ইয়াবা কারবারীদের আত্মসমর্পণের ব্যাপারে যা বললেন কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ হোসেন

sp-cox.jpg

কক্সবাংলা রিপোর্ট(২৮ জানুয়ারী) :: মরণ নেশা ইয়াবা পাচারকারীদের সম্ভাব্য আত্মসমর্পণ ঘিরে কক্সবাজারজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে  নানা আলোচনা। চুনোপুঁটি পাচারকারীদের অনেকেই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়া আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত পাচারকারীদের অনেকেই জীবন রক্ষায় ‘পুলিশ হেফাজতে’ যাওয়ায় কক্সবাজারের মানুষের মনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

আত্মসমর্পণের মাধ্যমে কি পাচারকারীদের জীবন রক্ষার আয়োজন হচ্ছে? তাদের অবৈধ সম্পদের বৈধতা দেওয়া হচ্ছে? এর মাধ্যমে কি সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা, জনপ্রতিনিধি ও তাঁদের অনুগতদের কৌশলে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে? সাধারণ মানুষ এসব প্রশ্ন মাথায় নিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছে আসলে ইয়াবা পাচারকারীদের ‘আত্মসমর্পণ’ বলতে পুলিশ কী বোঝাতে চাইছে। এমন বাস্তবতায় কালের কণ্ঠ’র মুখোমুখি হন কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন।নিন্মে তা কক্সবাংলা’র পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন : শীর্ষ ইয়াবা পাচারকারীদের মধ্যে কজন আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে?

মাসুদ হোসেন : ঠিক কতজন আত্মসমর্পণ করবে, সেই তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অনেকেই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। এ বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে।

প্রশ্ন : ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ইয়াবা পাচারকারীদের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাত্র চারজন। অন্যরা চুনোপুঁটি। চুনোপুঁটির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কী ইয়াবা পাচার বন্ধ হবে বলে আপনি মনে করেন?

মাসুদ হোসেন : পুলিশ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ পাচারকারী মারছে না। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়। আমার জানা মতে, যারা মারা গেছে তাদের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার অন্তত ১০ জন আছে। আর আপনি (প্রতিবেদক) যাদের চুনোপুঁটি বলছেন, তাদের অপরাধের খতিয়ান ও ইয়াবাসংক্রান্ত মামলার খোঁজ নিলে দেখবেন, তারা কত বড় মাপের পাচারকারী।

প্রশ্ন : কিন্তু শীর্ষ পাচারকারী তথা রাজনৈতিক প্রভাবশালী কেউ মারা যাননি। আর তাঁদের অনেকেই এখন আত্মসমর্পণ করতে পুলিশ হেফাজতে যাচ্ছেন।

মাসুদ হোসেন : বিষয়টি কিন্তু এমন না যে পুলিশ কাউকে ধরছে আর গুলি করে মারছে। বাস্তবতা হলো, ইয়াবাসহ যারা আটক হয়েছে, তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরো ইয়াবা উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে পাচারকারীর সহযোগীরা। পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তখন পুলিশও আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। আপনি যেভাবে ভাবছেন, তাতে মনে হতে পারে, তালিকাভুক্তদের পুলিশ ধরুক আর গুলি করে মারুক। বিষয়টি কিন্তু মোটেই এমন নয়। আবার এটা তো ঠিক যে তালিকাভুক্ত অনেক ব্যক্তিই ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে আটক হয়নি। তাহলে পুলিশ কী তাদের যখন পাবে, তখনই গুলি করে মারবে? এটা কী আইনের ভাষা হবে? এ ছাড়া যে তালিকার কথা বলা হচ্ছে, সেই তালিকায় প্যারালিসিস রোগীর নামও আছে। এখন কী ওই রোগীকে পুলিশ গুলি করে মারবে? তবে এটাও সত্য, অভিযান শুরুর পর অনেকেই এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল। তাদের কেউ কেউ এখন আত্মসমর্পণ করতে পুলিশের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগ করছে।

