izmir escort telefonlari
porno izle sex hikaye
çorum sürücü kursu malatya reklam

বাংলা সাহিত্যে কালের বৈপরীত্যে রবীন্দ্র-নজরুল

rn-1.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(৩ ফেব্রুয়ারি) :: বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আগমন কেবল যে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল তা নয়, এ ছিল নতুন একটি যুগের আগমন বার্তা। নজরুল নতুন যুগটাকে মূর্ত করে তোলেন। যুগের তিনি স্রষ্টা নন, যুগের মুখপাত্র। এই সত্যটা তখনকার বিশিষ্টজনেরা কেউ কেউ ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সেভাবেই নজরুলকে দেখেছেন। ১৯২৯-এ নজরুলকে যে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয় তাতে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায়; তিনি বলেছিলেন, নজরুল একজন প্রতিভাবান মৌলিক কবি। “রবীন্দ্রনাথের আওতায় নজরুল প্রতিভা পরিপুষ্ট হয়নি। তাই রবীন্দ্রনাথ তাকে কবি বলে স্বীকার করেছেন।” সভায় সুভাষচন্দ্র বসুও ছিলেন, তিনি বলেছিলেন, “আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাব তখন গাওয়া হবে নজরুলের গান, যখন কারাগারে যাব, তখনও গাইব নজরুলের গান।” ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে। অভিনন্দনের উত্তরে নিজের ভূমিকা সম্বন্ধে নজরুল যা বলেছিলেন তাও তার সম্পর্কে পুরোপুরি সত্য। বলেছিলেন, “বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরই অভিযান সেনাদলের তূর্যবাদক আমি।”১

‘মাভৈঃ মাভৈঃ নবযুগ এলো ওই’ এই বাণী তার কবিতায় ও গদ্যলেখায় প্রবলভাবে রয়েছে। নিজের একটি প্রবন্ধ সংকলনের নাম দিয়েছেন যুগবাণী। তার দৈনিকের নাম ছিল নবযুগ। ‘বর্তমানের কবি আমি ভাই’, এই কথাটা খুব জোর দিয়ে বলেছেন। এই যুগটা রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী; এটি ১৯১৭-এর রুশ বিপ্লবের পরের যুগ। ততদিনে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়েছে। ১৯০৮ সালে তার একটি প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া লিখেছেন যে বাঙালি পুরুষরা আর মেয়েলী নয়, তারা বেশ পুরুষসুলভ। বোঝা যায় রোকেয়ার দৃষ্টিতে পরিবর্তন আসার কারণ হল এই যে, ততদিনে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন।

ওই নতুন যুগকে তথাকথিত রেনেসাঁসের পূর্ণতা লাভের কাল বলবার কোনো উপায় নেই। প্রথমত রেনেসাঁস বলতে তেমন কিছু ঘটেইনি; যা ঘটেছিল তার ভেতরে রক্ষণশীলতার বিস্তর উপাদান ছিল; কারণ আন্দোলনটিতে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি করেছিল। তার আনুগত্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের প্রতি এবং তার ভয় ছিল কৃষকের অভ্যুত্থানকে। ১৮৫৭-এর পরে এই শ্রেণী সামনে আসে; সিপাহি অভ্যুত্থানের এরা বিরোধিতা করেছে, কৃষক-নিষ্পেষক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত যাতে বিদ্যমান থাকে তার জন্য ফন্দি-ফিকির এঁটেছে। রামমোহন ছিলেন ওই যুগের প্রথম মুখপাত্র; তিনি অনেক ক্ষেত্রেই অসাধারণ মাত্রায় প্রগতিশীল, কিন্তু অন্যদিকে তিনি আবার সমর্থক ছিলেন ইংরেজের ঔপনিবেশিকতার। ধর্মে তিনি আগ্রহ হারাননি, হিন্দুধর্ম সংস্কার করে ব্রাহ্মধর্মের তিনিই প্রতিষ্ঠাতা। উল্লেখযোগ্য আরেক ব্যক্তি; রাধাকান্ত দেব’ (১৭৭৩-১৮৬৭)। তাকে মনে করা হতো বেশ আধুনিক, হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় যিনি সাহায্য করেন, বিভিন্ন ভাষা জানতেন, মাতৃভাষার চর্চাকে উৎসাহ দিতেন। কিন্তু ডিরোজিওকে কলেজ থেকে বিতাড়িত করাতেও ভূমিকা রাখেন। সতীদাহ সমর্থন করতে এবং বিধবা-বিবাহের বিপক্ষে অবস্থান নিতে তিনি দ্বিধা করেননি। শেষ বয়সে তিনি আশ্রয় নেন বৃন্দাবনে। ব্যক্তিগত জীবনে মাইকেল মধুসূদন প্রায় বিপ্লবীই ছিলেন, কিন্তু সাহিত্যে মুখের ভাষা চলবে না বলে জানতেন এবং মেঘনাদ বধ কাব্যে প্রমীলাকে বীর হিসেবে উপস্থিত করে আবার স্বামীর সঙ্গে সহমরণে প্রেরণ করেছিলেন। বিদ্যাসাগর ধর্মকর্মে মোটেই উৎসাহী ছিলেন না। সমাজ সংস্কারে তার অঙ্গীকার ছিল অবিচলিত, কিন্তু তার জগৎ ছিল কৃষকশূন্য এবং মধ্যবিত্তদের ওপর আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে শেষ বয়সে কোনো কৃষকপল্লিতে না গিয়ে সাঁওতাল এলাকায় থাকবেন বলে স্থির করেন। শেষ বয়সে বঙ্কিমচন্দ্রও ধর্মের আশ্রয়ে চলে যান এবং বৃন্দাবনে না গেলেও মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের এই অগ্রসরমান ধারাটিকেই এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এর তিনি উজ্জ্বলতম প্রতিনিধি। বাংলা সাহিত্যকে তিনি সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত করেছেন, এনেছেন বিশ্বজনীন উপাদান; বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে পরিচিত করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্বে। তবে অসাধারণ প্রতিভাবান ও যুগসচেতন মানুষ ছিলেন বলেই এটা তার জানা হয়ে গেছে যে, নতুন এক যুগ এসেছে এবং সে যুগের জন্য নতুন মুখপাত্র প্রয়োজন হবে। রাজনীতিতে যেমন দেখছিলেন গান্ধী নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিন্তু সামলাতে পারছেন না, প্রয়োজন হচ্ছে সুভাষ বসুর, সাহিত্যেও নতুন সুর ও স্বর আনতে হল নতুন কবির যে প্রয়োজন তা বুঝেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের সচেতনতা ও অগ্রসরমানতা দু’টোই অসামান্য। ১৮৯৩তে তিনি কবিতা লিখেছেন ‘এবার ফিরাও মোরে’ নামে, তাতে বলছেন, মানুষের মূঢ় ম্লান মূক মুখে ভাষা দিতে হবে, শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিত করতে হবে আশা। তার ‘দুই বিঘা জমি’তে ভূমি থেকে কৃষকের উৎপাটনের কথা আসছে, ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে কৃষক পরিবারের দুর্দশার ছবি উঠে এসেছে; কিন্তু তিনি জানেন যে, কৃষককে তিনি সাহিত্যে নিয়ে আসতে পারেননি। ১৯৩১-এ ‘প্রশ্ন’ কবিতায় জানাচ্ছেন যে তিনি দেখেছেন প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী কীভাবে নীরবে নিভৃতে কাঁদছে; বলেছেন, “আমি যে দেখিনু, তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে/ কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে’; প্রশ্ন করছেন ভগবানকে, এই শোষণ-নিপীড়নের জন্য যারা দায়ী “তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কে বেসেছো ভালো?” ইতিমধ্যে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজ বিপ্লবের অসাধারণ সাফল্য দেখে এসেছেন। কি করতে হবে এ প্রশ্নের জবাব তারা দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু যে উদার মানবতাবাদের তিনি প্রতিনিধি সেটির পক্ষে ওই পথকে মেনে নেয়াটা সম্ভব হয়নি। ১৯৪১-এ লেখা ‘ওরা কাজ করে’ কবিতায় মেহনতীদের কথা প্রচুর মমতাসহ লিখেছেন; তিনি দেখেছেন যে, “ওরা চিরকাল/ টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল/ ওরা মাঠে মাঠে বীজ বোনে পাকা ধান কাটে”। সভ্যতা আসে যায়; “শত সাম্রাজ্যের পরে/ ওরা কাজ করে।” সভ্যতা ওদেরই শ্রমে তৈরি হয়। কিন্তু নিজের উদারনৈতিক অবস্থানের কারণে বলতে পারেননি ওদের মুক্তি কিভাবে সম্ভব। নতুন যুগের কবি নজরুলের কিন্তু জানা হয়ে গেছে যে, মুক্তির পথটা হচ্ছে সমাজবিপ্লব। নতুন কবি প্রশ্ন করেননি, সরাসরি জবাব দিয়ে দিয়েছেন। তার প্রথম কবিতার বই ‘অগ্নি-বীণা’র প্রথম কবিতা, ‘প্রলয়োল্লাস’; তাতে যে জয়ধ্বনি তোলা হয়েছে সেটা রুশ বিপ্লবের পক্ষেই, যদিও সে কথা উল্লেখ করা হয়নি; সম্ভব ছিল না উল্লেখ করা। একটা গল্পে ‘লাল ফৌজ’ লিখেছিলেন, পত্রিকায় প্রকাশের সময় ‘লাল ফৌজ’ কেটে মুজফ্ফর আহমদ বসিয়ে দিয়েছিলেন ‘মুক্তিসেবক সৈন্যদল’। টিকটিকিরা ভয় দেখাত।

