কক্সবাজার সদর হাসপাতাল : স্বাস্থ্য সেবায় মহা পরিকল্পনা তুলে ধরলেন ডা: পু চ নু

IMG_20180503_140919.jpg

বিশেষ প্রতিবেদক(৩ মে) :: উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামল কক্সবাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আসছিল। তখন মাত্র ২২টি বেড নিয়ে যাত্রা শুরু করা কক্সবাজার মহকুমা হাসপাতাল ১৯৬৫ সালে এসে ৩২ বেডে উন্নিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্র্তী ১৯৭২ সালে সাব-ডিভিশন হাসপাতাল হিসাবে ৫০ বেডে উন্নিত হয় এবং ১৯৯৬ সালে এর সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ১০০ বেডে। সর্বশেষ ২০০৭ সালে কক্সবাজার সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয়্যায় রুপান্তরিত করে জেলার স্বাস্থ্য সেবায় আমুল পরিবর্তন আনা হয়। ইতিমধ্যে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছরের অধিক সময় অতিক্রান্ত হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র স্বাস্থ্য ও জরুরী বহির্বিভাগের মাধ্যমে এই হাসপাতালের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এটিকে ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হিসেবে অত্র হাসপাতালে বর্তমানে ২৪ ঘন্টা ইমার্জেন্সি চিকিৎসা সেবা,আইসিইউ,সিসিইউ,শিশু স্বাস্থ্য ও স্কেনু, মেডিসিন, অবস এন্ড গাইনি, জেনারেল সার্জারি,অর্থোপেডিক সার্জারি,নাক-কান-গলা, চক্ষু, দন্ত, চর্ম ও যৌন রোগ,যক্ষা সেন্টার, মানসিক রোগ,এইচআইভি স্বাস্থ্য সেবা, ব্লাড ব্যাংক,২৪ ঘন্টা এ্যাম্বুলেন্স সেবা,প্যাথলজি ও রেডিও ইমেজিং,ওয়ান স্টপ দ্রুত চিকিৎসা সেবা(মা ও শিশুদের),ভেক্সিন টিকা ও ইপিআই টিকা,স্বাস্থ্য শিক্ষা সহ বিভিন্ন চিকিৎসায় সেবা প্রদান করে যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার জেলা সদর হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে হাসপাতালের বর্তমান ও ভবিষ্যত কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন ডা: পু চ নু।এসময় হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) যথাক্রমে ডা: শাহীন আব্দুর রহমান ও ডা: সুলতান আহমদ সিরাজী উপস্থিত ছিলেন।

এসময় ডা: পু চ নু বলেন, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল ঘিরে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। ২৫০ শয্যার এ হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় উন্নীত হচ্ছে খুব শিগ্গির। চলতি মাসের শেষের দিকে চালু হচ্ছে করোনারী কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ)। হাসপাতালে একটি পৃথক বর্জ্য অঞ্চল নির্মান করা হবে। এছাড়াও ‘লন্ড্রি ও স্টেরিলাইজেশন ইউনিট’ এবং ‘অক্সিজেন প্লান্ট’ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

একটি নতুন ওপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্সও নির্মাণ করা হবে। জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: পু চ নু এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন,‘এ হাসপাতালের জন্য সৌদি আরবের কিং সালমান রিলিফ অ্যান্ড হিম্যানিটারিয়ান সেন্টার ইতোমধ্যে ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহযোগীতা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) মাধ্যমে। তারা আমাদের স্বাস্থ্য অধিপ্তরের মহাপরিচালকের সাথে যোগাযোগ করেছেন। ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিকে কিভাবে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা যায় তার জন্য একটি পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে তারা একটি নতুন অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স নির্মাণ করে দেবে। সেখানে জেনারেল অপারেশন থিয়েটার হবে, অর্থোপেডিক্স অপারেশন থিয়েটার হবে, ইএনটি অপারেশন থিয়েটার হবে।

পুরো কমপ্লেক্স করে দেবে কিং সালমান রিলিফ অ্যান্ড হিম্যানিটারিয়ান সেন্টার। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সহযোগীতায় হাসপাতালের স্ক্যানু ইউনিট (নবজাতকের বিশেষ সেবা ইউনিট) সংস্কার করা হয়েছে। হাসপাতালের জরুরী বিভাগও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

ডা: পু চ নু বলেন, ‘পুরো জরুরী বিভাগকে ঢেলে সাজাবে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি ফর রেডক্রস (আইসিআরসি)। সেখানে একটি রেড জোন থাকবে, ইয়েলো জোন থাকবে এবং গ্রিন জোন থাকবে। রোগী আসার সাথে সাথে যাদের খারাপ অবস্থা তাদের আমরা রেড জোনে পাঠিয়ে দেবো। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেওয়ার পর তাদের ইয়েলো জোনে পাঠানো হবে। পরে রোগীর অবস্থার উন্নতি হলে তাকে গ্রিন জোনে স্থানান্তর করা হবে। এ ক্ষেত্রে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে আমরা একটি সমঝোতা চুক্তি করতে যাচ্ছি।’

