ইসলামী ব্যাংক ছাড়ছে ইবনে সিনা ট্রাস্ট

sina-logo-20180426195547.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(২৬ এপ্রিল) :: ইসলামী ব্যাংক যখন গ্রাহকদের ঋণ দিতে পারছে না, তখন  ব্যাংকটি ছাড়ছে ইবনে সিনা। মালিকানা পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বিদেশি উদ্যোক্তারা শেয়ার তুলে নিয়ে চলে যাওয়ার পর এবার ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার তুলে নিয়ে যাচ্ছে ইবনে সিনা ট্রাস্ট। ইসলামী ব্যাংকের এই উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানটি তাদের (করপোরেট স্পন্সর) সব শেয়ারই বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এ তথ্য জানিয়েছে।

ডিএসই জানিয়েছে, ইবনে সিনা ট্রাস্ট ইসলামী ব্যাংকের তিন কোটি ৬০ লাখ ৭৭ হাজার ৩৯১টি শেয়ার বিক্রি করবে। আগামী ৩০ কার্য দিবসের মধ্যে ইবনে সিনা ট্রাস্ট ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিদ্যমান বাজার দরে এসব শেয়ার বিক্রি করবে। যা লেনদেন হবে ব্লক মার্কেটে। ইবনে সিনা ট্রাস্ট ইসলামী ব্যাংকের যে শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে, তা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের দুই শতাংশের ওপরে।

এর আগে গত অক্টোবরে কোম্পানির উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান (করপোরেট স্পন্সর) বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার শেয়ার বিক্রি করে দেয়। বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের কাছে থাকা ইসলামী ব্যাংকের ৩৭ লাখ শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানাটি একলাখ শেয়ার বিক্রি করে। তারও আগে সেপ্টেম্বর কুয়েত ফাইন্যান্স হাউস ইসলামী ব্যাংকের সব শেয়ার বিক্রি করে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ছিল ৮ কোটি ৪৫ লাখ ৬৩ হাজার ৭৮২টি, যা ব্যাংকের মোট শেয়ারের সোয়া ৫ শতাংশ।

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশে ১৯৮৩ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা হয়। সে সময় ব্যাংকটির মোট শেয়ারের প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল বিদেশিদের হাতে। তবে ২০১৪ সাল থেকে বিদেশিরা ব্যাংকটির শেয়ার ছেড়ে দিতে শুরু করে। বর্তমানে বিদেশিদের কাছে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার আছে ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তা বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক ২০১৪ সালে ইসলামী ব্যাংকের সব শেয়ার বিক্রি করে দেয়। ২০১৫ সালে সব শেয়ার বিক্রি করে দেয় দুবাই ইসলামিক ব্যাংক।  গত বছরের ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসে। পরিবর্তনের পর গত মে মাসে ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক আইডিবি (ইসলামিক ডেভলপমেন্ট ব্যাংক) ৮ কোটি ৬৯ লাখ শেয়ার বিক্রি করে।

এদিকে, বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক বলে পরিচিত এই ব্যাংকের পরিস্থিতি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। নগদ টাকার সংকটে পড়ে ব্যাংকটি গ্রাহকদের ঋণ দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।

ব্যাংকটির কর্মকর্তারা বলেছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যেকোনও শাখাই আগের মতো নিজেদের পছন্দের গ্রাহককে ঋণ (বিনিয়োগ) দিতে পারছে না। শুধু তাই নয়, অর্থ ছাড়ের (ডিসবাসমেন্ট) ক্ষেত্রে শাখার কর্মকর্তাদের অথরাইজ করার ক্ষমতাও বাতিল করা হয়েছে। ফলে দেশের কোনও জায়গা থেকে কোনও ধরনের ঋণ দিতে পারছে না ব্যাংকের শাখাগুলো।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকটির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অর্থ ছাড় করার ক্ষেত্রে আগে শাখার ম্যানেজারে বা তার নিচের কর্মকর্তারা অথরাইজ করতো। এখন আর তারা অথরাইজ করতে পারছেন না। অর্থ ছাড় বা ডিসবাসমেন্টের ক্ষেত্রে ব্যাংকের সার্ভারে থাকা শাখার কর্মকর্তাদের নাম ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।প্রধান কার্যালয় থেকে এই সার্ভার এখন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘সার্ভারে শাখার অথরাইজ কর্মকর্তার ক্ষমতা এখন প্রধান কার্যালয়ের হাতে রেখে দেওয়া হয়েছে।’

জানা গেছে, গত বছর ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকে যে পরিবর্তন শুরু হয়, তা এখনও  অব্যাহত থাকায় ব্যাংকটি নানান সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি চেয়ারম্যান পদে আবারও পরিবর্তনের ফলে আস্থার সংকটে পড়েছে এই ব্যাংক। ইতোমধ্যে ব্যাংকটিতে নগদ টাকার সংকট সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে এতদিন শাখাগুলোকে মৌখিকভাবে ঋণ বিতরণ বন্ধ রাখতে নির্দেশনা থাকলেও, সম্প্রতি শাখার কর্মকর্তাদের অথরাইজ করার ক্ষমতাও বাতিল করা হয়েছে।

ব্যাংকটির শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংক বেশ কিছুদিন ধরে নতুন কোনও প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে না। আর আগের যেসব গ্রাহক ও প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগ অনুমোদিত হয়েছিল, সেগুলোতেও অর্থ ছাড় করার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করতো প্রধান কার্যালয়।

রবিবার (২২ এপ্রিল) থেকে শাখার ক্ষমতা একেবারেই তুলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ব্যাংকের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত বিনিয়োগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

তবে মতিঝিল শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত আমানত ও বিনিয়োগ হার (আইডিআর) সমন্বয় করার জন্য বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ রাখা হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকটির রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকে এক কোটির বেশি গ্রাহকের আমানত রয়েছে। নির্বাচনের বছরে সেই আমানত যেন কোনোভাবে খেয়ানত না হয়, সেজন্য বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বড় ঋণ ছাড় করা হচ্ছে যাচাই-বাছাই করে। নির্বাচনের বছরে ইসলামী ব্যাংকের কোনও টাকা যাতে জঙ্গি অর্থায়ন বা সন্ত্রাসী কাজে বা সরকারবিরোধী কোনও কাজে ব্যবহৃত হতে না পারে, সেজন্য শাখার কর্মকর্তাদের অথরাইজ করার ক্ষমতাও বাতিল করা হয়েছে।’

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মুস্তাফা আনোয়ারকে সরিয়ে পরিচালনা পর্ষদের প্রথম সভাতেই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন সরকারের সাবেক সচিব আরাস্তু খান। তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান আজিজুল হকও সেদিন পদত্যাগ করেছিলেন। এছাড়া, একইদিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল মান্নানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

Share this post

PinIt
scroll to top