কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে Oxfam তৈরী করল বিশ্বের সর্ববৃহৎ পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট

ox1.jpg

কক্সবাংলা রিপোর্ট(২৯ জানুয়ারী) :: অক্সফ্যাম এবং ইউএনএইচসিআর চলতি মাসে যৌথভাবে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে প্রথমবারের মতো একটি কেন্দ্রীয় পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্ল্যান্ট চালু করেছে। উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-৪ এ স্থাপিত এই প্লান্টটি বিশ্বব্যাপী শরণার্থী ক্যাম্পের মধ্যে সবচেয়ে বৃহত। এটি দেড় লাখ মানুষের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে সক্ষম। অক্সফ্যামের ব্যবস্থাপনায় এই প্লান্টটি তৈরিতে সহায়তা করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, ইউএনএইচসিআর।

২৯ জানুয়ারী প্লান্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুভ উদ্ধোধন করেন সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রান মন্ত্রী ডঃ মোহাম্মাদ এনামুর রাহমান. এমপি। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন- ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ শাহ কামাল,আক্সফামের কান্ট্রি ডিরেক্টর দীপংকর দত্ত,ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইস্টিভেন্ট কর্লিস, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম,অতিরিক্ত ত্রান ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শামসুদ্দৌজা, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নিকারুজ্জামান চৌধুরী, উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের।

এসময় মন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া বলপূর্বক বাস্ত্যচূ্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিশোধনাগারের মাধ্যমে পর্যায়ে ক্রমে পুরো ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের মানববর্জ্য পরিশোধন করা হবে। পাশাপাশি এটি চালুর ফলে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেকটা কমে এসেছে। আগামীতে এ ধরনের প্রকল্প দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অক্সফাম সূত্রে জানা গেছে, এটা করা হয়েছে যাতে করে বিপুল পরিমান পয়ঃবর্জ্য যত্র-তত্র না ফেলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিশোধন করা যায়। এটিকেজরুরী অবস্থা মোকাবেলায় পয়: বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ ও বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বছর শরণার্থী শিবিরে দুই লাখের বেশি মানুষ তীব্র ডায়রিয়সহ শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ও স্ক্যাবিসের মতো চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে। এই ধরনের সংক্রমনের অন্যতম কারণ হিসেবে নিম্নমানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে (স্যানিটেশন ও হাইজিন) মনে করা হয়।

আক্সফামের কান্ট্রি ডিরেক্টর দীপংকর দত্ত জানান,উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-৪ এ বিগত সাত মাস ধরে ৫ একর পাহাড়ি জায়গার উপর আড়াই কোটি টাকা ব্যায়ে অক্সফ্যাম এবং ইউএনএইচসিআর এর প্রকৌশলীরা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তায় মূলত এই বৃহৎ শোধনাগার তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এটি তৈরি করার ক্ষেত্রে বিশেষ নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে যাতে খাড়া ও উঁচু পাহাড়ের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কম রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা ব্যয় নিশ্চিত করা যাবে। শরণার্থী, ত্রান এবং পুনর্বাসন কমিশনারের অফিসের সহায়তায় সরকারের বরাদ্দকৃত জায়গায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন,পয়ঃবর্জ্যগুলো সংগ্রহ করার জন্য বিশেষায়িত ট্রাক আছে। সেই ট্রাকে পাম্প ও ট্যাঙ্ক রয়েছে। ট্রাক নিয়ে ক্যাম্পের বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে পয়ঃবর্জ্যগুলো সংগ্রহ করা হবে। পরে প্ল্যান্টের লেগুনের মধ্যে বর্জ্যগুলো ফেলা হবে। পয়ঃবর্জ্যের দুটি ধরণ রয়েছে। একটি শক্ত ও অপরটি লিকুইড। শক্ত শ্রেণির পয়ঃবর্জ্য থাকে ৩০ শতাংশ। আর লিকুইড শ্রেণির পয়ঃবর্জ্য থাকে ৭০ শতাংশ।

অক্সফ্যামের ওয়াটার ও স্যানিটেশন প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, পানিবাজিত রোগের প্রাদুর্ভাব কমানোর জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষের পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা, তাও আবার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিবেশবান্ধব প্লান্টটি শরণার্থীদের সুস্থ্য রাখবে, প্রতিদিন গড়ে ৪০ কিউবিক মিটার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যাবে এখানে – এটি আসলেই একটি বিরাট প্রক্রিয়া। প্রাথমিক দিকের বিনিয়োগ খুবই যথার্থ কারন এই প্লান্টটি খুবই সাশ্রয়ি। এছাড়াও পরিচালন ব্যয় অত্যন্ত কম। এর স্থায়িত্বকাল বিশ বছর। এখানকার স্থানীয় সম্প্রদায়ও এর উপকারভোগী হবে যখন এই জরুরি অবস্থা শেষ হয়ে যাবে। আমরা প্রত্যাশা করছি যে ভবিষ্যৎ কোন সংকটে এই মডেলটি আমরা পুনরায় অনুসরণ করার চেষ্টা করব।

