কক্সবাজারের ২৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তায় ১ হাজার ৬০৯ জন ‘মাঝি’

IMG_20171117_114123-2.jpg

কক্সবাংলা ডেস্ক(২৭ এপ্রিল) :: কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ছোট-বড় ২৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তায় কাজ করছেন ১ হাজার ৬০৯ জন ‘মাঝি’। তবে এই মাঝিরা নৌকার মাঝি নন। তারা স্বেচ্ছাসেবী। রাতের বেলা দুই শিফটে পাহারা দেওয়ার কাজটি করছেন ‘মাঝি’ পদবির এসব রোহিঙ্গা যুবক ও কিছু স্বেচ্ছাসেবী।

ক্যাম্পের ভেতরে চুরি, ডাকাতিসহ নানা অপরাধ ঠেকাতে কাজ করছেন তারা। এ ছাড়া ত্রাণ বিতরণসহ নানা শৃঙ্খলার কাজেও সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে এসব মাঝি সহযোগিতা করেন।

রোহিঙ্গা যুবকদের মধ্য থেকে বাছাই করে কমিউনিটি লিডার হিসেবে তাদের মনোনয়ন করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে তাদের মাঝি পদবি দেওয়া হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবীর গেঞ্জি পরে, গলায় ‘মাঝি কার্ড’ ঝুলিয়ে

তারা দিনরাত নির্ধারিত কাজ করে যান। জানা গেছে, রোহিঙ্গা তরুণদের ক্যাম্পের মধ্যেই কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে তাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি ক্যাম্পে তাদের ভাগ করে দেওয়া হয়। তাদের জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দিতে এবং রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবেলার জন্য সামাজিক পদ্ধতি অনুসরণ করে এই মাঝিদের কাজে লাগানো হচ্ছে। একজন হেড মাঝির অধীনে একজন মাঝি ও তারপর সাব-মাঝির পদ রয়েছে।

একজন মাঝির তত্ত্বাবধানে থাকে এক হাজার থেকে ১২০০ রোহিঙ্গা পরিবার। সাব-মাঝির তত্ত্বাবধানে থাকে ১০০ রোহিঙ্গা পরিবার। তাদের লিডার তারাই মনোনয়ন করে থাকেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাঝে মাঝেই লাল পতাকা দেখা যায়। তার মানে সেই পতাকা নির্দেশিত স্থানে একজন মাঝি আছেন।

আর্মি কো-অর্ডিনেশন সেল, উখিয়ার সাবেক চিফ কো-অর্ডিনেটর ও রোহিঙ্গা সংকটের শুরুতে দায়িত্ব পালনকারী লে. কর্নেল শাহ মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের একটা ডাটাবেজ সংরক্ষণ করছি। এই মাঝিদের সিস্টেমটা কাজের সুবিধার্থে গড়ে তুলেছি। রোহিঙ্গাদের প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের রেজিস্ট্রেশন নম্বরসহ তাদের থাকার জায়গারও আলাদা নম্বর দেওয়া আছে। প্রতিটি ব্লক অনুযায়ী মাঝিদের ছবিসহ তালিকা আমরা সংরক্ষণ করছি।

তিনি বলেন, এখানকার রোহিঙ্গাদের ম্যানেজ করতে আমাদের পিসকিপিং মিশনসহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে। বাংলাদেশের মিলিটারি এমন ক্রাইসিস প্রায়ই মোকাবেলা করে। আমরা নিজেদের ইনোভেশন দিয়ে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলা করেছি।

উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে মারামারি, খুনোখুনি নিত্যদিনের ব্যাপার। এ পর্যন্ত গত আট মাসে ১৫ জন খুন হয়েছে নিজেদের দ্বন্দ্বে। চুরি, ডাকাতি, অপহরণ তো আছেই। মিয়ানমারের পুরনো বিরোধ তারা এখানে মেটাচ্ছে। এখন তারা অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ও জড়িয়ে পড়েছে। ক্যাম্পগুলোতে পুলিশের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর একটি উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন আছে।

উখিয়া সার্কেলের এডিশনাল এসপি চাইলাই মারমা বলেন, পুরো উখিয়ায় আড়াই লাখ মানুষ। আর একই জায়গায় আরও ১১ লাখ বিদেশিকে রাখতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে ভালো মানুষ যেমন আছে তেমনি চোর, ডাকাত, সমাজবিরোধীও আছে। এত মানুষকে একসঙ্গে রাখা অনেক চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। 

জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে খাবার বিতরণের দায়িত্ব পালন করে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য সংস্থা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নন ফুড আইটেমসহ বিভিন্ন কাজে অংশ নিচ্ছে। কাজের সুবিধার্থে সেনাবাহিনীর ২০টিরও বেশি ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট রয়েছে।

লে. কর্নেল শাহ মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেন, ৭টি ক্যাম্পে আমরা মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছি। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন সংগঠন মেডিকেল সেবা দিচ্ছে। আমরা স্যানিটেশনের ওপরও কাজ করেছি।

তিনি বলেন, আমরা প্রায় ৪ হাজার রোহিঙ্গা ভলান্টিয়ার তৈরি করেছি। ভূমিধস, অগ্নিকা, সাইক্লোন, ঝড় ইত্যাদি মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় তাদের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাদক প্রতিরোধ, মানব পাচার বিষয়ে তাদের মোটিভেট করা হচ্ছে।

উলেল্গখ্য, সেনাবাহিনী কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের তিনটি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে। এ ছাড়া পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র‌্যাব নিয়মিত পাহারা অব্যাহত রেখেছে। বিকেল ৫টার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাইরের কারও অবস্থানের কোনো সুযোগ নেই। শুধু মেডিকেল ট্রিটমেন্টের প্রয়োজন ছাড়া কোনো রোহিঙ্গা সদস্যেরও বিকেল ৫টার পর ক্যাম্পের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

স্থানীয়রা বলছেন, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গারা কঠিন সময় পার করছে। তারপরও তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে চান।

কুতুপালং ক্যাম্পে কথা হয় মিয়ানমারের মংডু থানার নাইচাডং এলাকার বাসিন্দা হামিদ হোসেনের সঙ্গে। স্ত্রীসহ ১১ সদস্যের পরিবার তার। ৫ ছেলে, ৪ মেয়ে। তিনি বলেন, আমরা রাখাইনে ফিরে যেতে চাই। শুধু জানে বাঁচার নিশ্চয়তা পেলেই সেখানে ফিরে যাব। তিনি জানান, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী পাশে না থাকলে তাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠত।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ শাখার মুখপাত্র যোসেফ ত্রিপুরা বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের রাখছে সেটা একটা বিশ্ব রেকর্ড। এত দ্রুত সময়ে সরকার ও এ দেশের জনগণ তাদের প্রাণ-মন খুলে সহযোগিতা দিয়েছে। এটা বিশ্বে বিরল। তিনি বলেন, এত সহজে কোথাও রিফিউজিরা পুনর্বাসনের সুযোগ পায়নি। এখন আমরা তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে কাজ করছি।

Share this post

PinIt
scroll to top