দেশে মোট আয়ের ৩৮% শীর্ষ ধনী পরিবারের

bd-taka.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(১৮ অক্টোবর) :: খানা ভিত্তিক আয় বেড়েছে দেশে। দরিদ্রদের মধ্যে এ আয় যতটা বেড়েছে, তার চেয়েও বেশি হারে বেড়েছে ধনী পরিবারগুলোয়। এতে আয় আরো বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, দেশের মোট আয়ের ৩৮ শতাংশের বেশি মাত্র শীর্ষ ১০ ভাগ ধনী পরিবারের। আর শীর্ষ পাঁচ ভাগ পরিবারের আয় মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ২৮ শতাংশ। ২০১০ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে শীর্ষ ১০ ভাগ ধনী পরিবারের কাছে ছিল মোট আয়ের প্রায় ৩৬ শতাংশ।

আগে দু-তিন বছর অন্তর খানা আয়-ব্যয় জরিপ করা হলেও ১৯৯৫-৯৬ সাল থেকে পাঁচ পরপর এ জরিপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগে সর্বশেষ ২০১০ সালে খানা আয়-ব্যয় জরিপ করা হয়। আর ২ হাজার ৩০৪টি নমুনা এলাকার ৪৬ হাজার ৮০টি খানার তথ্যের ভিত্তিতে খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬ সম্পন্ন করেছে বিবিএস। এর প্রাথমিক প্রতিবেদন গতকাল প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতীয় আয় বণ্টন অংশে সব ডিসাইল গ্রুপেই (আয় বিবেচনায় পরিবার) হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে। ২০১০ সালের জরিপে সর্বনিম্ন আয়ের পাঁচ ভাগ পরিবারের ছিল মোট জাতীয় আয়ের দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৬ সালের জরিপে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র দশমিক ২৩ শতাংশে।

আর সর্বনিম্ন আয়ের ১০ ভাগ পরিবারের আয় দাঁড়িয়েছে মোট আয়ের ১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। আয় বিবেচনায় নিচের দিকে থাকা পরিবারগুলোর মোট আয়ে অংশ কমলেও বেড়েছে উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর।

২০১০ সালের জরিপে মোট আয়ের ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ শীর্ষ পাঁচ ভাগ পরিবারের থাকলেও সর্বশেষ হিসাবে তা বেড়ে হয়েছে ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। একইভাবে শীর্ষ ১০ ভাগ পরিবারের আয়ও ২০১০ সালের ৩৫ দশমিক ৮৪ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের মোট জাতীয় আয় ১০০ টাকা ধরলে ৩৮ টাকাই এ ১০ ভাগ পরিবারের।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ধনী পরিবারগুলো আয়ের একটিমাত্র উৎসের ওপর নির্ভরশীল নয়। আয়ের একাধিক উৎস থাকে তাদের। কোনো কারণে এক উৎস থেকে আয় কমলেও অন্য উৎস থেকে বাড়ে। তাছাড়া সঞ্চয় থাকায় তাদের বিনিয়োগের সুযোগও বেশি। অন্যদিকে আয় বিবেচনায় দুর্বল পরিবারগুলোর আয়ের উৎস যেমন কম, তেমনি সঞ্চয়ের সামর্থ্যও সেভাবে নেই। এ পরিস্থিতিতে ধনীদের মধ্যে আয় আরো বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন  বলেন, গত ছয় বছরে গরিবদের আয় যে পরিমাণ বেড়েছে, ধনীদের বেড়েছে তার চেয়েও বেশি হারে। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের যে প্রবৃদ্ধি, তা এসেছে মূলত উৎপাদন ও সেবা খাত থেকে। কৃষির অবদান কমে গেছে। অথচ কৃষিতে আমাদের ৪২ শতাংশ শ্রমজীবী কাজ করেন। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি যেমন কম, একইভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক হওয়ায় এ খাতে মজুরি বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। উৎপাদন খাতে যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তার সুফল ভোগ করছেন উৎপাদনমুখী শিল্পের মালিকরা।

তবে আয়বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। খানা আয়-ব্যয় জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমরা ধনী শ্রেণীর আয়কর বাড়াচ্ছি। তাদের কাছ থেকে কর আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে খানার মাসিক আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯৪৫ টাকা। ২০১০ সালে এ আয় ছিল ১১ হাজার ৪৭৯ টাকা। শহরে প্রতি খানায় মাসিক আয় এখন ২২ হাজার ৫৬৫ টাকা, ২০১০ সালে যা ছিল ১৬ হাজার ৪৭৫ টাকা। আর গ্রামে মাসিক আয় ৯ হাজার ৬৪৮ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩৫৩ টাকায়।

বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সময়ে দেশে আয়বৈষম্য বেড়েছে। আয়বৈষম্য পরিমাপক জিনি অনুপাত বেড়ে হয়েছে দশমিক ৪৮। ২০১০ সালে এটি ছিল দশমিক ৪৬। জিনি অনুপাত ১ হলে সেটিকে বলা হয় সর্বোচ্চ আয়বৈষম্য। আর শূন্য হলে বলা হয় সবার মধ্যে সাম্য, যেটি বিশ্বের কোথাও নেই। সে হিসাবে বাংলাদেশে ২০১০ সালের তুলনায় আয়বৈষম্য বেড়েছে।

আয়বৈষম্য এখন বৈশ্বিক প্রবণতা বলে মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উদ্বেগের বিষয় হলো, এটা কমার বদলে বাড়ছে। এর মানে হচ্ছে, সম্ভাবনাগুলো উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর জন্য। যারা নিচের দিকে আছে, তাদের আয় সম্ভাবনা তেমন সৃষ্টি হচ্ছে না। এর মধ্যে অন্যতম হলো কর্মসংস্থান। কিন্তু কর্মসংস্থানের পূর্বশর্ত যেমন বিনিয়োগ তা তেমন নেই। কর্মসংস্থান যাওবা হচ্ছে, তার বেশির ভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক। এসব শ্রমিকের আয় কম। আবার কাজের সুরক্ষাও কম।

তবে আয়বৈষম্য আরো বেশি হবে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর সাজ্জাদ জহির। তিনি বলেন, খানা জরিপে সাধারণত সব ধনী পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। এর ফলে হিসাবে একটা গরমিল থেকে যায়। সাধারণত অনুন্নত দেশে আয়ের হিসাবের এ গরমিলে আমাদের বৈষম্যের হারটা সঠিকভাবে শনাক্ত হয় না। এ কারণেই গবেষক মহলে বৈষম্য আরো বেশি বলে মনে করা হয়।

বিবিএস বলছে, গত ছয় বছরে মানুষের ভোগব্যয় স্থিতিশীল রয়েছে। ২০১০ সালে ভোগব্যয় ছিল দশমিক ৩২। ছয় বছর ধরে সেটি এখনো একই অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ ধনী-গরিব দুই শ্রেণীই ২০১০ সালে ভোগব্যয়ে যা খরচ করত, এখনো তা-ই করছে। খানা আয়-ব্যয় জরিপে উঠে এসেছে, দেশে এখন গড় দারিদ্র্য হার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri