কক্সবাজারের শীর্ষ ইয়াবা কারবারিরা সহজেই পার পাচ্ছে না

yaba-most-wanted-3.jpg

কক্সবাংলা রিপোর্ট(২৩ জানুয়ারী) :: ২০১৮ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকায় কক্সবাজার ও টেকনাফে ১১৫১ জন মাদক কারবারির তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। তারমধ্যে ৭৩ জন শীর্ষ মাদক কারবারি বা পৃষ্ঠপোষক রয়েছে। আর ২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে গত ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত শুধু কক্সবাজারেই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে ৩৯ মাদক কারবারি। মাদকের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরকার কঠোর হয়। এমন পরিস্থিতিতে মাদক কারবারিদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে।

জানা যায়,ইয়াবা নিয়ন্ত্রণে সরকারের তরফ থেকে বছর দুয়েক আগে পাঁচটি সংস্থা কারবারিদের তালিকা তৈরি করেছিল। সেই তালিকায় যেসব মাদক কারবারির নাম ছিল তাদেরকে নিয়ে একটি আলাদা তালিকা করা হয়। সেই তালিকার অনেকেই বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। অনেকে আবার রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কেউ কেউ পালিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছে। সব মিলিয়ে এসব মাদক কারবারির মধ্যে কে কোথায় আছে, নতুন কেউ এই কারবারে যোগ দিয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে নতুন তালিকা শুরু হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর একযোগে জেলা-উপজেলাভিত্তিক টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করবে। তালিকাভুক্ত সব মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সর্বশেষ ৭৩ জন শীর্ষ মাদক কারবারি বা পৃষ্ঠপোষক তালিকায় বদিসহ তার পরিবারের ২৬ জন রয়েছে। আছে টেকনাফ ও কক্সবাজার অঞ্চলের আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং হেফাজতে ইসলামের নেতাদের নামও। মূলত তাদের মাধ্যমেই দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা থেকে শুরু করে সব ধরনের মাদক কেনাবেচা হচ্ছিল। পৃষ্ঠপোষকরা মিয়ানমারে ৩৭টি ইয়াবা কারখানার ডিলার হিসেবে পরিচিত। তারা নিয়মিত ইয়াবার চালান এনে দেশের আনাচেকানাচে পাঠিয়ে দেয়। আর মাদকের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরকারও কঠোর হয়েছে সীমান্তে মাদক নির্মুলের।

জানা যায়,২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে গত ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত শুধু কক্সবাজারেই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে ৩৯ মাদক কারবারি। এমন পরিস্থিতিতে মাদক কারবারিদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। এ কারণে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ থেকে বাঁচতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করার চেষ্টা করছেন অনেক মাদক কারবারি। এজন্য তারা কয়েকটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ করছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে কিনা— এই প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। যারা নিজেদের আত্মস্বীকৃত ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আত্মসমর্পণ করবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের কিছু অনুকম্পা দেওয়া হবে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া তাদের মোকাবিলা করতেই হবে। যারা আত্মসমর্পণ করতে চাইছেন, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আগে থেকে একাধিক মামলা রয়েছে। সেসব মামলা তাদের মোকাবিলা করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের পূর্ণাঙ্গ বায়োডাটা ও সম্পত্তির হিসাবের তালিকা তৈরি করা হবে। এসব সম্পত্তি বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা, তা খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদকের কাছে পাঠানো হবে। তারা সেসব বিষয় তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। ফলে আত্মসমর্পণ মানেই যে দায়মুক্তি বা অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থে বিলাসবহুল জীবন-যাপন করতে পারবে তা নয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মাদক নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি সরকারের তরফ থেকে একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী বর্তমানে মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এরই মধ্যে নতুন করে মাদক কারবারিদের তালিকা করা হচ্ছে। এই তালিকা প্রণয়নে গোয়েন্দা সংস্থা ছাড়াও পুলিশ, বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। যেসব মাদক কারবারি আত্মসমর্পণ পক্রিয়ায় রয়েছে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিষয়ে আদালত নির্দেশনা দেবেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অ্যাকশন প্ল্যানের মধ্যে রয়েছে সীমান্ত পথে যাবতীয় মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশ ও পাচার বন্ধ। দেশের অভ্যন্তরে যাবতীয় মাদকের অবৈধ উৎপাদন, সরবরাহ ও সহজলভ্য বিলোপ করা। মাদক অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ, তাদের মদদদাতা, সাহায্যকারী ও অর্থলগ্নিকারীদের গ্রেপ্তার, যথাযথ তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা। মাদক কারবারিদের যাবতীয় অর্থ-সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা। মানি লন্ডারিং আইন ২০১২ (২০১৫ সালে সংশোধিত) প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, নতুন তালিকার মধ্যে একই ব্যক্তির নাম প্রতিটি তালিকায় থাকলে তাকে ‘এ’ ক্যাটাগরি, দুটি তালিকায় থাকলে ‘বি’ ক্যাটাগরি আর অন্যদের ‘সি’ ক্যাটাগরির মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। মাদক কারবারিদের তালিকা তিন মাস অন্তর হালনাগাদ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে কক্সবাজারে ইয়াবা পাচারকারীদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা থমকে আছে আইনি জটিলতায়।প্রধানত আত্মসমর্পণকালে ২০০ গ্রাম বা তার চেয়ে বেশি পরিমাণ ইয়াবা জমা দিলে এবং আত্মসমর্পণকারীদের সম্পদের বিষয়ে কী হবে, এর ফয়সালা হচ্ছে না। এ দুটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়ার জন্য কক্সবাজার জেলা পুলিশ তাকিয়ে আছে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে। উচ্চপর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত আসার পর আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা যাবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা।

সংশোধিত আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে ২০০ গ্রাম, অর্থাৎ বা দুই হাজারটি বা তার চেয়ে বেশি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে ওই ব্যক্তিকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আত্মসমর্পণ করতে আগ্রহী ইয়াবা পাচারকারীরা এখন চাইছে যে ইয়াবা নিয়ে যদি আত্মসমর্পণ করতে হয় তাহলে তারা কয়টি ইয়াবা বড়ি জমা দেবে পুলিশের কাছে। বিপুল পরিমাণ ইয়াবা জমা দেওয়া হলে নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড। মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের ঘটনায় আত্মসমর্পণ করার পর পুলিশ বা রাষ্ট্র পরে আত্মসমর্পণকারীদের রক্ষা করবে কি না, তা জানতে চায় আত্মসমর্পণকারীরা। আবার দুই হাজারের কম ইয়াবা বড়ি জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করার বিষয়েও আলোচনা চলছে নেপথ্যে। লাখ লাখ ইয়াবা বড়ির পাচারকারী হিসেবে দেশজুড়ে আলোচিত ব্যক্তিরা যদি মাত্র ৫০০-৭০০ ইয়াবা নিয়ে আত্মসমর্পণ করে তাহলে বিষয়টির গুরুত্ব কমে যাবে বলেও মনে করছেন পুলিশের অনেক কর্মকর্তা।

আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় বিলম্বের আরেকটি কারণ ইয়াবা পাচারকারীদের সম্পদ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেলা পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ পাচারকারীদের মধ্যে যারা আত্মসমর্পণ করবে তাদের সম্পদের কী হবে, অর্থাৎ ওই সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হবে, নাকি প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে আগেই সুস্পষ্টভাবে জানতে চায় পাচারকারীরা। আত্মসমর্পণের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলে অর্জিত সম্পদ ভোগদখলে রাখার সুযোগ পাওয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে আশ্বস্ত হতে চায় তারা।

আত্মসমর্পণে আগ্রহী পাচারকারীদের ওই সব প্রশ্নের জবাব নেই পুলিশের কাছে। আত্মসমর্পণের ইচ্ছাপোষণকারী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা চাইছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে। ভবিষ্যতে ইয়াবার কারবার করবে না তারা।

