হয়েছিলেন। এরিমধ্যে তার লিভার ও কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাঁচানো সম্ভব হলো না তাকে। ফলে শূন্য দশকের শক্তিমান কবি মাসউদ শাফির এখন আমাদের কাছে হারানো এক স্মৃতির নাম। অথচ এ নামের ভেতরেই রয়েছে জরাজর্ণীতা ভেঙ্গে নতুন স্বপ্ন প্রতিষ্ঠার নানা কথা। তাঁর ৩৫তম জন্মদিনে প্রকাশ করা হলো বিশেষ ক্রোড়পত্র।

মাসউদ শাফি’র দুটি কবিতা

শারদ প্রতিমা

আমাদের শারদ বিশ্বাস আঁকড়ে ধরেই
কাটুক পার্থিব সময়
আর মুখস্ত ধ্যানে পার্বন শালায়
বাজুক সার্বজনীন লয়
আমাকে বারংবার ডাকে-সনাতনী ললিতাদের উলুধ্বনিস্বর
এখন আমরা সকলেই মেলমন হই একই পার্বনে
যেখানে শারদীয় দূর্গা বিসর্জনে হাসে প্রতিমা সুন্দর
কখনো তবে একবার প্রতিমা সদৃশ সুন্দর হবো।
আজ থেকে সকলেই প্রতিমা সমান প্রাণে
হয়ে যাই আরেক প্রতি প্রতিমা
এভাবে ছুঁইয়ে যাক বিশুদ্ধ বোধ
অথবা পরম নির্বাণসীমা
তারিখ-১৬/১০/০৯-খৃঃ

ঈদ

ঈদ সকলের হতে পারলেই
আমি ত ঈদ কে বুজবো
ঈদ তো আসেনি কভু
আমার উপর একান্ত উৎসব
হয়ে আসেনি আমি জানি(মানি)
ঈদ প্রতিবোধনের মতোন——-

নোট;- লেখা ছিলো শফিউল আলম মাসুদ নামে,খ্যাতি পেয়েছে-মাসউদ শাফি নামে।ঈদ এর কবিতা টি উর্ধেক তারিখ বিহিন।কবিতা দুটি কবি কালাম আজাদ-মুল্যায়ন সম্পাদক-কবি অমিত চৌধুরি বাসা থেকে উদ্ধার করে।

গদ্য

আকাশের ছয়টি তারা মা স উ দ শা ফি
মোশতাক আহমদ

“তোমার সমগ্র নিয়ে আলোচনা হয় না কখনো
হতেও পারে না মনে হয়, হতে পারে নাকি?
মৃত্যুর দুদিন আগে তোমাকে কী সুন্দর দেখালো! “
(শক্তি চট্টোপাধ্যায়/ মৃত্যুর পরেও যেন হেঁটে যেতে পারি/ শ্রেষ্ঠ কবিতা )

মাসউদ শাফি কবি-বংশের সন্তান। তাকে প্রথম দিন দেখেই নিশ্চিত হয়েছিলাম যে সে নিজের জন্যে কবি-জীবনকেই বেছে নিয়েছে। জীবিকাসূত্রে প্রায় দু’বছর কক্সবাজারে থাকবার সময় তাকে দেখেছি। ষাট- সত্তর দশকে কবি নির্মলেন্দু গুন- আবুল হাসানদের যে উন্মূল-উদবাস্তু জীবনের কথা শুনে আসছিলাম, মাসউদকে দেখেছি সেই ধরনের জীবন যাপন করতে।

তার কবিতা খুব অল্প কয়েকটি পড়েছি; তাতে মনে হয়েছে প্রস্তুতিপর্ব সেরে নিজস্ব স্বর খুঁজে পেতে আরো কিছু পথ যেতে হতো তাকে; কিন্তু আমার মতে মাসউদের ঋদ্ধি আরেক জায়গায়। স্বভাবজাত গদ্য ছিল তার হাতে; সাক্ষাতকার নেয়া, বই আলোচনা বা লিটল ম্যাগাজিন আলোচনা, অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা- এ সব কাজে তার সামর্থ্যের প্রকাশ ঘটতে দেখেছি। ছবি তুলতো শখের বশে।

সাহিত্যের যে কোন অনুষ্ঠানে মাসউদ শাফির উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য্য, পর্দার পেছনে কি সামনে। অতিথি কবি-সাহিত্যিকদেরকে সময় দেয়ার মতো ধন্যবাদহীন কাজটিও সেই করতো। আমি তার ধারন করা কিছু সাক্ষাতকার পড়েছি , এক কথায় অনবদ্য লেগেছে। একবার একজন গল্পকারের সাথে মহেশখালি বেড়ানোর সুযোগে মাসঊদ যেন তাঁর একটা সাক্ষাতকার নিয়ে ফেরে, এই ছিল সম্পাদকের তাগাদা। মাসউদ কিন্তু যথেষ্ট প্রস্তুতির অভাবে সে পথে যায়নি।

আমার কক্সবাজার বাসের শেষের দিকে মাসউদ শাফি দায়িত্ব নিয়েছিল স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতার। লেখার অভাবে জমিজমার মাপজোক বিষয়ক লেখাও সেই সাহিত্য পাতায় ছাপা হতে দেখেছি। তাই মাসউদ প্রায়ই গদ্য লেখার তাগাদা দিত। ওর অনুরোধে সেই কাগজে কবিতা, গদ্য পাঠিয়েছি। সীমিত সাধ্যের মাঝেই সে সাহিত্য পাতাটি বেশ যত্ন নিয়ে বের করতো। লেখার তাগাদা, পাতাটির নিত্য নতুন বিষয় বৈচিত্র্য ও অলংকরণ নিয়ে ভাবা আর নিয়মিত প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে একজন সাহিত্য সম্পাদকের গুণাবলী নিয়ে বেড়ে উঠছিল সে।

২০১২ সালে কবি আবুল হাসানের ৬৫ তম জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আমি বেশ কিছু লেখা সংগ্রহ করেছিলাম- নতুন পুরানো মিলিয়ে। ইচ্ছে ছিল অনলাইনে আবুল হাসান পেজে প্রকাশ ছাড়াও ভবিষ্যতে একটা মান সম্পন্ন সংকলন প্রকাশের। আমার সংগৃহীত লেখাগুলো দিয়ে মাসউদ শাফি তার কাগজের আবুল হাসান সংখ্যা করতে চেয়েছিল । নানা কারনে তাকে এই ব্যাপারে আমি সহযোগিতা করতে পারিনি। এই অপারগতা এখন শেল হয়ে বিঁধছে ‘তীব্র তীক্ষ্ণ তমোহর’। মাসউদ নিজেই এখন কবি আবুল হাসানের মত ‘মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা’ হয়ে গেছে। আবুল হাসানকে নিয়ে আমার লেখা ‘আকাশের ছয়টি তারা’ কবিতাটিও মাসউদ ছেপেছিল তার ‘আমাদের সাহিত্যে’র পাতায়।

“তবে কি সে মানুষের সাথে সম্পর্কিত ছিল, কোনোদিন
ভালোবেসেছিল সেও যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙুল ?
ভালোবেসেছিল ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রান, আলোর ইশকুল ?
(আবুল হাসান/ আবুল হাসান/ রাজা যায় রাজা আসে)

———————————————————————-

অকাল প্রয়াত কবি মাসউদ শাফি’র ৩৫তম জম্মদিন আজ
মানিক বৈরাগী

এই দিনে তুই ৩৬ বছরের একজন পূর্ন যুবক। এত দিনে অন্তত একটি কাব্যগ্রন্থ আমরা পেতাম। তারপরও বাছাই করা কিছু কবিতা নিয়ে আলী প্রয়াস সম্পাদিত ‘তৃতীয় চোখ’ একটি সংখ্যা প্রকাশ করেছে। আলী প্রয়াস’র এই উদ্যোগকে আমি ও জায়নূর বেগম শাহীন আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমি তোর জন্য কিছুই করতে পারিনি। অন্তত তোর কিছু কবিতা, অন্যান কাগজ পত্র, ডায়রি এখনো যত্ন করে রেখে দিয়েছি। যে দুটি স্মরণ সভা সবাই মিলে করেছিলাম সেই অনুষ্ঠানের উদ্বৃত্ত ৪ হাজার টাকা, তোর কবরে একটি স্থায়ী বেড়া ও নাম ফলক লাগানোর জন্য জমা রেখেছিলাম। তোর উপজেলার সন্তান, টেকনাফ কলেজের বাংলার অধ্যাপক, কবি, গীতিকার এর কাছে। কারণ তুই জানিস আমি নিতান্ত গরিব মানুষ। তাই অভাবের তাড়নায় যদি চাল ডাল কিনে ফেলি, সেই ভয়ে টাকা গুলি আমানত হিসাবে থাকবে অধ্যাপক কবির কাছে। কারণ আমি রেখে খরচ করে ফেলি, তখোন তোর বিদেহী আত্মা কষ্ট পাবে। তোর কাছে অপরাধী হয়ে যাব ভেবে অর্থশালী কবির হাতে বিশ্বাস করে জমা রেখেছিলাম। যিনি কক্সবাজার বেতার থেকে মাসে ঘোষণা, খবর পাঠ, অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, গান বিক্রি করা সহ অন্যান মিলিয়ে অন্তত কুড়ি হাজার টাকা আয় করেন।
বর্তমান সরকার কলেজের এমপিও ভুক্ত শিক্ষক দের মাসিক বেতন অন্তত ৫০ হাজার করেছে, সবমিলিয়ে (ধারনা) করেছে। ঐ কবি মাস্টারের বউ মাদ্রাসা থেকে একি পরিমান আয় করে। সব মিলিয়ে উভয়ের মাসিক এক লক্ষ কুড়ি তিরিশ হাজার টাকা পড়ে। তার কক্সবাজার শহরে বাসা ভাড়া দিতে হয় না, ঘর জামাই হিসাবে থাকে। তারপর ও সে চার হাজার টাকার লোভ সামলাতে পারেনি। ক্ষমা করিস, মাসউদ শাফি। এটি আমার বিশ্বাসের অপরাধ, তুই তাকে বিশ্বাস করে তার বাচ্চা ও তাকে ঘরে পৌঁছে দিতি। তোর গ্রামের অগ্রজ কবি হিসাবে। এটিও তোর, তাকে বিশ্বাসের অপরাধ।

তোর কথা লিখতে গিয়ে অন্যের বদনাম হয়ে যাচ্ছে, লোকে বলবে। কিন্তু সত্যের ভার আমি আর বহন করতে পারছি না। অন্তত তোর কবর টি রক্ষা করে স্মৃতি ফলক লাগানোকে আমি মনে করি কবিতার ফরজ কাজ।

তাই তোর জন্মদিনে এই সত্যটি তোর রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসি তোর অনুজ, বন্ধু, অগ্রজ, আর তোর ভক্তদের জানানো টা কবিতা ও কবির জন্য ফরজে কেফাইয়া।

ভালো থাকিস। শুভ হোক তোর জন্মদিন।
জয় কবিতা, জয় সমাজতন্ত্র, জয় বাংলা।

—————————————————————-

মাসউদ শাফি : কবির শহর
মনির ইউসুফ

প্রাগৈতিহাসিক বালির বৃত্ত, মৃত্তিকায় থরে থরে সাজানো পাহাড়, ইউ আকারে ঘিরে আছে সাগর। তার মাঝখানে মহেশখালি অক্ষরের বিম্বিত এক পুরাণের ভূমি। নাথ ও আদিনাথের বুক জুড়ে আধুনিক নাথনাথিনীর শহর। তার ফাঁকে জোছনা গলে যওয়া দ্যুতির মোজেজায় আলোকিত কস্তুরা ঘাট। তারপর কক্সবজার ভূমি। বাইবৃক্ষ। প্রাচীন জাদি, বুদ্ধের জ্যোর্তির বলয়। খুরুস্কুল চৌফলদণ্ডি গোমাতলী ঈদগাহ, ঈদগড়, গর্জনিয়া, নাইক্ষংছড়ি অপূর্ব সবুজের ভূখণ্ড। সেই বিস্তৃত মৃত্তিকা টেনে ধরে প্রতিটি কাল, অবাক কাল। তারপর মেহের ঘোনা, কালির ছড়া, রামু ঘন বনের টিলা, আলিফ মানে লাঠি, লাঠি মানে গর্জন-ঝাউ বৃক্ষ, বৃক্ষ মানে খুটি, বা মানে ভিটে, তা ছা মিঠাছড়ি নীলা উখিয়া টেকনাফ আর অবাক পৃথিবী। তার আগে গেটওয়ে হারবাং চকরিয়া, মালুমঘাট, ডুলাহাজেরা আবার বঙ্গোপসাগর, আবারও অবারিত আকাশ- ‘যতদূর দৃষ্টি ততদূর উড়িয়েছি মনের ডানা’। আলিফ আল্লাহ। মানুষ-মানুষ। আব্রাহামের লাঠি। র‌্যাঁবোর অক্ষরের রঙ। আমার শিশ্ন। আই মানে লাল, বি মানে সবুজ, সি হলুদ। কবির অক্ষর রঙের বিন্যাসে বিভূষিত। অ মানে অবাক, আ মানে আল্লাহ। শব্দের জিকির, বৃক্ষের জিকির আর সাগরের জিকির চলতে থাকে কবির শহর বঙ্গোপসাগরের তটে, মৈনপাহাড়ের রেশতায়। আ মানে আলাওল, পদ্মাবতী। শ মানে শুক্লা শকুনতলা। পুরাণের আদি আশ্রম। দরিয়ানগর বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতা। আর মাসউদ শাফির ঝাকড়া চুল। এই পাগলামী নিয়ে আমরা কক্সবাজারে কবিতা লিখতে এসেছিলাম। আমরা মানে আমার মতো ঘোরলাগা আরও অনেক তরুণ। যারা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাকে শুরু থেকেই দেখিয়েছিলো বুড়ো আঙুল। আমরা পকেটে কবিতা নিয়ে ঘুরতাম, আমরা মগজে কবিতা নিয়ে ঘুরতাম। আমার চোখের ইশারায়, হাতের ছোঁয়ায় কবিতা নিয়ে দরিয়ানগর বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার এই তীর, মৈনপাহাড়ের এই তট চষে ফেলেছি। আমাদের আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়ার মত মন সমাজের তখনও তৈরি হয়নি, না এখনও। র‌্যাঁবোর আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়ার মন যেমন সেই সময়ের প্যারিসের তৈরি হয় নাই ঠিক তার মতো। সভ্যতার এত বয়স হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের সমাজের মানসিক পরিপুষ্টি হল না। পুঁজির অবক্ষয়ের ভেতর আমাদের সমাজের স্বপ্ন ডুবে গেল, তার নাম হলো আধুনিক সভ্যতা। অবক্ষয়, অবক্ষয়। আমরা দরিয়ানগরের তরুণীদের কবিতা শুনাতে চাইতাম। আমাদের তাজা আবেগের সেই কবিতা। বঙ্গোপসাগরীয় তীরের দরিয়ানগরের মেয়েরা তো রাশিয়ার নাতাশা, আখমাতাভা, মারিয়া না তারা কবিতা শুনবে। তারা কবিতা লিখি শুনলে তিন মাইল দূরে চলে যায়। তারা না কবিতা না ধর্মের কথা শুনতে চাই। তার কি চাই কি চাই। সে আমরা বুঝতাম না, এখনও কি বুঝি! আমি মানে তুমি, তুমি মানে আমি। আহা! কবিতা। কবিতা কবিতা করে কেটে গেল কত সময়, কত ঘোর, কত দূর, কত ভাব, অভাব। আমি আলী প্রয়াস, নুপা আলম, শাহেদ, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, ফোরকান আহমেদ, কুতুব হিলালী, রহমান মুফিজ, হাসান মুরাদ ছিদ্দিকী, অরন্য শর্মা, মাসউদ শাফি, কালাম আজাদ,হাসেম সৈকত, মোতেহারা হক মিতু, নীলা আরও অনেক অনেক তরুণ এ মুহূর্তে নাম মনে পড়ছে না। কি ঘোরে না কাটিয়েছি এই শহরে। বাস্তবতা আমাদের কারও মাথায় খেলেনি, কবি হবো কবি হবো এই ঘোরে কাটিয়েছি পৃথিবীর বারান্দায়। কবি হলে কি হয়, কবি না হলে কি হয় সে কি আমরা জানতাম! আমাদের বেদনা, আমাদের ঘোর একান্তই আমাদের। প্রতিদিনের ঘোরে প্রতিদিন কেটে যেত সমুদ্রের ঢেউ গুনে গুনে। রাত হয়ে যেত। বাড়ি ফেরার তাড়ায় মন ভেসে যেত কোথাও। আমরা ফিরে আসতাম রাতের আন্ধারে। সন্ধ্যার সূর্য ডুবে যেত নগরের গভীরে। তারপর হুট করে নামতো রাত। সাগরের ধমকা বাতাসে তারার বিনিসূতার মালায় দূর গগনে আরেক ঘোরে ডুবে যেতাম। লাবনী পয়েন্ট, উর্মি, ঝাউবনের তলায় আমরা বসে পড়তাম। সাগরের ঢেউ গুনে গুনে বড় হওয়া, বিকশিত হওয়া এই ঘোরের সন্তান মাসউদ শাফি। কবিতার জন্য দিয়ে দিল জীবন। কবিতার জন্য মুক্তো কুড়োতে গিয়ে যে ডুব দিলো আর উঠতে পারেনি; বেহায়া মৃত্যু টেনে নিয়ে গেল তাকে।

মফস্বল শহরে কবিতা লিখে জীবন যাপন করা কত কষ্টের সে আমাদের মত করে কেউ বুঝবে না। মফস্বল শহরের সংকীর্ণ সমাজিক চোখ কবিতার সৃষ্টিশীলতাকে কখনও বুঝতে পারে নাই। তারা স্বার্থের সৃষ্টিশীলতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে। অধ্যাপক, কবি, ব্যবসায়ী, মাস্টার, সামন্তীয় মানসিকতায় বেড়ে ওঠা মানুষগুলো এতটা নির্দয় স্বার্থপর তাতে অবাক হয়ে যেতাম আমরা। এই করতে করতে সমাজকে তারা একটা কূপমণ্ডুক শহরে পরিণিত করে ফেলেছে। তাদের ছেলে মেয়েরা এখন মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ী, সীমান্তের ব্ল্যাকার, নীতিহীন রাজনৈতিক নেতা, সরকারি ঘুষখোর আমলা অফিসার। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তারা ঢুকে গেছে স্বার্থপরতা নিয়ে। যার কারণে তাদের অজ্ঞান মন, অচেতন মন সৃষ্টিশীলতাকে সহ্য করতে পারে না। তাদের সস্তানদের তারা নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না। সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে যারা বেঈমানি করে, কালের সঙ্গে যারা বেঈমানি করে আর মানুষের কমিন্টমেন্টের সঙ্গে যারা থাকে না, প্রকৃতি তাদেরকে ঠিকই শাস্তি দিয়ে বসে। এখন মানুষ সেই শাস্তির শিকার হচ্ছে। ভেতরের অসুন্দর মনের মানুষেরা কিভাবে সুন্দরকে সহ্য করবে। সেটা আমাদের সমাজের বেলায় যেমন সত্য পৃথিবীর অবক্ষয়ী সমাজ ব্যবস্থার জন্যও তেমনই সত্য। মফস্বলের কবিতা চর্চাকারি অনেক কবি সাহিত্যিকদেরও মনোগঠন হয় না। তারা নিজেদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নজুরুলকে মিলায়। এরা বুঝতে চাই না একজন রবীন্দ্রনাথ বা একজন নজরুল পৃথিবীর পথে মানবজাতির প্রতি কি অসহ্য কমিটমেন্ট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। মফস্বলে বসে দুটো ভালো কবিতা লেখা আর চায়ের দোকানে বসে কবিতার আড্ডা দেওয়া এক জিনিস নয়। সেখান থেকে যদি কবিতার কোনো সৌন্দর্য সৃষ্টি না হয় সে আড্ডা এমনই আড্ডা হয়ে থাকে। আমি মাসউদ শাফি নুপা আলী মুরাদসহ আরও অনেকে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের এমন ব্যবহারের শিকার হয়েছি। আমি অবাক হয়ে যাই যারা কবিতা লেখে, সুকামার বৃত্তির চর্চা করে তারা কিভাবে এমন নৃশংস নিষ্ঠুর হয়। তাদেরও মন কেন তৈরি হয় না। এই বিশাল পৃথিবীকে স্বাগত জানতে পারে না কেন তারাও। বেশির ভাগ পুঁজিবাদি বুর্জোয়া খায়েশের মানুষ পরিবার পরিবার করে নিজেদেরকে আরও বেশি স্বার্থপর করে তোলে।

আমি মনে করি মাসউদ শাফি এই সামাজিক মানসিক বিকারের শিকার। আমরা যারা কবিতা লিখতে এসেছি সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত তারাও এই সামাজিক মানসিক বিকারের শিকার। কবিরা খ্যাতির জন্য পাগল, প্রকাশের জন্য প্রচারের জন্য পাগল কিন্তু তারা বুঝতে চাই না, এই অমরত্বের মোহ তাকে পুঁজিবাদী ভাঁড় বানিয়ে তোলে। নিজের অজান্তে নিজেই মহকালের কাছে ছোট হয়ে পড়ে। সমাজ তো এমনিতেই তা হয়ে রয়েছে। তার মানবিক বিকাশ তো অনেক দূরের ব্যাপার। সেখানে যারা কবিতা লিখে তাদের মানসিক নীচুতা, ছোটত্ব, ইতরামি, নোংরামি আমাদের আহত করেছে, আমাদের নিহত করেছে। মাসউদ শাফি আমার অনুজ বন্ধু কবি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত একজন সংবেদনশীল কবি। সমাজকে পরিবর্তন করার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া কর্মীও। মনে এক মুখে এক এমন দ্বিধাদ্বন্ধে ভুগতে থাকা কোনো নাবালাক সমাজকর্মী সে ছিল না। তার রাজনৈতিক মতবাদও স্পষ্ট ছিল। মানুষের জন্য কবিতা। সমাজ পরিবর্তনের জন্য লড়াই। সেই লড়াইয়ের সৈনিককে আমরা হারিয়েছি অকালে। বলবো আমরা তাকে হত্যা করেছি। অনাদরে অবহেলায়। তার ভিন্ন ঘরনার চুল রাখা। অদ্ভুত রকমভাবে চলাফেরা করা, মফস্বলের সুশীলরা কেউ মেনে নিতে পারে নাই। তাদের ইস্ত্রি করে মনে ইস্ত্রি করা পোশাকে এ ছিল বড় বেমানান। এইসব কষ্ট বৈপরিত্য নিয়েও বলতে পারি কক্সবাজার আমাদের কবিতার শহর। মাসউদ শাফির কবিতার শহর। আমাদের বেড় ওঠা এই বিশাল বঙ্গোপসাগরের বুকে। তার ধমকা থীর তাজা বাতাসের নিঃশ্বাস টেনে টেনে। শুধু আমার আফসোস থেকে গেল, আমাদের কবিরা, কক্সবাজারের মানুষেরা এত বড় আকাশ, এত বিশাল বিস্তৃত বেলাভূমি এই সমুদ্র নীলাচাল পাওয়ার পরও মনকে বড় করতে পারে নাই। সমুদ্র থেকে কিছুই শিখতে পারে নাই। প্রকৃতির অভিশাপ বুকে নিয়ে পড়ে থাকে তারা।

