কক্সবাজার-ঘুমধুম রেল প্রকল্প : ৯ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ

rail-project-cox-map-coxbangla.jpg

কক্সবাংলা রিপোর্ট(২৩ জানুয়ারী) ::‍‍ অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর একটি দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেল প্রকল্প। কক্সবাজারকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনতে ২০১০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি পাস হয়। এরপর প্রায় নয় বছরে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। ভূমি অধিগ্রহণ ও কিছু সেতুর কাজ হলেও রেললাইন বসানোর কাজ শুরু হয়নি।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ১২৯ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার রেলপথটি নির্মাণে মোট জমির প্রয়োজন ১ হাজার ৩৬৭ একর। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় প্রয়োজন ৩৬৪ একর। বাকি জমি প্রয়োজন কক্সবাজার জেলায়। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের এরই মধ্যে অধিকৃত জমির অর্থ পরিশোধ করা হলেও জমি বুঝে পাওয়া গেছে এখন পর্যন্ত ২০ শতাংশ।

প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ে প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভূমি অধিকৃত এলাকাগুলোয় মাটি ভরাটের কাজ করছেন তারা। দোহাজারী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার বেশকিছু এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫টি সেতুর কাজ শুরু হয়েছে। নদী ও খালসংলগ্ন এলাকায় জমি অধিগ্রহণের জটিলতা কম থাকায় প্রকল্পের সেতুর কাজ এগিয়ে নিতে চাইছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়া নির্মাণাধীন স্টেশন এলাকার মাটি ভরাটের পাশাপাশি সয়েল টেস্ট শেষ করে পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে বেশ কয়েকটি সেতুর।

জানতে চাইলে দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের সাইট প্রকৌশলী সোহেল উদ্দিন বাবু বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে চায়না রেল ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের সঙ্গে ৫২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের কাজ পেয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা তিনটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করেছি। সয়েল টেস্ট শেষে পাইলিংয়ের কাজ চলছে। জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হলে পুরোদমে রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

তবে বন বিভাগ থেকে অধিগ্রহণকৃত ২০৭ একর জমির সংরক্ষিত বনাঞ্চল বিধি সংশোধন না করায় প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছে রেলওয়ে। দুই বছর ধরে তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও রেলওয়েকে জমি বুঝিয়ে দিতে পারেনি বন বিভাগ। বন অধিদপ্তর, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বন মন্ত্রণালয়ে একাধিক তাগাদাপত্র দেয়া হলেও গতি আসেনি বন অবমুক্তকরণ কাজে। এতে প্রকল্পটির প্রায় ১৫ কিলোমিটারের কাজই শুরু করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে লক্ষণীয় অগ্রগতি আসেনি প্রকল্পের সার্বিক কাজে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। কক্সবাজার উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের এসব সংরক্ষিত জমি অবমুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পে ব্যবহারের উপযোগী করা গেলে প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত বন বিভাগের অধিকৃত জমি সংরক্ষিত বন থেকে অবমুক্তকরণ সম্পন্ন হয়নি। ফলে ওই এলাকায় প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে প্রকল্পের প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় কাজ শুরু করা যায়নি। বন অবমুক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রকল্পটির কাজ পুরোদমে এগিয়ে যাবে।

বন বিভাগ বলছে, বনের ক্ষয়ক্ষতি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ শেষ হয়েছে। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প হওয়ায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে কালক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই। কী পরিমাণ গাছ কাটতে হবে, এর মূল্য কত ও জীববৈচিত্র্যের কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হবে, এরই মধ্যে তা নিরূপণ করে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এরপর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বন বিভাগকে অর্থ পরিশোধ করলে কাজ শুরু করতে বাধা নেই।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান বন সংরক্ষক মো. জগলুল হোসেন বলেন, নিয়ম অনুযায়ী বন বিভাগ থেকে কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অনেক প্রাচীন গাছ ও জীববৈচিত্র্য রয়েছে। এসব নিরূপণ করে সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে অবমুক্ত করা হবে। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমরা অগ্রাধিকার দিয়েই প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। অনুমোদন পেলেই বনের গাছ ও জীববৈচিত্র্যের মূল্যায়িত টাকা পরিশোধসাপেক্ষে রেলওয়েকে জমি বুঝিয়ে দেয়া হবে।

এদিকে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে বিলম্বের কারণে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে অর্থায়নকারী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বিলম্বের কারণে প্রকল্প ব্যয় ও বাস্তবায়ন সময় দুটোই বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে সংস্থাটি।

দেশের পর্যটন শহর কক্সবাজারের সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ ও মাতারবাড়ীসহ একাধিক বৃহৎ বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে প্রকল্পটি। প্রকল্পের অধীনে শুরুতে সিঙ্গেল মিটার গেজ রেললাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। পরে ২০১৪ সালে ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে এডিবি। বাকি ৬ হাজার ৩৪ কোটি টাকা সরকারের অর্থায়ন। প্রকল্পের সংশোধিত বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২২ সাল।

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, প্রকল্পটি দুটি পর্যায়ে বাস্তবায়ন হবে। প্রথম পর্যায়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩১ কিলোমিটার মেইন লাইনের পাশাপাশি ৩৯ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ করা হবে। ৩৯টি মেজর ব্রিজ, ১৪৫টি মাইনর ব্রিজ/কালভার্ট, বিভিন্ন শ্রেণীর ৯৬টি লেভেল ক্রসিং ও একটি আন্ডারপাসও থাকবে।

প্রকল্প এলাকায় বন্য হাতির চলাচল থাকায় বনজ প্রাণীর চলাচলে ওভারপাস ছাড়াও থারমাল ইমেজিং ক্যামেরা প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, হাবরাং, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ইসলামাবাদ, রামু, কক্সবাজারসহ মোট নয়টি নতুন স্টেশন এবং প্রথম পর্যায়ের জন্য মোট ১ হাজার ৩৯১ একর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করেছে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ।

দ্বিতীয় পর্যায়ের ২৮ দশমিক ৭৫২ কিলোমিটার মেইন লাইনের পাশাপাশি ৩ দশমিক ৯১৬ কিলোমিটার লুপ ও সাইডিং ডুয়াল গেজ লাইনে ১৩টি মেজর ব্রিজ, ৪৫টি মাইনর ব্রিজ/কালভার্ট, বিভিন্ন শ্রেণীর ২২টি লেভেল ক্রসিং ও একটি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে। বন্যপ্রাণীর চলাচলে ওভারপাস ছাড়াও দ্বিতীয় পর্যায়েও থারমাল ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

Share this post

PinIt
scroll to top