অন্যদেরও নিরুসাহিত করবে, যাতে টেকনাফ দিয়ে ইয়াবা পাচারের দুর্নাম ঘোচানো যায়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি এবং সম্পদ বিষয়ে কোনো প্রশ্নের জবাব তাদের দিচ্ছে না জেলা পুলিশ।

ইয়াবা পাচারকারী জাফর আহমদ বলেন, ‘আমার তেমন কোনো সম্পদ নেই। গরুর ব্যবসা করি। এখন যদি সব সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে চলব কিভাবে? আমি তো স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে চাই।’

গুরুত্বপূর্ণ ওই দুটি প্রশ্ন ছাড়াও আত্মসমর্পণে আগ্রহী পাচারকারীদের বিরুদ্ধে চলমান মামলার ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়টিও আলোচনায় আছে। সেই সঙ্গে কোনো কোনো গডফাদারের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র জমা দেওয়া হবে কি না বা এই মুহূর্তে যাদের কাছে ইয়াবা নেই, তাদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, সেসব বিষয়েও আলোচনা চলছে।

আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ার শর্ত বা কৌশল কী—জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেন, ‘আত্মসমর্পণকারীদের অনেক প্রশ্নই থাকতে পারে, সেসব প্রশ্নের উত্তর তো আমরা দিতে পারব না। অনেক বিষয় আছে, যেগুলোর সিদ্ধান্ত জানতে হবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। সে হিসেবে সব বিষয়ে আলোচনা চলছে। আশা করা যায়, একটি ফলপ্রসূ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কী পরিমাণ ইয়াবা জমা দিয়ে তারা আত্মসমর্পণ করবে কিংবা সবাই একসঙ্গে ইয়াবা জমা দেবে, নাকি একজন একজন করে জমা দেবে, সেসব বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’ ইয়াবা গডফাদারদের সম্পদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে—জানতে চাইলে এসপি বলেন, ‘সম্পদের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রচলিত আইনে কারো কাছে অবৈধ সম্পদ থাকলে সে বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ও সিআইডি অনুসন্ধান চালাতে পারে।’

গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কেন আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনেকেই পুলিশ হেফাজতে চলে গেল—জানতে চাইলে একজন পাচারকারী বলেন, ‘আত্মসমর্পণকারী ও পুলিশ—উভয় পক্ষের উচিত ছিল আগে থেকেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, তাহলে সবার জন্য ভালো হতো। এখন আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন। কিন্তু কোথাও উত্তর পাচ্ছি না। তাই পুলিশের হেফাজতে যেতে সময়ক্ষেপণ। তবে এটাও ঠিক, পুলিশ হেফাজতই এখন নিরাপদ। বাইরে থাকলেই মৃত্যুভয় কাজ করছে পাচারকারীদের মধ্যে। কারণ এখনো বন্দুকযুদ্ধ অব্যাহত আছে।’

সর্বশেষ গত রবিবার রাতে শামসুল ইসলাম ওরফে বার্মাইয়া শামসু এবং আগের দিন শনিবার রাতে মোস্তাক আহমদ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে। তাই সম্ভব্য আত্মসমর্পণকারীরা কোনো ধরনের পূর্বশর্ত বা সিদ্ধান্ত ছাড়াই প্রাণরক্ষার্থে পুলিশ হেফাজতে চলে যাচ্ছে। ৭০ জনের বেশি মাদক পাচারকারী পুলিশ হেফাজতে গেছে বলে জানা গেছে।তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সব কটি তালিকায় ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে চিহ্নিত সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদি আত্মসমর্পণ করছেন না।

Share this post

PinIt
scroll to top
alsancak escort bornova escort gaziemir escort izmir escort buca escort karsiyaka escort cesme escort ucyol escort gaziemir escort mavisehir escort buca escort izmir escort alsancak escort manisa escort buca escort buca escort bornova escort gaziemir escort alsancak escort karsiyaka escort bornova escort gaziemir escort buca escort porno