মাসউদ শাফি আমার কবিতায় রক্তের বন্ধনে জড়িয়ে থাকা আমার হাতের শিরা। আমার কবিতার পঙক্তির বেদনা, আমার আাহত হৃদয়ের আকুলতা। তোমাকে হারানোর কষ্ট আমি কি করে প্রকাশ করবো কবি। আমি বেকার। আমি মজনু। আমি লায়লা। গভীর রাত্রির ঘূর্ণি ঘোরে বয়ে যাওয়া তাজা হাওয়া। সেই আমরা বের হতাম রাত্রি। একদিন রাতে আমাদের পুলিশ তুলে নিয়ে থানার সামনে থেকে ছেড়ে দিয়েছিলো। সেই রাত্রি এত তারা আকাশে উলেছিলো, আহা! সেই তারা হয়ে গেলে তুমি। এখন আমি সমুদ্রে গেলে আহমদ ছফা মাসউদ সাফি মালিক সোবহান এ রকম অসংখ্য তারার পানে আনমনে তাকিয়ে থাকি। কেননা, যতই যা বলি এই শহর কবির শহর। এই শহর তোমার শহর। আর আমার অনন্ত বেদনার ঢেউ।

————————————————————————————–

স্মৃতিসত্তায় অমলিন কবি মাসউদ শাফি
আলী প্রয়াস

মাসুদ শাফির মৃত্যু আমাকে নানাভাবে দোলা দেয়। ২৩ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে স্বল্পপ্রজ অনুজপ্রতিম এই কবিকে হারিয়ে নিজের মৃত্যু নিয়েও ভাবনার জায়গা তৈরি হয়েছিল। মানুষ এত সহজে চলে যেতে পারে! তাঁর চলে যাওয়া আমার বিষাদমাখা অন্তরের স্মৃতিসত্তায় নান্দনিক পুরুষ হয়ে চির জাগরুক হয়ে আছেন এখনও। নাগরিক নৈরাশ্যতায় বেড়ে ওঠা এই তরুণ সহজ-যাপনের সমস্ত বৈপরিত্য নিয়ে এক প্রকার যুদ্ধ করে চলে গেছেন অন্যপারে। যাপনে কবি, চিন্তায় রাজনৈতিক ও মননে অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিসত্তায় নিজেকে উৎকর্ষতার অনন্য অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন চর্চা, সংগ্রাম ও ভাবনা-বৈদগ্ধের ভেতর দিয়ে। প্রচলিত সমাজের অনাচার-অসংলগ্নতার বিরুদ্ধে আজীবন সোচ্চার থাকা এই কবি তুমুল সৃষ্টিশীলতায় বাঁচতে চেয়েছিলেন। পারিবারিক বঞ্চনা, সামাজিক রুঢ়তা ও ধাপ্পাবাজির অসময়ে জীবিকার কথা ভুলে কবিতাতেই ধরেছিলেন জীবনবাজি। সাহিত্যের প্রতি আকণ্ঠ অনুরাগী কবি জীবন প্রত্যাশী এক বুভুক্ষু কবিতা কর্মী ছিলেন মাসুদ শাফি।
চলতি শতাব্দীর প্রথম দশকে কক্সবাজারের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে মাসুদ আবির্ভূত হয়েছিলেন অন্যরকম সম্ভাবনা নিয়ে। উত্তরপ্রজন্ম জেলায় যারা এখন ছাত্র ইউনিয়ন করেন বেশির ভাগই মাসুদ শাফির ভাবশিষ্য, সংগ্রামী সহযোদ্ধা। পুরো দশক জুড়ে আন্দোলন সংগ্রামের মুখ্য কর্মী ও প্রতিবাদী যুবক হিসেবে বেশ পরিচিতি পেয়েছিলেন। শিক্ষার অধিকার, সামাজিক বঞ্চনা, ন্যায় বিচার ও রাষ্ট্রীয় অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ-সংগ্রামের অবদান এখনও নবীন রাজনৈতিক কর্মীদের প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করছে।

মাসুদ শাফি একটি সুন্দর, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতো। এ লক্ষেই সে কলম ধরেছিলেন, রাজনীতি করতেন। সেজন্য তাঁর নানামাত্রিক প্রস্তুতিও ছিল। বিশ্বরাজনীতির পাঠ ও সাহিত্যের ধ্রুপদী পথে হাঁটা শুরু করেছিলেন। চরম অর্থনৈতিক টানাপোড়নের কারণে এক প্রকার কষ্টকর জীবন ধারণ করা পোশাক পরিচ্ছদে উদাসীন মাসুদ শাফি’র ভাবসত্তার জায়গা ছিল অনেক বড় ও মহৎ। সমকালিন অনেক মানুষ মাসুদের ব্যক্তিগত যাপনে বিরক্ত হলেও তাঁর ভেতরের বাসনা, ক্রন্দন, অভাব কিংবা সৃষ্টি মুখরতায় জ্বলতে থাকা আগুনকে কেউ বুঝতে চায়নি। মাসুদ শাফি সেই পোড় খাওয়া মানুষ যে কবি শুকান্ত ভট্টচার্যেরর মতো পৃথিবীকে পালটে দেয়ার স্বপ্ন দেখতেন, সমাজ-রাষ্ট্রকে পুন:নির্মানের চিন্তায় মগ্ন থাকতেন।

তিনি যেমন ছিল রাজনীতির মাঠে, তেমনি ছিলেন লেখালেখিতে। মূলত মাসউদ শাফির সাহিত্য জীবনের শুরু ছাত্রাবস্থাতেই। ১৯৯৯ সালের ৯ জুলাই উখিয়ায় লেখা ডায়েরিতে লেখেন, ‘কবিতা আমার জীবনের প্রথম প্রিয়া-আমি যার প্রেমে পড়েছিলাম’। মুদ্রিত রচনার মধ্যে ‘কালো পর্দার রাজত্ব’ শিরোনামে ২০০০ সালে দৈনিক আজাদী পত্রিকায় ছাপানো কবিতাটিই তাঁর প্রথম প্রকাশিত লেখা। স্কুল জীবনের শুরু থেকেই মেধাবী ও ক্লাসে ফাস্ট বয় হিসেবেও খ্যাত ছিলো। মাধ্যমিকে থাকতেই বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীর সাথে পরিচিত হন। ১৯৯৯ সালে পালং উচ্চ বিদ্যালয় সংসদের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে মনোনিত হন। পরবর্তীতে উখিয়া উপজেলা সংসদের সভাপতি, জেলা সংসদের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনসহ আমৃত্যু জেলা সংসদের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন।

শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কক্সবাজার কলেজ হতে এইচএসসি পাশ করেন মাসুদ শাফি। পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। এ সময় উখিয়া সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ (উসাস) নামে সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠা করেন। এ সংগঠনের উদ্যোগে উপজেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে, রাজনীতি এবং কবিতা বিষয়ক চিন্তা নিয়ে আলোচনা করতেন পরবর্তীতে সে সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা করে নিজেকে জ্ঞানসম্মৃদ্ধ ও মানবিক স্তরের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

মাসউদ শাফির জন্ম ১৯৮২ সালের ১০ জুলাই কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার রত্মাপালং। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করার অভিযোগে প্রতিক্রয়াশীল রাজনীতির সাথে জড়িত বৈমাত্রেয় ভাইদের প্রতিকূলতার শিকার হয়েছে। সাহিত্য আর রাজনীতির টানে এক সময় কক্সবাজার চলে আসেন। তখন থেকে সর্বশেষ বিষয়ভিক্তিক ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। সংযুক্ত ছিলেন খেলাঘর, থিয়েটার ও পাবলিক পাবলিক কেন্দ্রিক সংস্কৃতি চর্চায় ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ লেখক শিবির আন্দোলনে। বলতে গেলে তিনি লেখক শিবিরের কক্সবাজারের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সভা সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। লিখতেন কবিতা, প্রবন্ধ, করতেন পুস্তকের আলোচনা। কিছু সময় সাংবাদিকতাও করেছেন। রাজনৈতিক কর্মীর পাশাপাশি সংস্কৃতি ও কবিতাকর্মী হিসেবে কক্সবাজারে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। তার সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। এই গুণের কারণেই কক্সবাজার সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। ‘দাহকাল’ ও ‘রক্তবাক’ নামে সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ওই কাগজে দেশের অনেক গুনী লেখকের সমাবেশ ঘটিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি দৈনিক কক্সবাজার বাণী নামে পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদনা করতেন। আমৃত্যু এ কাগজের সাথে যুক্ত ছিলেন।

মাসউদ শাফি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় অসংখ্য কবিতা প্রবন্ধ লিখলেও জীবিতকালে তার কোন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। তার উল্লেখযোগ্য কবিতা গুলো হলো-ছায়ালোক, মানুুষ ও কবি, মাটি অথবা মানুষ, আত্মসন্ধান, সুন্দর, মানুুষ ও কবি, সমুদ্রস্বর, নির্মূখী, তুমি ও শহর, হৃদকাব্য Stop the Genocide, , পানশালা পঙক্তি-১, আগুনের আগুনে পুড়ি, দইজ্যাপাড়ার শব্দবৃক্ষ প্রমুখ।

সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়েছিলেন মাসউদ কিন্তু কখনো কারও কাছে মাথা নত করেননি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু চাইতেন না, যেটা তার দ্বারা সম্ভব হবে না, তা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না তিনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ও প্রতিবাদী ছিলেন। বাংলা সাহিত্যে শূন্য দশকের অন্যতম কবি ও রাজনৈতিক কর্মী মাসউদ শাফি দূরারোগ্য ব্যাধি লিভার জন্ডিস ও হ্যাপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্ত হওয়ায় কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে মারা যান।

নাগরিক জীবন মাসুদ শাফিকে বারবার তাড়িত করেছে। সে জীবন থেকে তিনি প্রতারিতও হয়েছেন অনেক। নিষ্ঠুর শহর আর শহরের মুখোশধারী মানুষগুলো তাঁকে করেছে অমানবিক অবহেলা, যা তাঁকে এক প্রকার বৈরাগ্য জীবন যাপনে বাধ্য করে। নিজের সাথে নিজের দ্বন্দ্ব আর অনিয়ম, অসুস্থতা ও বিষাদ তাঁকে নিয়ে যায় মৃত্যুর মুখোমুখি। কবি মাসুদ শাফি’রা মরে যায় সামাজিক শৃঙ্খলের নিষ্পেষনে, আর তথাকথিত অমানুষগুলো বহাল থেকে যায় সমস্ত অসুন্দরের ভেতরও। তাই, মাসুদের মৃত্যু আমাদের বারবার প্রশ্নের মুখোমুখি করে। যে জীবন সৃষ্টির, সম্ভাবনার সে জীবন কেন ধুকে ধুকে মরে? আমার কাছে কবি মাসুদ শাফি, সৃষ্টি উন্মাদনায় যাপিত এক মহানাগরিক মানুষ। তিনি যে মূল্যবোধ লালন করতেন তার গভীরতা অসীম। সে আছে কবিতার ভেতর, আছে তাঁর দর্শনের ভেতর, আমাদের ভালোবাসার ভেতর। জয়তু মাসদু শাফি।

———————————————————————-

বন্ধু মাসউদ শাফি
হাশেম সৈকত

মাসউদ শাফি শূন্য দশকের কবি। অকাল প্রয়াত মাসউদ শাফি কক্সবাজারে অভিভূত হয়েছিল ধূমকেতু রূপে। নিজের আগমন বার্তা জানান দিয়ে নিরবেই চলে গেলেন। ছাত্র ইউনিয়নের হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। আমৃত্যু বাম চেতনার মধ্যে যাপন করেছেন।

মাসউদ শাফি স্বভাবে বোহেমিয়ান। তার সাথে প্রথম পরিচয় হয় ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে। মাসুদ শাফি আমার এক ব্যাচ জুনিয়র। সে উখিয়ার পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ত। বিজ্ঞান বিভাগে। সপ্তম শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সে ছিল টানা ক্লাস ক্যাপ্টেন।

তার সাথে কথা বলার প্রাসঙ্গিক বিষয় ছিল তার সম্পাদনায় পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় হতে প্রকাশিত ‘পালং সাহিত্য সাময়িকী’। এভাবেই শুরু। ওই সময়ে উখিয়ার তরুণরা কক্সবাজারের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখি। আমরা কোর্টবাজারে নিয়মিত দেখা সাক্ষাত শুরু করে দিলাম। সাহিত্য কেন্দ্রিক আড্ডা শুরু হয়ে গেল। বৃহৎ কিছু করার জন্য একটি সাহিত্য সংগঠক করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। সারোয়ার সাহেল, হাশেম সৈকত, সাগর ফরহাদ, মাসউদ শাফি, আবুল হাশেম কায়সারসহ অন্যান্য লিখিয়েদের নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল উখিয়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদ – উসাসাস। এই সাহিত্য সংসদের প্রার্থীবিহীন প্রথম নির্বাচনে মাসউদ শাফি আর আমি সাধারণ সম্পাদক পদে সমান সংখ্যক ভোট পাই। সংগঠনে মাসুদের বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকায় আমি মাসউদ শাফিকে সাধারণ সম্পাদক পদে সমর্থন করলাম। সভাপতি নির্বাচিত হয় সারোয়ার সাহেল। আমি সাহিত্য সম্পাদক।

২০০২ খ্রিষ্টাব্দে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় লিটল ম্যাগাজিন ‘ইনানী’। ইনানী বিপননে মাসউদ শাফির অগ্রণী ভূমিকা ছিল। শুধুমাত্র পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে রফিক উদ্দিন মাহমুদ স্যারের সহযোগিতায় ইনানী প্রায় আশি কপি বিক্রি হয়। ওই সময়ে এই সহযোগিতা নতুন সম্পদকের জন্য বিশাল পাওয়া।

মাসউদ শাফি ২০০২ খ্রিষ্টাব্দের এসএসসি পরীক্ষার্থী। আমরা বারবার তাগাদা দিলাম ভালো মতো আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য। সাহিত্য, ঘুরাঘুরির চেয়ে জীবনে এসএসসি পরীক্ষার মূল্য অনেক। আমাদের কথা কী মাসউদ শাফির কানে যায়! যথারীতি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে মাসুদ শাফির ফলাফল সি গ্রেড। এই ফলাফল দেখে আমি কখনো মাসউদ শাফিকে বিস্মিত বা হতাশ হতে দেখিনি।

তারপর মাসউদ শাফি চলে গেল কক্সবাজার শহরে। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যোগ দিয়ে মন মননে প্রগতির সারথি। কক্সবাজার গিয়েও তার চালচলনে কোন পরিবর্তন আসেনি। কোথায় খায়, ঘুমায় তার ঠিকঠিকানা নেই। তাকে বললাম নিজেকে চেনো, কক্সবাজার সিটি কলেজ হতে অন্তত ইন্টারমিডিয়েট পাশ কর। তুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা রাখো। নিজেকে নিঃশেষ করনা। মাসউদ ম্লান হেসে বলেছিল- ‘আমি এখনো শেষ হয়ে যাইনি।

আমি চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার জন্য কক্সবাজার ছেড়ে চট্টগ্রাম চলে গেলাম। পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। মধ্যখানে দীর্ঘদিন দেখা/কথা হয়নি। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে আমি আর জসিম আজাদ চকবাজার গোলজার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় মাসউদ শাফি আমাদের সামনে উপস্থিত। দু জনে কোলাকুলি করে অনেক কথা হল। তার পকেট প্রায় খালি থাকে। সকালে কিছু খেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস না করে, তাকে ভালো মতো খাওয়ালাম। বলল- ‘কবি পকেটে টাকা আছে? থাকলে কিছু টাকা দাও’
আমি বললাম – ‘ পকেটের অবস্থা ভালও না’। সে বলল- তাহলে একটা সিগারেট কিনে দাও’।
এটাই মাসউদ শাফির সাথে শেষদেখা, শেষকথা।

আজকে মাসউদ শাফির একটি কথা বারবার মনে পড়ছে- ‘আমি এখনো শেষ হয়ে যাইনি’। সত্যি, মাসউদ শাফি শেষ হয়ে যায়নি। মাসউদ শাফি শেষ হবার নয়।

—————————————————————————————

যে আশা অপূর্ণতায় শেষ
কালাম আজাদ

মাসউদ শাফি , বাঙলা সাহিত্যে শূন্য দশকের অন্যতম শক্তিমান কবি, রাজনৈতিক কর্মী। শূণ্য দশকের আরেক শক্তিমান রাকিুবল ইবনের মতো তিনিও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন ২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর ভোর সাড়ে ৫টায়। ভূগেছেন লিভার জন্ডিস রোগে। কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তিও হয়েছিলেন নিজের আরোগ্য লাভের জন্য কিন্তু নিষ্টুর দূরারোগ্য ব্যাধি লিভার জন্ডিস ও হ্যাপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তার লিভার ও কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাচানো সম্ভব হলো না।

শূণ্য দশকের শক্তিমান কবি মাসউদ শাফির পুরো নাম শফিউল আলম মাসউদ (ভোটার আইডি কার্ডে শফিউল আলম বলে উল্লেখ আছে)। জন্ম ১৯৮২ সালের ১০ জুলাই (এসএসসি’র সনদ অনুযায়ী ১০ জুলাই ১৯৮৬)। উখিয়া উপজেলার রত্মাপালং ইউনিয়নের রুহল্লরডেবা গ্রামের বনেদী পরিবারের সন্তান মৃত এজাহার মিয়া ও মা ফিরোজা বেগমের শেষ সন্তান তিনি। স্কুল জীবনের শুরু থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত। স্কূলে ফাস্ট বয় হিসেবেও খ্যাত ছিলো। স্কুল জীবন পেরিয়ে কক্সবাজার কলেজে অধ্যয়ন করেন। পাশ করেন এইচএসসি। পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জন্ম হওয়া বাংলাদেশ ভূখন্ডের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীর সাথে পরিচিত হন। শংকর বড়–য়া রুমি (কক্সবাজার জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন কক্সবাজার জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক) এর হাত ধরে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সহপাঠী-বন্ধু হাশেম কায়সার, চারুয়ার চাহেল, ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী শংকর বড়ুয়া রুমি, জসিম আজাদ, শরীফ আজাদ, সরওয়ার কামালসহ অন্যান্য বামপন্থী বন্ধুদের পরিচিত হওয়ার পর থেকে শুরু হয় রাজনৈতিক পরিচয়। ১৯৯৯ সালে পালং উচ্চ বিদ্যালয় সংসদের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে যোগদান করে উখিয়া উপজেলা সংসদের সভাপতি, জেলা সংসদের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনসহ আমৃত্যু জেলা সংসদের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ দিকে কবি মাসউদ শাফির বৈমাত্রয় ভ্রাতারা বিএনপি জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত। বড় ভাই নুরুল আলম কন্ট্রাক্টর উপজেলা বিএনপি নেতা এবং সেজ ভাই ফরিদুল আলম (কোট বাজার স্টেশনের জমজম মার্কেটে যার একটি ফার্মেসীও রয়েছে এবং সেখানে এলএফ এম ডাক্তার হিসেবে চিকিৎসা সেবাও প্রদান করেন, পাশাপাশি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডাক্তারি করেন, যাকে আমরা হাতুড়ে ডাক্তার বলে জানি) উখিয়া উপজেলা জামায়াত নেতা হওয়ায় অসম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসেবে পরিবারের প্রতিকুল অবস্থার শিকার তো হতে হবেনই। ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে কয়েকবার ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়। পারিবারিক আনুকূল্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কৈশোর জীবনে জেটার বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে লেখাপড়া করতেন। এসএসসি পাশের পর কক্সবাজার সরকারি কলেজে এইচএসসি অধ্যয়নকালে বৈমাত্রেয় ভ্রাতাদের প্রতিকূলতার শিকার হয়েছে। তাকে পারিবারিকভাবে এত নির্যাতন করা হতো যে পারিবারিক বিশাল সম্পত্তি থেকে বাদ দেয়া সম্ভব। মা ও ভ্রাতাকে না খাইয়ে আলাদা করে ঘর তৈরী করে দিয়েছিলেন। সম্ভাব্য এবং বনেদী পরিবারের বউ হয়ে স্বামী মারা যাবার তাকে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ঝিইয়ের কাজ করতে হয়েছে। মাসউদ শাফিকে পড়াতে হয়েছে। তারপরেও শান্তি নেই। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও উখিয়ায় থেকে কক্সবাজার কলেজে যাতায়াত করতেন। পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। এ সময় উখিয়া সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ (উসাস) নামে সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠা করেন। এ সংগঠনের উদ্যোগে উপজেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে, রাজনীতি এবং কবিতা বিষয়ক চিন্তা নিয়ে আলোচনা করতেন। পাশাপাশি ছাত্র ইউনিয়নের কাজও করতেন। এ মুহর্তে স্কুল জীবনের একটি স্মৃতি এবং মাসউদ ভাইয়ের সাথে পরিচয় পর্বের কথা মনে পড়ে যায়। সময়টা ছিল ২০০১। ২০০১ সালের আগস্ট মাসের কোন একদিন (এ মূহূর্তে দিনটা মনে পড়ছে না) উসাস এর বুলেটিন নিয়ে হাজির হন মরিচ্যা পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে। যেখানে আমি পড়তাম। একদিন ক্লাসে ঢুকার আগেই দেখতে পেলাম লম্বা এবং কালো এক সুদর্শন পুরুষ কবিতা, সাহিত্য এবং রাজনীতি সম্পর্কে আলোচনা করছেন। তার সাথে আমাদের আরেক বড় ভাই বাবুল মিয়া মাহমুদ। তিনিও ছড়া কবিতা লিখতেন। এখনো লেখেন এবং সাংবাদিকতাও করেন। বাবুল মিয়া মাহমুদের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করায় শফিউল আলম মাসউদ এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর থেকে তার সাথে দেখা হলে বলতেন, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা রক্তপিপাসুদের খোঁজে বের করে তাদের সমূলে ধ্বংস করতে হবে। এভাবে কয়েকদিন যেতে না যেতেই একদিন কোন কাজে আমি গিয়েছিলাম কোটবাজার স্টেশনে। সেখানে দেখা হওয়া মাত্রই স্নেহের পরশ বুলিয়ে আমাকে বুকে টেনে নিয়ে চা ও বিস্কুট খাওয়ালেন। পরিবারের সবার খবর নিলেন। এক পর্যায়ে ছোটদের অর্থনীতি, ছোটদের রাজনীতি নামক দুইটি বই হাতে দিয়ে বললেন এগুলো নিয়ে যাও, পড় এবং পড়েই আমাকে হাজিরা দিতে হবে কিন্তু। ছোটদের রাজনীতি নামক বইটি পড়তে গিয়ে কিছু কিছু বুঝতে পারলেও কয়েকটি বিষয়ে না বুঝায় তার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করায় তিনি এমন বুঝিয়েছেন যে এখনো পর্যন্ত আমার মনে আছে। এর পর থেকে “তানিয়া, কী করতে হবে কেন করতে হবে?, লেনিন, কার্ল মাক্র্স, এঙ্গেলস, চালর্স ডারউইন, স্টিফেন হকিং, আবুল ফজল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মাদামকুরী, শেক্সপিয়র, লিও টলস্তয়, ম্যাক্সিম গোর্কি, এন্থনিও গ্রামসীসহ একের পর এক বই পড়তে দিতেন এবং সব বই ফেরত নিয়ে নিতেন আবার। এই বইগুলো পড়তে গিয়ে নিজের অজান্তে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকান্ডের সাথে পরিচিত হয়ে পড়ি। যদিও ছাত্র ইউনিয়ন করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তার একটি বড় ইতিহাস রয়েছে, তা পরে আরেকটি লেখায় লিখবো বলে এখানেই ইতি টানলাম।

মাসউদ শাফির সাহিত্যজীবনের শুরু ছাত্রাবস্থাতেই। ১৯৯৯ সালের ৯ জুলাই উখিয়ায় লেখা ডায়েরিতে লেখেন, “কবিতা আমার জীবনের প্রথম প্রিয়া-আমি যার প্রেমে পড়েছিলাম। ছেলেবেলায় ইস্কুলে যেতে রাস্তা বড়ো নির্জন এবং দু’পাশে সারি সারি গাছে পূর্ণ থাকত। অনেকদিনই ঐ পথে একা ইস্কুলে গেছি এবং যেদিনই একা যেতাম জোরে জোরে আবৃত্তি করতাম। এখনো সে সব দু-একটি মনে আছে- ঐ কবিতা এখন পেলে হয়ত পড়তেই ইচ্ছে করবে না। কিন্তু সে-দিন কী ভালোই যে লাগত। ক্লাসের নতুন বই কেনা হলে দেখা যেত, মাসখানেক না যেতেই বাংলা পাঠ্য বইয়ের সবক’টি কবিতা কণ্ঠস্থ হয়ে গেছে। ইচ্ছে করে করেছি তা নয়, ব্যাপারটা কেমন যেন আপনা থেকেই হয়ে যেত। কত চরণ তার মনের মধ্যে এখনো জ্বলজ্বল করছে।”

মাসউদ কলেজে পড়ার সময়ই কবিতা ও প্রবন্ধ লিখতেন। মুদ্রিত রচনার মধ্যে ‘কালো পর্দার রাজত্ব শিরোনামে ২০০০ সালে দৈনিক আজাদী পত্রিকায় যে-কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেটিই তাঁর প্রথম প্রকাশিত লেখা বলে ধরে নেওয়া যায়।

এরপর আসা যাক পারিবারিক আনুকূল্য ছেড়ে কেন কক্সবাজারে বসবাস করতেন সে সব কথায়, ২০০৩ সালে কোটবাজার স্টেশনে বিজয় দিবসের এক অনুষ্ঠানে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা হিসেবে বক্তৃতা করার সুযোগ হয় তার। ওই অনুষ্ঠানে শফিউল আলম মাসউদ ওই সময়ে বিএনপি জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীদের দ্বারা সংঘটিত কয়েকটি সহিংসতার কথা উল্লেখ করে বক্তব্য রাখেন। বক্তব্য রাখার সময় বিপুল জনতা তাকে সাধুবাদ জানায়। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতের নেতা ফরিদুল আলম ও বিএনপি নুরুল আলম কন্ট্রাক্টর (তার বৈমাত্রয় বড় ভাই ) তাকে ধরে কোটবাজার স্টেশনে ব্যাপক মারধর করে এবং মাথার চুল কেটে দিয়ে চারদিকে ঘুরায়। মার খাওয়ার পর মায়ের কাছে গিয়ে সমাদর পাননি তিনি। কোত্থকে পাবে, বাবা এজাহার মিয়ার মারা যাবার পর মা ফিরোজা বেগমতো পালিত হতেন প্রথম পক্ষের সন্তানের হাতে। এমন অপমানের পর পারিবারিক আনুকূল্য ছেড়ে দিয়ে পর্যটন শহরে কক্সবাজারে শংকর বড়–য়া রুমির কাছে চলে আসেন। ওই সময় থেকে সর্বশেষ বিষয়ভিক্তিক ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। জড়িয়ে পড়েন খেলাঘর, থিয়েটার ও পাবলিক পাবলিক কেন্দ্রিক সংস্কৃতি চর্চায় ও পরবর্তীতে বাঙলাদেশ লেখক শিবির আন্দোলনে। বলতে গেলে তিনি লেখক শিবিরের কক্সবাজারের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সভা সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। লিখতেন কবিতা, প্রবন্ধ, করতেন পুস্তকের আলোচনা। ওই সময় শখের বসে সাংবাদিকতাও করতেন তিনি। থাকতেন শংকর বড়ুয়া রুমি, নুপা আলম, রহমান মুফিজ এবং বৈরাম ইলিয়াসের ছত্রছায়ায়। সৎ চরিত্র ও ব্যবহারে অমায়িক হওয়া অধিকারী হওয়ায় পছন্দ করতে প্রগতিশীল রাজনীতি পরিবারের সদস্যরা। শুধু তাই নয়, তাকে দেখতে পেতেন এমন লোক খুবই কম রয়েছে। তবে জামায়াতের লোক একদম দেখতে পেতেন না তিনি। জামায়াত শিবির এবং বিএনপির রাজনীতির নামে মানুষ মারা রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িকা ও যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিরোধীতা করে ঘর ছেড়েছেন এবং আমৃত্যু তিনি রাজপথে এবং শ্লোগানে জামায়াত শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবী জানিয়েছেন এবং পাশাপাশি আমৃত্যু নিজের আদর্শকে জলাঞ্জলি দেননি। তার সাথে দ্বিতীয়বার পরিচিত হয় যখন আমি অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্র (তখন তিনি পুরোদস্তে রাজনৈতিক কর্মীর পাশাপাশি সংস্কৃতি ও কবিতাকর্মী হিসেবে কক্সবাজারে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন।) ওই সময় বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করতাম। একদিন কি কারণে বাড়িতে যেতে না পারায় আমাকে তার মোহাজের পাড়াস্থ বাসায় নিয়ে গিয়েছিলো। ওইখানেই আবিষ্কার করলাম শূণ্য দশকের এক আপাদমস্তক কবিকে। মফস্বলবাসী কবি হিসেবে জাতীয় পত্রিকা ও সাময়িকীতে সমান ভাবে লিখেছেন তিনি। আমৃত্যু কবিতা চর্চা করলেও বের হয়নি কোন প্রকাশনা। তবে দাহকাল ও রক্তবাক নামে সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ওই কাগজে দেশের অনেক গুনী লেখকের সমাবেশ ঘটিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি দৈনিক কক্সবাজার বাণী নামে পত্রিকার সাহিত্য পাতা দেখতেন তিনি। আমৃত্যু এ পাতা দেখেছেন।

সেই ২০০৭ থেকে তিনি কোন সমস্যায় পড়ে বাসা ছেড়ে দেয়ায় প্রায় সময় আমার বাসায় থাকতেন। এমনকি চুল রাখায় তার জন্য আমার একটি ভাড়া বাসাও ছাড়তে হয়েছিলো। তারপরও আমার সাথে ছিলেন সব সময়। ওই সময় আমি যুব ইউনিয়নের সাথে জড়িত হয়ে পড়ি। যার ফলে তার সাথে ওঠাবসা আরো বৃদ্ধি পেয়ে যায়। গত প্রায় ৬ বছর যাবৎ তিনি আমার সাথে থাকতেন। মাঝে মধ্যে অমিত চৌধুরীর বাসায়ও থাকতেন। মাঝে মধ্যে কোথাও উধাও হয়ে যেতেন। বেশ কয়েকদিন পরেই আবার রাত একটা কিংবা তিনটায় এসে বাসার দরজায় কড়া নাড়তেন। এ নিয়ে ওনার সাথে কয়েকবার কথাকাটাকাটিও হয়েছিলো। রাগ করে চলে যাবার জন্য উদ্যত হইলে মাফ চেয়ে নিয়ে নিতাম। সে সময় বলতো কালাম সবাই না বুঝলে তুমি তো বুঝ, আমাকে। মাঝে মাঝে এতই আবেগপ্রবণ হয়ে যেত তাকে সামলানো যেত না, ওই সময় শুধু কান্না করে করেই পরিবারের কথা বলতেন, কিন্তু একদিনও তার মায়ের কথা বলিনি। কেন বলিনি। তা কেউ জানে না একমাত্র তিনি ছাড়া। জামায়াত নেতা ফরিদুল আলমকে তার এ অবস্থার জন্য দায়ী করতেন তিনি। ওই সময় মাঝে মধ্যে আগুন আগুন বলে বলে চিৎকার করে একটি কবিতা সব সময় মুখে আওড়াতেন। আমি এই কবিতাটির ভগ্নাংশ তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারলামনা

আগুন
আগুন আগুন…
বুকে আগুন

চোখে আগুন
মুখে আগুন
সিগারেটের মতোন পুড়ে পুড়ে
দগ্ধ হতে হতে
ছাই হচ্ছি বারংবার এভাবে।

এ কবিতা আওড়াতেন আর কান্না করতেন। সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে যে এতিম হয়েছিলেন মরা অবস্থায়ও তা ছিলেন, কিন্তু কখনো কারো কাছে মাথা নত করতে দেখেনি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু চাইতেন না, যেটা তার দ্বারা সম্ভব হবেনা, তাই নিয়ে তা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না তিনি। কিন্তু মেহনতি মানুষের যেখানে কষ্ট পেতে দেখেছেন সেখানেই স্বোচ্ছার হয়েছেন।

তিনি রাত করে যে বাসায় যেতেন আর মাঝে মধ্যে দুস্তামি করতেন তা নিয়ে অনেক সময় ঝগড়া হতো। আমি বাসায় না গেলেও আন্টিকে দেখে বাসায় ঢুকে ঘুমিয়ে পড়তেন তিনি। কয়েকদিন কথা বলাবলি বন্ধ থাকার পর হটাৎ আমাকে খুঁজে নিয়ে বাসায় ফিরতেন। মাঝে মধ্যে ফোন করে জেনে নিতেন পত্রিকার কাজ শেষ হয়েগেছে কিনা। কাজ শেষ হয়েছে আপনি বাসায় চলে যান আমি আসতেছি, কিন্তু পরক্ষণে দেখা যায় আমি কোন একটা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তিনি বাসায় শীতের সময় শীত এবং গরমের সময় গরমকে উপেক্ষা করে বাসায় সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। কিন্তু এক্টু বিরক্ত হননি। তবে মাঝে মধ্যে আমিও রেগে যেতাম, এটা করলে কেন আসেন, আসিয়েন না, কোন কিছু খেয়ে আসলে মানুষেরা বলবে, আমাকে আবার…. এমন একদিন সারারাত খেয়ে সকালে বাসায় পড়ে গিয়ে বৈদ্যুতিক বল ভেঙে ফেলায় তার সাথে ঝগড়া করি ; তাকে কটুক্তিও করে ছিলাম এরপর ৬/৭ সে আর আসেনি। শুনেছি সে সময় তিনি আমার জন্মস্থান হলদিয়া পাতাবাড়ির তার এক বন্ধু কাসেম, আমার মায়ের বাসায় গিয়ে থেকেও এসেছে। এখান থেকে এসে একদিন শীতের রাতে আমার বাসায় আছে, ওই দিন ঘুমে থাকায় আমাকে না পেয়ে ছেনু আন্টিকে ডাক দিলে তিনি দরজা খুলে দিলে ঘুমিয়ে পড়েন। খুব সকালে চলে যায় এক রিক্সাওয়ালাকে নিয়ে। এই দিন আমি দেখিনি তারে। দেখেছি হাসপাতালে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পেয়ে রাত ১২টায় হাসপাতালে গিয়ে দেখা করি আসি। পরক্ষণে আমি চলে আসি। তারপরদিন যাই। ওই দিন আমাকে দেখে কালাম আমাকে ফেলে চলে যাইয়ো না। রিদুয়ান, মানিক ভাই, শহীদ ভাইসহ অনেকের কাছে অনুরোধ করেছিলো তার সাথে একজন রাখার, কিন্তু থাকার বেলায় কেউ থাকেনি। অবশেষে পত্রিকার কাজ ছেড়ে প্রেস ক্লাবের ইসহাক ভাইকে নিয়ে আমি হাসপাতালে গেলে দেখি তিনি বিছানাতেই মলত্যাগ করেছেন। অনেক কষ্ট করে সেগুলো পরিষ্কার করি। সে সময় দুজনকে মানুষকেও দেখি। পরে জানতে পারি তারা দুজনই মাসউদ শাফির আত্মীয় স্বজন। একজন নিজের ভাই, অন্যজন দুলাভাই। এর এক ঘন্টা কি পৌণে এক ঘন্টার মধ্যে মাসউদ শাফিকে ফেলে তারা উখিয়ায় চলে যায়। আমার পরীক্ষা আসে বলে মিথ্যার অজুহাত দিয়ে ভাইদের রাখতে চাইলেও এত জোরাজুরির পরও তারা থাকেনি। এমনকি মাসউদ শাফি তাদের ভাই সেটা পর্যন্ত ডাক্তারদেরকে পরিচয় দেয়নি। তারা চলে যাবার পর মাসউদ শাফি আমাকে দেখে বললো কালাম তুই আমাকে ফেলে যাবিনা (অথচ কোন দিন আমাকে তিনি তুই বলে ডাকেনি) শপথ কর। আমি বললাম, না যাবনা। ’

