জাতীয় সংসদ নির্বাচন : কদর বেড়েছে ছোট দলগুলোর

election-nt-coxbangla.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(১৯ অক্টোবর) :: জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, এ নিয়ে রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড ততই বাড়ছে। দলগুলো একদিকে যেমন সাংগঠনিকভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে মেতে উঠেছে জোট ভাঙাগড়ার খেলায়। এই খেলার অংশ হিসেবে বিদ্যমান জোট সম্প্রসারণ বা নতুন নতুন জোট গড়ার তোড়জোড় যেমন চলছে, তেমনি ভেঙে যাচ্ছে বিদ্যমান জোট।

কারণ ভোটের লড়াইয়ে জিততে হলে ফলপ্রসূ ও কার্যকর জোট গঠনের কোনো বিকল্প নেই। বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় এ বাস্তবতা মেনে নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। দেশে অন্তত ৫টি নতুন জোট গঠন হয়েছে গত কয়েক মাসে।

এর মধ্যে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ২টি, বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও এরশাদের নেতৃত্বে আরো দুটি পৃথক জোট গঠন হয়েছে। ড. কামাল হোসেন প্রথমে জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া গড়ে তোলেন, সর্বশেষ করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এর আগে বদরুদ্দোজা চৌধুরী গড়েন যুক্তফ্রন্ট এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গড়েন সম্মিলিত জাতীয় জোট।

অবশ্য এক সময়ের বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাও বাংলাদেশ জাতীয় জোট নামে একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করেছেন। যদিও রাজনৈতিক অঙ্গনে তা নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। তবে জোটটি সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে অন্তর্ভুক্ত হতে চেষ্টা করছে। ১৪ দলীয় জোটের অন্য শরিকদের আপত্তিতে বিএনএ অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। সহযোগী সংগঠনের মর্যাদা দিয়ে যুগপৎ আদর্শিক আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনএকে পাশে রেখেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

জোটের ভাঙাগড়ার এ খেলায় গত মঙ্গলবার ২০ দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে বাংলাদেশ ন্যাপ ও এনডিপি। জোট ছেড়ে আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশ ন্যাপ ও এনডিপি যোগ দিল যুক্তফ্রন্টে। বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও এনডিপির চেয়ারম্যান খন্দকার গোলাম মোর্তুজার যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান বি. চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ ঘোষণা দেয়া হয়।

এর আগে দল দুটির চেয়ারম্যান দলীয় নেতাদের নিয়ে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে বি. চৌধুরীর বারিধারার বাসভবন মায়া-বি-তে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় বৈঠকটি শুরু হয়ে সন্ধ্যা পৌনে ৬টা পর্যন্ত চলে। বৈঠক শেষে প্রেসব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখেন জেবেল রহমান গানি. খন্দকার গোলাম মোর্তুজা ও মাহী বি. চৌধুরী।

জেবেল রহমান গানি বলেন, আমরা সাবেক রাষ্ট্রপতিকে অভিভাবক হিসেবে মনে করি এবং আগামী দিনে গণতান্ত্রিক ধরাবাহিকতা রক্ষা এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে তার নেতৃত্বে এক সঙ্গে পথ চলব। আমরা ২০ দলীয় জোট রাজনীতির সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে বি. চৌধুরীর সঙ্গে মিলিত হলাম। আমাদের মনের মিল ও রাজনৈতিক মিল আছে।

যুক্তফ্রন্ট থেকে আ স ম আবদুর রবের জেএসডি ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যকে বের করে এনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত করা ও কৌশলে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারাকে এই জোটের বাইরে রাখতে বিএনপির বড় ভূমিকা রয়েছে। এমন অভিযোগ থেকেই পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ২০ দল ভেঙেছেন বি. চৌধুরী- এমন প্রচারণাও রয়েছে।

পাল্টা আঘাত হিসেবে আজ শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন বিকল্পধারার ঘোষণা আসছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা ভেঙে নতুন করে গড়া এ দলটির সভাপতি হচ্ছেন দলটির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য নূরুল আমিন বেপারি। আহমেদ বাদল হবেন মহাসচিব। আর জানে আলম থাকবেন যুগ্ম মহাসচিব।

ওই সংবাদ সম্মেলন থেকে বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও মহাসচিব মেজর (অব.) আব্দুল মান্নানকে দল থেকে বহিষ্কার করে ৭১ সদস্যের একটি কমিটি আত্মপ্রকাশ করবে। নতুন এ অংশের নেতারা জানান, বিকল্পধারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গেই থাকবে।

অবশ্য ২০ দলে নিজেদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ তুলে আরো কয়েকটি দল জোট থেকে বের হয়ে অন্য জোটে যোগ দিতে পারে এমন গুঞ্জনও রয়েছে। তবে কোন কোন দল বের হবে তা এখনো স্পষ্ট হয়নি।

অবশ্য জোটে ভাঙাগড়ার খেলায় জড়িয়েছেন বিএনপির কয়েকজন কুশীলবও। তাদেরই প্ররোচনায় ২০ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে যাওয়া বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানিকে বহিষ্কার করে দলের চেয়ারম্যান সেজেছেন এম এন শাওন। দলের একটি অংশকে সঙ্গে নিয়ে তিনি অবশ্য ২০ দলীয় জোটে থেকে গেছেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙার অভিযোগে তাকে পাল্টা বহিষ্কার করেছেন জেবেল রহমান গানি।

অন্যদিকে এনডিপির চেয়ারম্যান খন্দকার গোলাম মোর্তুজাকে বহিষ্কার করে চেয়ারম্যান হয়েছেন মোকাদ্দিম হোসেন। তিনিও এনডিপি নামে ২০ দলে প্রতিনিধিত্ব করছেন। খন্দকার গোলাম মোর্তুজাও মোকাদ্দিমকে বহিষ্কার করে নিজের মান বাঁচিয়েছেন। ফলে এখন দল দুটিতে চলছে বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কারের পালা।

অন্যদিকে নির্বাচনের ডামাডোল যতই এগিয়ে আসছে ইসলামী দলগুলোও একটি বড় জোট গঠন করতে যাচ্ছে বলে আভাস পাওয়া গেছে। এ জোটে এক সময়ে ২০ দলে থাকা ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা আবদুল লতিফ নেজামী বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। তার সঙ্গে হেফাজতে ইসলামীর মতো অরাজনৈতিক ইসলামী সংগঠনগুলোকে দেখা যেতে পারে। তাদের আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে যোগ দেয়ার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর বিপর্যয়ের সুযোগে ইসলামী আন্দোলন ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। চরমোনাইর পীরের এ রাজনৈতিক দলটি ইতোমধ্যে সারা দেশে ব্যাপক শক্তি সঞ্চয় করেছে। আগামী নির্বাচনের আগে এ দলটির নেতৃত্বে একটি ইসলামী জোটের আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। তা সম্ভব না হলে এ দলটিকে দেশের বড় দুই জোটের কোনো একটির সঙ্গে দেখা যেতে পারে বলে জনশ্রæতি রয়েছে।

আগামীকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করবে এরশাদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোট। এ জোটটি নিয়েও রয়েছে নানা গুঞ্জন। আগামী নির্বাচনের আগে এ জোটটির ভূমিকা কী হবে তা নিয়েও চলছে নানা কল্পকথা। কারো মতে এরশাদ ঝোপ বুঝে কোপ মারবেন। যদি পরিস্থিতি সরকারি দলের অনুক‚লে থাকে তবে এরশাদ অবশ্যই ১৪ দলে মিলে মহাঐক্যজোট তৈরি করবেন। আর যদি বিপরীত চিত্র থাকে তবে সুযোগ সন্ধানী এরশাদকে দেখা যেতে পারে বিরোধী প্ল্যাটফর্মে।

এ কারণে সময় থাকতেই তিনি সম্মিলিত জাতীয় জোট তৈরি করে রেখেছেন। শুধু এরশাদই নন, এমন সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে ১৪ দলের কোনো কোনো দলের ক্ষেত্রেও। তবে এ বিষয়টি এখনো দৃশ্যমান নয়। এ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহ দেখান না দলগুলোর নেতারা।

২০ দলীয় জোট ছেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে জেবেল রহমান গানি বলেন, নিজেদের মতবিরোধ ও মতপার্থক্য থাকলেও জোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সব সময়ই ছিলাম আন্তরিক। এমনকি ২০১৪ সালের নির্বাচনে নানা ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব থাকার পরও জোট ত্যাগ করিনি। এই ত্যাগকে বিএনপি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে কোনো রকম মূল্যায়ন করেছে বলে আমাদের কাছে কখনোই প্রতীয়মান হয়নি।

গানি আরো বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে যাদের অগ্রণী ভূমিকা পরিলক্ষিত হয়েছে, তারা প্রায় সবাই ওয়ান-ইলেভেনের অরাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাদের অনেকেই মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এরা যখন বিএনপির পাশে অবস্থান করে তখন আমরা ব্যথিত হই, আতঙ্কিত হই। আমরা আরেকটি অগণতান্ত্রিক ও অশুভ শক্তিকে ক্ষমতায় আনার ষড়যন্ত্রের অংশ হতে যাচ্ছি কিনা?

২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। এই ঐক্য আরো জোরদার হবে, আরো সম্প্রসারিত হবে। দুই-একটি দল যদি সেখান থেকে ছিটকে পড়ে তাতেও জনগণ মোটেও বিভ্রান্ত হবে না। বরং যারা ছিটকে পড়ে তারাই আঁস্তাকুঁড়ে চলে যায়।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ বিষয়ে বলেন, কিছু কিছু মানুষ বৈষয়িক প্রশ্নে অনেক আপস করেন। স্বাধীনতার যুদ্ধের সময়ও হয়েছে। এরশাদের সময়ও হয়েছে। এই আপসকামিতা, স্ববিরোধিতা- এটা তো যুগ যুগ ধরে চলেছে।

তবে বিএনপির জোটকেন্দ্রিক তৎপরতাকে ভালো চোখে দেখছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন নিয়ে চক্রান্ত হচ্ছে। তথাকথিত জোটের নামে ঘোট পাকানো হচ্ছে। ঘোটের মাধ্যমে নির্বাচন ভণ্ডুল করার চেষ্টা হচ্ছে।

Share this post

PinIt
scroll to top
bahis siteleri