খালেদা জিয়ার কারাবাসের এক বছর পূর্ণ 

khaleda-zia-2-1.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(৮ ফেব্রুয়ারি) :: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাসের এক বছর পূর্ণ  হলো ৮ ফেব্রুয়ারি। গত বছরের এই দিন দুর্নীতি মামলায় কারাবন্দি হন তিনি। পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার একবছর কেটেছে নিজের চিকিৎসা আর মামলা মোকাবেলায়। এর মধ্যে চিকিৎসার জন্য কারাগারের বাইরে নেয়া হয়েছে কয়েকবার।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী দুটি ঈদসহ এক বছর কারাগারে কাটিয়েছেন স্বজনবিহীন। ঈদের দিনে স্বজনরা কারাগারে দেখা করলেও ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর দুই মৃত্যুবার্ষিকীতে একা একা নামাজ আদায়, দোয়া, কোরআন পড়েই কেটেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দিন। ছেলের কথা মনে করে তিনি অঝোরে কেঁদেছেন কারাগারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থেকেও তার মনোবল এতটুকুও টলেনি বলে জানান স্বজনরা। কিন্তু শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ আছেন তিনি। পুরনো উপসর্গ বা রোগগুলো কিছুটা বেড়েছে। চোখেও প্রচন্ড ব্যথা, তার পা ফুলে গেছে। একা একা হাটতে পারছেন না।

খালেদা জিয়ার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অসুস্থ খালেদা জিয়া স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর স্যাঁতস্যাঁতে বদ্ধ পরিবেশের মধ্যে তাকে কারাগারে দিনযাপন করতে হচ্ছে।

বেগম জিয়ার চিকিৎসকরা জানান, তার আর্থারাইটিসের ব্যথা, ফ্রোজেন শোল্ডার, হাত নড়াচড়া করতে পারেন না। হৃস্ট জয়েন্ট ফুলে গেছে, সার্ভাইক্যাল স্পন্ডিলোসিস এর জন্য কাধে প্রচন্ড ব্যথা, এই ব্যথা হাত পর্যন্ত রেডিয়েট করে। হিপ-জয়েন্টেও ব্যথার মাত্রা প্রচন্ড। ফলে শরীর অনেক অসুস্থ, তিনি পা তুলে ঠিক মতো হাঁটতেও পারেন না।যদিও কারবাসের এক বছরে মাঝামাঝি সময়ে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় গত বছর অক্টোবর থেকে ৮ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীনও ছিলেন।

কারা সূত্র বলেছে, কারাগারে সেলে রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার পাশাপাশি এবাদত-বন্দেগি করেন তিনি। ফজর নামাজ পড়েন বিএনপি চেয়ারপারসন। সকালে কারা কর্তৃপক্ষের দেয়া নাস্তা করেন তিনি। কারাগারে তার চিকিৎসাসেবার জন্য সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসকও রাখা হয়েছে। খালেদার সঙ্গে একজন ব্যক্তিগত পরিচারিকা ফাতেমা রয়েছেন।

সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন বলেন, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে কারাগারের মূলফটকের ভেতরের ভবনে রাখা হয়েছে। সিনিয়র জেল সুপারের ওই অফিসের পাশে ভবনে একটি খাট, টেবিল, চেয়ার, দুটি ফ্যান রয়েছে। দেয়া হয়েছে টেলিভিশন, তবে সেখানে দেখানো হবে শুধু বিটিভি। পাশের রুমে গ্যাসের চুলায় রান্নার ব্যবস্থাও রয়েছে।

তিনি বলেন, তার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে একজন চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে রয়েছেন তার ব্যক্তিগত পরিচারিকা ফাতেমা। ভিআইপি বন্দি ও জেলকোড অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে সব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। সকালে তাকে তিনটি জাতীয় দৈনিক পড়তে দেয়া হচ্ছে। ওই সেবিকা সার্বক্ষণিক তার সঙ্গে থাকছেন। ভিআইপিবন্দি ও জেল কোড অনুযায়ী খালেদা জিয়া সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। পরিত্যাক্ত ওই কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে তিনি রয়েছেন।

কারা সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে খালেদা জিয়া রাতে ভাত, মাছ ও সবজি খাচ্ছেন। সকালে কারা কর্তৃপক্ষের দেয়া রুটি-সবজি দিয়ে নাস্তা করেন তিনি। খালেদা জিয়াকে বন্দি হিসেবে কয়েদি পোশাক পরানো হয়নি।

এদিকে বিএনপির একাধিক প্রবীণ নেতা বলেছেন, খালেদা জিয়া কারাগারে থাকাবস্থায় গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। যে নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধ্বস পরাজয় হয়েছে। এই দলের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মাত্র ৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এরপর থেকেই দলের নেতাকর্মীরা হতাশাগ্রস্থ হলেও তারা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত দলের প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে। কারাগারে নেয়ার পর খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তারা। বিভিন্ন সময় বিএনপি দাবি করে আসছে, পরিত্যক্ত কারাগারের  স্যাঁতস্যাঁতে একটি কক্ষে একা ৭৩ বছর বয়সী একজন বয়স্ক মহিলাকে রাখা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিনই তার স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে।

এবিষয়ে কারা অধিদফতরের ডিআইজি (ঢাকা বিভাগ) টিপু সুলতান বলেছেন, বিশেষ কারাগারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নেই। তিনি ভালো ও সুস্থ আছেন। তবে বয়সের বার্ধ্যক্যের কারণে তার পুরাতন রোগের কিছু উপসর্গ রয়েছে। এ বিষয়ে কারা চিকিৎসকের পাশাপাশি মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরা তার চিকিৎসার ফলোআপ করছেন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যত মামলা

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাসের এক বছর পূর্ণ হল শুক্রবার (৮ ফেব্রুয়ারি)। গত বছরের এই দিন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ  আখতারুজ্জামান। রায় ঘোষণার পরপরই তাকে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। গত এক বছর ধরে খালেদা জিয়া এ বিশেষ কারাগারে অন্তরীণ আছেন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ডাদেশ বাতিল চেয়ে করা আপিলে  সাজা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করেন উচ্চ আদালত।

গত বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় একই  আদালত খালেদা জিয়াকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ সাজা বাতিল ও খালেদা জিয়ার জামিন চেয়ে উচ্চ আদালতে তার আইনজীবীরা আবেদন করলেও এখনও শুনানিতে অংশ নেননি। জামিনের বিষয়ে উচ্চ আদালতে কোনও আদেশ হয়নি।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী সৈয়দ জয়নুল আবেদিন মেজবাহ বলেন, ‘খালেদা জিয়া সাংবিধানিক ও আইনগত  অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। মূলত মামলা দিয়ে তাকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে চিরতরে শেষ করার ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা আশা করি, অতি শিগগিরই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খালেদা জিয়া কারামুক্তি পাবেন।’

এ দুই মামলা ছাড়াও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরও  ৩৩টি মামলা রয়েছে যার মধ্যে ২২টি বিচারাধীন। তদন্ত চলছে আটটির এবং আদালতের নির্দেশে তিনটি মামলার কার্যক্রম স্থগিত আছে। এদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে, গ্যাটকো দুর্নীতির মামলার অভিযোগ গঠন শুনানি ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ জজ  আবু সৈয়দ দিলজার হোসেনের আদালতে বৃহস্পতিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। এ মামলায় বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে হাজিরা দেন তিনি। আদালতে খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শুনানি হয়।

এদিকে নাইকো দুর্নীতি মামলার অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য ঢাকার ৯ নম্বর বিশেষ জজ শেখ হাফিজুর রহমানের আদালতে মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য রয়েছে। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলায় অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য ঢাকার ২ নম্বর বিশেষ জজ  এ এইচ এম রুহুল ইমরানের আদালতে ২৬ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য আছে।

এছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগে বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ভুয়া জন্মদিন পালন ও যুদ্ধাপরাধীদের মদদ দেওয়ার দুই মামলায় অভিযোগ গঠন শুনানি ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নুরের আদালতে ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও জাতিগত বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসিম। এ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের জন্য ১৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন আদালত।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করার অভিযোগে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশের জন্য ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসিমের আদালতে ২৫ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য রয়েছে। ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত থেকে মানহানির একটি মামলা খারিজ করে দিয়েছেন বিচারক। এছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ঢাকার বাইরে নড়াইলে মানহানির একটি এবং কুমিল্লায় হত্যা মামলা, বিস্ফোরণ ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে তিনটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও নাশকতার ১১টি মামলায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ  কে এম ইমরুল কায়েশ -এর আদালতে অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য ১৭ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য আছে। মামলাগুলো হলো দারুস সালাম থানার নাশকতার আট মামলা, যাত্রাবাড়ী থানার একটি হত্যা মামলাসহ দুই মামলা এবং রাষ্ট্রদ্রোহের একটি মামলা।

এছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় নাশকতা ও মানহানির আটটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। আর গুলশান ও দারুস সালাম থানার করা নাশকতাসহ ড্যান্ডি ডায়িং মামলাটি উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে।

Share this post

PinIt
scroll to top