izmir escort telefonlari
porno izle sex hikaye
çorum sürücü kursu malatya reklam

আদর্শ ও অনুপ্রেরণার প্রতীক জননী রমা চৌধুরী

roma-chy.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(৭ সেপ্টেম্বর) :: বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে যে কয়েকজন বীর নারীর সম্ভ্রমহানির ইতিহাস জড়িয়ে আছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম তিনি। তিনি তাঁর সর্বস্ব দিয়ে বাংলাদেশটা আমাদের উপহার দিয়েছেন। এ দেশের জন্য তিনি তাঁর সম্ভ্রম উৎসর্গ করেছেন, উৎসর্গ করেছেন জীবনের অনেক খ্যাতিময় অর্জন। যে জাতীয় পতাকা আজকে আমাদের কাছে, যা নিয়ে আমাদের গর্ব, সেই জাতীয় পতাকার মাঝে অন্তর্নিহিত আছে তাঁর গল্প। ১০:৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের আয়তক্ষেত্রাকার গাঢ় সবুজ এবং মাঝখানে লাল বৃত্তের জাতীয় পতাকার মধ্যে লুকিয়ে রমা চৌধুরী, তারামন বিবি, জয়ন্তী বালা দেবী, আছিয়া বেগমসহ অসংখ্য বীর নারীর গল্প; যাঁরা নিজেদের সবচেয়ে পবিত্র সম্পদটুকু দেশের জন্য উৎসর্গ করেছেন। বলছিলাম রমা চৌধুরীর কথা, যিনি নিজেই একজন আদর্শ ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে স্বীয় আমাদের কাছে।

১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবা রোহিনী চৌধুরীকে হারান। মা মোতিময়ী চৌধুরী শত বাধা পেরিয়ে তাঁকে পড়াশোনার জন্য অনুপ্রেরণা দিয়ে যান। মায়ের অনুপ্রেরণায় ১৯৫২ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে বোয়ালখালীর মুক্তকেশী গার্লস হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৫৬ সালে কানুনগোপাড়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৫৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।

মোতিময়ী চৌধুরীর উৎসাহ ও উদ্দীপনায় ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ষাটের দশকে তখন নারীদের উচ্চশিক্ষা এত সহজ ছিল না। সেই সময় রমা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের তিনিই প্রথম নারী, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। তাই তিনি এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘সুযোগ পেলে আবার ভর্তি হতে চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে মাস্টার্সটা করতে চাই ইংরেজিতে।’

তাঁর জন্ম অন্য সাধারণ নারীর মতো হতে পারত, স্বামী-সংসার, সন্তান-সন্ততি নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে দিন পার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা পারেননি। মাত্র ২০ বছর বয়সে কক্সবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ এক যুগের উপরে তিনি বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে চলতে চলতে তিনি বৈবাহিক জীবনে আবদ্ধ হন। এরই মধ্যে আসে ১৯৭১, স্বাধীনতা যুদ্ধ।

১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বিদুগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ রমা চৌধুরীর সামনে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে দেশান্তরী হয়ে যান। সাগর আর টগর দুই সন্তানকে নিয়ে রমা চৌধুরী পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায় বসবাস শুরু করেন।

১৯৭১ সালের ১৩ মে সকালবেলা পোপাদিয়ায় স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রমা চৌধুরীর বাড়িতে আক্রমণ চালায়। সেদিন পাকিস্তানি এক সৈনিক তাঁর সম্ভ্রম কেড়ে নেয়। তাঁর ওপর চালায় শারীরিক নির্যাতন। এ ক্ষত তিনি কখনই ভুলতে পারেননি।

ওই বিভীষিকার বর্ণনা রয়েছে তাঁর ‘একাত্তরের জননী’ বইয়ে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘যখন আমাকে নির্যাতন করতে উদ্যত হলো পাক সেনা, তখন জানালার পাশে দাঁড়ানো আমার মা ও দুই ছেলে বারবার আকুতি করছিল। ছিল আমার পোষা বিড়াল কনুও। তখন আমি মাকে আমার সন্তানদের নিয়ে সরে যেতে বলেছিলাম।’

সম্ভ্রম হারানোর পর রমা চৌধুরী পাকিস্তানি দোসরদের হাত থেকে পালিয়ে পুকুরে নেমে আত্মরক্ষা করেছিলেন। হানাদাররা তাঁকে না পেয়ে গানপাউডার দিয়ে ঘরবাড়িসহ যাবতীয় সহায়-সম্পদ পুড়িয়ে দেয়। এ সময় এলাকাবাসী কেউ কেউ তাঁর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর নিজের আত্মীয়রাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। রমা চৌধুরী তাঁর একাত্তরের জননী বইয়ে লিখেছেন, ‘…আমার আপন মেজো কাকা সেদিন এমন সব বিশ্রী কথা বলেছিলেন, লজ্জায় কানে আঙুল দিতে বাধ্য হই। আমি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছি না, দোকানে গিয়ে কিছু খাবারও সংগ্রহ করতে পারলাম না মা ও ছেলেদের মুখে দেবার জন্য।’

ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বলহীন বাকি আটটি মাস তিনি দুই পুত্র সাগর, টগর আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে জলে-জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে দিন পার করেছেন। পোড়া ভিটায় কোনো রকমভাবে পলিথিন আর খড়কুটো মাথায় আর গায়ে দিয়ে রাত কাটিয়েছেন। এভাবে বহু কষ্টে যুদ্ধের দিনগুলো পার করেন।

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে তার ছেলে সাগর ছিল সাড়ে পাঁচ বছরের। দুরন্ত সাগর মিছিলের পেছনে পেছনে ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’ বলে ছুটে বেড়াত। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে একসময় সাগর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর মারা যায়। সাগরের মৃত্যুর এক মাস ২৮ দিনের মাথায় তিন বছরের টগরও মারা যায়। ছেলেদের হিন্দু সংস্কারে না পুড়িয়ে তিনি মাটি চাপা দেন। দুই সন্তানের দেহ মাটিতে আছে বলে রমা চৌধুরী জুতা পরা বন্ধ করে দেন।

ছেলেদের মৃত্যুর স্মৃতি কখনই তিনি ভুলতে পারেননি। খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় তাঁর পায়ে ঘা হয়ে যায়। আত্মীয়স্বজনের জোরাজুরিতে তিনি অনিয়মিতভাবে তখন জুতা পরা শুরু করেন।

প্রথম সংসারের পরিসমাপ্তি ঘটলে রমা চৌধুরী দ্বিতীয়বারের মতো সংসার বাঁধার স্বপ্ন দেখেন। দ্বিতীয়বার সংসার বাঁধতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। দ্বিতীয় সংসারের ছেলে টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। টুনুর মৃত্যুর পর রমা চৌধুরী জুতা পরা একেবারে ছেড়ে দেন।

২. যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রথমে তিনি একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। সম্মানীর বিনিময়ে তাঁকে পত্রিকার ৫০টি কপি দেয়া হতো। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবন-জীবিকা। পরে তিনি নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ করে বই ফেরি করতে শুরু করেন। তাঁর সব বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন ছায়াসঙ্গী হিসেবে সবসময়ই তাঁর পাশে থেকেছেন।

প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা সব মিলিয়ে তিনি নিজের ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে ভৃত্য’, ‘নজরুল প্রতিভার সন্ধানে’, ‘স্বর্গে আমি যাব না’, ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন’, ‘শহীদের জিজ্ঞাসা’, ‘নীল বেদনার খাম’, ‘সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

রমা চৌধুরী নিজেই নিজের বই ফেরি করে বিক্রি করেছেন। এ থেকে প্রতি মাসে তাঁর হাজার বিশেক টাকার মতো আয় হতো। এ দিয়েই তিনি থাকা-খাওয়ার সংস্থান করেছেন। একই সঙ্গে পরিচালনা করেছেন ‘দীপংকর স্মৃতি অনাথালয়’ নামের একটি অনাথ আশ্রম। প্রচণ্ড কষ্টের জীবন কাটলেও তাঁর দু’চোখে স্বপ্ন ছিল সুখ-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম খুলতে চেয়েছেন। সব ধর্মের অনাথরা সেই আশ্রমে থাকবে। মনুষ্যদীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে তারা কর্মজীবনে প্রবেশ করবে। তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন প্রতিনিয়ত।

২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহে রমা চৌধুরী তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেখা করেননি, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে রমা চৌধুরী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। খালি পায়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতে নিজের কষ্টের কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী আর্থিক সহযোগিতা করতে চাইলে রমা চৌধুরী বিনয়ের সঙ্গে তা ফিরিয়ে দেন। বরং উল্টো তাঁকে উপহার দিয়ে এসেছিলেন নিজের লেখা ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থটি।

সবকিছু হারিয়ে এক রকম নিঃস্ব তিনি। জীবনের দীর্ঘ সময় পার করে ফেলেছেন, এখন এ আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে তিনি কিইবা করবেন, তাই কোনো ধরনের আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করেননি। নিজের সন্তানরা শহীদের মর্যাদা পায়নি, কিন্তু তাঁর কাছে ওরা শহীদ।

একাত্তর রমা চৌধুরীকে দিয়েছে পোড়া ভিটে, কাঁধের ঝোলা, ছেলের শোক আর খালি পা। এ নিয়েই ছিল রমা চৌধুরীর দিনযাপন। ১৯৯৫ সালের মার্চে একবার মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত রোগে রমা চৌধুরী আক্রান্ত হয়েছিলেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গোটা দেড় মাস আলাউদ্দিন তাঁর সেবাশুশ্রূষা করেছেন। এ অসুস্থতায় তাঁর ডান পাশ অবশ হয়ে পড়েছিল, একটি চোখও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এ ভয়ানক সময়ে আলাউদ্দিন যেন দেবতারূপে রমা চৌধুরীকে একা টেনে সুস্থ করে তুলেছিলেন।

আলাউদ্দিনের শুশ্রূষায় তিনি আবার চলার শক্তিও ফিরে পান। শুরু হয় আবারো তাঁর পথচলা। কাঁধে ঝোলা, কানে হিয়ারিং এইড লাগানো রমা চৌধুরী হেঁটে যাচ্ছেন চট্টগ্রামের ফুটপাত ধরে। এ দৃশ্য সরার পরিচিত। বয়সের কারণে তাঁর সুস্থতা টিকে উঠতে পারেনি।

বছরখানেক অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন রমা চৌধুরী। চিকিৎসার সুব্যবস্থা করার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন আলাউদ্দিন। কোথাও সহযোগিতা পেয়েছেন, কোথাও পাননি। অবশেষে সরকারি নির্দেশে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর জন্য কেবিনের ব্যবস্থা হয়েছিল। এ সময়ও সার্বক্ষণিক জেগে ছিলেন সেই আলাউদ্দিন। তাঁর ইচ্ছা ছিল শত বছর বেঁচে থাকার। কিন্তু শত বছর আর ছোঁয়া হয়নি এ যোদ্ধার। ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে, ৭৭ বছর বয়সে রমা চৌধুরী নিজের জীবনের অধ্যায় সমাপ্ত করে দেন।

৩. একজন হার না মানা নারীর নাম রমা চৌধুরী। একজন দৃপ্ত সৈনিকের নাম রমা চৌধুরী। রমা চৌধুরী এ সময়ে মরতে চাননি। অনেক কিছুই তাঁর লেখার বাকি ছিল। দেশকে অনেক কিছুই দেয়ার ইচ্ছে ছিল তাঁর। গোটা জীবন স্বনির্ভর, স্বাবলম্বী আর আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন রমা চৌধুরী। দেশব্যাপী অনাথ আশ্রম গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে এখন বহুদূরে।

তিনি এতটাই তেজস্বী যে, কারো দান-দক্ষিণা গ্রহণ করতেন না, নিজের কষ্টের কথা কাউকে মুখ ফুটেও বলতেন না। জীবনের সর্বস্ব হারিয়েও একা দীপ্তিময় ভূমিকায় হেঁটে গেছেন। যুদ্ধদিনের বিভিন্ন ঘটনাসহ অসংখ্য ইতিহাসের সাক্ষী ছিলেন তিনি। তিনি আমাদের সবার প্রিয়, জননী রমা চৌধুরী। 

লেখক-বিনয় দত্ত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Share this post

PinIt
scroll to top
bedava bahis bahis siteleri
bahis siteleri