জরুরি অবস্থায়, বর্জ্য নিষ্কাশনের সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে ট্যাঙ্ক ব্যবহার করার মাধ্যমে বর্জ্যগুলো ল্যাট্রিন থেকে তুলে আনা এবং দূরে নিয়ে ফেলে দেয়া। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে বিশ্বের শতকরা ৮৫ ভাগ শরণার্থীই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রয়েছে বাস করছে, এসব ক্যাম্পে প্রায়ই অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকে যার ফলে অতিরিক্ত বর্জ্য পরিশোধন করা সব সময় সম্ভব হয় না। কিন্তু এই ধরনের পরিশোধন ব্যবস্থা ক্যাম্পের মধ্যেই তৈরি করা যায় তাহলে স্বাস্থ্য ঝুঁকিসহ অন্যান্য অনেক ঝুঁকি কমে আসবে।

পরিবেশবান্ধব এই প্লান্টটি তৈরি করা হয়েছে আবৃত পুকুর এবং জলাভূমি তৈরির মাধ্যমে যা কিনা মানুষ এবং পরিবেশের জন্য খুবই নিরাপদ। এটার রয়েছে একাধিক পরিশোধন ধাপ যা কিনা স্থানীয় পানির উৎসকে দূষিত করবে না । এতে আরো রয়েছে একটি উচ্চমাত্রার পলিথিন লাইনার। তাছাড়াও আবৃত থাকার কারনে এই ইউনিট থেকে কোনো দূর্গন্ধ বাইরে আসবে না।

ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশ এর প্রতিনিধি,স্টিভ করলিস এই প্লান্টটি সম্পর্কে বলেন, এর সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্যাম্প এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা এবং এরই সাথে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং স্থায়িত্ব বজায় রেখে রোগ সংক্রামণ কমিয়ে আনা। বর্জ্য এর সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপাদ অপসারণ পরিবেশের দূষণ কমায় পাশাপাশি রোগ জীবাণুর প্রাদুর্ভাব কমায়। ঘনবসতি পূর্ণ শরণার্থী স্থানগুলোতে বর্জ্যরে সঠিক অপসারণ করা খুবই জরুরি, যা আমাদের সুযোগ তৈরি করে দিবে জৈব বর্জ্যগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। আজ আমরা খুব গর্বের সাথে বিশ্বব্যাপি শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর মধ্যে স্থাপিত সবচেয়ে বড় পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট শুরু করতে যাচ্ছি বাংলাদেশ সরকার এবং আমাদের সহযোগি অক্সফ্যামের সহযোগিতায়।

প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থী এমুহুর্তে কক্সবাজারে বাস করছে। এই বিপুল পরিমান শরণার্থীদের বেঁচে থাকার জন্য এখনও নিরাপদ খাবার পানি, আশ্রয় এবং অন্যান্য সহায়তা প্রয়োজন। অক্সফ্যাম ও ইউএনএইচসিআর এই লক্ষ্যে আরো মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানাচ্ছে যাতে অসহায় এই মানুষগুলো নিরাপদে থাকতে পারে এবং তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে আরো সক্ষম হয়।

অক্সফ্যাম এই মুহুর্তে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ পানি এবং খাদ্য সহায়তা প্রদান করছে। এখন পর্যন্ত ২৬৬,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী এই মানবিক সহায়তা পেয়েছে। ইউএনএইচসিআর অন্যান্য সহযোগিদের নিয়ে রোহিংগা শরণার্থীদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করছে বিভিন্ন ক্যাম্পে। এ পর্যন্ত ছোট আকারে সবমিলিয়ে ২৭৫টি বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও আরো ১৫টি বিভিন্ন ট্রিটমেন্ট টেকনোলজি রয়েছে, যা কিনা বিভিন্ন মাত্রায় কাজ করে থাকে। এর মধ্যে কিছু আছে যাতে চুন ব্যবহার করে বর্জ্য পরিশোধন করা হয় এবং পরবর্তীতে সেই বর্জ্যকে জীবানমুক্ত করে তা থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে শরণার্থীদের সুরক্ষা এবং ভাল সেবা নিশ্চিত করাই এই কাজের উদ্দেশ্য।

নবনির্মিত বিশালাকার এই প্লান্টটি ডিজাইনে সহায়তা করেছে জার্মান সংস্থা BORDA যারা উন্নত দেশগুলোতে স্যানিটেশন ব্যবস্থা তৈরিতে বিশেষ পারদর্শী।

Share this post

PinIt
scroll to top