 

ডা: পু চ নু আরও বলেন, ‘হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে সিসিইউ স্থাপন করা খুবই প্রয়োজন। এটি চালু হলে কক্সবাজারে হৃদরোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হবে। ইতোমধ্যে সমস্ত লজিষ্টিক সাপোর্ট আমারা পেয়ে গেছি। আশা করছি, এই মাসের শেষের দিকে সিসিইউ চালু করা সম্ভব হবে।’

হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান প্রেক্ষিত তুলে ধরে ডা: পু চ নু বলেন, ‘বর্তমানে একটি মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে যেভাবে বর্জ্য রাখা হয় তা খুবই উদ্বেগের। আমাদের বর্জ্যগুলো সবচেয়ে বিপজ্জনক বর্জ্য। আমার একটি স্বপ্ন ছিল এখানে ‘বর্জ্য অঞ্চল’ করার।

সুখের বিষয় হচ্ছে, এই কাজে এগিয়ে এসেছে বেলজিয়াম এমএফএফ। তাদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে। জেলা প্রশাসকও তাদের সাথে চুক্তির বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। এই চুক্তি হয়ে গেলে বর্জ্য অঞ্চল হয়ে যাবে।’

তিনি আরও জানান, এমএসএফ বেলজিয়াম হাসপাতালে একটি ‘লন্ড্রি এন্ড স্টেরিলাইজেশন ইউনিট’ স্থাপন করে দেবে। এছাড়াও স্যানিটেশন সিস্টেম করে দেবে তারা। কারণ হাসপাতালটি যখন নির্মাণ করা হয় তখন সেফটি ট্যাংক থেকে শুরু করে পাইপ লাইনসহ সবকিছুই নির্মাণ করা হয় একশত শয্যার উপযোগী করে। বর্তমানে ১৫ দিন পরপর সেফটি ট্যাংক পরিস্কার করতে হয়। এই জন্য হাসপাতালের অবকাঠামো এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালের মচুয়ারি এবং পুষ্টি বিভাগ সংস্কার করা হবে। একটি অক্সিজেন প্লান্টও স্থাপন করা হবে।

সদর হাসাপাতাল তত্বাবধায়ক ডা: পু চ নু আরও জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের অনুপ্রবেশের ঘটনার পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি জেলা সদর হাসপাতালে অনেক বৈদেশিক সাহায্য এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা হাসপাতালে প্রচুর যন্ত্রপাতি দিয়েছে।

এর মধ্যে জাপানের সাহায্য সংস্থা জাইকা দিয়েছে, ৪টি কার্ডিয়াক মনিটর, করোনারী কেয়ার ইউনিটের জন্য চারটি শয্যা, দুইটি সার্জিক্যাল ডায়াথার্মি মেশিন, দুইটি সিরিঞ্জ পাম্প, একটি সেমি অটো ক্যামিস্ট্রি এনালাইজার।সুইস এজেন্সি অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন দিয়েছে মেট্রেসসহ ১০০টি শয্যা, একটি অটো বায়োকেমিক্যাল এনালাইজার, একটি পোর্টেবর এক্স-রে মেশিন, একটি ইকোকার্ডিওগ্রাফি, রোগীর জন্য ১০টি ট্রলি, ২০টি বেড সাইড লকার এবং ৫০টি স্যালাইন স্ট্যান্ড।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) থেকে দেওয়া হয়েছে দুইটি ইসিজি মেশিন, ৩টি মোবাইল আল্ট্রা সাউন্ড, ৪টি ডিজিটাল ইউরিন এনালাইজার, দুইটি ব্লাড এনালাইজার ও ৬ টি হুইল চেয়ার। তুর্কি সাহায্য সংস্থা টিকা দিয়েছে একটি এ্যাম্বুলেন্স ও একটি মাইক্রোবাস।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কাছ থেকে পাওয়া গেছে ৩০টি স্ট্রেথোস্কোপ, ৩০টি বিপি মেশিন, ৬টি ফিঙ্গার পালস অক্সিমিটার, ১০টি নেব্যুলাইজার, একটি পোর্টেবল ইলেক্ট্রিক্যাল এনালাইজার, ৪টি ইসিজি, ৪০টি ইসিজি পেপার, একটি পোর্টেবল আল্ট্রাসাউন্ড, দুইটি এয়ার মিটারস উইথ পাম্প।

নাহিদ চৌধুরী নামে একজন দিয়েছেন রোগীর জন্য চারটি শয্যা এবং ডা: নুরুল করিম খান দিয়েছেন ১০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ১০টি অক্সিজেন ফ্লো মিটার।

Share this post

PinIt
scroll to top