কক্সবাজারে মাঠে ৩ লাখ মে.টন লবণ মজুদ : চলছে আমদানির পায়ঁতারা !

Pic-2Chakaria-24.10.18.jpg

মুকুল কান্তি দাশ,চকরিয়া(২৪ অক্টোবর) :: চলতি বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে এসে এতদাঞ্চলের লবণ চাষী, ব্যবসায়ী, প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি। তিনি ওইদিনের সভায় বলেছিলেন, দেশীয় লবণ শিল্প রক্ষা এবং শিল্পের সঙ্গে জড়িত অন্তত ৫ লক্ষাধিক মানুষের জীবনমানের নিশ্চয়তাকল্পে সরকার বিদেশ থেকে লবণ আমদানির মতো আত্মঘাতী সিদ্বান্তে যাবেনা। মন্ত্রীর এমন আশ^াসে সভায় উপস্থিত সকলের মাঝে নতুন করে আশার সঞ্চার ঘটে।

অবশ্য ওইদিনের সভায় শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু কক্সবাজার বিসিকের কাছে জানতে চান বর্তমানে কত পরিমাণ লবণ চাষীর মোকামে আছে তা নিশ্চিত করতে। এইজন্য মন্ত্রীর নির্দেশে পাঁচ সদস্যদের একটি কমিটিও গঠন করা হয়। ইতোমধ্যে গঠিত কমিটি মাঠ পর্যায়ে জরিপ শেষে শিল্প মন্ত্রানালয়ে প্রতিবেদনও জমা দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) কক্সবাজারের কর্মকর্তা (রসায়নবিদ) মো.নুরুল আলম ভুইঁয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি কক্সবাজার অঞ্চলের লবণ উৎপাদন এলাকার মাঠ পর্যায়ে জরিপ চালিয়ে বর্তমানে তিন লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুদ থাকার তথ্য পেয়েছেন। এতথ্য লিখিতভাবে শিল্প মন্ত্রানালয়ে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আগামী নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এবছরের লবণ উৎপাদন মৌসুম শুরু হচ্ছে। সে কারনে মজুদ থাকা লবণ ব্যবহার শেষ হওয়ার আগেই মৌসুমের নতুন লবণ বাজারে আসবে। ফলে মৌসুমের নতুন লবণে দেশের চাহিদা মেটানো সক্ষম হবে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) কক্সবাজার উন্নয়ন প্রকল্প কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক দিলদার আহমদ চৌধুরী বলেন, ২০১৭ সালে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, উখিয়া, টেকনাফ, কক্সবাজার সদর উপজেলা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার আংশিক এলাকার ৬৪ হাজার ১৪৭ একর জমিতে প্রাকৃতিকভাবে লবণ চাষ হয়।

প্রতিবছর ১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত এসব জমিতে লবণ উৎপাদন চলে। চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন উপকূলের ৪৫ হাজার চাষি। ২০১৭ সালে উল্লেখিত পরিমাণ জমিতে বিসিক লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ লাখ ২১ মেট্রিন টন নির্ধারণ করেন। মৌসুমের শেষ পর্যায়ে লবণ উৎপাদন হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি।

তবে মাঠ পর্যায়ে চাষী, ব্যবসায়ী, আড়তদার ও মিল মালিকদের দাবি, গত বছর বিসিকের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে অতিরিক্ত পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়েছে। যার কারনে সারা বছরের চাহিদা মেটানোর পরও এখনো মাঠ পর্যায়ে তিন লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুদ রয়েছে। যা শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপির নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে বর্তমান পটভুমিতে দেশে লবণ আমদানির কোন প্রয়োজন নেই।

চকরিয়া উপজেলার দরবেশকাটা এলাকার লবণচাষি মোহাম্মদ এখলাছ উদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বধীন বর্তমান সরকার দেশীয় লবণের দাম অনেক বাড়িয়েছে। চাষীরা মাঠ পর্যায়ে লবণ বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করা হলে আমরা ভালো মূল্য পাবোনা।

একই উপজেলার বদরখালীর লবণচাষি নুর-উন নবী বলেন, গতবছর উৎপাদিত লবণ এখনো আমার মোকামে মজুদ আছে। আমার মতো আরও অনেকে লবণ মজুদ রয়েছে। তারপরও কেন এবং কাদের স্বার্থে বিদেশ থেকে লবণ আনা হবে ?

বাংলাদেশ লবণ চাষি সমিতির সভাপতি ও চকরিয়া উপজেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শহীদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশে লবণের কোনো ঘাটতি নেই, কিন্তু কিছু অসাধু মিল মালিক মাঠ পর্যায়ে তদারকি না করে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন এবং বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রনালয়ে ভুল তথ্য দিয়ে ঘাটতি দেখিয়ে লবণ আমদানির অপচেষ্ঠা করছে।

তিনি অভিযোগ তুলেছেন, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা প্রতিবছর এরকম ষড়যন্ত্র করে লবণ আমদানি করার পাঁয়তারা করে। ওই সিন্ডিকেট আবার সব পারমিট ভাগিয়ে নিতেও অপতৎপরতা শুরু করেছে। লবণ আমদানি হতে পারে সংকায় চাষিরা শংখিত।

বাংলাদেশ লবণ চাষী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও চকরিয়া উপজেলার বৃহত্তম লবণ চাষী দরবেশকাটা এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো.শহিদুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীসহ আট উপজেলায় লবণ চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন ৪৫ হাজার চাষী। আবার এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন অন্তত ৫ লক্ষাধিক মানুষ। প্রতিবছর এখানকার প্রায় ৬৫-৭০ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ করে উৎপাদিত লবণ দেশের চাহিদা পুরণ করে আসছে।

তিনি বলেন, দেশে লবণের ঘাটতি নেই, এ পেক্ষাপটে মজুদ থাকার পরও কতিপয় মহলের চক্রান্তে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করলে দেশীয় লবণশিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে। এতে চাষের আগ্রহ হারাবে চাষীরা। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সুবিধাভোগী কতিপয় মহলের পক্ষ নিলে দেশীয় লবণ শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। এতে কর্মসংস্থান হারাবে লবণ শিল্পে সঙ্গে জড়িত ৫ লক্ষাধিক মানুষ। তাই দেশীয় লবণ শিল্প রক্ষা ও জনগণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির মতো আত্মঘাতী পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হবে।

মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক বলেন, গতমাসে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত সভায় শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপির দৃষ্টি আকর্ষন করে দেশীয় লবণ শিল্পকে রক্ষাকল্পে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি না করতে অনুরোধ করেছি। এখানকার চাষীদের দু:খ দুদর্শা মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছি। চাষিরা ক্ষতিগ্রস্থ হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহন না নেয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টির আলোকে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। এরই প্রেক্ষিতে শিল্পমন্ত্রী লবণ আমদানী হবেনা বলে ওই সভায় বলেন।

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri