কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ১০লাখ শরণার্থীকে মানবিক সহায়তা দিচ্ছে সেনাবাহিনী

r-camp-coxbangla.jpg

কক্সবাংলা রিপোর্ট(২১ নভেম্বর) :: মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ ও অন্যান্য সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা ছাড়াও সমন্বয়ও করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সেনাবাহিনী কাজ শুরু করার পরে সেখানকার কাজে শৃঙ্খলাসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হয়।

সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আসার আগে যত্রতত্র ত্রাণ ও নগদ অর্থ বিতরণ করতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মৃত্যুসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু, এখন সবকিছু একটি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে।

রোহিঙ্গারা তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে এক অত্যাচারী সেনাবাহিনীকে দেখেছে। পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে তারা দেখছে এক মানবিক সেনাবাহিনীর রূপ।

আইএসপিআর সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলা প্রশাসন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ ও অন্যান্য সহায়তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের নির্দেশক্রমে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ৬৫ ডিভিশন মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করে।

উখিয়ার প্রবেশ পথে ত্রাণ সংগ্রহ ক্যাম্প থেকে শুরু করে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকিতে সেনা সদস্যদের অক্লান্ত সেবার ছাপ পরিষ্কার। এছাড়া বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রোহিঙ্গা রেজিষ্ট্রেশনেও তারা সরাসরি কাজ করছে।

ক্যাম্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও উখিয়া ডিগ্রী কলেজ মাঠে সেনা সম্বনয় কেন্দ্রের বৈঠকে (যা প্রতি বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়) উপস্থিত থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

যেভাবে ত্রাণ গ্রহণ ও পরীক্ষা

উখিয়া থেকে কুতুপালং যাবার পথে প্রধান সড়কের পাশে ত্রাণ সংগ্রহের জন্য ক্যাম্প রয়েছে। কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান ত্রাণ দিতে চাইলে প্রথম ত্রাণ হিসেবে কী কী দিতে চাইছে তার একটি তালিকা ওই ক্যাম্পের দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে দিতে হয়। ত্রাণের গাড়িতে থাকা ত্রাণ সেনা সদস্যদের দ্বারা পরীক্ষার পর তা বিতরণ সেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

উখিয়া-টেকনাফ সড়কে সেনা সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ছবি- আব্দুর্লাহ আল সাফি
উখিয়া-টেকনাফ সড়কে সেনা সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থায় ওইসব ত্রাণ যথাস্থানে পৌঁছে দেন সেনা সদস্যরা। সেই ত্রাণ কোন ক্যাম্পের কোন শেডে বিতরণ করা হবে তাও ত্রাণদাতাকে ক্যাম্প থেকে জানিয়ে দেয়া হয়।

ত্রাণ কেন্দ্রের সামনে সেনা সদস্যরা। ছবি- আব্দুল্লাহ আল সাফি
ত্রাণ কেন্দ্রের সামনে সেনা সদস্যরা।

কোরোসিনসহ কোনো দাহ্য পদার্থ, বিশেষ ধরণের কোনো ওষুধ, গুঁড়ো দুধ (ইউনিসেফের অনুমোদিত কিছু দুধ দেয়া যায়), পুরাতন কাপড়, নগদ টাকাসহ কিছু আইটেম ত্রাণ হিসেবে দেয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ওই ক্যাম্পে ত্রাণ চাহিদার একটি সম্মিলিত তথ্য দেয়া থাকে, যার ভিত্তিতে দায়িত্বশীল সেনা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন কোথায় ত্রাণ বিতরণ করা হবে। সে অনুযায়ী ত্রাণ বিতরণের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়ে থাকে।

সরেজমিন ত্রাণ বিতরণের চিত্র

বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করা রোহিঙ্গা পরিবারের তথ্য সেনা সদস্যরা  সংগ্রহ করেছেন। সে অনুযায়ী তাদের প্রতিটি ঘরে একটি নির্দিষ্ট নম্বর দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর অবস্থা ও বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত সংগ্রহসহ নানা কাজে গতি আনতে প্রতি ১০০ পরিবারের জন্য একজন রোহিঙ্গা ব্যক্তিকে নিযুক্ত করা হয়েছে। ওইসব ব্যক্তিদের ‘মাঝি’ নামে ডাকা হয়ে থাকে, তাদের বিশেষ ধরণের পোশাকও দেয়া হয়েছে। মাঝিদের সমন্বয় করতে আবার ‘হেড-মাঝি’ও নিযুক্ত করা হয়েছে।