প্রশ্ন : কোটিপতি ইয়াবা পাচারকারীদের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

মাসুদ হোসেন : নিকট অতীতে দেখুন, জলদুস্যরা আত্মসমর্পণ করল। তখন কী জলদস্যুদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়েছে? হয়নি। আবার ইয়াবা মামলায় যদি কোনো আসামির সাজা হয়, তাহলে কী সেই মামলার রায়ে আদালত দোষী আসামির সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার রায় দিয়েছেন? এ রকম রায় হয়নি। এ ছাড়া কোনো পাচারকারীর মৃত্যু হলে ওই ব্যক্তির সম্পদ কী রাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করেছে? করেনি। তাহলে এখন কেন প্রশ্নটা আসছে? কিছু পাচারকারী আত্মসমর্পণ করে যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, তাহলে তারা রাষ্ট্রের কাছে সেই আইনগত সুযোগ পেতে পারে। তার পরও পাচারকারীদের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে বিষয়ে আইনগগত মতামত জানতে চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের আইন শাখায় চিঠি লিখবে জেলা পুলিশ। যেভাবে আইনি মতামত আসবে, সেই মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশ্ন : আত্মসমর্পণের পর ইয়াবা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

মাসুদ হোসেন : তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা আছে। মামলার আসামি হিসেবে তারা আদালতে যাবে। সেখানে বিচারের দায়িত্ব আদালতের। তবে রাষ্ট্র বিপথগামী নাগরিকদের সুপথে ফেরানোর উদ্যোগ নিতেই পারে।

প্রশ্ন : পাচারকারীরা পুনরায় যে ইয়াবা পাচারে জড়াবে না, তার নিশ্চয়তা কী?

মাসুদ হোসেন : পুলিশের সঙ্গে তো মাদক পাচারকারীদের এমন কোনো মুচলেকা হচ্ছে না যে ভবিষ্যতে ওই পাচারকারী পুনরায় অপরাধে জড়ালেও পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে না। যারা সুপথে ফিরে আসবে, তাদের ওপর পুলিশের নজরদারি আরো বেশি থাকবে। এর পরও যদি অপরাধে জড়ায়, তাহলে তখন আরো কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশ্ন : আত্মসমর্পণপ্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কৌশলগত সুরক্ষা কবচ কি না?

মাসুদ হোসেন : ইয়াবা পাচারকারীদের পরিচয় শুধুই অপরাধী। আর অপরাধীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হয়, সেটা ফৌজদারি আইনে বলা আছে। আমার জানা মতে, চলমান অভিযানে কারো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। সেই সুযোগও পুলিশের নেই। পুলিশ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব আইনগতভাবে পালন করছে।

প্রশ্ন : ‘বন্দুকযুদ্ধ’ কী ইয়াবা পাচাররোধের সেরা উপায়?

মাসুদ হোসেন : আপনি বারবার বন্দুকযুদ্ধ বলছেন। কিন্তু নিহতের তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখবেন সেখানে ২০ জনের বেশি পাচারকারীর মৃত্যু হয়েছে পাচারকারীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গোলাগুলির কারণে। আবারও বলছি, পুলিশ বন্দুকযুদ্ধ করছে না। তবে কয়েকটি ঘটনায় আসামি ছিনিয়ে নেওয়া ঠেকাতে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়েছে। আর ইয়াবা পাচাররোধে অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন আছে। তা হলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে।

প্রশ্ন : তাহলে সামাজিক আন্দোলন শুরু করছেন না কেন?

মাসুদ হোসেন : সামাজিক আন্দোলন সমাজের নেতৃস্থানীয় ও সচেতন মহল থেকে শুরু হলেই ভালো। পুলিশ এতে সার্বিকভাবে সহযোগিতা দেবে।

প্রশ্ন : আপনাকে ধন্যবাদ।

মাসুদ হোসেন : কালের কণ্ঠকেও ধন্যবাদ।

সূত্র : কালের কণ্ঠ

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri