কক্সবাজারের হাটবাজারে মাছের তীব্র সংকট : সাগরে মাছ ধরা বন্ধে দিশেহারা লাখো জেলে পরিবার

f1.jpg

বিশেষ প্রতিবেদক(২৬ মে) :: কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূলে ২০ মে থেকে মাছ ধরা বন্ধ আছে। এ নিষেধাজ্ঞা চলবে ৬৫ দিন। এতে জেলার ৮টি উপজেলার ৩৩টি হাটবাজারে সামুদ্রিক মাছের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বেড়ে গেছে মুরগি, মাংস, মিঠা পানির মাছ, ডিম ও তরিতরকারির দাম।  অন্যদিকে আয় রোজগার বন্ধ থাকায় দিশেহারা লাখো জেলে পরিবার। পবিত্র রমজান এবং আসন্ন ঈদ উদযাপন নিয়ে জেলেপল্লিতে হাহাকার অবস্থা যাচ্ছে। অসহায় ও বেকার জেলেদের পুনর্বাসনে এ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কোনো ত্রাণ সহায়তাও দেওয়া হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তে বঙ্গোপসাগরের মৎস্যভান্ডার সমৃদ্ধ করতে ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মাছ ধরা বন্ধের কারণে জেলেরা কষ্টে আছেন, তাঁদের সহায়তা দরকার। বেকার জেলেদের পুনর্বাসনের জন্য প্রতি পরিবারে ৮৫ কেজি চাল চেয়ে ইতিমধ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়াও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কুতুবদিয়ার ২৫০০ এবং মহেশখালীর ১৫০০ পরিবারের জন্য চাল-ডাল-তেলসহ ঈদের খাবারসামগ্রী পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে জেলে পরিবারও আছে।

৩৩ হাটবাজার ফাঁকা

২৬ মে সকালে শহরের বাহারছড়া বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, সামুদ্রিক মাছ নেই। বাজারে বিক্রি হচ্ছে খামার ও পুকুরে উৎপাদিত তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কাতলা, বাটা, ট্যাংরা, চিংড়ি প্রভৃতি মাছ। দামও আকাশছোঁয়া। সামুদ্রিক মাছ লইট্যা, রুপচান্দা, কোরাল, ইলিশ, পোপা মাছ নেই।

এ বাজারে মাছ কিনতে আসা শহরের ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম (৪৫) বলেন, ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধের প্রভাব পড়েছে হাটবাজারে। এখন ১২০ টাকার তেলাপিয়া কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকায়, ৪০০ টাকার ছোট চিংড়ি ৬০০-৭০০ টাকা। পোলট্রি মুরগির দাম কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৬৫ টাকা। দেশি মুরগির কেজি এখন ৬০০ টাকা। আগামী দিনে মাছের দাম আরও বাড়বে। তখন মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাবে।

শাকসবজি তরিতরকারির দামও বেড়েছে কেজিতে ১০-৩০ টাকা। প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকায়, ঢ্যাঁড়স ৬০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, বরবটি ৪৫ টাকা।

বাহারছড়ার গৃহবধূ সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, মাছ সংকটের কারণে অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ ও চাকরিজীবীদের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। পবিত্র রোজার মাসে মাছ ধরা বন্ধের এ সিদ্ধান্ত সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আবদুল জলিল বলেন, ২০ মে থেকে সাগরে মাছ ধরা বন্ধ আছে। এ কারণে বাজারের মাছের সংকট চলছে। এখন বাজারে সামুদ্রিক মাছ নেই বললে চলে। তবে কিছু বাজারে আগের মজুত করা সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। কয়েক দিনের মধ্যে মজুত শেষ হলে সংকট আরও বাড়বে।

বিকেলে শহরের বিমানবন্দর সড়কের কালাইয়া বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানেও সামুদ্রিক মাছ নেই। লোকজন খামার ও পুকুরে উৎপাদিত তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই মাছ কিনছেন। কেউ কেউ পোলট্রির মুরগি কিনছেন।

মাছ কিনতে আসা নুনিয়াছটার ব্যবসায়ী মনির আহমদ বলেন, মাছ সংকটের কারণে বাজারে প্রতিটা ডিমের দাম ১ টাকা বেড়ে ১০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। শাকসবজি-ফলমূলের দামও বেড়েছে ২০-৫০ টাকা। ১৪০ টাকার এক কেজে আপেল বিক্রি হচ্ছে ২৪০-২৬০ টাকায়। এসব দেখার যেন কেউ নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার টেকনাফ, রামু, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া ও কুতুবদিয়ার অন্তত ৩৩টি বাজারেও মাছের তীব্র সংকট চলছে। চাহিদা বাড়ছে তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কাতলা, বেড়, গ্রাসকার্প মাছের। এসব মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ৫৫০ টাকায়, যা আগে ছিল ১০০ থেকে ২৬০ টাকা।

বিপাকে লাখো জেলে 

দুপুরে শহরের অন্যতম পাইকারি মাছের বাজার (মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র) নুনিয়াছটার ফিশারিঘাটে গিয়ে দেখা গেছে কোনো মাছ নেই। ফিশারিঘাটের পাশে বাঁকখালী নদীতে নোঙর করে আছে শত শত ট্রলার। ট্রলার পাহারা দিচ্ছেন একজন করে জেলেশ্রমিক। ট্রলারের অন্য জেলেরা কয়েক দিন আগে বাড়িতে চলে গেছেন। প্রতিটি ট্রলারে জেলে থাকেন ১৫-২০ জন করে।

একটি ট্রলারের জেলে মনির উল্লাহ (৪৪) বলেন, টানা ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধের ঘটনা আগে কখনো হয়নি। এমনিতে চলতি সালের গত পাঁচ মাসে একাধিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড় আর মৎস্য আইন কার্যকরের ফলে আড়াই মাস মাছ ধরা বন্ধ ছিল। এ নিয়ে জেলে পরিবারগুলো অভাব অনটনে ছিল। এখন ইলিশ ধরার মৌসুমে টানা ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ জেলেদের দুঃখ দুর্দশা শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতির সভাপতি ওসমান গণি বলেন, ২০ মে থেকে ফিশারিঘাটে মাছ বেচাকেনা বন্ধ রয়েছে। এ কারণে কক্সবাজার পৌরসভাসহ জেলার টেকনাফ, মহেশখালী, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, চকরিয়া উপজেলার ৩৩টি হাটবাজারে সামুদ্রিক মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। এখন সাগরেও কোনো ট্রলার অবশিষ্ট নেই। টানা ৬৫দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকলে কক্সবাজারের অন্তত ১০ হাজার মৎস্য ব্যবসায়ী বেকার হয়ে পড়বেন। মাছ সংকটের কারণে শুঁটকি উৎপাদনেও ধস নামবে। বেকার হবেন ৩০ হাজারের বেশি শুঁটকিশ্রমিক। কক্সবাজারে প্রতিবছর ৩০০ কোটি টাকার বেশি শুঁটকি উৎপাদন হয় ।

নুনিয়াছটার একটি ট্রলারের জেলে আবদুল মালেক (৪৫) বললেন, ছয় দিন ধরে তিনি ঘরে বসে থেকে বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। সংসারে স্ত্রী ও ছয় ছেলেমেয়ে তাঁর। খেয়ে না-খেয়ে কোনো মতে রোজা পার করলেও ঈদে ছেলেমেয়েদের নতুন জামা কিনে দেওয়া নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। ট্রলার মালিকেরাও কোনো অর্থ সহযোগিতা দিতে রাজি হচ্ছেন না। কারণ, এবার মাছ ধরে কোনো ট্রলারমালিক লাভবান হননি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম খালেকুজ্জামান বলেন, সাগরে এখন বড় প্রজাতির মাছ লক্ষ্যা, তাইল্যা, গুইজ্যা, বোম মাইট্যা তেমন ধরা পড়ে না। কারণ অপরিকল্পিতভাবে মাছ আহরণ। এখন ওই সব প্রজাতির মাছের প্রজনন মৌসুম চলছে । তাই সরকার টানা ৬৫ দিন (২০ মে থেকে ২৩ জুলাই ) মাছ ধরা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, মাছ ধরা বন্ধের সময় কোনো জেলে যেন সাগরে মাছ ধরতে নামতে না পারেন, তাই কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী তৎপর আছে।

কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, টানা দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জেলার প্রায় দুই লাখ মৎস্যজীবী অভাব অনটনের শিকার। জেলেদের দুর্ভোগ লাঘবে ত্রাণসহায়তা দরকার।

সূত্র : আব্দুল কুদ্দুস রানা, প্রথম আলো

Share this post

PinIt
scroll to top
bahis siteleri