স্থবির থাকা অসম্ভব ছিল রবীন্দ্রনাথের জন্য। তার চিন্তার অগ্রগতির অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। নাটকের দিকে তাকালে অগ্রগমনটা সহজেই দৃশ্যগোচর হয়। ১৮৯৬তে তিনি নাটক লিখেছেন বিসর্জন; সেখানে ধর্মের নামে মানুষ ও পশুহত্যার বর্বরতাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ১৯১২তে লিখেছেন ডাকঘর, যে নাটকে ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়টা এসেছে। একই বছরে লেখা অচলায়তন। সেখানে ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির স্বাধীনতার প্রশ্নটিও যুক্ত হয়েছে। এই তিনটি নাটকেই ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিষয়টি রয়েছে। ১৯২২ সালে লেখা নাটক মুক্তধারাতে নদীতে বাঁধ দিয়ে উপরের এলাকার ক্ষমতাবানরা নিচের এলাকার মানুষদের নিপীড়ন করছে, ছবিটা এই রকমের। অত আগেই কবি দেখতে পাচ্ছিলেন নদী কীভাবে ক্ষমতা-লোলুপতার শিকার হবে। ১৯২৬-এ এল রক্তকরবী। সে নাটকে দেখানো হয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কেমন করে প্রকৃতির প্রাণ এবং মেহনতী মানুষের শ্রমশক্তিকে শোষণ করছে। উদারনৈতিক দ্বিধার কারণেই হবে, দ্বন্দ্বটিকে তিনি পুঁজিবাদী বলে চিহ্নিত করে দেননি। বলেছেন বিরোধ চলছে কর্ষণজীবীদের সঙ্গে আকর্ষণজীবীদের। ১৯৩২-এ রবীন্দ্রনাথ লেখেন কালের যাত্রা নামের নাটক। সেখানে দেখা যাচ্ছে ইতিহাসের চাকা অচল হয়ে গেছে; কারণ রাজা, ব্রাহ্মণ, সৈনিক- এই মানুষগুলো নিজ নিজ শ্রেণী স্বার্থের সেবা করেছে, মানুষ ও প্রকৃতির দিকে তাকায়নি, ফলে ইতিহাসের রথের চাকা একদিকে হেলে পড়েছে, চাকা গেছে দেবে, চারদিকে অভাব ও দুঃখ দেখা দিয়েছে। রথকে চালু করা চাই, নইলে সর্বনাশ ঘটে যাবে। একে একে সবাই চেষ্টা করল, রথ নড়ল না; খবর পেয়ে চলে এসেছে মেহনতী মানুষ, তারা এসে হাত লাগাতেই রথ চালু হয়ে গেল। মেহনতীদের রবীন্দ্রনাথ অবশ্য সরাসরি মেহনতী বলছেন না, বলছেন শূদ্র; তা সত্ত্বেও এ নাটকে ১৯১৭-পরবর্তী সময়ের চেতনার প্রতীকী তাৎপর্যটা বেশ সুদৃঢ়। বোঝা যাচ্ছে ইতিহাসের চাকাকে শেষ পর্যন্ত মেহনতী মানুষই চালু রাখবে, অন্যকেউ পারবে না। তবু, এখানেও, উদারনীতির সতর্কতার বাণীটা আছে। নাটকে একজন কবি রয়েছেন, যিনি সবটা বোঝেন; তিনি জানাচ্ছেন অতীতের শাসকেরা ছিল একপেশে, সবকিছু তারা নিজের দিকে টেনেছে; ভবিষ্যতে রথের চালক শূদ্ররাও যদি একপেশে হয় তবে রথের চাকা আবারও দেবে যাবে। অসামান্য কল্পনাক্ষমতা রবীন্দ্রনাথের, কিন্তু তিনিও এমন একটা ব্যবস্থার কথা ভাবতে পারেননি যেখানে শ্রেণী থাকবে না এবং অবসান ঘটবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির। পরবর্তী নাটক তাসের দেশ, তাতে দেখানো হয়েছে যে একটি দেশের সব মানুষ তাস হয়ে গেছে। তারা আইনের শাসন মানে, অন্যকিছু জানে না, মানে না। তাসেরা অবশ্য শেষ পর্যন্ত মানুষ হল, স্বাধীনতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিনদেশের এক রাজপুত্রের আগমনের ফলে। দ্বিতীয় সংস্করণে তাসের দেশ নাটকটি উৎসর্গ করা হয় সুভাষচন্দ্র বসুকে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি নায়ককে। রবীন্দ্রনাথ নায়ক হিসেবে ব্যক্তিকেই দেখতে পছন্দ করতেন, জনসমষ্টিকে নয়। সে জন্যই রক্তকরবীতে নিপীড়নবাদী রাজ্যের যে পতন ঘটল সেটা জন-অভ্যুত্থানে নয়। রাজ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, আরেকটু সময় পেলে নিপীড়িত মানুষ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেলতো; কিন্তু তেমন কিছু ঘটল না। নন্দিনী নামের একটি মেয়ে রাজাকে তার স্বশাসিত অন্ধ গুহা থেকে বের করে আনল। ব্যবস্থা বদলাল, রাজাও বেঁচে গেলেন। পরিবর্তনটা একটি মেয়েই ঘটাল। কিন্তু তাতে ব্যবস্থার ভেতরকার পিতৃতান্ত্রিকতার যে অবসান হল এমন নয়; বোঝা যাচ্ছে রাজা রাজাই থাকবেন, যদিও ভিন্নভাবে। যারা বিদ্রোহ করবে বলে মনে হচ্ছিল রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তাদের শ্রমিক বলেননি, কৃষকও নয়; নাম দিয়েছেন কারিগর।

রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসেও চিন্তার উদারনৈতিক বিস্তার দেখা যাবে। গোরা’র (১৯১০) নায়ক ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতিষ্ঠা চায়, এবং ভারতের হিন্দু ঐক্যে বিশ্বাস করে। এই নায়কের সব প্রচেষ্টার অন্তঃসারশূন্যতা নির্মমভাবে উদ্ঘাটিত হয়ে পড়ল যখন দেখা গেল যে, গোরা নিজে ব্রাহ্মণ তো দূরের কথা ভারতীয়ই নয়; তার জন্ম সিপাহী অভ্যুত্থানের সময়, তার মাতা ও পিতা উভয়েই আইরিশ, সিপাহীদের সঙ্গে সংঘর্ষে যাদের মৃত্যু ঘটে। ঘরে-বাইরে (১৯১৬) এবং চার অধ্যায় (১৯৩৪) ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নিয়ে লেখা, যে আন্দোলনে সহিংসতার প্রবেশকে রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করেননি। উপন্যাস দু’টিতে আন্দোলনের নেতাদের ব্যক্তিগত স্বার্থই আন্দোলনের নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায় এমনটা দেখানো হয়েছে। যোগাযোগ (১৯২৯) উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে একটি শ্রেণীদ্বন্দ্ব; পতনের সম্মুখবর্তী এক জমিদারের সঙ্গে এক উঠতি মুৎসুদ্দী বণিকের দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্বটির পরিণতি করুণ হতে পারতো জমিদারটি যদি বণিকটির কাছে নত হতে অসম্মত হতো।

রবীন্দ্রনাথের পক্ষে যে এই নতুন যুগের মুখপাত্র হওয়া সম্ভব নয়, এটা তিনি মেনে নিয়েছেন। সে কথাটা মৃত্যুর অনতিপূর্বে লেখা ‘ঐকতান’ কবিতাতে আছে। তিনি বলছেন যে, তিনি পৃথিবীর কবি, কিন্তু ‘বিপুলা বিশ্বের’ কতটুকুই বা জানেন। বিশেষভাবে জানা হয়নি নিজ দেশে কৃষকদের জীবনকথা। তাই তিনি প্রতীক্ষায় থাকবেন সেই কবির বাণীর জন্য কৃষাণের জীবনের যে শরিক হয়েছে, কর্মে ও কথায় যে ‘সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন’। এর অল্প কয়েকদিন পরে লেখা ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন যে, প্রয়োজন একজন নেতার। এই নেতা সম্পর্কে তার ধারণা, ‘সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা সে শোনাবে’। এবং আসবে সে পূর্ব দিগন্ত থেকে।

নেতা কবি হতে পারেন, নায়কও হতে পারেন, দু’জনে মিলেমিশে একজন হওয়াও অসম্ভব নয়। নায়কে এই আস্থা উদারনীতিক রবীন্দ্রনাথ যে কখনোই হারাননি তার সাহিত্যে তার বহু প্রমাণ মিলবে। যথার্থ নায়কের সন্ধান পাওয়া সেকালে কঠিন ছিল। অল্পকিছু সময়ের জন্য হলেও ফ্যাসিবাদী মুসোলিনীও তো তার কাছে নায়ক হিসেবে দেখা দিয়েছে। উদারনীতির জগতে লেনিন অবশ্য পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক।

রবীন্দ্রনাথ যার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন সেই চাহিদা কি নজরুল মেটালেন? না, সেটা বলা যাবে না। যতই হোক নজরুল অতবড় নায়ক ছিলেন না যাতে তিনি বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবেন। তার শ্রেণী ও পরিবেশ তাকে সমর্থন দেয়নি। মুজফ্ফর আহমদরা যেমন বিপ্লবের নেতা হননি, নজরুলের বেলাতেও সেই একই কথা সত্য। অন্য বিবেচনার সঙ্গে এটাও দেখতে হবে যে এরা ব্যক্তি নেতৃত্বে আস্থাশীল ছিলেন না, এঁদের চেষ্টা ছিল দল গড়বার, মানুষকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করবার। ব্যক্তি নেতারা যে শেষ পর্যন্ত জনতার সঙ্গে থাকে না এটা তাদের জানা হয়ে গিয়েছিল। তবে নজরুল যে নতুন যুগের বিপ্লবী আকাক্সক্ষার একজন মুখপাত্র ছিলেন তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের মূল ব্যবধানটা আসলে যুগেরই, বাংলা সাহিত্যে তারা দুই ভিন্ন যুগের প্রতিনিধি; একটি তখন শেষ হচ্ছে, অন্যটির শুরু। নজরুল নতুন যুগের মর্মবাণীটি ধরতে পেরেছিলেন, নইলে কেবল প্রতিভার জোরে অতবড় হতে পারতেন না।

যুগের ব্যবধান নানা ক্ষেত্রে ধরা পড়ে। ধরা যাক আমেরিকার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার, ১৯১৬-এর শেষে এবং ১৯১৭-এর শুরুতে রবীন্দ্রনাথ আমেরিকায় তার Nationalism বক্তৃতায় জাতীয়তাবাদের কঠিন সমালোচনা করেন। যে জাতীয়তাবাদের নিন্দা করেছেন সেটি অবশ্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদ নয়, সেটি হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী জাতীয়তাবাদ। ব্যাপারটাকে খুব স্পষ্ট বোঝা যেত তিনি যদি আমেরিকা ও ইউরোপের Nationalismকে ভিন্ন নামে না ডেকে সরাসরি পুঁজিবাদী জাতীয়তাবাদ বলতেন। সেটা কিন্তু বলেননি। উদারনীতিই তাকে নিবৃত্ত করেছে। স্মরণীয় যে উদারনীতি কিন্তু পুঁজিবাদবিরোধী নয়, তার শত্রুতা সমাজতন্ত্রের সঙ্গেই।

১৯১৬-১৭তে আমেরিকা যখন সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকা গ্রহণের জন্য ভীষণভাবে প্রস্তুত এবং রুশ দেশ প্রস্তুত হচ্ছে বিপ্লবের জন্য, কয়েক মাস পরেই যেটা ঘটবে, রবীন্দ্রনাথ তখন আমেরিকাকে বলছেন পশ্চিমের বিপন্ন সভ্যতার পতাকা বহনকারীর ভূমিকা নিতে। বলছেন, …I connot but think that it is the special mission of America to fulfil this hope of God and man. You are the country of expectation […] America is destined to justify Western civilisation to the

East.2

এই আমেরিকা কিন্তু মোটেই নজরুলের আমেরিকা নয়; নজরুল যে আমেরিকাকে পছন্দ করতেন সেটি হুইটম্যানের; সেটি গণতন্ত্রাভিমুখী এবং সাধারণ মানুষের অগ্রযাত্রায় কোলাহলে মুখর। ইংরেজদের বিদায় করে আমেরিকানদের দ্বারস্থ হতে হবে এমন চিন্তা নতুন বিপ্লবী যুগের প্রতিনিধির পক্ষে ধারণ করা সম্ভব ছিল না।

ধরা যাক তাদের দু’জনের জীবনের সূচনাপর্বের চাঞ্চল্যকর দু’টি কবিতার কথা : রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ এবং নজরুলের ‘বিদ্রোহী’। শিল্পমূল্যের নয়, আমরা বক্তব্যের পার্থক্যটা দেখব। রবীন্দ্রনাথের কবিতার বিষয় পাহাড়ি ঝর্ণার স্বপ্নভঙ্গ, নজরুলের বিষয় জাগ্রত মানুষের বিদ্রোহ। রবীন্দ্রনাথ বলছেন বিশ্বময় তিনি করুণার ধারা ঢালবেন, নজরুল সর্বদাই করুণার পক্ষে, কিন্তু তিনি বলতে চাইছেন করুণা যথেষ্ট নয়, অবসান ঘটনো চাই অত্যাচারী শাসনের।

রবীন্দ্রনাথের বীর শিশু তার মা’কে পাহারা দেবে, লড়বে সে দস্যুদের সঙ্গে; নজরুলের শিশু বলছে রাত্রিশেষে মা’কে সে জাগিয়ে দেবে; কেবল মা’কে নয়, জাগাবে সবাইকে, সবাই না জাগলে সকাল হবে কি করে? রবীন্দ্রনাথের উপেনের তাও বিঘে দুই ভূমি ছিল, নজরুলের কৃষকের কোনো জায়গা-জমি নেই, সে এখন কুলি-মজুর। এই কুলি-মজুর যে বাউন্ডেলের মতো ঘুরে বেড়াবে তা নয়, তারা কাজ করবে শোষকদের অধীনে এবং শেষ পর্যন্ত শোষকদের কাছ থেকে তারা পাওনা আদায় করে নেবে, কেবল বাংলার ভূমিতে নয়, সারা বিশ্বে। এরা শ্রেণীসচেতন, অত্যাচারীর কাছে এরা ঋণী নয়, অত্যাচারীরাই এদের কাছে ঋণী, কারণ এদের শ্রমের ওপর ভর করেই অত্যাচারীরা দালান তুলেছে, বাষ্পশকটে-আকাশযানে চলাফেরা করছে। এরা বিচ্ছিন্ন থাকবে না, সংগঠিত হবে।

রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী এবং নজরুলের সেতু-বন্ধ প্রায় একই সময়ে লেখা; দুটিতেই মানুষ ও প্রকৃতির ওপর পুঁজিবাদী অত্যাচারের কথা রয়েছে। শিল্পমূল্যে রচনা দু’টির তুলনার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু বক্তব্যের ক্ষেত্রে পার্থক্যটা লক্ষ্য করার মতো। রক্তকরবীর রাজা এখনও মানুষই আছে, সেতু-বন্ধের রাজা কিন্তু মানুষ নয়, সে একটি যন্ত্র, তার নামই যন্ত্ররাজ। রক্তকরবীর রাজ্য চলে ধনসম্পত্তির দেবতা কুবেরের আদর্শে; সেতু-বন্ধের যন্ত্ররাজ্যের চালক নেপথ্যচারী কুটিল অর্থনীতিবিদ কৌটিল্য। যন্ত্ররাজার সিংহাসনের পেছনে সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা কথাগুলো কেটে দিয়ে লেখা রয়েছে বিদ্বেষ শোষণ পেষণ। রবীন্দ্রনাথের নাটকে রাজা মুক্ত হয় নন্দিনীর ডাকে, নজরুলের নাটকে যন্ত্ররাজ পদ্মার জলে নিক্ষিপ্ত হয় প্রকৃতির শক্তি এবং ভারবাহী মানুষ ও পশুর মিলনে। উভয় রাজত্বেই নেতৃত্ব নারীর, তবে রক্তকরবী নাটকের শেষে পিতৃতান্ত্রিকতার যে অবসান ঘটবে এমন নয়; নতুন ব্যবস্থায় পুরুষই আবার রাজা হবে। সেতু-বন্ধের রাজা বলে সে আবার ফিরে আসবে; প্রকৃতির প্রতিনিধি পদ্মানদী, সে জানায় যতবারই সে আসুক ততবারই সে নদীতে নিক্ষিপ্ত হবে।

পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নজরুলের মতো স্পষ্ট ও অনমনীয় অবস্থান এর আগে বাংলা ভাষায় দেখা গেছে কি না সন্দেহ। সেটা অবশ্য সম্ভবও ছিল না। কেননা পিতৃতান্ত্রিকতার কেন্দ্রে রয়েছে যে ব্যক্তি-মালিকানা তাকে প্রত্যাখানের যুগটা এর আগে আসে নি। সাম্যবাদী কবিতাগুচ্ছের ‘নারী’ কবিতায় বলা হচ্ছে “সাম্যের গান গাই-/ আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।/ বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।” আরও বলা হচ্ছে, “সে যুগ হয়েছে বাসি,/ যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক’, নারীরা আছিল দাসী/ বেদনার যুগ, সাম্যের যুগ আজি,/ কেহ রহিবে না বন্দি কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি।” নারীকে উদ্দেশ করে বেগম রোকেয়ার মতোই নজরুলও বলছেন, “চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায়ে মল/ মাথায় ঘোমটা, ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও শিকল।” তার ওই কবিতায় আছে, “ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মত আয় না পাতাল ফুড়ি।/ আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন-চুড়ি!/ পুরুষ যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও পদাঘাতে/ লুটিয়ে পড়িবে চরণ-তলে দলিত যমের সাথে।” অসাধারণ কবিতা ‘বারাঙ্গনা’; তাতে আছে “সেরেফ পশুর ক্ষুধা নিয়ে হেথা মিলে নরনারী যত,/ সেই কামনার সন্তান মোরা/ তবুও গর্ব কত।/ শোন ধর্মের চাই-/ জারজ কামজ সন্তানে দেখি কোনো সে প্রভেদ নাই।”

নজরুল সাহিত্যে এমন কিছু নারী চরিত্র আছে যাদেরকে ভোলা কঠিন। যেমন মৃত্যুক্ষুধা’র মেজ-বউ। মৃত্যুক্ষুধা’র জগৎটা দুঃখপ্রধান, যে জন্য নারীরাই সেখানে আধিপত্য করে, অভাবের পীড়নটা তাদের ওপর দিয়েই চলে বেশি। মেজ-বউদের পরিবারে বাবারা সবাই মারা গেছে, ছোট ছোট সন্তানের সংখ্যা এক ডজন। সম্পত্তি বলতে কানাকড়ি নেই, জীবনের যে সংগ্রাম তাতে দুঃখিত হবারও সময় পায় না। নজরুল কিন্তু কেবল দুঃখ দেখাচ্ছেন না, প্রতিকারের উপায়ও বলছেন। সে জন্য বলশেভিক আনসারকে নিয়ে এসেছেন। আনসার যেমন ঠিক তেমনি, সমান-মাপে, উজ্জ্বল মেজ-বউ। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পড়লে এমন একটা ধারণা তৈরি হতে পারে, যে সশস্ত্র বিপ্লবীরা নিজেদের প্রবৃত্তির তাড়নাতেই পরিচালিত, নজরুলের কুহেলিকা কিন্তু সে ধারণা দেয় না। তার বিপ্লবীরা আত্মত্যাগী, বিশেষ করে মেয়েরা। চম্পা ও তার মা জয়তী দু’জনই অসাধারণ; চম্পা জানে যে বিপ্লবীদের কারো কারো ভেতরে পশুত্ব রয়েছে, কিন্তু বিপ্লবী দলে সে পশুত্ব আবার প্রয়োজনও, শত্রু-হননের জন্য। দলে নতুন আগন্তুক জাহাঙ্গীরকে তারই সমবয়স্ক চম্পা বলছে, “তোমাদের মনের পশুকে একেবারে মেরে ফেললে তোমাদের দেবত্ব বা মনুষ্যত্ব দিয়ে আর যাই হোক- আমাদের যে মন্ত্র, যে সাধনা তার কিছুই হবে না।” কথাটা শুনে “জাহাঙ্গীর উঠিয়া আসিয়া চম্পার দুই হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিল, ‘চম্পা, এমন কথা তো কেউ কোনো দিন বলেনি। প্রমত-দা’ও নয়’।” প্রমত-দা’ অসাধারণ। দলের কর্মীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক পিতার মতো নয়, মাতার মতো; কিন্তু দৃষ্টির স্বচ্ছতার ব্যাপারে সেও পিছিয়ে রয়েছে, চম্পার তুলনায়।

চিন্তার ক্ষেত্রে নজরুল অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেছেন। নবযুগ পত্রিকায় বিপ্লবের কথা নেই, ধূমকেতুতে তা এসে গেছে; কিন্তু ধূমকেতু’র বিপ্লবটা কিছুটা নৈরাজ্যিক, সেই দুর্বলতা সংশোধন করে এলো লাঙল। কৃষকের কথা তখন অন্যদের অধিকাংশই সেভাবে ভাবছে না, যেভাবে নজরুল ভাবছেন। আসলে মধ্যবিত্ত ছিল কৃষকবিদ্বেষী। নজরুল নিয়ে এলেন কৃষকের কথা; করুণা প্রকাশ করার জন্য নয়, বিপ্লবের মূল শক্তি হিসেবে। লাঙল-এর পরে এল গণবাণী, যেখানে কৃষক আছে, রয়েছে শ্রমিকও। তার কবিতার বইয়ের নাম দাঁড়াচ্ছে সাম্যবাদী এবং সর্বহারা। তিনি লিখছেন শ্রমিক, কৃষক, ধীবর, ছাত্র, নারী, চোর-ডাকাত সবাইকে উদ্বুদ্ধ করবার জন্য। ঢাকায় তার তরুণ বন্ধুরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক মুসলিম সাহিত্য সমাজ গড়ছেন নজরুল তখন কৃষ্ণনগরে ব্যস্ত রয়েছেন কৃষক ও শ্রমিকদের নিয়ে সাম্যবাদী রাজনৈতিক দলের পত্তনে। কেবল বুদ্ধির মুক্তির জন্য নয়, কাজ করছেন হৃদয়বান বুদ্ধি ও বুদ্ধিমান হৃদয়কে প্রশিক্ষিত ও ঐক্যবদ্ধ করতে। দেশে সাম্প্রদায়িকতা যখন রক্তাক্ত হয়ে উঠছে, নজরুল তখন গান গেয়ে ডাক দিচ্ছেন সব সম্প্রদায়কে মূল শত্রু ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য; বলছেন- হিন্দু না মুসলিম জিজ্ঞাসা করো না, বলো ডুবছে সন্তান মোর মা’র, জানে না সে সন্তরণ।