কুতুপালং ক্যাম্পে কাজ করা আব্দুর রহিম নামের একজন মাঝি। পাশে ত্রাণের অপেক্ষায় রোহিঙ্গা নারী-শিশু। ছবি- আব্দুল্লাহ আল সাফি
কুতুপালং ক্যাম্পে কাজ করা আব্দুর রহিম নামের একজন মাঝি। পাশে ত্রাণের অপেক্ষায় রোহিঙ্গা নারী-শিশু।

বিভিন্ন ক্যাম্পে ত্রাণের চাহিদা থাকলে তা মাঝিদের মাধ্যমে জানা ও তাদের মাধ্যমে ওইসব পরিবারের একজন করে সদস্যকে ডেকে এনে তার হাতে ত্রাণের টোকেন দেয়া হয়। ওই নির্দিষ্ট টোকেন নিয়ে নির্দিষ্ট শেড থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করে থাকে রোহিঙ্গারা।

কার্ড দেখে ত্রাণ বিতরণ করছেন একজন সেনা সদস্য। ছবি-সাকিব উল ইসলাম
কার্ড দেখে ত্রাণ বিতরণ করছেন একজন সেনা সদস্য।

সেনাবাহিনী ত্রাণকাজে যুক্ত হবার আগে ক্যাম্পগুলোর বাইরে সড়কে ত্রাণের গাড়ি এলে সেখানে হুড়াহুড়ি করে ত্রাণ সংগ্রহ করতে দেখা যেত। ওইচিত্র এখন আর নেই। এছাড়া নগদ টাকা বিতরণের মাধ্যমে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে নেতিবাচক আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা দূর হয়েছে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নেবার পরে।

নির্ধারিত লাইনে ত্রাণের অপেক্ষা করছে রোহিঙ্গারা। ছবি- আব্দুল্লাহ আল সাফি
নির্ধারিত লাইনে ত্রাণের অপেক্ষা করছে রোহিঙ্গারা।

ক্যাম্পের ভেতর বাইরে অবকাঠামো

সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটের সদস্যরা ক্যাম্পের ভেতরে বাইরে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষে তাদের যন্ত্রপাতি ও জনবল ব্যবহার করে একটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পেরেছেন।আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর মাষ্টারপ্ল্যান ও নির্মাণ সবই তাদের হাতে হয়েছে। খোলা মাঠে একসময় ত্রাণ বিতরণ করা হলেও বর্তমানে সব ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে নারী-শিশুদের জন্য মানবিক কারণে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ শেড। 

বিরাট সংখ্যক ওই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির সহায়তায় বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নিয়োজিত বিভিন্ন পক্ষের যোগাযোগের কারণে কক্সবাজার-উখিয়া-টেকনাফ সড়কে যানজট হচ্ছে। ওই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কুতুপালং ক্যাম্প থেকে বালুখালি ক্যাম্পে যাতায়াতের জন্য একটি বিশেষ সড়ক নির্মাণ করছে সেনাবাহিনী। এছাড়া পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার ও ব্যক্তি উদ্যোগকেও পদ্ধতিগত পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন

প্রতিটি স্থায়ী ও অস্থায়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও কম্পিউটারসহ সেনা সদস্যরা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে নারী-শিশু ও পুরুষদের আলাদা কক্ষে রেজিষ্ট্রেশন কাজ করে যাচ্ছেন। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সহায়তায় এ কার্যক্রম গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে চলছে।

রেজিস্ট্রেশন ক্যাম্পে এক রোহিঙ্গা শিশুর রেজিস্ট্রেশন করছেন এক সেনা সদস্য। ছবি- আব্দুল্লাহ আল সাফি
রেজিস্ট্রেশন ক্যাম্পে এক রোহিঙ্গা শিশুর রেজিস্ট্রেশন করছেন এক সেনা সদস্য।

রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনে নেওয়া হচ্ছে কয়েকটি তথ্য, ছবি ও আঙ্গুলের ছাপ। এএফআইএস (অটোমেটিক ফিঙ্গার আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম) সাপোর্ট সার্ভিসের মাধ্যমে যে দ্বৈত ভোটার শনাক্ত করা হয়, তাই ব্যবহৃত হচ্ছে সেখানে। রোহিঙ্গাদের আঙ্গুলের ছাপ তথ্যভাণ্ডারে মিলিয়ে দেখলে জালিয়াতদের ধরা যাবে।

এক রোহিঙ্গা শিশুর আঙুলের ছাপ নিয়ে তার কার্ড তৈরি করে দিচ্ছেন সেনা সদস্যরা। রেজিস্ট্রেশন করতে ক্যাম্পের ভেতরে প্রচারণা। ছবি- আব্দুল্লাহ আল সাফি
এক রোহিঙ্গা শিশুর আঙুলের ছাপ নিয়ে তার কার্ড তৈরি করে দিচ্ছেন সেনা সদস্যরা। রেজিস্ট্রেশন করতে ক্যাম্পের ভেতরে প্রচারণা।

প্রথম দিকে রোহিঙ্গাদের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে অনিহা থাকলেও ত্রাণ সুবিধা পেতে হলে রেজিষ্ট্রেশন বাধ্যতামূলক হওয়ায় এখন প্রায় সব রোহিঙ্গাই রেজিস্ট্রেশনে আগ্রহী হচ্ছেন।

গত ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ৫ লাখ ২৭ হাজার ৫৯৭ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীর বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে বলে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়া রোহিঙ্গাদের ছবিসহ পরিচয়পত্রও দেওয়া হয়েছে। সেনাসদস্যরা এসব কার্যক্রমের প্রতিটি পদক্ষেপ ধৈর্য্য ও আন্তরিকতার সঙ্গে করে যাচ্ছেন।

ক্যাম্প এলাকার নিরাপত্তা ও ক্যাম্প ছেড়ে পালানো রোধ

উখিয়া বাজারের পর থেকে ক্যাম্প এলাকা শুরুর আগ থেকেই প্রধান সড়কে সেনা সদস্যদের টহল থাকে রাত-দিন ২৪ ঘন্টা। সাধারণ পরিবহন থেকে শুরু করে ত্রাণের গাড়ি সবই একটি বিশেষ নজরদারির মধ্যে দিয়ে চলাচল করছে নিরাপদে। ত্রাণের গাড়িগুলোকে সঠিক গন্তব্য ও নির্ধারিত ব্যবস্থা সর্ম্পকে প্রাথমিক তথ্যও প্রদান করছেন সড়কে টহলরত সেনা সদস্যরা।দেশে আসার পরে ক্যাম্প ছেড়ে রোহিঙ্গাদের পালানোর প্রবণতা বেশ লক্ষ করা গেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ‘৮ অক্টোবর, ২০১৭ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ৬৯০ জন রোহিঙ্গাকে সারাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আটক করে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং ক্যাম্প এলাকা থেকে অন্য জেলায় যাওয়ার সময় দেশের পায় ২৫,০০০ জনকে আটক করা হয়েছে (বিভিন্ন জেলা থেকে)।

বাসে উঠে যাত্রীদের পরিচয় নিশ্চিত করছেন একজন সেনা সদস্য। ছবি- আব্দুল্লাহ আল সাফি
বাসে উঠে যাত্রীদের পরিচয় নিশ্চিত করছেন একজন সেনা সদস্য।

সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরে সে হার অনেকটাই কমে গেছে। ক্যাম্প এলাকা থেকে বের হয়ে যাবার আগে সেনা সদস্যরা বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি ও পরিচয় নিশ্চিত করছেন।

২৫ আগস্টের আগে ও পরে প্রবেশ করা রোহিঙ্গা মিলিয়ে উখিয়া ও টেকনাফে প্রায় ১৬টি ছোট-বড় স্থায়ী-অস্থায়ী ক্যাম্পে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাস করছেন। ওই এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্থানীয় জনমনে স্বস্তি ও এলাকায় নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকায় রাখছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

Share this post

PinIt
scroll to top
bahis siteleri