ইয়াবা কারবারিদের ”আত্মসমর্পণে “ বদির লোকদের সুবিধা !

yaba-dengar.jpg

কক্সবাংলা রিপোর্ট(২৫ জানুয়ারি) :: দেশের ইয়াবা ট্রানজিট পয়েন্ট খ্যাত সীমান্ত শহর টেকনাফে এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।একদিকে আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া অন্যদিকে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় সীমান্ত এলাকার মানুষের মাঝে ভয়, আতংক এবং নানান কৌতূহল ঘুরফাঁক খাচ্ছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি কোনো দিকে গড়াচ্ছে তা কেউ জানে না।গত কয়েক দিনে র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে চারজন মাদক কারবারি নিহত হয়েছেন।আর ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ করার কথা বলা হলেও সব ইয়াবা কারবারি এ সুযোগ পাচ্ছেন না বলে লোকেমুখে বলাবলি হচ্ছে। আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার মাঝেও গত কয়েক দিনে র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে চারজন মাদক কারবারি নিহত হয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়াটা আমাদের কাছে সাবেক এমপি বদির পক্ষের লোকদের বাঁচানোর প্রক্রিয়া বলে মনে হচ্ছে। তিনি (বদি) আত্মসমর্পণ করতে ইচ্ছুক ইয়াবা কারবারিদের তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে ঘোষণা দিয়েছেন, অর্থাৎ এ পর্যন্ত বদিকে এড়িয়ে কেউ আত্মসমর্পণ করতে যেতে পেরেছে বলে আমাদের মনে হয় না।’

তিনি বলেন, সাবেক এমপি গত ১০ বছর সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন জনপ্রতিনিধি বা সাংসদ হিসেবে তার একটা পাওয়ার (ক্ষমতা) ছিল। তাঁর সদিচ্ছা থাকলে তখনই ইয়াবা বন্ধ করা যেত। অথচ তিনি সে সময়ে ইয়াবা কারবারিদের মদদ দিয়েছেন এবং তাঁর নিকট জন হিসেবে ঠাঁই দিয়েছেন। কিন্তু এখন এমপি পদ হারানোর পর থেকে তিনি ইয়াবা বন্ধ করার জন্য তোড়জোড় করছেন। তাই তার এ তোড়জোড় আত্মরক্ষার্থে কিনা সেটিও দেখা উচিত।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বদির সমর্থনপুষ্ট হয়ে যেসব ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করতে গেছেন তাদের অনেকে বড় মাপের ইয়াবা কারবারি। তারা আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া চলমান থাকায় পুলিশ হেফাজতে নিরাপদে রয়েছেন। অন্যদিকে ইয়াবার চুনোপুঁটি ও খুচরা কারবারিরা এখন বলি হতে যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে বন্দুকযুদ্ধে নিহতের মধ্যে মাত্র চার জনের নাম ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৭৩ জনের ইয়াবা কারবারির তালিকায়। বাকীরা ইয়াবার চুনোপুঁটি নয়তো খুচরা বিক্রেতা ছিল।

ইয়াবায় হুন্ডি সিন্ডিকেট

টেকনাফে এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করলেও ইয়াবা পাচার থেমে নেই। নিত্য নতুন কৌশলে চলছে ইয়াবা পাচার। শুক্রবারও টেকনাফ সীমান্তে বিজিবি’র পৃথক অভিযানে উদ্ধার হয়েছে দেড় লাখ ইয়াবার চালান। সীমান্ত জনপদে একের পর এক বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ইয়াবা কারবারি নিহতের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। তারপরও ইয়াবা কারবারের টাকার লোভের সামনে যেন এমন অনাকাংখিত মৃত্যুও এখন হয়ে পড়েছে গৌণ। তদুপরি কারবারিদের আত্মসমর্পণের ঢামাঢোলের মধ্যেও চলছে ইয়াবা কারবার।

