রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ

IMG_20180429_122442.jpg

কক্সবাংলা রিপোর্ট(২৯ এপ্রিল) :: মিয়ানমার সেনাদের নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শনে আসা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলটি তুমব্রু সীমান্ত এলাকার শুন্য রেখার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন।

২৯ এপ্রিল রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত দক্ষিণ আমেরিকান দেশ পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো মেজা-চুয়াদ্রার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নাইক্ষংছড়ির তুমব্রুর কোনারপাড়া জিরো পয়েন্ট যান। সেখানে নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি সরেজমিন দেখে তারা উখিয়ার বালুখালী-০২ ময়নারঘোনা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।

সেখানে কথা বলেন নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাথে। উচ্চ পর্যায়ের এ প্রতিনিধি দলকে কাছে পেয়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা তাদের উপর মিয়ানমারে চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দেন। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা তাদের অবস্থান থেকে এ ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাস দেন রোহিঙ্গাদের।

এরপর সারে ১১টায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধি দলটি কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌছালে সেখানে রোহিঙ্গাদের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে একটি প্রতিেিবদন তুলে ধরা হয়।এরপর তারা মিয়ানমার সেনাদের দারা নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারী,শিশু ও পুরুষদের সাথে কথা বলেন।

রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখার পর সংবাদ সম্মেলনে প্রতিনিধি দলের সদস্য পেরুর গুস্তাভো মেজা কোয়াদ্রার মন্তব্য, ‘আমরা এই শরণার্থী সংকট দেখে খুব উদ্বিগ্ন। আমরা এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। রোহিঙ্গাদের জন্য যেন কিছু করতে পারি, তাই সমস্যাটিকে আরও ভালোভাবে জানার জন্য আমরা এখানে এসেছি। আর রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।

প্রতিনিধি দলের আরেক সদস্য যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি কারেন পিয়ার্স বলেন, ‘আমরা এখান থেকে মিয়ানমারে যাবো। তাদের কাছ থেকে শুনতে চাইবো, সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হতে পারে তারা। আর রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আমরা নিরাপত্তা পরিষদে সমর্থন দেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবো ও রোহিঙ্গাদের উপকারে আসে এমন সিদ্ধান্ত নেবো।’

কুয়েতের প্রতিনিধি মনসুর আল উতাইবি আশ্বাস দিলেন, ‘আমরা এখান থেকে মিয়ানমারে যাবো ও সেখান থেকে নিউইয়র্কে ফিরে বিষয়টি নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলোচনা করবো। তবে আমরা এমন কোনও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না যে, আমরা দ্রুত কোনও ব্যবস্থা নেবো।’

অপরদিকে জাতিসংঘের নিরাপওা পরিষদের চীন ও রাশিয়া প্রতিনিধিরা বলেছে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন করতে হবে এবং তারাও এ সমস্যার দ্রুত এর সমাধান চায়। আর রোহিঙ্গা প্রত্যবাসনে চীন ও রাশিয়াও বাংলাদেশের পাশে থাকবে।

রুশ প্রতিনিধি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি সত্য, রোহিঙ্গা সমস্যা অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। আমরা নিরাপত্তা পরিষদে এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করছি।’নিরাপত্তা পরিষদের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রেজ্যুলেশনের সময় এখনও আসেনি। এটি শুধুমাত্র প্রেস স্টেটমেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।’তিনি বলেন, ‘এখানে কোনও ম্যাজিক সমাধান নেই। তবে অবশ্যই আমরা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো এবং চেষ্টা করবো সবচেয়ে ভালো সমাধান খুঁজে বের করতে।’ রাশিয়ার প্রতিনিধি বলেন, ‘আ মরা উৎসাহিত করি দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যাটির সমাধান হোক এবং আমরা চেষ্টা করছি দুদেশকে বোঝানোর জন্য, যাতে করে গঠনমূলক দর কষাকষি করে।’

