ইয়াবা সম্রাট হাজি সাইফুল করিম সহ আত্মসমর্পণ করছে ১৫০ ইয়াবা ব্যবসায়ী

YabaTrade-Int-haji-saiful-karim-wanted.jpg

কক্সবাংলা রিপোর্ট(১২ ফেব্রুয়ারী) :: কক্সবাজার জেলায় মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরুর পর ৪৪ মাদক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে টেকনাফেই মারা গেছে ৪০ জন। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ বিশেষ অভিযান থেকে রক্ষা পেতে আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে দেশের ইয়াবা ব্যবসার ‘সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত টেকনাফের হাজি সাইফুল করিম সহ শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ী।এছাড়াও রয়েছেন টেকনাফের সরকারদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ভাই, ভাগ্নেসহ আত্মীয়স্বজন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব তালিকায় শীষে নাম থাকা  বদি’র আত্মসমর্পণ না করায় সবাই হতাশ হয়েছে।

ইতিমধ্যে পুলিশ হেফাজতে চলে আসা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত এসব ইয়াবা ব্যবসায়ী আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফ কলেজ মাঠে অনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করবেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপির) ড. জাবেদ পাটোয়ারি।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি করা ইয়াবা গডফাদারদের তালিকায় নাম থাকা প্রায় শতাধিক ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণের জন্য কক্সবাজার পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর  হাত থেকে রক্ষা করতে গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে টেকনাফের ইয়াবা ব্যবসায়ীরা পুলিশের কাছে আত্মসপর্ণের জন্য কক্সবাজার পুলিশ লাইনসে যাওয়া শুরু করে।

এদিকে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, অপরাধের মাত্রা কম হলে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ভালো হওয়ার সুযোগ দেবে সরকার।তবে ইয়াবা ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়লে তা অবৈধ সম্পদ হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা হবে। মাদকের টাকা বিদেশে পাচার করলে মানি লন্ডারিংয়ের মামলা হবে। আত্মসমর্পণ করলেই ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সবকিছু মাফ হবে-তা না। আত্মসমর্পণের জন্য ১০৭ জনের মতো মাদক ব্যবসায়ী পুলিশের হেফাজতে এসেছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন থেকে আত্মসমর্পণ করছেন প্রায় ৫১ জন। টেকনাফ সদর ও পৌরসভা থেকে ৪২ জন, হ্নীলা ইউনিয়ন থেকে ২৪ জন। অন্যরা হোয়াইক্যং ও বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। ১৬ ফেব্রুয়ারির আগে এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।আত্মসমর্পণের পর তাদের কক্সবাজার জেলা কারাগারে নেওয়া হবে।

কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সর্বশেষ ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায় ১ হাজার ১৫১ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ জন প্রভাবশালী ইয়াবা কারবারী (গডফাদার)। তাদের ৬৬ জনই টেকনাফের বাসিন্দা।

জেলা পুলিশের হেফাজতে থাকা উল্লেখযোগ্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির তিন ভাই আবদুল আমিন, মোঃ শফিক ও মোঃ ফয়সাল, চাচাতো ভাই মোঃ আলম, খালাতো ভাই মং মং সিং, ফুফাতো ভাই কামরুল ইসলাম, ভাগনে সাহেদুর রহমান নিপু, টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদের ছেলে দিদার মিয়া, ভাইপো মোঃ সিরাজ, হ্নীলার ইউপি সদস্য নুরুল হুদা ও জামাল হোসেন, টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর নুরুল বশর নুরশাদ, নারী কাউন্সিলর কোহিনুর বেগমের স্বামী শাহ আলম, টেকনাফ সদর ইউপি সদস্য এনামুল হক, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবদুল্লাহর দুই ভাই জিয়াউর রহমান ও আবদুর রহমান। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ২ থেকে ১৬টি মামলা রয়েছে।

আত্মসমর্পণ করছে ইয়াবা সম্রাট হাজি সাইফুল

আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে দেশের ইয়াবা ব্যবসার ‘সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত টেকনাফের হাজি সাইফুল করিম । দেশব্যাপী ইয়াবা ছড়িয়ে দেয়া সাইফুল করিমের আত্মসমর্পণের ব্যাপারে এতোদিন ধোঁয়াশা থাকলেও পুলিশের হাতে তার আত্মসমর্পণ করা অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এরই মধ্যে আত্মসর্মপণের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে জানান কক্সবাজার জেলা বিশেষ পুলিশ কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) টেকনাফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের হাতে এই ইয়াবা সম্রাট আত্মসমর্পণ করবেন বলে পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে। এরইমধ্যে সাইফুল করিমের সিন্ডিকেটের অন্যতম দুই সদস্য তার শ্যালক জিয়াউর রহমান ও আবদুর রহমানও আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

দেশের সর্বত্র মরণ নেশা ইয়াবা ছড়িয়ে দেয়ার নেপথ্যে রয়েছেন দেশের শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী সাইফুল করিম ও তার পরিবারের ১০ সদস্যের ভয়াবহ সিন্ডিকেট। পুলিশ প্রশাসন আশা করে, সাইফুলের পরিবারের ( ইয়াবা সিন্ডিকেট) সকলেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসর্মপণ করবেন।

পুলিশ প্রশাসনের দেয়া তথ্য মতে, এক সময় ছাত্রদলের রাজনীতি করা সাইফুল ও তার পরিবারের সদস্যরা চট্টগ্রামে অবস্থান করে সারা দেশের ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ করছেন। একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় হাজি সাইফুল ও তার পরিবার বহাল তবিয়তে থেকে ইয়াবা ব্যাবসা নিয়ন্ত্রণ করছিল। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার পরোক্ষ সহযাগিতা পেয়ে সাইফুল করিম ও তার পরিবার এ কাজ করে আসছিলো বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে করা ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সর্বশেষ তালিকায় শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে টেকনাফের শীলবনিয়া পাড়ার এই সাইফুল করিমকে।

সাইফুল করিম সারাদেশে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছে ‘এসকে’ নামেই পরিচিত। তালিকায় দেখা গেছে, শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী সাইফুল করিম এবং তার ভাই রেজাউল করিম, রফিকুর করিম, মাহাবুবুল করিম ও আরশাদুল করিম সারাদেশে বড় ইয়াবা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।

সাইফুল করিমের দুই শ্যালক টেকনাফ বিএনপির নেতা জিয়াউর রহমান ও শ্রমিক দলের নেতা আবদুর রহমানও এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইয়াবার গডফাদারের তালিকায় এই দুইজনের নামও রয়েছে। সাইফুল করিমের ভগ্নিপতি সাইফুল ইসলামও এই ইয়াবা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, সাইফুল নিজেকে টেকনাফ বন্দরের আমদানি-রফতানিকারক বলে পরিচয় দেন। তার বৈধ ব্যবসার সাইনবোর্ডের নাম এসকে ইন্টারন্যাশনাল। কিন্তু গত ৯-১০ বছর ধরে সাইফুল ও তার পরিবারের সদস্যরা এখন অবৈধভাবে হাজার কোটি টাকার মালিক। সাইফুল করিমের ইয়াবা সিন্ডিকেটের মূলশক্তি হিসেবে রয়েছে তার মামা, মিয়ানমারে মংডুর আলী থাইং কিউ এলাকার মোহাম্মদ ইব্রাহিম।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় দেখা গেছে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা পাঠান সাইফুলের মামা ইব্রাহিম ও তার অন্য সহযোগীরা। সাইফুল ও তার পরিবারের সদস্যরা মিয়ানমার থেকে এই ইয়াবা এনে সারা দেশে পাচার করেন।

অভিযোগ উঠেছে, এই কালো টাকা দিয়ে সাইফুল তার ভীত অনেক শক্তিশালী করেছেন। হাত করেছেন অনেক বড় বড় রাজনীতিবিদ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে।

জানা গেছে, সাইফুল করিম বিয়ে করেছেন টেকনাফের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিএনপির রাজনীতিবিদ আবদুল্লাহের ছোট বোনকে। সাইফুলের শ্যালক জিয়াউর রহমান উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এবং গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। অপর শ্যালক আবদুর রহমান উপজেলা শ্রমিক দলের নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সর্বশেষ যে তালিকায় বলা হয়েছে, সাইফুল করিম স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় তিনি অর্থ দিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তিনি চট্টগ্রামের ভিআইপি টাওয়ারে অবস্থান করেন। চট্টগ্রামের টেরিবাজারে বিনয় ফ্যাশন নামের একটি কাপড়ের দোকানের আড়ালে তার পরিবারের সদস্যরা ঢাকা ও চট্টগ্রামে ইয়াবা পাচার করেন।

এ বিষয়ে কক্সবাজার পুলিশের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান, তালিকাভূক্ত অধিকাংশই ইয়াবা ব্যবসায়ী শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণের ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। আত্মসমর্পণের দিন তালিকাভুক্ত বড় বড় ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করবেন বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।

Share this post

PinIt
scroll to top