টেকনাফ থেকে কুতুপালং পর্যন্ত তিন শতাধিক দালাল সক্রিয় : মাথাপিছু নেয়া হচ্ছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা

rh6.jpg

দেব দুলাল মিত্র(৯ সেপ্টেম্বর) :: ‘কারো পৌষ মাস, আর কারো সর্বনাশ’-এই প্রবাদটির সত্যতা মিলেছে টেকনাফে। জাতিগত সহিংসতার মুখে মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সর্বশান্ত রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের পর থেকে টেকনাফের এক শ্রেণীর মানুষের এখন পৌষ মাস চলছে। নৌকা ভাড়া করে মায়ানমারের ভ’খন্ড থেকে রেহিঙ্গাদের বাংলাদেশে নিয়ে আসা, যানবাহন ভাড়া করে দেয়া, বিভিন্ন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া, বসবাসের জন্য জমির ব্যবস্থা করা, রোহিঙ্গা নারীদের স্বর্নের জিনিসপত্র বিক্রি করে দেয়া, হ্রাসকৃত দামে মায়ানমারের মুদ্রা ‘কিয়েট’ কেনা গত ১৫ দিন ধরে অনেকেরই পেশায় পরিনত হয়েছে।

এর পাশাপাশি অপর এক শ্রেনীর দূর্বৃত্ত রোহিঙ্গাদের জিম্মি করেও মোটা অংকের টাকা আদায় করছে।

ইতিমধ্যেই তারা রোহিঙ্গাদের দালাল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। টেকনাফের বাসস্ট্যান্ড, শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং, খুরের মুখ, বাহারছড়া, শামলাপডুার, নাইটপাড়া, উনচি প্রাং, হোয়াইক্ষ্যং, মুচনী, লেদা, লম্বাবিল, বালুখালি, ঠ্যাংখালি, কক্সবাজারের কুতুপালং সহ রোহিঙ্গাদের যে সব স্থানে সমাগম ঘটছে সেখানেই এই দালালরা সক্রিয় রয়েছে। পর্যন্ত প্রায় তিন শতাধিক ‘দালাল’ এসব অপকর্মের সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।

দুপুর দেড়টা। টেকনাফের স্থলপথের শেষ সীমানা শাহপরীর দ্বীপ। খাঁ খাঁ রোদের মধ্যে শাহপরীর দ্বীপ এলাকার বাসিন্দা ও ট্রলার চালক সিরাজের শ্বাস ফেলার সুযোগ নেই। ১৪ জন রোহিঙ্গাকে এইমাত্র মায়ানমার থেকে নিয়ে এই মাত্র দ্বীপে পৌঁছেছেন। ট্রলার থেকে শিশুসহ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষরা নেমে যাওয়ার কয়েক মিনিট সময়ের মধ্যেই কথা হয় তার সঙ্গে। সিরাজ জানালেন, ‘সময় নেই।

এখনই আবার তিনি মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সীমান্তবর্তী নুরুল্লাপাড় ও কুইন্নাপাড়ার কাছে যাবেন। সেখানে হাজার হাজার রোহিঙ্গা অপক্ষো করছে। তাদের নিয়ে আসতে হবে’। একথা বলেই সে ট্রলারের দিকে ছুটে গেলেন। তার এক সহকর্মী গ্যালনে ভরে ট্রলারের জ্বালানী নিয়ে এসেছেন।