ধূমকেতু এবং লাঙল দুই পত্রিকার জন্যই রবীন্দ্রনাথ বাণী লিখেছিলেন। বাণী দু’টি তাৎপর্যপূর্ণ। ধূমকেতুর জন্য লিখেছেন, “আয়রে চলে আয়রে ধূমকেতু/ আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/ দুর্দিনের এই দুর্গশিরে/ উড়িয়ে দে রে তোর বিজয় কেতন/ অলুক্ষণের তিলকরেখা রাতের ভালে হোক না লেখা/ জাগিয়ে দে রে চমক মেরে আছে যারা অচেতন।” পত্রিকার ব্যাপারে নজরুলের সঙ্গে তার কোনো আলাপ হয়নি, কিন্তু তিনি বুঝে নিয়েছেন ধূমকেতু কি চায়। আঁধারে আলো আনা, অচেতনকে চমকে দিয়ে জাগিয়ে তোলা- এ কাজ এই অর্ধ-সাপ্তাহিকের। লাঙলে’র বাণীটিতেও জাগরণের কথা আছে, রয়েছে প্রাণ ও শক্তিদানের কথাও; লক্ষ্য করবার মতো নতুন বক্তব্যটি হচ্ছে- ‘স্তব্ধ করো ব্যর্থ কোলাহল’। কোলাহল তো চলছিলই, কিন্তু কোনো কোলাহলই সফল হয়নি, রবীন্দ্রনাথ আশা করছেন নতুন পত্রিকাটি অর্থহীন কোলাহলকে স্তব্ধ করে দিয়ে নতুন বাণী নিয়ে আসবে।

লাঙল এবং গণবাণী নতুন বাণী নিয়ে এসেছিল বৈকি। সেটা হচ্ছে সমাজব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের। লাঙল-এর প্রথম সংখ্যার বিষয়সূচির দিকে তাকালেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে। ছিল ‘সাম্যবাদী’ নামে নজরুলের কবিতাগুচ্ছ; সঙ্গে ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাস মা-এর ধারাবাহিক অনুবাদ; কার্ল মার্কসের সংক্ষিপ্ত জীবনী, বাংলার প্রজাস্বত্ব আইন নিয়ে আলোচনা, এবং একটি ছবি যাতে দেখা যাচ্ছে একজন শ্রমিক কীভাবে মালিকের দ্বারা নিগৃহীত হচ্ছে। দ্বিতীয় সংখ্যাতে ছিল মার্কস ও তার অর্থনৈতিক চিন্তার ওপর একটি প্রবন্ধ; তৃতীয় সংখ্যাতে লেনিন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর একটি আলোচনা। পঞ্চম সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল কমিউনিজম ও বলশেভিজম নিয়ে একটি বক্তৃতার অনুবাদ। পরবর্তী একটি সংখ্যাতে ব্রিটিশ ইতিহাস সম্পর্কে মার্কসের বক্তব্যের বিশ্লেষণ দেয়া হয়েছিল। পঞ্চদশ সংখ্যা থেকে লাঙল-এর প্রচ্ছদে হাতুড়ি ও কাস্তের প্রতীক থাকতো; এর আগে উপমহাদেশে অন্যকোনো পত্রিকা এই প্রতীক ছাপে নি। ১৯২২ সালে যে নজরুল বলেছিলেন স্বরাজ-টরাজ বোঝেন না, ওর অর্থ একেকজন একেক ভাবে করেন, তিনি চান ভারতের এক পরমাণু অংশও ব্রিটিশের অধীনে থাকবে না, সে-নজরুল ১৯২৬-এ এসে একজন পরিপূর্ণ মার্কসবাদী-লেনিনবাদীতে পরিণত হয়েছিলেন। ইন্টারন্যাশনাল নামে যে গানটি সারা পৃথিবীর কমিউনিস্টরা গেয়ে থাকে, নজরুল সেটির বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। কোনো ভারতীয় ভাষায় এটিই ওই গানের প্রথম অনুবাদ। গানের সুর জানা ছিল না, ইংরেজি অনুবাদের কপি সংগ্রহ করা হয়েছিল একটি আমেরিকান নাটকে-দেয়া উদ্ধৃতি থেকে। লাঙল-এর নাম বদলে গণবাণী হিসেবে প্রকাশিত হয় ১৯২৬-এর ১২ আগস্ট। প্রথম সংখ্যা থেকেই পত্রিকার নামের ওপরে লেখা থাকত, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও।’৩

নতুন বাণী আনার কাজটিই ছিল নজরুলের লক্ষ্যবস্তু। নতুন যুগের তিনটি প্রশ্ন প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন তিনটি আগেও ছিল; কিন্তু নজরুলের সময়ে এরা মীমাংসার জন্য বিশেষভাবে সামনে চলে আসে। প্রশ্ন তিনটি হচ্ছে, জাতীয়তাবাদ, শ্রেণী এবং নারী-পুরুষ সম্পর্ক।

তার সময়ে জাতীয়তাবাদীরা ছিল প্রধান রাজনৈতিক শক্তি; এবং জাতীয়তাবাদীরা এদলে-ওদলে বিভক্ত ছিল সত্য, কিন্তু সবাই ছিল পুঁজিবাদে বিশ্বাসী। ব্রিটিশের কারসাজি এবং নিজেদের শ্রেণীগত স্বার্থ পরিপুষ্টির অভিসন্ধি একত্রযোগে তৈরি করে দেয় সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি। ব্রিটিশ-বিরোধিতাকে পেছনে ঠেলে দিয়ে সাম্প্রদায়গত প্রতিদ্বন্দ্বিতাই প্রধান হয়ে ওঠার দিকে এগুতে থাকে। ভারতের জাতি-সমস্যার সমাধান নিহিত ছিল ধর্মের জায়গাতে ভাষাকে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করার ভেতরে। নজরুলের রচনাবলী পাঠ করলে দেখা যাবে যে, বাঙালিদের তিনি একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবেই দেখতেন। ভারতীয় পরিচয়টাকে তিনি অস্বীকার করেননি, সে পরিচয়টা বিশেষভাবে দরকার ছিল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে। ১৯৪০-এর পর থেকে তার নিকটজনরা কেউ কেউ যখন ‘পাকিস্তান’ দাবির পক্ষে বলে গেছেন, নজরুল তখন পাকিস্তানকে ফাঁকিস্তান বলেছেন, এবং বাকহারা হওয়ার আগের একটি লেখাতে বাঙালির জয়ের পক্ষে বলেছেন, বলেছেন জয়ের জন্য ঐক্য প্রয়োজন এবং তাৎপর্যপূর্ণভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ওই বাংলায় বিদেশি রামা ও গামাদের জায়গা থাকবে না, বাংলা হবে বাঙালির। তখনকার লেখকদের অনেকের ভেতরই জাতীয় পরিচয় নিয়ে দ্বিধা ছিল, নজরুলের মধ্যে সেটা ছিল না। রবীন্দ্রনাথও নিজেকে একই সঙ্গে বাঙালি ও ভারতীয় মনে করেছেন, নজরুল তা করতেন না। নজরুলের ওই ধারা যদি প্রধান হয়ে উঠত তা হলে ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের মতো ট্র্যাজেডি ঘটতো না, পাঞ্জাবও ভাগ হতো না। ভারতীয় উপমহাদেশ সুযোগ পেত বহুজাতির একটি দেশে পরিণত হওয়ার, বাস্তবে যেটি সত্য ছিল। ভারত বহুজাতির দেশ হিসেবে নিজেকে চিনে ফেলুক এটা ব্রিটিশরা চায়নি। ভারতীয় বণিকেরাও চায়নি, চায়নি এমনকি উদারনীতিক রাজনীতিকরাও। এমনকি কমিউনিস্ট পার্টিও জোরগলায় দেশভাগের বিরোধিতা করতে পারেনি, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিভ্রান্তি ছিল। নজরুল ব্যাপারটাকে স্বচ্ছ দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু তার পক্ষে কী-ই বা করবার ছিল।

সব মিলিয়ে নজরুলের যে পরিচয়টি ফুটে ওঠে সেটা হল বাংলা সাহিত্যে তিনিই ছিলেন পরিপূর্ণ অর্থে প্রথম বাঙালি লেখক। বঙ্কিমচন্দ্র একদা বলেছিলেন যে, ঈশ্বর গুপ্ত হচ্ছেন খাঁটি বাঙালি কবি; তাতে বোঝা যায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীকেই তিনি জাতি বলে মেনে নিয়েছিলেন; অন্যরা আবার শ্রেণীকে নয় সম্প্রদায়কেই জাতি ভাবতেন। নজরুলই প্রথম বাঙালি যিনি হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান বৌদ্ধ নির্বিশেষে সব বাঙালিকে সাহিত্যে একত্রে নিয়ে এসেছেন, সেই সঙ্গে এনেছেন সব শ্রেণীকে; ভেঙে দিয়েছেন নারী-পুরুষের বৈষম্য। এমনটি আগে কখনও ঘটেনি। জীবনানন্দ দাশও খাঁটি বাঙালি কবি, বয়সে সমসাময়িক হলেও কাব্যক্ষেত্রে নজরুলের তিনি পরবর্তী; তদুপরি তিনি ততটা বিস্তৃত ও সর্বজনীন নন, নজরুল যতটা ছিলেন।

সমাজ যে শ্রেণীতে বিভক্ত এটা বোঝা তো কোনো কষ্টের ব্যাপার নয়। কিন্তু সেই রূঢ় বাস্তবতাকে আচ্ছাদিত করে রাখা হয়েছিল জাতি প্রশ্নের অন্তরালে। আর জাতি হিসেবে তখন দাঁড় করানো হয়েছিল সম্প্রদায়কেই। নজরুল শ্রেণী বুঝতেন। সাহিত্যে শ্রেণীর কথা তিনি যেভাবে তুলে ধরেছেন তখনকার অন্য কোনো লেখক তেমনটা করতে পারেননি; উদারনীতিকরা তো ধারে-কাছেও ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য ছিল ভারতের সমস্যাটা রাজনৈতিক নয়, সামাজিক। নজরুলের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, রাজনৈতিক সমস্যাকে উপেক্ষা করবার কোনো উপায়ই নেই; এবং ব্রিটিশের রাষ্ট্রীয় শাসন আছে বলেই সমাজ মুক্ত হতে পারছে না। রাষ্ট্রকে তাই বদলাতে হবে, তবে ধনীর স্বার্থে নয়, জনগণের স্বার্থে- এই ছিল তার উপলব্ধি। রাষ্ট্র যে কত বড় শত্রু সে তো নজরুল বুঝেছেন তার নিজের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দেখেই; জেলখানায় বসে লেখা এবং আদালতে দাঁড়িয়ে পাঠ করা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দীতে’ নজরুল বলেছেন যে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রাজদ্রোহের, এবং তিনি যে সেটা অস্বীকার করছেন না। তার ‘আজ চাই কি’ প্রবন্ধে রাষ্ট্র পরাধীনতাকে রক্তচোষা রাক্ষসীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তার প্রথম জীবনে আমেরিকার সমাজে বিদ্যমান সহিংসতার ওপর দু’টি ছোট প্রবন্ধ লিখেছিলেন, তাতে উল্লেখ ছিল যে, ওই সহিংসতার উৎস হচ্ছে আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার ও দাসব্যবস্থা; সেই আমেরিকা যখন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তখন সে যে তার ওই সহিংসতাকে সঙ্গেই রাখবে এই সত্যটা পরে স্থূলভাবেই ধরা পড়েছে, রবীন্দ্রনাথের উদারনীতি যদিও সে ব্যাপারটি দেখেনি।

তৃতীয় বিষয় নারী-পুরুষ সম্পর্ক। এই সম্পর্কের ভেতর প্রেম থাকে, কামও থাকে; উভয় প্রবণতার সত্যই নজরুল তার লেখাতে নিয়ে এসেছেন; কিন্তু যেখানে তিনি নতুন যুগের মুখপাত্র সে জায়গাটা হল নারী-পুরুষে সাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। এ কাজে নজরুল কখনও পরিশ্রান্ত হননি। আর তিনি যেটা চাইছিলেন তা হল নারী-পুরুষ বৈষম্যের আসল যে নিয়ন্ত্রক, পিতৃতান্ত্রিকতা, তার অবসান; যে পিতৃতান্ত্রিকতা দাস ব্যবস্থায় ছিল, ছিল সামন্ত ব্যবস্থাতে এবং যার অবসান ঘটেনি পুঁজিবাদেও। এবং আমরা তো দেখছিই এই ‘সুসভ্য’ বিশ্বে পিতৃতান্ত্রিকতা নারীকে কিভাবে লাঞ্ছিত করছে।

কিন্তু নজরুল তো চুপ হয়ে গেলেন ১৯৪২-এ এসেই। চুপ হয়ে যাননি, আসলে তাকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়েছে। শত্রুপক্ষের ভেতরে প্রথম ছিল ব্রিটিশ রাষ্ট্র। হেন নির্যাতন নেই রাষ্ট্র যা নজরুলের ওপর চালায়নি। দ্বিতীয়ত ছিল অর্থনৈতিক সংকট। নজরুলের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না, ছিল না এমনকি স্থায়ী বাসগৃহও। শরৎচন্দ্রও নজরুলের মতোই জীবিকার জন্য সাহিত্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন; লেখক হিসেবে দু’জনই ছিলেন অসম্ভব রকমের জনপ্রিয়। কিন্তু শরৎচন্দ্র লিখতেন উপন্যাস ও গল্প, তাদের কাটতি থেকে যে আয় হতো কবিতার বই থেকে সে আয় আসবার কথা নয়। আসেওনি। তাছাড়া নজরুলের ছয়টি বই ছিল নিষিদ্ধ। অভাবের কারণে কোনো কোনো বইয়ের গ্রন্থস্বত্ব তিনি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। তাই দেখা যায় শরৎচন্দ্র যখন কলকাতা শহরে চমৎকার একটি বাড়ি তৈরি করেছেন নজরুল তখন পুরোপুরি উদ্বাস্তু। অর্থ ব্যবস্থাপনায় নজরুলের না ছিল দক্ষতা না আগ্রহ। শখ করে এক সময়ে তিনি একটি মোটর গাড়ি কিনে ছিলেন, কিন্তু রাখতে পারেননি। কবিতা ও গদ্য চর্চা ছেড়ে নজরুল যে এক সময়ে পুরোপুরি গানের জগতে চলে গিয়েছিলেন তার পেছনেও অর্থনৈতিক কারণ ছিল। গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে ভালো আয় হতো, যে আয় অন্য কোনোভাবে সম্ভব ছিল না। এক সময়ে রেকর্ডের দোকান খুলবেন ভেবেছিলেন, উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিন্তু সফল হননি।

নজরুল ভয়ঙ্করভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন শোক ও ব্যাধির দ্বারা। চুপ হয়ে যাওয়ার পেছনে সেটা একটা বড় কারণ। অত্যন্ত আদরের সন্তান বুলবুলকে হারিয়ে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। তার স্ত্রী প্রথমে বাতে আক্রান্ত হন, পরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য বন্ধুদের পরামর্শে তিনি এক আধ্যাত্মিক ‘বন্ধু’র শরণাপন্ন হয়েছিলেন, অবধারিতরূপেই তাতে অবস্থার উন্নতি না হয়ে অবনতিই ঘটেছিল।

আর ছিল অতিরিক্ত মানসিক পরিশ্রম। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে লিখতেন, নিজের মস্তিষ্ককে কোনো প্রকার বিশ্রাম দিতেন না। সেই পরিশ্রম তার মস্তিষ্কের ওপর এমন চাপ ফেলেছিল যেটা তার মতো অসাধারণ প্রতিভার পক্ষেও বহন করা সম্ভব হয়নি। তদুপরি তার যথার্থ চিকিৎসা হয়নি; যেটুকু হয়েছে তাও ছিল বিলম্বিত ও অপর্যাপ্ত।

ছিল রাজনৈতিক হতাশা। যে রাজনীতির তিনি প্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন নানা কারণে সেটি এগুতে পারেনি। মৃত্যুক্ষুধা’র বলশেভিক নায়ক আনসার যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছে, ফলে বেঁচে থাকতে পারেনি; কমরেড মুজফ্ফর আহমদকে কারাগারে, অন্তরীণে ও আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে, তারও যক্ষ্মা হয়েছিল, মারা যেতে পারতেন। বাংলায় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা যারা ঘটিয়ে ছিলেন তারা অবস্থাপন্ন ছিলেন না, সবাই দরিদ্র ছিলেন, নজরুলের মতোই। পার্টি পরে বিভ্রান্তিতেও পড়েছিল। রাষ্ট্রীয় নিষ্পেষণ তো ছিল অমানুষিক। আন্দোলনের দৈন্যদশা তাকে দুঃখ-ভারাক্রান্ত করে থাকবে। আর এটাও সত্য যে পার্টি যে তার চিকিৎসার ব্যাপারে যত্ন নেবে, তাও করেনি।

নজরুলের এই নিশ্চুপীকরণ একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এর ভেতরে সমষ্টিগত দুঃখ ও ব্যর্থতা রয়েছে। দুঃখ ও ব্যর্থতা কেবল প্রতীক হিসেবে নয়, বাস্তবিক অর্থেও। স্বাধীনতার যে আন্দোলন চলছিল তার পরিণতি সমাজবিপ্লবে ঘটবে এমন একটি মহাকাব্যিক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, সেটি পরিণত হল ট্র্যাজেডিতে। দেশ ভাগ হল, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে গেল ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য; পূর্ববঙ্গ চলে গেল পাকিস্তানের কব্জায়, যেখান থেকে বের হয়ে আসতে পূর্ববঙ্গের মানুষকে রীতিমতো যুদ্ধে যেতে হয়েছে। কলকাতা হাতছাড়া হয়ে গেল পূর্ববঙ্গের, সেই শহর ক্রমে ক্রমে চলে গেল অবাঙালিদের দখলে। দু’দিকেই প্রতিষ্ঠিত হল পুঁজিবাদে দীক্ষিতরা। কাটা পড়লো নদী, ভাগ করা হল প্রকৃতিকে, দুর্বল হল দু’দিকেরই অর্থনীতি; ভয়ঙ্কর ক্ষতি হল সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, চিত্রকলার, এক কথায় সমগ্র সংস্কৃতির। বিভক্ত অবস্থায় মস্ত বড় বিপদ দেখা দিল সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতির। বামপন্থিদের ভাগ করে ফেলা হল এবং উভয় বঙ্গে তাদের ওপর চলল ব্রিটিশ আমলের চেয়েও ভয়াবহ নিপীড়ন। মোট কথা, এপার বাংলা ওপার বাংলার ফাঁকে পড়ে আসল বাংলার দশাটা দাঁড়াল জবুথবু; নজরুল যে বাংলার মুখপাত্র ছিলেন সে-বাংলা এগুতে পারল না।

স্পেনের কবি গার্সিয়া লোরকার কথা স্মরণে আসে। একই বছরে জন্ম নজরুল ও লোরকার; উভয়েই ছিলেন বিপ্লবের চেতনায় সর্বক্ষণ উদ্বুদ্ধ। মানুষের ওপর রাষ্ট্র ও সমাজের নিপীড়নের বিষয়ে লিখতেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে লোরকা অস্ত্রহাতে অংশ নেন এবং প্রাণ দেন। নজরুলও যুদ্ধে ছিলেন; তাকে হত্যা করা হয়নি, কিন্তু স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছিল। নজরুলের পরে মার্কসবাদী ধারায় দু’জন প্রধান লেখক এসেছিলেন, সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-৪৭) এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-৫৬)। দু’জনের কেউই দীর্ঘজীবন লাভ করেননি। মানিক তবু বেঁচে ছিলেন ৪৮ বছর, সুকান্তের জীবনকাল মাত্র ২১ বছরের, কাব্যচর্চার সুযোগ পেয়েছেন ৭ বছর, যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন সে বছরই, যে বছর দেশভাগ হল, নিজের প্রথম কবিতার বইটির প্রকাশনাও তিনি দেখে যেতে পারেননি।

সুকান্ত নজরুলের মতোই অনেক কাজে নিযুক্ত ছিলেন; কবিতা লিখতেন, গান লিখেছেন, ছোটদের জন্য তার রচনা আছে। ছিল তার কৌতুকের বোধ যা দিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করেছেন শত্রুপক্ষকে। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন, পার্টির মুখপত্র দৈনিক স্বাধীনতায় কাজ করতেন। ছাত্র ফেডারেশনের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কিশোর বাহিনীতে তার সাংগঠনিক দায়িত্ব ছিল। নজরুলের সাতাশ বছর পরে তার জন্ম, কিন্তু তখন নতুন কোনো যুগ তৈরি হয়নি, সমাজে তখন বিপ্লবী ধারাটা আছে, কিন্তু বুর্জোয়া রাজনীতির ধারাটাই আগের মতো প্রধান হয়ে রয়েছে। তৎপর রয়েছে পুঁজিবাদী সেই শক্তিগুলো যারা নজরুলকে স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম হয়েছিল। নজরুলের সঙ্গে সুকান্তের বিশেষ নৈকট্য এই ক্ষেত্রে যে তিনিও পুরোপুরি বাঙালি এবং সার্বক্ষণিক বিপ্লবী। তার সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ভয়াবহ মাত্রা নিয়েছে, ১৯৪৬-এ কলকাতার দাঙ্গায় কমপক্ষে দশ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, ১৯৪৩-এর মন্বন্তরে ত্রিশ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়; কিন্তু সে সব ঘটনা তাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। তিনি উদ্দীপ্ত হয়েছেন চতুর্দিকে বিদ্রোহ দেখে এবং বিপ্লবের সম্ভাবনা অনুভব করে। সুকান্ত মেহনতী মানুষদের পক্ষে লিখেছেন, তে-ভাগা আন্দোলনে কৃষকদের যে অভ্যুত্থান ঘটেছে এবং কলকাতায় শ্রমিকদের যে বিক্ষোভ দেখেছেন, তাতে বাংলাদেশকে সাবাস দিয়েছেন, নিজেকে দেখতে পেয়েছেন বিপ্লবের একজন সৈনিক হিসেবে। চারদিকে দামামা বাজছে বিপ্লবের, একজন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী হিসেবে ‘বিপ্লব-স্পন্দিত বুকে’ মনে হচ্ছে তিনিই লেনিন। ধূর্ত মধ্যবিত্তকে তিনিও ঘৃণা করেন, ইংরেজের বিরুদ্ধে বস্তির আলীজানের লড়াই আর তার লড়াই অভিন্ন হয়ে ওঠে। নজরুলের মতোই তিনিও জানেন মেহনতীরা তাদের পাওনা সুদে ও আসলে কড়ায় গ্লায় আদায় করে নেবে। তিনিও ইতিহাস-সচেতন, ইতিহাসকে সম্বোধন করে বলেছেন, ‘জানি নীরব সাক্ষী তুমি/ আমরা চেয়েছি স্বাধীন স্বদেশ ভূমি’, এবং নিজের ভূমিকা সম্বন্ধে তারও বক্তব্য, ‘ইতিহাস! নেই অমরত্বের লোভ, আজ রেখে যাই আজকের বিক্ষোভ’। নজরুলের মতোই তিনিও রবীন্দ্রনাথের ধারা থেকে স্বতন্ত্র, এবং নজরুলের মতোই রবীন্দ্রনাথকে তিনি আত্মস্ত করে তবেই এগিয়েছেন। তার স্বল্পসংখ্যক রচনার মধ্যে তিন তিনটি কবিতা আছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। ‘প্রথম বার্ষিকী’ কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরের বছর যে পৃথিবীকে সুকান্ত দেখতে পাচ্ছেন সেখান মুখ্য সত্য হচ্ছে আতঙ্ক। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় নিজেকে বলছেন ‘দুর্ভিক্ষের কবি’; আর ভীষণ অন্ধকারের ভেতরেও ভরসা পাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিরা আছে বলে। তৃতীয় কবিতাটির নাম ‘পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশে’। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনকে সম্বোধন করে তিনি বলছেন, ‘আর একবার জন্ম দাও রবীন্দ্রনাথের’; তার আশা পরিবর্তিত পৃথিবীতে যে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা হবে ভিন্ন রকমের এবং নিজে অনুভব করছেন চারদিকে দিনবদলের যে দামামা বাজছে তাতে দ্বিতীয় রবীন্দ্রনাথের আগমন অনিবার্য। কিন্তু ঈপ্সিত রবীন্দ্রনাথের তো আর আসা সম্ভব ছিল না; এসেছেন তার উদারনীতির ধারার নতুন প্রতিনিধিরা যারা বিপ্লববিরোধী এবং গোপনে তো বটেই প্রকাশ্যেও যারা পুঁজিবাদের সমর্থক। এই সাহিত্যিকরাই শক্তিশালী, কিন্তু এরা জনগণের পক্ষে অবস্থান নেন না, নিতে পারেন না। নজরুলের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া, সুকান্তের দ্রুত প্রস্থান, অনেকটা সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ার মতোই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা; কিন্তু তা ছিল অনিবার্যও। পৃথিবী স্থির থাকে না, বিপ্লব না এগুলে প্রতিবিপ্লব তো এগুবেই।

সাহিত্য আরও অনেককিছুর ভেতর একটা রুচিও তৈরি করে দেয়। উদারনীতিক সেই রুচির সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিনিধি হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ, সাহিত্য ক্ষেত্রে ওই রুচিই স্থায়ী হয়ে আছে। নজরুল যে একটা ভিন্ন রুচি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন সেটি পেছনে হটে গেছে। সাহিত্য ভদ্রলোকরাই লেখেন এবং তারাই পড়েন; শিক্ষা সর্বজনীন হয়নি এবং শিক্ষিত ব্যক্তিরা যতটা না মানবিক হতে চেয়েছে তার চেয়ে বেশি চেষ্টা করেছে ভদ্রলোক হওয়ার; ভদ্রলোকদের রাজত্বে নজরুলের গান তবুও চলে, তার সাহিত্য কদর পায় না, মনে হয় কেমন যেন গরিব গরিব, আবার উচ্চকণ্ঠও, অর্থাৎ অভদ্র। পিতৃতান্ত্রিক এই ব্যবস্থায় বিপ্লব যা করবার শরৎচন্দ্রের সব্যসাচীরাই করেছে, নজরুলের সব্যসাচীরা পারেনি। পরাজয়টা নজরুলের একার নয়, দেশের শতকরা আশিজন সুযোগবঞ্চিত মানুষেরই।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দরিদ্র নিম্নবিত্তের মানুষদের নিয়ে লিখেছেন, প্রথম জীবনে মানুষকে তিনি দেখতেন নানাবিধ শক্তির হাতে পুতুল হিসেবে, পরে মার্কসবাদী দৃষ্টিতে বিচার করতে গিয়ে দেখতে পেয়েছেন মূল নিয়ন্ত্রক অর্থনীতি। পরবর্তী জীবনের কথাসাহিত্য ওই সত্যটির যে উন্মোচন তিনি ঘটিয়েছেন তেমনটা অন্য কোনো কথাসাহিত্যিক করতে পারেননি। কিন্তু তিনি এটাও দেখতে পেয়েছেন যে, তার কালের মার্কসবাদীরা; সমাজের মন বোঝেনি, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে ডাইরিতে ছোট্ট করে লিখেছিলেন সিপিআই ভারতের মন বোঝে না; সেই অভিযোগ মিথ্যা ছিল না। ওই না বোঝার দরুনই পরে সিপিআই দু’টুকরো হয়েছে, বুদ্ধিজীবীরা অধিকাংশই রয়ে গেছেন সিপিআই-এর সঙ্গে, কিন্তু অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে সিপিএম; এবং সিপিএমও যখন বিপ্লবী ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে তখন বিদ্রোহ করে শত শত মেধাবান তরুণ যোগ দিয়েছে নকশালবাড়ির বিপ্লব-স্পন্দিত আন্দোলনে; এবং নৃশংস বর্বরতায় প্রাণ হারিয়েছে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসিদের হাতে।

নজরুল পরবর্তীদের ভেতর সমর সেন (১৯১৬-৮৭) মার্কসবাদী ধারায় কবিতা লিখবেন বলে ঠিক করেছিলেন, কিন্তু বেশিদূর এগুতে পারেননি, ১৯৪৭-এ এসে কবিতা লেখাই থামিয়ে দিয়েছেন। এটা সেই সময় যখন সুকান্ত লিখেছেন যে, কবিতাকে তিনি ছুটি দেবেন, কেননা ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় হয়ে পড়েছে। কবিতা ছাড়বেন কিন্তু তাই বলে যে আন্দোলন ছাড়বেন এমন বক্তব্য সুকান্তের ছিল না; সমর সেনও কবিতা ছেড়েছেন কিন্তু আন্দোলনে থেকেছেন, কেবল থাকেনইনি, নজরুলের মতোই স্বউদ্যোগে ও সম্পাদনায় ফ্রন্টিয়ার নামে সাপ্তাহিক বের করে বিপ্লবী ভূমিকাকে প্রসারিত করতে সচেষ্ট থেকেছেন এবং আজীবন মার্কসবাদীই রয়ে গেছেন। সেটা কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) করতে পারেননি। কমিউনিস্ট হিসেবে জীবন শুরু করে জীবন শেষ করেছেন কংগ্রেসি হিসেবে। ঢাকায় তিনি একাধিকবার এসেছেন। শেষবার এসেছিলেন এরশাদের রাজত্বকালে, রাজকীয় কবিতা উৎসবে যোগ দিতে। তার সহপাঠী ফররুখ আহমদের (১৯১৮-৭৪) ভেতরও ছাত্রজীবনে বিলক্ষণ বামপন্থি প্রবণতা ছিল, কিন্তু তিনিও জীবন শেষ করেছেন পাকিস্তানপন্থি হিসেবে। নিচে নামার পথ সব সময়ই প্রশস্ত।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

তথ্যসূত্র

১. উদ্ধৃত, চির উন্নত শির, সম্পাদক মানিক মুখোপাধ্যায়, সারা বাংলা নজরুল শতবর্ষ কমিটি, কলকাতা ২০০১, পৃ ১৮৪-৮৬

২. Rabindra Oevure, Dhaka, Pathok Samabesh, 2013, vol xx, p 439

৩. চির উন্নত শির, প্রাগুক্ত, পৃ ১৩০-৪০

Share this post

PinIt
scroll to top
bedava bahis bahis siteleri
bahis siteleri