চায়ের দোকানী থেকে দেশ সেরা বলি এখন চকরিয়ার জীবন

jibon-Pic-126.04.18.jpg

মুকুল কান্তি দাশ,চকরিয়া(২৬ এপ্রিল) :: দীর্ঘদিন ধরে জীবন মনে মনে একটি স্বপ্ন দেখছিলেন। যে স্বপ্ন রাতের ঘুম পর্যন্ত হারাম করে নিয়েছে। সে স্বপ্ন আর কিছু নয় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জব্বারের বলি খেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া। অবশেষে সে কাঙ্খিত স্বপ্ন পুরণ হয়েছে। ছোট বেলা থেকে বলি খেলা দেখতাম।

এ প্রতিবেদককে কথাগুলো বলছিলেন ঐতিহাসিক জব্বারের বলি খেলার ১০৯ তম আসরের চ্যাম্পিয়ন কক্সবাজারের চকরিয়ার জীবন বলি।

সুঠাম দেহের অধিকারী জীবন বলি বলেন, যখন আমার বুদ্ধি হয় তখন থেকেই চট্টগ্রামে চলে আসতাম জব্বারের বলি খেলা দেখার জন্য। ২০০৯ সালে প্রথম জব্বারের বলি খেলায় অংশ নিয়ে পরাজিত হয়। গতবার কোয়ার্টার ফাইনাল রাউন্ড থেকে ছিটকে পড়ি।

তারপরও আশা ছাড়িনি। অবশেষে আমি জয়ি হয়েছি। এবছর চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় মক্কার বলি খেলা, পটিয়ার ভাটিখাইনের বলি খেলায় এবং পাবনা জেলায় অনুষ্টিত বলি খেলাতেও আমি চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।

তাছাড়া গতবছর কক্সবাজারের ডিসি সাহেবের বলি খেলায় আমি রানার্সআপ হয়েছি। আগামীকাল শুক্রবার ও শনিবার অনুষ্টিত হতে যাওয়া কক্সবাজারের ডিসি সাহেবের বলি খেলাতেও অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হবেন বলে আশা রাখেন।

চৈত্র মাস শুরু হলে মাতামুহুরীর চরে প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই নেমে পড়ে খসরতে। এলাকার আরো দুই-তিন বলিকে সাথে প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘন্টা পর্যন্ত এই খসরত চলে বলে জানান জীবন বলি। এছাড়া তিনি প্রতিদিন তিন বেলা ভাত, দুই বেলা নাস্তা করেন। এর বাইরে তেমন আর কিছু খাননা।

এদিকে, গত বুধবার জীবন বলি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জব্বারের বলি খেলায় কুমিল্লার শাহজালাল বলিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় তার নিজ এলাকা চকরিয়ায় চলছে আনন্দের বন্যা। জীবন বলি কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরশহরের মগবাজার এলাকার বাসিন্দা। চকরিয়াবাসী বৃহস্পতিবার বিকালে পৌরসভার মগবাজারস্থ শেখ রাসেল স্টেডিয়ামে এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেছে।

ছাব্বিশ বছর বয়সি তারেকুল ইসলাম প্রকাশ জীবন বলি গত দুই বছর আগে বিয়ে করেছেন। সংসারে ৯ মাস বয়সি ফুটফুটে রিয়া নামের একটি কন্যা সন্তানও রয়েছে। দুই ভাই এক বোন। ভাইদের মধ্যে সবার বড়। বাবা মুছা আকবর মারা গেছে বহু বছর আগে। মা, স্ত্রী-সন্তান ও ভাই-বোনেদের নিয়ে সংসার। অভাবের সংসার তাই পড়া লেখা করতে পারেনি। সংসারের দু:খ লাগবে বাড়ি পাশে মায়ের দোয়া নামের একটি চায়ের দোকানে ব্যবসা শুরু করেন। পাশাপাশি বলি খেলাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এতেই চলছিল সংসার।

জীবন বলির চাচাতো ভাই ইমামুল হোসেন ইমন বলেন, জীবন বলির বয়স যখন ৮ তখন সে এলাকার ছোট ছোট বিভিন্ন বলি খেলায় অংশ নিয়ে বলি খেলার প্রতি ঝুকে পড়ে। একসময় এলাকায় ক্ষীরা বলি হিসেবেও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। বয়স যতই বাড়তে থাকে ততই বলি খেলার প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে।

এক পর্যায়ে নিজ এলাকা পেরিয়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বলি খেলায় অংশ নিতে থাকে। বলি খেলায় অংশ নিয়ে গত ৮ বছরে প্রায় শতাধিকের বেশি শিরোপা অর্জন করেছে জীবন।

তিনি আরো জানান, গত ৯ বছর ধরে সে ঐতিহাসিক জব্বারের বলি খেলায় অংশ নিয়ে আসছিলো। কোন বারেই চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। তারপরও হাল ছাড়েনি। বিভিন্ন বলি খেলায় অংশ নিয়ে বড় বড় বলিদের সাথে বলি খেলে সে আস্তে আস্তে বলি খেলার কৌশল রপ্ত করতে থাকে। বাড়িয়ে দেয় চর্চা। তার সাধনা ও চর্চা বাস্তবায়িত হয় ২০১৮ সালের জব্বারের বলি খেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে।

জীবন বলির মা জোছনা খানম আবেগাপ্লুত হয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে জব্বারের বলি খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে শুধু এলাকার নাম নয় জেলার নামও উজ্জল করেছেন। আমি সকলের কাছে আমার ছেলের জন্য দোয়া চাই।

জানা গেছে, ১৯০৬ সালে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুবকদের অংশগ্রহণ করার লক্ষ্যে চট্টগ্রামের বদরপট্টি এলাকার ব্যবসায়ী জব্বার সওদাগর বলি খেলার আয়োজন করেন। প্রতিবছর বৈশাখের ১২ তারিখ এই বলি খেলার আয়োজন হয়ে আসছে। এতে দেশের নামকরা সব বলিরা অংশ নিয়ে থাকেন। ইতিমধ্যে ঐতিহাসিক জব্বারের বলি খেলাকে বিশ্ব হেরিটেজ ঘোষনার দাবি জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বাড়ি পৌছালে জীবন বলির সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।

এসময় তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন ছিলো ঐতিহাসিক জব্বারের বলি খেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার। আল্লাহ আমার সে স্বপ্ন পূরণ করেছেন। আমি খুব খুশি। আমি চাই এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে। সেজন্য সবার দোয়া চেয়েছেন।

গত বুধবার চট্টগ্রামে লালদিঘীর মাঠে অনুষ্টিত ঐতিহাসিক জব্বারের বলি খেলার ১০৯ তম আসরে ফাইনাল রাউন্ডে প্রায় ১৫ মিনিট ৩২ সেকেন্ড কুমিল্লার শাহজালাল বলির সাথে লড়াই করে চ্যাম্পিয়ন হয়।

ঐতিহাসিক জব্বারের বলি খেলায় ১০৯ তম আসরের মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ার দিদার বলি ১৭ বার, চকরিয়া জাফর আহমদ বলি ৭ বার, টেকনাফের নুর মোহাম্মদ বলি ২ বার ও মহেশখালীর কামাল বরি ১ বার করে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জেলা সুনাম ধরে রেখে আসছিল। তারই ধারাবাহিকতায় জীবন বলি ১০৯ তম আসরে জয়ী হয়ে আবারো জেলার সুনাম ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

Share this post

PinIt
scroll to top