এগুলো ট্রলারে তুলেই সিরাজ আবার মায়ানমারের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। সিরাজের ট্রলারের মতো একের পর এক মাছ ধরার ট্রলার শহপরীর দ্বীপ এলাকায় রোহিঙ্গাদের আনা-নেয়া করছে। শুধু মাছ ধরা ট্রলারই নয়, ছোটবড় ইঞ্জিন চালিত নৌকাও রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই ট্রলার বা নৌকার দালালরা সীমান্তের কাছকাছি পৌছে রোহিঙ্গাদের ফুসলিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। রোহিঙ্গাদের আনা-নেয়ার জন্য এই দালাল সিন্ডিকেটের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় প্রায় ৩০০ ট্রলার ও নৌকা রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের ভাষ্য হচ্ছে, ‘এই সুযোগ সব সময় আসে না। একারনে অল্প সময়ে বেশী টাকা আয় করার জন্য মাছ ধরা বাদ দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসার কাজে নিয়োজিত রয়েছে।’ একই অবস্থা দেখা গেছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিনড্রাইভ সংলগ্ন শামলাপুর এলাকায়। এখানেও অনেক ট্রলার রোহিঙ্গাদের আনা নেয়ার কাজ করছে।

নৌকা দালাল সিন্ডিকেটের সদস্যরা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে মাথাপিছু ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করছে। টাকা দিতে না পারলে নৌকা থেকে একজনকে জিম্মি করে রাখা হয়। পরে টাকা দিয়ে ওই ব্যক্তিকে মুক্ত করে নিয়ে যাওয়ার একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাবরাং এলাকার বদু নামের এক দালালের নেতৃত্বে এসব অপকর্ম চলছে। বদুর সঙ্গে আরো ২০/৩০ জন রয়েছে। আবার কোন কোন নৌকা ১০ হাজার থেকে পনের হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করছে।

শামলাপুর বাজরের রোহিঙ্গা জাহাঙ্গীর জানায়, বাহাইল্লা নামে তার পরিবারের এক সদস্যকে ৩০ হাজার টাকার জন্য বদুর লোকজন শাহপরীর দ্বীপে জিম্মি করে রেখেছে। তাদের কাছে টাকা ছিল না। তাই দিতে পারেনি। টাকা সংগ্রহের পর ০১৮৩৬১৫৭৩৩১ মোবাইল নম্বরে ফোন করতে বলেছে। একারনে একজনকে রেখে অন্যদের ছেড়ে দিয়েছে। অবশ্য এই প্রতিবেদক এই নম্বরে ফোন করেেল মোবাইলে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

নদীর ঘাটেও অপর এক শ্রেনীর দালাল সক্রিয় রয়েছে। যানবাহন ভাড়া করে টেকনাফ বাস টার্মিনাল পর্যন্ত পৌছে দেয়া তাদের কাজ। এই দালালরা ও রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে মায়ানমারে মুদ্রা হাতিয়ে নিচ্ছে। সিএনজি, ইজিবাইক, চান্দের গাড়ি ও পিকআপে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। অপর একটি দালাল চক্র টেকনাফ বাসস্ট্যান্ড ঘিরে সক্রিয় রয়েছে। ক্যাম্পগুলো কোথায় তা বাসস্ট্যান্ডে আসা রোহিঙ্গারা জানে না। তখন দালালরা রোহিঙ্গাদের ফুসলিয়ে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেয়। মাথাপিছু ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা চুক্তিতে রাজি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাক অথবা গাড়ি নিয়ে আসে। এরপর সবাইকে তুলে পাহাড় ও বনের জমিতে নিয়ে ছেড়ে দেয়। যারা টাকা দিতে পারে না, তারা এখনো রাতের পর রাত মার্কেটের বারান্দা, মসজিদের সামনে, গাছের নিচে অপেক্ষার প্রহর গুণছে।

পাহাড়ে ও বনবিভাগের জমির কাছেই দালালদের অপর একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। ট্রাক থেকে রোহিঙ্গারা নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে দালালরা ঘিরে ধরে। ৮ ফুট বাই ১০ ফুট সরকারী জমি দেয়ার বিনিময়ে এই দালাল চক্রের সদস্যরা ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা আদায় করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রইক্ষ্য এলাকায় জমি দেয়ার নামে ৬০ জনের একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা ৫ হাজার টাকা করে নিচ্ছে। মাসেও টাকা দিতে হবে বলে আগেভাগেই রোহিঙ্গাদের জানিয়ে দিয়েছে।