মারা যাবার দেড় ঘন্টা আগে এর একদিন আগে লিখিত সুন্দর কবিতাটি পড়ে শুনতে চাইছিল। পরে শুনাবো বলায় আমাকে থাপ্পড়ও মেরে ছিল। তারপর তার কবিতাটি পড়ে শোনালাম। শুনেই বলল, শান্তি পেলাম, মানিক ও সিরাজ স্যারকে ডাক, ওরা কি জানে আমার অবস্থা এ রকম হচ্ছে। তুই আমার সামনে ফোন দে, আমার রাজনীতির গুরু শংকর দা ও নুপা কেন আসছেনা, সাহেল এর নাম্বার আছে তারে ফোন দে। এর দুই মিনিট পরই চিল্লা চিল্লি শুরু হইল। থামাতে পারলাম না, থামাতে গিয়ে সেলাইনের শিষ বের হয়ে প্রচুর রক্ত বের হল, তারপর রক্ত পড়া শেষ করলাম। এরপরই বলল, কালাম লাইটা দাও (লাইট থাকার সত্বেও), আমি মুখ খুলতে পারছিনা ( লেবাই লেবাই )। মানিক ভাইকে ফোন দাও, আমার ভাইকে ফোন দাও। আমাকে নিয়ে যেতে বলো, আমি বাঁচতে চাই। আমার মায়ের জন্য মন কাঁদে…. কালাম। আমি তাকে শান্ত করতে চাইলে তিনি আমাকে পারছিনা ভাই, আমাকে বাঁচতে দাও। ডাক্তার নোবেল কুমার বড়ুয়াকে দেখে আনলাম, দেখলো, অবস্থাখারাপ, বলল, তারপর ভাই ও মানিক ভাইকে খবর দিতে গিয়ে হাসপাতালে বাইরে বের হয়ে (হাসপাতালের ভিতরে আমার মোবাইলের নেটওয়র্ক. ছিল না) সংযোগ না পেয়ে অস্থির হয়ে যায়, তারপর বেহুশ হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। আর কি হয়েছিল জানিনাতবে আমার মনে আছে বাসার পাশের এক দারোয়ান আমাকে নিয়ে গেল বাসায়। (অব্শ্য রাত আড়াইটাায় আমি মানিক ও কলিম ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম, তারা আমাকে থাকতে বলে ছিল)। এর আধঘন্টা অর্থাৎ ৫টায় পরই কালাম কালাম আল্লাহ, মা মা বলে মারা গেল… ওই সময় উখিয়ার আমাদের সিনিয়র বন্ধু নিধু ঋষির বন্ধু সমীরণ ছিল)। আমি হাসপাতালে থাকা অবস্থায় তাকে সামলাতে গিয়ে নিজেই বেহুশ হয়ে না যেতাম তাহলে তার মৃত্যুতা দেখে যেতে পারতাম। আর মাত্র আধঘন্টা অপেক্ষা করতে পারিনি। তারপরে আমার কোন দোষ ছিলোনা। সেময় অনেককে ফোন করেও কাউকে পাওয়া যায়নি। তবু শেষ রক্ষা করতে পারলাম না কবি মাসউদ শাফিকে। তার শেষ কথা, কালাম, কালাম কালাম তুই আমাকে ফেলে চলে যাইসনা, সবাই গেলেও তুই যাইসনা, আমিও কথাও দিয়েছিলাম। থেকেও ছিলাম। তারপরও তাকে রক্ষা করতে পারেনি। শেষ মেষ নিজ কাঁধে তাকে রহুল্যারডেবাস্থ সালিম মসজিদ কবরস্থানে দাফন করে এলাম। এই দুঃখটা কোন দিন ভুলতে পারবনা। তিনিও আরো কোন দিন আমার বাসায় দরজায় কড়া নেড়ে ঘুম থেকে জাগাবে না। মারা যাবার পর বেশ কয়েকবার স্বপ্ন দেখেছি তারে প্রত্যেকবারই আমার দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ছে আর কালাম কালাম বলে ডাক দিচ্ছে….

উনি মারা যাবার উনার শোক সভায় অনেককে মায়াকান্না এবং পোশাকি দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে, অথচ মারা যাবার একদিনও তাকে দেখতে যায়নি এবং বড় বড় কথা বলেছে। অথচ ছাত্র ইউনিয়নের শোক সভার দিন অনেককে দেখলাম তার দোষ সম্পর্কে বলতে, দুই একজন ছাড়া আর সবাই তার দোষ টা দেখিয়েছে, তার কর্মকেও নয়। ওই সব পোশাকি মানুষ নামে অমানুষদের মাসউদ শাফি যেমন ঘৃণা করতেন তেমনি আমিও। মাসউদ শাফিকে নিয়ে লিখতে গেলে পুরো একটা গ্রন্থ লিখে শেষ করা যাবে না, কিন্তু এখন নয়, পরের এক লেখায় লিখবো বলে আশা রাখি।

তার সাথে আমার দ্বৈতাদত্তে প্রথাগত নিয়মের দ্বন্ধ থাকলেও একটি জায়গায় চরম অন্ত্যমিল। মাসউদ সাত বছর বয়সে পিতৃহারা হন, আমি আটে। আমেন।

কালাম আজাদ: কবি ও সাংবাদিক। মাসউদ শাফির অকৃত্রিম বন্ধু ও একই পথের সারথী।
[মাসউদ শাফি র মৃত্যুর পরই লেখা এবং কোনো ধরনের এডিট ছাড়া পোস্ট করলাম। লেখাটি অবশ্য দৈনিক পূর্বদেশে ঈষৎ পরিমার্জনা করে ছাপিয়েছিলেন।]


শিরোনামহীন
উপল বড়ুয়া

মানুষের সঙ্গে হৃদ্যতা বা সখ্যতা বলতে যা বুঝায়, কারও সঙ্গে আমার তা আজও গড়ে ওঠেনি। এমন না যে, চেষ্টা করিনি। কিন্তু আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সবকিছুকে একটু দূর থেকে দেখা। কাছে গিয়েও দূরের হয়ে থাকা। কবি মাসউদ শাফির সঙ্গেও আমার সম্পর্কটা তেমন ছিল। আমার পক্ষ থেকে আপনি সম্বোধনের সম্পর্ক। আমাদের উভয়ের জন্মস্থান কক্সবাজারে। পরিচয় চট্টগ্রামে। দুই হাজার আটের দিকে (হয়তো)। মাঝেমধ্যে বিয়ার-বইপত্র নিয়ে আসতেন আমার জন্য। কাঁধে কবি ব্যাগ থাকতো ওর। একটু আলাভোলা টাইপের লোক। নজরুলের মতো বাবরি চুল। কোটরে বসে যাওয়া চোখ। যেন অভাব সেখানে চিরদিনের জন্য বাসা বেধে ফেলেছে। যেন এক জনমদুঃখী-ছন্নছাড়া কবি। তো কবিতা আগেও যেমন বুঝতাম না এখনও তাই আছি। কয়েকটা ছোটকাগজ-স্থানীয় পত্রিকায় ওর কবিতা পড়েছিলাম। বেশি কিছু নয়। এমনিতে স্থানীয় কবি-লেখকদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ খুব কম। যেহেতু না রাখার পক্ষে আমি। তো আজ ফেসবুকে দেখি, মাসউদ শাফির ৩৫তম জন্মদিন। ওনার মৃত্যু কবে হয়েছিল ভুলে গেছি। বছর চারেক হবে কি? আমি ভাবছিলাম আজ ওনার মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুর খবর শোনার সময় শাফির জন্য আমার খারাপ লাগেনি। মিসও করিনি তেমন কখনও। কিন্তু কেন জানি আজ, ওনার সঙ্গে প্রবর্তক মোড়, চকবাজার, জামাল খান, চেরাগীতে আড্ডা দেওয়ার দিনগুলো হঠাৎ মনে পড়ে গেলো। হয়তো এসব কালকেই ভুলে যাবো। শাফির কোনো পুস্তক প্রকাশিত হয়েছিল কিনা জানা নেই। কেউ জানালে আনন্দিত হবো। অথবা ওনার বইপত্র প্রকাশে যদি কোনো সাহায্য লাগে তবে আমি অল্প-বিস্তর সাহায্য করতে রাজি আছি।

————————————————————————

মাসউদ ভাই কে যতটুকু দেখেছি জেনেছি
অজয় মজুমদার

বয়সে মাসউদ শাফি ভাই আমার ২-১ বছর বড় হবেন। ক্ষণজন্মা এই মানুষটি মৃত্যুবরণ করার সম্ভবত ৭/৮ মাস আগে আমার সাথে পরিচয়। তখন আমি হেমন্তিকা সাংস্কৃতিক গোষ্টীতে একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে ছিলাম। রিয়াজ শহীদ ভাইয়ের জাগরনী গানে আমরা দিক্ষীত হয়ে হেমন্তিকায় লেগে ছিলাম। মাসুদ ভাইকে দেখতাম সব সময় একটা ব্যাগ কাঁধে থাকতো। পাবলিক লাইব্রেরীতে বেশিভাগ উনার সাথে দেখা হতো। দেখা হলেই অনেক নম্রভাবে দাদা বলে আদাব বিনিময় করতেন। আমি লজ্জা পেয়ে তাঁকে বলতাম ভাইয়া আমি আপনার ছোট হবো। উনি দুষ্টুমির ছলে বলতেন। আপনি আমার দাদা। খুব কম কথা বলতেন। অনেক ভদ্র ও বিনয়ী একজন ব্যাক্তি ছিলেন। যদিও তখন আমি উনার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতাম না। তবে জানতাম উনি একজন কবি। অনেক মানুষজন তখন তাঁর নামে আমাদের সহপাঠিদের বদনাম বুঝাতেন। যদিও ঐ সব মানুষের কথাকে কোন দিনও পাত্তা দেয়নি। সম্ভবত তখন একই সাথে আমি পরিচয় হয়েছিলাম মনির মোবারক ভাই, শহিদ উল্লাহ্ শহীদ ভাই, কালাম আজাদ ভাই সহ আরো অনেকের সাথে। আমি কোনদিন সক্রিয় ভাবে রাজনীতির সাথে জড়িত না থাকলেও ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টির অনেক সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল বিধায় সম্ভবত অনিল দার মাধ্যমে জানতে পারি দীর্ঘদিন জন্ডিস এবং লিভার জনিত সমস্যায় ভুগে মাসউদ ভাই মৃত্যু বরণ করেছেন। এই সময়ে এসে অনেকের মুখে বা ফেসবুকে তাঁর কবিতা চর্চা করতে দেখি। সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে গুরুত্ব দিয়ে অনেক লেখা প্রকাশ করতে দেখি এবং এও দেখি তাঁর কবিতাকে অনেকে নিজেদের বলে চালিয়ে দিয়েছেন।

তখন আমি সাংস্কৃতি, সাহিত্য, রাজনীতি এগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। তাই মাসউদ ভাইকে নিয়ে কোন স্মৃতি চারণও করিনি। গত ৩/৪ বছরে বিশেষ করে কবি মানিক বৈরাগীর সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে এবং গণমুখের নাট্যদলে যোগদানের মাধ্যমে আমি কবিতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংস্কৃতি কবির মূল্যায়ন সমাজে কতটুকু জরুরী এসব অনেক বিষয়েই অনেক কিছুই জানতে পারি। তাই মনে হলো কবি সম্পর্কে একটু স্মৃতি চারণ করা দরকার। শুভ জন্মদিন কবি মাসউদ শাফি ভাই।

জন্ম যেমন সত্য,
মৃত্যুও তেমন সত্য
আর সব সত্যকেই জয় করে পৃথিবীর বুকে জন্ম থেকে জন্মাতর মানুষ বেঁচে থাকে তার ভালো কর্মে।

——————————————————————————————-

শাফি কে ঘিরে কয়েক টুকরো শ্রদ্ধা ভালোবাসা
মনির মোবারক

ছাত্র ইউনিয়ন করার প্রথমদিককার সময়ের কথা। তখনই মাসউদ শাফির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা গড়ে ওঠে। সংগঠনের প্রায়ই কাজ আমরা একসাথে করতাম। চিকা মারার সময়, পোষ্টার সাঁটানো থেকে শুরু করে, পত্রিকায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো পর্যন্তও। আমার থাকার মতো তেমন বাসা-বাড়ি ছিলো না, তারও ছিলো না। শেষমেষ একটা ঘর পেলাম, তাও কাঠের একটি ঘর। খুবই ময়লাযুক্ত-কাঁদামাটা ঘরটি। শহরের একদম কাছের বলে কি আর করা। আমি মাসউদ ও আলাউদ্দিন দিনের সব কাজ শেষে রাতে ওই ঘরে থাকতাম। বুঝেন তো, ভাঙ্গা চোরা ঘর তার উপর ঝড় বৃষ্টি। খুব কষ্ট আর যন্ত্রণা সঙ্গী ছিলো আমাদের। সে রাত জেগে কবিতা লিখতো পড়তো। আমরা কোনমতে শুয়ে পড়তাম। আবার বের হয়ে যেতাম সকালে। সংগঠনের কাজে সারাদিন ঘুরতাম। এভাবে চলতে থাকতো দিনের পর দিন রাতের পর রাত। অসাধারণ মেধার অধিকারী মাসউদ একটা কবিতা লিখতো আর বলতো মনির কবিতা পড়ো। আমি পড়তাম। কঠিন শব্দশৈলী দিয়ে তার লেখা কবিতাগুলো বুঝতে চেষ্টা করতাম। ছাত্র ইউনিয়নের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, লিফলেট সব ও লিখতো। তার সাহিত্যজ্ঞান কক্সবাজারের অনেক নামীদামী লেখককেও হার মানাবে। শিল্প-সাহিত্য চর্চায় আমার দৌড় একটু কম, তাই কম বুঝি। তবে মাসউদ শাফি আপাদমস্তক সমাজতান্ত্রিক চেতনার একজন কবি ও সংগঠক। তার চেতনার জগত সমুদ্রেরও চেয়ে বিশাল-এটা বুঝা যায় তার একটি কবিতা থেকে-

‘সমুদ্র পোড়ে যে অন্তর্দহনে
আমিও পুড়ি সম সন্তর্পনে
আমাদের দন্ড যাতনাগুলো নিশর্ত
বিনিময়ে দুসত্তা হয়ে যাই-
রূপক সমীকরণ, সে এক বিস্ময়ীকর।
আমি সমুদ্রআত্মা, সমুদ্র আমি আত্মা
অথবা আমি ও সমুদ্র সমসত্তা
আমার ভেতর সমুদ্র, সমুদ্রের ভেতর আমি
সমুদ্র ও আমি মহকালের জময সমকামী
-মাসউদ শাফি

শূন্য দশকের শক্তিমান কবি ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মাসউদ শাফির আজ ৩৫তম জন্মবার্ষিকী। । বাংলা কবিতার এই ক্ষণজন্মা তরুণ রচনা করে গেছেন অজস্র দ্যুতিময় কবিতা। সমুদ্র এবং মানবপ্রেমের অপূর্ব রহস্যালোক তার কবিতায় বহুমাত্রিক বিভায় অলংকৃত। মুক্তিযুদ্ধ এবং প্রগতির সপক্ষে আমৃত্যু এ কবি নিজের সৃষ্টিশীলতায় বহমান ছিলেন। ২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর দূরারোগ্য ব্যাধি লিভার জন্ডিস ও হ্যাপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্ত হয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন ।
উল্লেখ্য উখিয়া উপজেলার রত্মাপালং ইউনিয়নের রুহল্লরডেবা গ্রামে ১৯৮২ সালের ১০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন।
মাসউদ শাফি বেঁচে থাকবে আমাদের মাঝে আজীবন। মাসউদ তুমি যেখানেই থাকো ভালো থাকো। তোমার সৃষ্টকর্ম ও যে মশাল জ্বালিয়েছে রাজপথে সেই মশাল জ্বলবে আরো অনাধিকাল।

মিছিলে আমার বাম পাশে যে রয়েছে তার নাম কবি মাসউদ শাফি। জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে গেছে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কক্সবাজার জেলা সংসদের সাবেক সহ সভাপতি।।
আমার খুব কাছের একজন সহযোদ্ধা ছিলো। দীর্ঘদিন আমরা একসাথে রাজপথে সংগ্রাম করেছি। কক্সবাজারের যে কোন আন্দোলন সংগ্রামে সামনে এগিয়ে আসতো সে। আমার সাথে অনেক ঝগড়া করতো। গতকাল দুপুরেও হাসপাতালে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তখনও ভাবিনি সে আমাদের ছেড়ে চলে।
আমি বিশ্বাস করতে পারছি মাসউদ আর আমাদের মাঝে নেই।। সবাই তার জন্য একটু দোয়া করবেন।
লাল সালাম মাসউদ শাফি…

জেগে আছে তবুও লিখতে বাধ্য হয়েছি শোক সংবাদ
ছাত্র নেতা ও কবি মাসউদ শাফি আর নেই

জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি ও তরুণ কবি মাসউদ শাফি গতকাল সোমবার ভোর পাঁচ টায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৩১ বছর। সে উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের রহুল্লাডেবা গ্রামের বনেদি পরিবারের সন্তান মৃত এজাহার মিয়ার পুত্র। ১৯৯৯ সালে উখিয়ার পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে তার ছাত্র রাজনীতির সূচনা ঘটে। এরপর উখিয়া উপজেলা সংসদের সভাপতি এবং পরবর্তীতে জেলা ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠনের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক থাকাকালীন তার কবি প্রতিভার বিকাশ ঘটে। এর মধ্যেই তিনি বিভিন্ন গ্রন্থের সম্পাদনা ও বিভিন্ন কাব্য গ্রন্থের লেখক ছিলেন। জনপ্রিয় ভাঁজপত্র রক্তবাক এর সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি খেলাঘর ও সংস্কৃতিকর্মী ছিলেন। ছাত্র জীবনে পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি ও কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচ.এস.সি এবং বাংলা বিষয়ে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক পাশ করেন।
এদিকে তার মৃত্যুতে তিন দিনের শোক পালন করবে জেলা ছাত্র ইউনিয়ন। জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল্লাহ শহীদ ও সাধারণ সম্পাদক সৌরভ দেব এক যুক্ত বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে এই তথ্য জানান।

জানাযা সম্পন্ন
২৩ ডিসেম্বর বিকাল ৩টায় উখিয়ার রত্মাপালংস্থ মফরিহ সালিম জামে মসজিদ প্রাঙ্গনে নামাজে জানাজা শেষে রুহুল্লার ডেবা কবরস্থানে তাকে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয়। অকাল প্রয়াত শক্তিমান তরুন কবি মাসউদ শাফির নামাজে জানাজায় কক্সবাজার জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন, রত্মাপালং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্বাস উদ্দিন কন্ট্রাক্টর, প্রয়াত কবির বড় ভাই বিএনপি নেতা নুরুল আলম কন্ট্রাক্টর, এডভোকেট মনজুরুল ইসলাম, কবি সিরাজুল হক সিরাজ, মানিক বৈরাগী, তেল গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব কলিম উল্লাহ, জেলা যুব ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শংকর বড়–য়া রুমি, নুপা আলম, ইলিয়াস বেঙ্গল, কল্লোল দে চৌধুরী, আদিবাসী নেতা মংথেœলা রাখাইন, জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল্লাহ শহীদ, ছাত্রনেতা মনির মোবারক প্রমুখ।

স্মরণে বরণে
মাসউদ শাফি যেখানে শুয়ে আছে, সেখানে আমরা…
সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা কবি মাসউদ শাফির দ্বিতীয় মৃত্যুবাষির্কীতে তার কবর জিয়ারত এবং শোক সভা করেছে ছাত্র ইউনিয়ন উখিয়া উপজেলা সংসদের নেতৃবৃন্দ। তাদের ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না, তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে ছাত্র ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ কাজ করে যাবে-সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করে যাবে এই প্রজন্মের ছাত্র ইউনিয়নের কমরেডগণ এই আশাটুকু করি।
আজ অকাল প্রয়াত কবি মাসউদ শাফির ৩৫তম জন্মবার্ষিকীতে উপর্যুক্ত স্মতির ভালোবাসার পোস্ট গুলো একত্রে এনে জড়ো করেছি মাসউদ ভাইয়ের স্নেহ ভালোবাসার প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্যে নিবেদন করতে।
ভালো থাকুন প্রিয় শ্রদ্ধেয় কবি মাসউদ শাফি, আপনি জেগে আছেন আমার হৃদয়ের চেরাগ হয়ে।

——————————————————————–

কবি মাসউদ শফি
মইন উদ্দীন

শফিউল আলম মাসুদ কবি মাসউদ শফি নামেই পরিচিত। কয়েকদিন আগে মানিক বৈরাগী ভাই ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন সেখানে উল্লেখ করেছেন শফি ভাই নাকি খুব অসুস্থ। মাসউদ শফি ভাইয়ের সাথে আমার কথা হয়েছিল অনেক আগে। মানিক ভাই একদিন রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে আমিও কয়েকজন মিলে ওনাকে হাসপতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করি। সেখানে মানিক ভাইকে দেখতে গিয়েছিলেন কবি মাসউদ শফি। তিনি হাসপাতালে অস্থির হয়ে পড়েন। মানিক ভাইয়ের অসুস্থ হওয়ার কথা কয়েকজনকে ফোনে বলতে লাগল এবং আমাদের একটু ভালো ভাবে দেখতে বলেন। তখন তার সাথে আমার বেশ কতক্ষণ কথা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ তার মৃত্যুর খবরে সবার মত আমিও আবেগআপ্লুত। কারণ আমি তার অনেক লেখা পড়েছি। তার লেখাগুলো আমার অনেক ভালো লাগত। বিশেষ করে মানিক বৈরাগী ভাই সম্পাদিক শিল্প সাহিত্যের কাগজ গরাণে তার একটা সাক্ষাৎকার ছাপানো হয়েছিল সেটি। আমি তার অকাল মূত্যুর খবর শুনো সর্ব প্রথম গরাণের সেই সাক্ষাৎকারটা পড়েছিলাম। তাকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি। মহান আল্লাহ তার মাগফেরাত কামনা করুক।


কবিতা

সতীর্থের খোঁজে
আলম তৌহিদ

ফিরে আসা ডাউন ট্রেনের মত
কবিতার শেষ লাইনে এসে থেমেছি।

এখন মধ্যরাত।
আত্মার ভেতর ঢেঊ খেলে যায় যেন
প্রসূতির প্রসব-বেদনা সমাপ্তির অনাবিল আনন্দ।
কবিতা তো কবিরই সন্তান হাতে তুলে নিই মমতায়
তারপর আমার স্ত্রীর দিকে তাকাই একবার।
দেখি কবিতার প্রথম শ্রোতা ঘুমিয়ে গেছে কাব্যিক ভঙ্গিতে।
সময় ক্ষেপণ সূত্রে আমার ব্যাত্তিগত আকাশে
কেবল বাড়ছে অস্থির পাখির ঝাঁক।
ওরা বড় অবাধ্য
কেউ ফিরে আসতে চায়না মনোবৃক্ষের ডালে।

প্যানোয়ায় যাব বলে কবিতাটি ভাঁজ করে নিয়েছি
পাঞ্জাবির পকেটে ।
কিন্তু সেখানে আড্ডা জমানো সতীর্থ আর কই?
সকলে দূরগামী নক্ষত্রের মত অনন্তের যাত্রী।

বিষকন্যা বেহূলার খুঁজে আসিফ ঢাকাতে
শরবিদ্ধ স্বরের শহরে তবুও সে
কাব্যঘৃত দীপ জ্বালায় সোডিয়াম আলোতে।

রেডিও থেকে ফিরে সিরাজ নীল জোছনায় মগ্ন।
মানিক যেন বিপ্লবের রংছটা পোষ্টার
বৈরাগি সময় যার ঝলসে দিয়েছে ধূসর একতারা।
ভয়ানক অন্ধকার এ শহরে কুড়ানো শিশিরে
জীবনের রং খুঁজে মাসউদ আর কালাম ।
নিলয় দ্বীপবাসী,
মৈনাকের চূড়ায় দেখে স্বপ্নের টংঘর।
আর নোমান মাটির ব্যাকরণ পাঠ শেষে
মুখে বাঁধে ফসলের গান।
তবুও চুক্তিহীন কবিতার শপথে বেরিয়ে পড়ি সতীর্থের খোঁজে।

————————————————————————

কুদোং গুহা
মানিক বৈরাগী

স্বপ্নের কোন ক্রান্তিকাল নেই সে আসবেই তেঁদরের মতো
স্মৃতিরা বেশ্যার ন্যায় আনাগোনা কানাঘুষা করে চুমু খায়
স্বপ্নের গভীরে ঈশ্বর খুঁজতে খুঁজতে আইলার মিছিলে যাই।

আদিম গ্রন্থের খোঁজে মাসুদ শাফির সাথে ঘুমাইনি কতকাল
স্বপন স্মৃতি অবহেলা করে ধুতরা রস খাই হিমালয় মানুষের মতন
তবুও তারা আসে যায় আমার জালালী কৈতর বাকবাকুম করে।

হিমালয়ে বরফ জলে জেগে ওঠে শীল মাছ, আমি খেলা করি
গৌতম বুদ্ধের নির্বাণ চোখে মুহম্মদকে দেখি আরব ভূমে শুভ্র আলখাল্লা
আমিও আদম সন্তান যীশুর রক্তাক্ত বুকে দেখি সবুজের ঐক্যতান

জিবরাইল আসে না তাই স্বপ্ন দেখি কুদোং গুহায়।

—————————————————————————

ধুলোমাখা পথ
মনজুরুল ইসলাম

ঝাঁকড়া বটের মতো উস্কুখুস্কু চুল যেন অরণ্য বনানী-
মোড়ানো কাফন ধরে অধোমুখ হেঁটে যায় জনতার ঢল,
তোমার পতাকা হাতে অগ্নিনেত্র বজ্ররুষ্ট বিপ্লবী সেনানী-
আকাশে বাতাসে বাজে বিদায়ী তোমার কথা-চোখ ছল ছল;

নিবিষ্ট ধ্যানের বৃন্তে সমুজ্জ্বল সৃষ্টিশীল স্বপ্নের কোরক-
বিমূর্ত কাব্যের স্বরে হলোনা গাওয়া আর অসমাপ্ত গান,
বাজিবে সে স্বরলিপি উন্মুক্ত সোনালী ভোর- রক্তাক্ত মোড়ক,
কালজয়ী বিজয়ীর রেখে যাওয়া রক্তমাখা স্মৃতি অফুরান;
তুমিও সবার মতো পথভূলে এসেছিলে মাটির ভুবনে-
পথপাশ ঝুপঝাড় একাকীযে পার হলে-শেষ হলো রথ,
আবার কি আসবে তুমি স্বপ্নহারা পথহারা উন্মুল জীবনে?
তোমার শহীদী রক্তে চিরকাল পড়ে রবে ধুলোমাখা পথ;

যুদ্ধোত্তর রাজপথে মিছিলে মিছিলে আজ মুষ্টিবদ্ধহাত-
সমকালে স্বপ্ননিয়ে উদিবে দিগন্ত পারে অরুণ প্রভাত।

——————————————————————

নাসের ভূট্টো’র দুটি কবিতা

আত্মার প্রার্থনা

কবি মাসউদ শাফির আকীর্ণ আত্মা
আমাকে ঘুমুতে দেয় না….
ঝুলন্ত বন্ধনীতে জলন্ত হয়ে ঝুলে শব্দের প্রার্থনা।
ঐ যে মৃত্তিকার গালিছাতে দিব্যি শুয়ে আছে
কাব্য হয়ে নান্দনিকতার কবি,
বিশুদ্ধ ছওয়াবের কিছু দীপশিখা দীপালি আলোক
কারা যেন লুট করে প্রয়াত শীৎকারের মুগ্ধ-ভ্রুুণ।

দুঃখিত কবি!
আমরা তা চাইনি কখনোও তবু ফুল ও ফলে
কূলে কূলে আমাদের অভিমান
শূন্য পানে অন্তহীন উদাসীন।

শেষ বিকেলের কবি

শেষ কবিতাটি লেখার আগেই
তুমি চলে গেলে দিগন্ত পেরিয়ে সুর্যাস্তে
স্বরচিত পথ ছেড়ে – নমস্তে ভঙ্গিতে
তাই
তোমার শেষ কবিতাটি মুখস্হ করার
সুযোগ হলো না আমার।
তোমার সমস্ত গন্তব্যে-
পাহাড়ে বরফ গলেছে
উপরে ভেঙ্গেছে নিঃসীম আকাশ আর
কিছু কবিতা যার বিরহে শিহরিত হয়ে ওঠে
শহীদ দৌলত ময়দান।
সেই থেকে প্রহর গুনি
মধ্যমিত্ত রাত্রির প্রিয় মাদকতায়
কখন এসে তুমি বলবেঃ
কবি! উড়ে উড়ে পাখির পালকে আজও লিখি –
” নতদের দু’চোখ ভরে ঘৃনা করি “।

————————————————————————-

এই বুঝি তুমি এসেছো
শহিদুল্লাহ শহিদ

মাসউদ তোমাকে মনে পড়ে কবিতায়,মিছিলে,শ্লোগানে।
এখনো কানে বাজে তোমার কন্ঠ।
আমাকে এখনো অপরাধী করে তোমার মৃত্যু
তুমি বেঁচে থাকো আমাদের মাঝে বর্নমালা হয়ে।
রাতের আড্ডায় তোমার ছুড়ে দেয়া প্রশ্নের উত্তর খুজি এখনো।
এখনো রাতে কেউ দরজায় টুকা দিলে মনে হয় এই বুঝি তুমি এসেছো।
যুগ যুগান্তরে থাকো আমাদের হয়ে,আমাদের সাথে।

———————————————————————

[কবি মাসুদ শাফি। প্রিয় মাসুদ ভাই। যাকে দেখেই আমার শব্দের ভাঙা গড়ায় কবিতা লিখতে শেখা। মাসুদ ভাই কবি ছিলেন, পয়গম্বর ছিলেন। পুরোদস্তুর সমুদ্রের কাছে নিজেকে সপে দেওয়া কবি। কবি, মিছিলের সহযোদ্ধা অগ্রজ মাসউদ শাফির স্মৃতির উদ্দেশ্য আমার শব্দের শোকসভা।]

অন্তিক চক্রবর্তী’র দুটি কবিতা

কবি খুন হলে কাঁদে মাউথ অর্গান

সমুদ্রের লোনা হাওয়ায় ওড়ে ধূলিমগ্ন স্মৃতিস্তুপ।
স্মৃতিট হিমায়িত আলোতে-রাত জুড়ে এই শহরে হেঁটে বেড়ান একজন ভবঘুরে।
নিউরনের আর্কাইভে জমানো কিছু সুপার ওয়ার্ড রের্কড।
হাতঘড়ি বন্ধি বিপ্রতীপ সময়। মাঠে ঘাটে বিষবৃক্ষের চাষ।
মর্গমুখী মানবিক হৃদয়! অষ্টপ্রহর কপি পেস্টের যুগে
মাসউদ শাফিকে মাতাল বলতে পারেন। নেশায় বুদ তারুণ্যের একজনও বলতে পারেন।
শুধু কবিতার জন্য, মানব মুক্তির মিছিলের তাগিদে ঘর হারানোর দৃশ্যগুলি মিলিয়ে যায় দ্রুত, অপপ্রচারের তাক করা বন্দুকে। রাখাইন পাড়া বেয়ে নেশায় মত্ত মাসউদ যখন হেঁটে আসেন তখন রাত শেষ হয়ে ভোর।
আকাশে ভেসে আসে পাখির দল, অদ্ভুত আলো আধারে মাঝে হেটে আসছেন একজন শব্দ কারিগর, ছন্দ মিলাচ্ছেন, পান্ডুলিপি ছিড়ে ফেলছেন। রাষ্ট্রীয় বাহিনী ছুটছে তার পিছু। কলার চেপে ধরছে কিংবা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে ব্যাথার আখ্যান।
আর সকালে রোদ উঠলেই শহর ভর্তি মানুষের চেঁচামেচি।
ঠিক তখনই এই দুনিয়াকে কবির মিথ্যা বলে মনে হয়। মাথা নীচু করে, ক্ষিধে ভরা পাকস্থলি আর আউলা চুলের এক লোক হাটা শুরু করলেন সমুদ্রের দিকে।
কাধে ঝোলানো ব্যাগের পকেটে হাতড়াতে গিয়ে মনে পড়লো পান্ডুলিপির ছুড়ে ফেলা হয়েছে নর্দমায়।
আবার শব্দ বুননে ব্যস্ত মাতাল কবির কোন সহোদর কিংবা বন্ধু রাতের ক্ষুধা কিংবা মাথা রাখার আশ্রয়ের বিনিময়ে চুরি করেছে কবিতার পান্ডুুলিপি।
আর কবির বুক জুড়ে ক্ষীণস্বরে কেঁদে উঠে নিঃসঙ্গ মাউথ অর্গান!
কবি খুন হলে কেঁদে উঠে নিঃসঙ্গ মাউথ অর্গান!

যার বুকে অনন্ত আগুন

বিপন্ন আগুনে পোড়ে কাঠ
নাকি নীতিহীন অন্ধ প্ররোচনা??
নিঃশব্দে পুড়িয়ে দেয়
সম্পর্ক-বিলাস
​কাদামাখা কবির শরীর
নিজের আঙুল ধরে হেঁটে যায় অলীক শ্মশানে।
ঘোলাজলে স্নান সেরে
ফিরে এসে
হিমাগারে জমা রাখে পান্ডুলিপি
নির্জীব কবিতা
পরশ্রীকাতর কিছু সাপেদের ঠোঁটে
সযত্নে মিশিয়ে দেয় সোহাগি গরল
অক্ষম আক্রোশে
ভেঙে দেয় যা কিছু সুন্দর

কে কাকে পোড়ায়
অস্থির লাবণ্য ঘিরে
যার বুকে অনন্ত আগুন
সে কাউকে পারে না পোড়াতে।

53 ভিউ

Posted ৬:৫০ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১০ জুলাই ২০২১

coxbangla.com |

Archive Calendar

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১

Editor & Publisher

Chanchal Dash Gupta

Member : coxsbazar press club & coxsbazar journalist union (cbuj)
cell: 01558-310550 or 01736-202922
mail: chanchalcox@gmail.com
Office : coxsbazar press club building(1st floor),shaheed sharanee road,cox’sbazar municipalty
coxsbazar-4700
Bangladesh
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ABOUT US :

coxbangla.com is a dedicated 24x7 news website which is published 2010 in coxbazar city. coxbangla is the news plus right and true information. Be informed be truthful are the only right way. Because you have the right. So coxbangla always offiers the latest news coxbazar, national and international news on current offers, politics, economic, entertainment, sports, health, science, defence & technology, space, history, lifestyle, tourism, food etc in Bengali.

design and development by : webnewsdesign.com