উপরন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি সংস্থাগুলোর সদস্যরা কেবল মাত্র ইয়াবা কারবারিদের টার্গেট করলেও নিরাপদেই রয়ে গেছে সীমান্তের হন্ডি সিন্ডিকেট। হুন্ডি সিন্ডিকেটে এ পর্যন্ত আঘাত না করায় একদম নিরাপদেই তাদের কারবার চলছে। ফলে সীমান্তে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ মাধ্যমে এত বিপুল প্রাণহানি হবার পরেও ইয়াবা পাচার বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সীমান্তের লোকজন জানিয়েছেন, ইয়াবা কারবারিদের সঙ্গে হুন্ডি সিন্ডিকেটের সদস্যদের রয়েছে ওতপ্রোত সম্পর্ক। ইয়াবার কারবার চলে হুন্ডির মাধ্যমেই।

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের হুন্ডি সিন্ডিকেট রয়েছে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, দুবাই, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পাচার করা ইয়াবার চালানের লেনদেন হয়ে থাকে হুন্ডির মাধ্যমেই। তাই ইয়াবা ডনদের অনেকেই হুন্ডি সিন্ডিকেটও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আন্তর্জাতিক  হুন্ডি সিন্ডিকেটের অফিস রয়েছে দুবাই। দুবাই হয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার, থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশের সিন্ডিকেট সদস্যদের সাথে লেনদেন হয়ে থাকে।

কয়েক বছর আগে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের হুন্ডি সিন্ডিকেটের প্রধান ছিলেন জলিল আহমদ প্রকাশ হুন্ডি জলিল। ফি বছর হুন্ডি সিন্ডিকেটের নেতা নির্বাচিত হয়ে থাকে। বর্তমানে টেকনাফ সীমান্তের জাফর আলম প্রকাশ টিটি জাফর হুন্ডি সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন বলে জানা গেছে। টেকনাফ সীমান্তের অন্যতম ইয়াবা ডিলার হাজী সাইফুল করিম এবং টেকনাফের শীর্ষ স্থানীয় অপর একজন ইয়াবা ডন হুন্ডি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বলে এলাকায় প্রচার রয়েছে।

ইয়াবা ডিলার হাজী সাইফুল করিম গত বছরের মে মাসে ইয়াবা বিরোধী সাঁড়াশি অভিযান শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই দুবাই পাড়ি জমান। হাজী সাইফুল করিম ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নিজের ফেসবুক আইডিতে স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন-‘ হুন্ডি জাফরকে ধরলে সব কিছু বের হয়ে যাবে। সঙ্গে ইয়াবা ব্যবসার পার্টনার কে কে আছে। বাংলাদেশকে ইয়াবামুক্ত করতে হবে।’ হুন্ডি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত একজন ইয়াবা ডিলারের দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসের পরেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কক্সবাজার জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা সৌমেন মন্ডল  জানিয়েছেন, হুন্ডি সিন্ডিকেটের কোন হালনাগাদ তালিকা তাদের কাছে নেই। তিনি স্বীকার করেছেন হুন্ডি সিন্ডিকেট বন্ধ করা না গেলে ইয়াবা কারবার বন্ধ করা যাবে না।  বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারে ৩১ জন হুন্ডি সিন্ডিকেট সদস্যের নাম সম্বলিত একটি তালিকা গত ক’বছর আগে করা হয়েছিল।

টেকনাফ সীমান্ত থমথমে

টেকনাফের হাটবাজার থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা কোথাও স্বস্তিকর পরিস্থিতি নেই। সর্বত্র অজানা আতংক বিরাজ করছে। তালিকাভুক্ত শীর্ষ ইয়াবা গডফাদারদের অনেকে আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশ হেফাজতে চলে গেছেন। যাদের আত্মসমর্পণের সুযোগ মিলছে না তারা বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কখন কি ঘটবে তা কারো অনুমানে নেই।

টেকনাফের সবচেয়ে আলোচিত ইয়াবা ট্রানজিট পয়েন্ট নামে পরিচিত সদর ইউনিয়নের নাজির পাড়ার বেশির ভাগ বাড়িতে পুরুষ কর্তা নেই। তারা অন্যত্র পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে। এই এলাকা থেকে জিয়াউর রহমান ও কামাল হোসেন নামে দুই ব্যক্তি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। এরপর থেকে এই এলাকায় অন্য ইয়াবা কারবারিদের মাঝে ভয় ও আতংক কাজ করছে।