তারা ফসলি জমি ছেড়ে দেয়ার ক্ষতিপূলন হিসাবে এই টাকা নিচ্ছে বলে ভোরের কাগজ প্রতিবেদকের কাছে সিন্ডিকেটের সদস্যরা দাবী করেছে। এই সিন্ডিকেটের কাছে টাকা দিতে না পারলে সেখানে ঘর বা থাকার জায়গা পাওয়া যাবে না। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টাকা ছাড়া রইক্ষ্যংয়ের পুথিন পাহাড়ে রোহিঙ্গারা জমি পায় না। যারা আগে এসেও টাকা দেয়নি। তারা এখনো খোলা আকাশের নিচে বা স্কুল ও মাদ্রাসার বারান্দায় রাত কাটাতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা অমিয় বড়–য়া, কাশের ও শাহাব নামের তিন ব্যাক্তি। অমিয় জানান, তারা ওই জমির মালিক। তারা বন বিভাগের কাছ থেকে লিজ নিয়েছেন। এরপর তারা চাষাবাদ করছেন। এখর রোহিঙ্গরা এসে দখল কওে নিয়েছে।

কাহাব মিয়া জানান,তাদেও ৬০ জনের একটি ভ’মিহীন কমিটি রয়েছে। প্রত্যেকের ৭ কানি কওে জমি আছে। এই জমিতেই ফসল ফলাচ্ছেন। রোহিঙ্গারা তাদেও ফসল নষ্ট করেছে। এজন্য দুই হাজার টাকা কওে ক্ষতিপূরণ নিয়েছেন। তারা জমি দেয়ার কথা বলে কোন টাকা নেননি। রইক্ষ্যং এলাকার কালামিয়া নামের এক ব্যক্তি বলেন, তিনি ৭১ শতক জমি লীজ নিয়েছেন। ফসলের ওপর রোহিঙ্গারা বসতি গড়েছে।

টেকনাফ শহরে এক শ্রেনীর দালাল রোহিঙ্গা নারীদেও কাছে গিয়ে স্বর্ণেও জিনিস বিক্রি কওে দেয়ার জন্য ফুসলাচ্ছে। নগদ টাকার অভাবে অনেক নারীই এই প্রস্তাবে রাজী হচ্ছেন। তাদেরকে দালারা বিভিন্ন স্বর্নেও দোকানে নিয়ে যায়। অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে স্বর্ণ নিয়ে নিচ্ছে।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে খবর নিয়ে জানা গেছে,সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন ডানো এই দালাল সিন্ডিকেটের অন্যতম নেতা। শাহপরীর দ্বীপ, হাড়িয়াখালি, এলাকা থেকে তীওে ওঠা রোহিঙ্গারা তার জিম্মায় থাকে। এই সিন্ডিকেটে আছে টেকনাফের আলম, ফরিদ, বাবুল, সিরাজ, রফিক, জয়নাল ও শাহ আলম, কুতুপালংয়ে হাফেজ, হাসান, নুর হাসান সিন্ডিরেকট অন্যতম। শামলাপুর এলাকার বদুর নিয়ন্ত্রনে রয়েছে। এদেও লোকজনই বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে রমরমা বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকার

দালাল চক্রের ব্যাপাওে জানতে চাইলে টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন সিদ্দিক বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে দালাল চক্রের সক্রিয় হয়ে ওঠার বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। এখানে দালাল আছে। তবে আমরা তাদের ছাড় দিচ্ছি না। দালালদের ততপরতা প্রতিরোধে আমরা কাজ করছি। ইতিমধ্যেই ২৫ দালালকে গ্রেপ্তার করেছি। ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে তাদের সাজাও দেয়া হয়েছে। দালাল প্রতিরোধের জন্য আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। কারো বিরুদ্ধে দালালির প্রমান পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যাবস্থা নেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। টেকনাফ শহর সহ বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে।

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri