সিরিয়া যুদ্ধের চোরাবালিতে ডুবছেন এরদোগান

erdogan-syria.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(৩ ফেব্রুয়ারি) :: গত মাসে ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’-এর সর্বশেষ তরতাজা বিজ্ঞাপন প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপের পর হুটহাট করেই বিশ্বরাজনীতির মোড়ল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিরিয়ার ‘গৃহযুদ্ধ’ থেকে আমেরিকার সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা বিশ্ববাসীকে অবাক করেছে এবং পরমুহূর্তেই এ সিদ্ধান্তকে রাশিয়া, ইরান ও তুরস্কের পক্ষ থেকে সময়োচিত আখ্যা দিয়ে সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মুহূর্তটির জন্য অধীর আগ্রহের কথা জানান দেয়া হলো। এ সংকটপূর্ণ সিদ্ধান্ত ট্রাম্প ও এরদোগানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে অনুকূল বাতাস বইয়ে দেবে, তা দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার। একই সঙ্গে পুতিনকে পরিষ্কারভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে সিরিয়ায় আমেরিকার নতজানুর আরাম আর ইরানকে সিরিয়ার অভ্যন্তরে আরো বেশি শক্ত ঘাঁটি বানানোর সুযোগ করে দেবে সন্দেহাতীতভাবে।

তবে পাঠককে আগেই জানান দিতে চাই কোনো ধরনের লুকোচুরি ছাড়াই যে, আজ আমি এ জটিল ও ঘোলা পরিস্থিতিতে যেভাবে এরদোগান ভয়ংকর এক চোরাবালির ছোবলে শিকার হতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে আলাপ করতে আগ্রহী। কারণটা পরিষ্কার, সিরিয়ান যুদ্ধে ২০১৬ সালের পর থেকে তুরস্কের নেয়া প্রতিটি পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে নির্বিচারে, আর এ দামামায় উসকানি দিয়ে এরদোগান কীভাবে নতুন এক ইসলামী জাতীয়তাবাদ উত্থানের নায়ক হতে চলেছেন, যেন মিসরের গামাল আবদেল নাসেরের মতো।

গণতান্ত্রিক অধিকারচর্চার নামেই আসছে মার্চের শেষ দিনে তুর্কিবাসী সাধারণ পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি নির্বাচন করার জন্য ভোট প্রদান করবেন, যদিও পাশ্চাত্যের নিবাসীরা তুরস্ককে আরো গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যে মোড়ানো দেখতে যারপরনাই অনাগ্রহী। অনাগ্রহের কারণগুলো অন্যদিনের আলাপের জন্য তুলে রেখে সামনে এগোনোই ভালো। তুরস্কের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকেই এরদোগানের সেই সুদিন নেই বলতে চাওয়া অবিচার হবে বলে মনে করার পক্ষে নই। কারণ হিসেবে অর্থনীতির চরম দুরবস্থা ও নগ্নভাবে তুর্কি মুদ্রার দাম পড়ে যাওয়া, যা কিনা দুর্বল অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং অস্থির পররাষ্ট্রনীতির প্রতীক।

তরতর করে সাধারণ পণ্যের দাম নাগালের বাইরে যাওয়া, সিরিয়ার যুদ্ধে নগ্নভাবে জড়ানো এবং নতুন করে তুর্কি জাতীয়তাবাদের নগ্ন উত্থান, যা কিনা অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে ভয়ংকরভাবে বেদনার পাশাপাশি আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে আগামীর জন্য। এ সবই এরদোগানের সুদিনকে কঠিন দিনে রূপান্তরিত করছে। এখানে বলে রাখা ভালো, সিরিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্টতা তুরস্কের জাতীয় স্বার্থের চেয়ে এরদোগানের অহমিকার ফলাফল হিসেবেই দেখতে আগ্রহী সাধারণ মানুষদের একটি অংশ, আবার যাদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছেন না তুর্কি সমাজের অনেক উচ্চ মহলের মানুষজনও। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল সিরিয়ান যুদ্ধকে এরদোগানের নিজস্ব যুদ্ধ হিসেবে অবহিত করেছে বারবার।

কুর্দিদের একটি অংশ অন্ততপক্ষে শত বছর ধরে নিজস্ব রাষ্ট্রের জন্য বা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্তাক্ত সংগ্রামে লিপ্ত এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ আন্দোলন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিরাপদ মাতৃভূমির সংগ্রামকে বেগবান করেছে তুমুলভাবে। গত শতাব্দীর শেষ ভাগে কুর্দিরা তাদের এ সংগ্রামকে কমিউনিস্ট মতবাদের সঙ্গে একাত্ম ঘোষণা করে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করে ইরাক, ইরান ও তুরস্কে, যা কিনা আমাদের উপমহাদেশের নকশালবাড়ী আন্দোলনের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে। পাশ্চাত্য ও তাদের মধ্যপ্রাচ্যের কুশীলবরা সঙ্গে সঙ্গেই এ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ‘পিকেকে’কে সন্ত্রাসী সংগঠনের মর্যাদা দিয়ে নিষিদ্ধের খাতায় নথিভুক্ত করে। কারণ একই সময় পাশ্চাত্য ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে অস্তিত্বের যুদ্ধযাত্রায় ছিল। কিন্তু কোনো কিছুই তাদের দমাতে পারেনি।

কিন্তু সমাজচ্যুত নিষিদ্ধ এ কমিউনিস্ট ভাবধারার সংগঠনের সঙ্গে পাশ্চাত্যের দহরম মহরম শুরু হয় আইএসআইএসের উত্থানের পর থেকে। এমনকি ওবামা প্রশাসনের শেষ দিকে আমেরিকা প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীকে আধুনিক রাইফেল দিয়ে আইএসের বিরুদ্ধে মাঠে নামায়। মজার ব্যাপার হলো, যারা কিনা বামপন্থীদের সংগ্রাম ও কৌশল নিয়ে আগ্রহী, তারা দিশা হারিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল— যারা কিনা স্বৈরাচারী রাষ্ট্র ব্যবস্থা, আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে আজীবন শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে, তারাই নাম বদল করে বিনা দ্বিধায় সাম্রাজ্যবাদীদের দোস্তি গ্রহণ করল।

নব্য সুলতান এরদোগানের রেগে ছটফট করার মতো অবস্থা, কারণ তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র আমেরিকানরা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন বন্ধু হিসেবে পেয়েছে, যা কিনা এরদোগানের সব ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ধূলিসাৎ করে দেবে। তিনি অত্যন্ত ক্রোধপূর্ণ ভাষায় সাম্রাজ্যবাদীদের নতুন মার্ক্সীয় দোস্তদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে তাদের কঠোর হস্তে দমনের প্রতিজ্ঞা করলেন। আর তার দাবির পেছনে যুক্তি উত্থাপন করলেন যে, আমেরিকার নথিতে ‘পিকেকে’কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নথিভুক্ত থাকাকে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে পিকেকে এর নাম বদল করে। ওয়াইপিজি বানিয়ে যুদ্ধে পাঠালেন কুর্দিদের, আর এ নাম বদলের খেলা মার্কিন জেনারেলদের নিজস্ব বয়ান থেকেই বিশ্ববাসী জেনেছে।

এরদোগানের কণ্ঠ আঙ্কারা থেকে বের হয়ে পাশ্চাত্যের মন গলাতে পারেনি, কিন্তু তাদের নাখোশ করে ব্যাপকভাবে। এর ফলাফল এরদোগান হাতেনাতেই পেয়েছেন, ২০১৬-এর রেসামরিক অভ্যুত্থান ও অভ্যুত্থান-পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এ নব্য সুলতান সেই অর্থনৈতিক বিপর্যয় পরাস্ত করার আগেই আরেক বিপর্যয় নিয়ে হাজির হচ্ছেন তুর্কিদের দরজায়, যা মধ্যপ্রাচ্যে অশেষ যুদ্ধের এবং অমোচনীয় সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সূচনা করবে বলে আমাদের ধারণা।

এ নতুন বিপর্যয় এরদোগানের তুর্কি সীমান্ত লাগোয়া, ২০১৫ থেকে কুর্দি গেরিলাদের দখলে থাকা মেনবিচে হামলার প্রস্তুতি এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, আগামী মার্চের নির্বাচনের আগেই তিনি দখলকাজের সমাপ্তি করে নির্বাচনে কট্টর তুর্কি ধর্মীয় রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারদের একটি অংশের ভোট কবজা করে আবার ক্ষমতায় আসার পথ নির্বিঘ্ন করতে চান। এরদোগান কুর্দি গেরিলাদের সঙ্গে আলাপের রাস্তা বন্ধ করে সহিংসতার পথ কেন বেছে নিলেন, তা যারা নতুন এ সুলতানের কাজকর্ম বোঝার চেষ্টা করেন তাদের জন্য গোপন রহস্য, যেমনিভাবে কুর্দি গেরিলাদের সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে প্রকাশ্যে ওঠা-বসা এবং তাদের গোলাম বনে যাওয়াও।

এরদোগান ও তুর্কি মিডিয়ার ভাষ্যে, মেনবিচে ৩০ হাজার কুর্দি গেরিলা তুর্কি সেনাদের দখলে থাকা যে বাধা হতে পারে কিন্তু ভিতরের খবর অনেকটাই ভিন্ন রকমের। কুর্দি গেরিলারা এবার আর ছাড় দিতে রাজি নন। তারা এ সংঘর্ষকে একটি জনতার যুদ্ধে রূপ দেয়ার পরিকল্পনা এঁকেছেন, যেখানে তারা স্থানীয় আরব গোত্রদের পাশে পাবে বলে আশা করছে।

৩০ হাজার প্রশিক্ষিত গেরিলা ইউরোপিয়ানদের ও আমেরিকানদের সরবরাহ করা আধুনিক অস্ত্র নিয়ে তুর্কি সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করবে, কিন্তু যা আমাদের বেশ উদ্বিগ্ন করে, তা হলো ক্ষমতার এ মুখোমুখি লড়াই শুধুই প্রশিক্ষিত গেরিলা ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, যদি তা জনতার যুদ্ধে রূপ নেয়, তাহলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটবে। কুর্দি গেরিলারা যদি সফলতার স্বাদ পায়, তাহলে তারা তুরস্কে বসবাসরত কুর্দিদের সঙ্গে পাবে সহজেই, যাদের একটি অংশ ১৭ বছর ধরে এরদোগানের স্থায়ী ভোটব্যাংক বলে বিবেচিত। কারণ সব কুর্দি আজ একটি নিরাপদ বসবাসের উপযোগী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সায় দিচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদীরা নানা কায়দায় এরদোগানকে ধীরে ধীরে সিরিয়ার যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে ফেলতে অনেকটা সফল হচ্ছে, যার সর্বশেষ দলিল মেনবিচে আগ্রাসনের প্রস্তুতি। এরদোগান হয়তো মেনবিচকে হাতিয়ার করবেন, কিন্তু কুর্দিদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়া শান্তির সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে না। পুরনো পোশাক থেকে বেরিয়ে পাশ্চাত্যের সহায়তায় কুর্দিরা আজ অনেকটাই বলবান, সেটা আন্তর্জাতিক অথবা স্থানীয় রাজনীতিই হোক না কেন।

এরদোগানের সমকালীন ইতিহাস পাঠের সঙ্গে সংশ্লিষ্টটা কতটা, সে বিষয়ে আমাদের অজ্ঞতা থকলেও ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আর সোভিয়েতদের আফগানিস্তানে হামলার ফলাফল আমাদের সবারই জানা। ইতিহাস পড়তে ভালো লাগার কথা আমাদের সবারই, কিন্তু ইতিহাসকে আমরা রাজনীতিতে কতটা ব্যবহার করি তা প্রশ্নসাপেক্ষ। আলোচনা, জাতিরাষ্ট্রের ধ্যানধারণা থেকে মুক্ত হয়ে পারস্পরিক আস্থাই শান্তির একমাত্র পথ। সময় আর এরদোগানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ইতিহাসের পাতায় তার স্থান নির্ধারণ করবে। এরদোগান সফল হলে কুর্দিদের নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কিছুটা ভাটা পড়বে কিন্তু থেমে যাবে না।

লেখক-রাহুল আনজুম :

সাবেক শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; বর্তমানে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত

Share this post

PinIt
scroll to top