চীনের প্রতিনিধি বলেন, ‘এটি একটি জটিল বিষয় এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, জাতিগত সত্তা।’ তিনি বলেন, ‘এর কোনও সহজ উত্তর নেই এবং আমাদের সবাইকে একসঙ্গে এর সমাধানের জন্য কাজ করতে হবে।’চীনা প্রতিনিধি বলেন, ‘আমরা আশা করি এ সমস্যা সমাধানের জন্য সবাই গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে।’

নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে কোনও কোনও রাষ্ট্র এই দুঃস্থ মানুষগুলিকে ‘রোহিঙ্গা’ নামে ডাকে। এ বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে রাশিয়া ইতিবাচক উত্তর দিলেও চীন এ বিষয়ে কঠোর মনোভাব পোষণ করে।

এসময় প্রতিনিধি দলের সাথে থাকা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের একটি সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং দেন।

এসময় সাথে ছিলেন-শরনার্থী সচিব আবুল কালাম, চট্রগ্রামের রেঞ্জের ডি আইজি এ এইচ এম মনিরুজ্জামান,ককসবাজার জেলা প্রশাসক মো: কামাল হোসেন, জেলা পুলিশ সুপার ড:একে ইকবাল হোসেন, উখিয়া সার্কেল চাই লাউ মারমা,উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিকারুজ্জামান, উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি একরামুল ছিদ্দিক ও উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের।

এদিকে কুতুপালং শরনার্থী শিবির পরিদর্শন শেষে জাতিসংঘের নিরাপওা পরিষদের প্রতিনিধি দলটি ক্যাম্প ত্যাগ করার সময় শত শত রোহিঙ্গা নারী-শিশু ও পুরুষ বিভিন্ন ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে মিয়ানমার বিরোধী মিছিল করে।

অপরদিকে জাতিসংঘের নিরাপওা পরিষদের দলটির আগমনে সকাল থেকে ককসবাজার-টেকনাফ সড়কের বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।অন্যান্য দিনের তুলনায় যানবাহন কম ছিল।

এরআগে শনিবার বিকাল ৪টা ২৫ মিনিটের সময় কুয়েত থেকে বিমান যোগে সরাসরি কক্সবাজার বিমান বন্দরে পৌঁছেন ৩০ সদস্যের এই প্রতিনিধি দল।

কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে এ প্রতিনিধি দল ইনানীর হোটেল রয়েল টিউলিপে চলে যান বিকেল ৫টার দিকে। ওই হোটেলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী ও রোহিঙ্গা শরনার্থী প্রত্যাবসন কমিশনারের সাথে মতবিনিময় করেন।জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধি দলের কক্সবাজার আগমনকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে জেলা পুলিশ।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য সহ ৩০ জন প্রতিনিধি দলের মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধিসহ ১০ জন স্থায়ী প্রতিনিধি, ৫ জন উপ স্থায়ী প্রতিনিধি। রোববার বিকাল সাড়ে তিনটায় ঢাকার উদ্দেশ্যে বিমান যোগে কক্সবাজার ত্যাগ করবেন প্রতিনিধি দল।

সোমবার সকাল সাড়ে ৯ টায় প্রতিনিধি দলের সদস্যদের গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে বিমানযোগে ঢাকা ত্যাগ করবেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের এ প্রতিনিধি দল। রোহিঙ্গা সংকটের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধি দলটি প্রথমবারে মতো রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছেন।

উল্লেখ্য,গত বছরের ২৫ আগস্টে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাজ্য রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

অভিযানের মুখে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।তারা উখিয়া টেকনাফের ৩০ টি ক্যাম্পে বসবাস করছে। জাতিসংঘ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্বের অভিযোগ, এই অভিযানের সময় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ‘জাতিগত নিধন’,‘গণহত্যা’ ও ‘পদ্ধতিগত’ মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে।

যদিও শুরু থেকেই মিয়ানমার এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার চুক্তি করেছে।

Share this post

PinIt
scroll to top