রয়েল বেঙ্গল টাইগার ২০৭০ সালের মধ্যে বিলুপ্ত হবে

tiger.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(৭ মে) :: প্রাণবৈচিত্র্য আর বাস্তুসংস্থান নিয়ে জাতিসংঘের নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর আবারও আলোচনায় এসেছে প্রজাতি হিসেবে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের টিকে থাকার প্রশ্ন। ফেব্রুয়ারিতে বিজ্ঞান বিষয়ক এক সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানীদের গবেষণা প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজিত হওয়ার অক্ষমতার কারণে ৫০ বছরের মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিলুপ্ত হবে।

এদিকে জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনে স্থলভাগের যে ৫ লাখ প্রজাতির বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বাঘও। এমন বাস্তবতায় নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের এক প্রতিবেদনে আবারও ২০৭০ সালের মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিলোপের আশঙ্কাকে সামনে এনেছে।

সোমবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ‘সামারি ফর দ্য পলিসিমেকার’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় জাতিসংঘের প্রতিবেদনের সারমর্ম। ১৫ হাজার তথ্যসূত্র নিয়ে ৩ বছরের গবেষণা শেষে জাতিসংঘের ইন্টারগভার্নমেন্টাল সায়েন্স পলিসি প্ল্যাটফর্ম অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিস ১৮০০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদন হাজির করেছে। সোমবার প্রকাশিত এর ৪০ পৃষ্ঠার সারমর্ম থেকে জানা গেছে, স্থল, জল কিংবা আকাশ; সবখানেই মানুষের কারণে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে বিভিন্ন প্রজাতি।

সদ্য প্রকাশিত জাতিসংঘ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকার কারণে বাঘের সর্বশেষ, সর্ববৃহৎ ও শক্ত আবাসস্থল বলে বিবেচিত সুন্দরবন চিরতরে বিলীন হয়ে যেতে পারে। নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা স্থলভাগের প্রায় ৫ লাখ প্রাণী প্রজাতির মধ্যে বিগ ক্যাটস্ অন্যতম। বাঘ, সিংহ, জাগুয়ার, চিতা ও পাহাড়ি চিতার মতো হিংস্র প্রাণীগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে সবই ওই বিগ ক্যাটস প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত, যারা ডোরাকাটা শ্রেণীর বিড়াল (স্পটেড ক্যাট) প্রজাতি থেকে বিবর্তিত। নতুন জাতিসংঘ প্রতিবেদনে সুন্দরবন ও ‘বিগ ক্যাটস’ প্রজাতি বিলোপের আশঙ্কার কথা সামনে আসার পর আবারও সামনে এসেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট-এ প্রকাশিত ফ্রেবুয়ারির এক প্রতিবেদন।

বাংলাদেশ ও ভারতের দশ হাজার বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। ইতোমধ্যে বিপন্ন হয়ে পড়া রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য সুন্দরবনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বলে বিবেচনা করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশি ও অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, সুন্দরবনের ৭০ শতাংশ ভূমির অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েক ফুট উপরে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়তে থাকার কারণে যে পরিবর্তনগুলো হয়েছে তা সেখানে বসবাসরত কয়েকশো বাঘ ‘কমিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট’। গবেষণা প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, ‘২০৭০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘদের জন্য উপযুক্ত কোনও আবাসস্থল থাকবে না।’

জাতিসংঘের ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ এর শনাক্তকৃত জলবায়ু পরিস্থিতি ও এর বিভিন্ন মডেলের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে ৫.৪ শতাংশ থেকে ১১.৩ শতাংশ পর্যন্ত বাঘের আবাসস্থল বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুন্দরবন সংক্রান্ত প্রতিবেদনের প্রধান গবেষক শরিফ এ. মুকুল ও তার সহকর্মীরা বাঘের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বাইরে অন্য কোনও ঝুঁকি রয়েছে কিনা তা শনাক্ত করার চেষ্টা করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য বিষয়গুলো সুন্দরবনের বাঘেদের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর। ১৯০০ সালের শুরু থেকে আবাসস্থল বিলীন হওয়া, শিকার ও বন্যপ্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবৈধ বাণিজ্যের কারণে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ থেকে ৪ হাজারের কিছু কমে নেমে এসেছে।

নতুন গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং উদ্ভিদের ধরন পরিবর্তনের কারণে বাঘের সংখ্যা আরও কমে যাবে। সুন্দরবন প্লাবিত হওয়ার কারণে বন্যপ্রাণীরা নিজেদের আবাস ছেড়ে নতুন ভূমির সন্ধানে বের হবে। এতে মানুষ ও বাঘের কাছাকাছি আসার ঘটনা বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের ইন্ডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শরিফ এ. মুকুল মনে করেন, ‘অনেক কিছুই ঘটতে পারে। ওই এলাকায় সাইক্লোন হলে বা কোনও রোগ ছড়িয়ে পড়লে কিংবা খাদ্য সংকট দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও বাজে রূপ ধারণ করতে পারে।’

রয়েল বেঙ্গল টাইগার ২
২০১০ সালে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার পরিচালিত এক গবেষণায় আভাস দেওয়া হয়েছিল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১১ ইঞ্চি বাড়লে কয়েক দশকের মধ্যে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা ৯৬ শতাংশ কমে যেতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত ক্ষতির মাত্রা পূর্ববর্তী ধারণার চেয়ে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এরইমধ্যে বিশ্বের বিপন্ন প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীদের প্রায় অর্ধেকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বৈজ্ঞানিক প্যানেলের এক প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছিল, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হওয়ার বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সাল নাগাদ বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা শিল্পপূর্ববর্তী পর্যায়ের চেয়ে ২.৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি হবে। এর কারণে খাদ্য শৃঙ্খল, প্রবাল প্রাচীর ও বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে।

কয়েক দশকের জোয়ারের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে উঁচু জোয়ারের সংখ্যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্রুতহারে বাড়ছে। ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞানী সুগত হাজরা বলেছেন, সুন্দরবনের কিছু ভূমি বিলীন হয়ে যেতে পারে, তবে তার গবেষণায় দেখা গেছে বাঘের ওপর চরম প্রভাব কমই পড়বে।

বাংলাদেশের বন বিভাগের কর্মকর্তা জহির উদ্দিন আহমেদ নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, নিম্ন এলাকাগুলোর সুরক্ষায় এরইমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বাঘেরা সেখানে থাকছে। উচ্চ পর্যায়ের লবণাক্ত পানিতেও টিকে থাকতে পারে এমন শস্য সেখানে লাগানো হচ্ছে। ঝড় প্রতিরোধক দেয়াল তৈরি করেছে সরকার। বিভিন্ন জায়গায় পলি ভাগ করে দেওয়ায় প্রাকৃতিকভাবেই কিছু দ্বীপের উচ্চতা বেড়েছে।

তবে “দ্য ভ্যানিশিং: ইন্ডিয়া’স ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইসিস” এর লেখক প্রেরণা সিং বিন্দ্রা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা শিল্পোন্নয়ন যাই হোক না কেন বাঘের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। তার মতে, অন্য একটি সুরক্ষিত ভূমিতে বাঘদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি কোনও ‘টেকসই সমাধান’ হতে পারে না। ‘এসব বাঘকে কোথায় রাখবেন? এ জনাকীর্ণ পৃথিবীতে একটি উপযুক্ত ও নির্বিঘ্ন আবাস কোথায় আছে?’ প্রশ্ন করেন প্রেরণা।

Share this post

PinIt
scroll to top
alsancak escort bornova escort gaziemir escort izmir escort buca escort karsiyaka escort cesme escort ucyol escort gaziemir escort mavisehir escort buca escort izmir escort alsancak escort manisa escort buca escort buca escort bornova escort gaziemir escort alsancak escort karsiyaka escort bornova escort gaziemir escort buca escort porno