নাজির পাড়ার শীর্ষ ইয়াবা কারবারি ও ইউপি সদস্য এনামুল হক আত্মসমর্পণের জন্য কক্সবাজারে পুলিশ হেফাজতে অবস্থান করছে। অবশ্য আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার প্রথম ইয়াবা কারবারিও তিনি। তার সঙ্গে সহযোগী অনেক ইয়াবাকারবারিও আত্মসমর্পণ করার জন্য নাম লিখিয়েছেন বলে জানা যায়।

নাজির পাড়ার মতো একই চিত্র দেখা গেছে ইয়াবা পাড়া খ্যাত টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মৌলভী পাড়া, পৌরসভার জালিয়া পাড়া, নাইট্যংপাড়া, সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া, কচুবনিয়া এলাকায়ও। এসব এলাকার ইয়াবা কারবারিসহ তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

এদিকে ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ করার কথা বলা হলেও সব ইয়াবা কারবারি এ সুযোগ পাচ্ছেন না বলে লোকেমুখে বলাবলি হচ্ছে।

সীমান্তের গ্রামে ঢুকে পড়েছে ইয়াবা কারবার

টেকনাফ সীমান্তের হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের গ্রামগুলোতেই এখন ইয়াবার রমরমা কারবার চলছে। হ্নীলা স্টেশনের  একজন পান দোকানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী, লেদা, আলীখালী, জাদিমুরা, নয়াপাড়া, দমদমিয়া, উলুচামরি, সিকদার পাড়া, পানখালী, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাংখালী, নাচরপাড়া, কাচারপাড়া, কমবনিয়া পাড়া সহ বিভিন্ন গ্রামে এখন ইয়াবা কারবার ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রাম এলাকা থেকে স্কুল ছাত্র, রিকশাচালক, ভিক্ষুকসহ নানা কৌশলে পাচার করা হচ্ছে ইয়াবা।

কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না : বদি

কোনও ইয়াবা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এক কাপ চাও খাননি দাবি করে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি বলেছেন, আমি ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে বিন্দুমাত্র জড়িত নই। ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে আমার জড়িত থাকার প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না।

বদি বলেন, কোন গ্রামে যদি ইয়াবার চালান প্রবেশ করে, সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দেবেন, না হলে ইয়াবাসহ কারবারীদের ধরিয়ে দেবেন। যদি ইয়াবা চালান প্রবেশের খবর না দেন, তাহলে সেই গ্রামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসে অভিযান শুরু করবে। কেন না সরকার প্রধানের নির্দেশে এই সীমান্তকে ইয়াবামুক্ত করার লক্ষে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

এ সময় অনুষ্ঠানে আগতদের উদ্দেশে বদি বলেন, কেউ মরণনেশা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে যাবেন না। যেসব লোকজন ইয়াবা ব্যবসা করে কোটি টাকা বানিয়েছেন, তারা এখন কোথায়? বর্তমানে যারা  ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে। তারা যেকোন সময় গ্রেফতার হবেন। সরকার আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়েছে, এটি সবাই কাজে লাগান।

শুক্রবার বিকলে টেকনাফের সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক জিরো পয়েন্টে উপজেলা রেন্ট-এ-কার নোহা মাইক্রোচালক সমবায় সমিতির আয়োজনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শাহিন আক্তারকে গণসংবর্ধনা ও বার্ষিক বনভোজন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্ত্যবে এসব কথা বলেন তিনি।

Share this post

PinIt
scroll to top
alsancak escort bornova escort gaziemir escort izmir escort buca escort karsiyaka escort cesme escort ucyol escort gaziemir escort mavisehir escort buca escort izmir escort alsancak escort manisa escort buca escort buca escort bornova escort gaziemir escort alsancak escort karsiyaka escort bornova escort gaziemir escort buca escort porno