টেকনাফে কোস্ট-এর মতবিনিময় সভায় বক্তারা : জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাজেট বৃদ্ধি আবশ্যক

IMG_3934.jpg

প্রেস বিজ্ঞপ্তি(২০ জুন) :: টেকনাফ উপজেলা পরিষদ কনফারেন্স হলে কোস্ট ট্রাস্ট-এর উদ্যোগে ১৯ শে জুন বুধবার দুপুর তিন টায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব মো: রবিউল হাসান-এর সভাপতিত্বে ‘ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সকলের আচরণ পরিবর্তন প্রয়োজন এবং বাজেট বৃদ্ধি আবশ্যক’ শীর্ষক একটি মাল্টি-স্টেকহোল্ডার সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব মো: নূরুল আলম এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান মৌলানা ফেরদৌস আহমদ জমিরী ও উপজেলা পরিষদ মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান জনাব তাহেরা আক্তার মিলি এবং হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জনাব নূর আহমদ আনোয়ারী।

সভায় বক্তৃতা করছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: রবিউল হাসান।

সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন কোস্ট ট্রাস্ট-এর সহকারী পরিচালক ও সিএফটিএম প্রকল্পের কক্সবাজার জেলা টিম লিডার মকবুল আহমেদ। তিনি মাল্টিমিডিয়া স্লাইট শোর মাধ্যমে সিএফটিএম প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকাসহ প্রতিপাদ্য বিষয়টি উপস্থাপনা করেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব রবিউল হাসান তাঁর বক্তৃতায় বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে আমাদের সকলকে গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সাথে সাথে উন্নয়ন কর্মকান্ডে বাজেট তৈরিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। সরকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছে। এখন ইউনিয়ন পরিষদগুলো ও উপজেলা পরিষদ বাজেট তৈরি করবে ও ঘোষণা করবে। তিনি সকল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের এবং অন্যান্য স্টেক হোল্ডারদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমাদের সকলের মনোযোগ দিতে হবে যেন বাজেট তৈরিতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলাকে মাথায় রেখে বাজেট তৈরি করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানগণকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, আপনারা নিজেদের এলাকায় কোথায় বাঁধ দিতে হবে, কোথায় রাস্তা উঁচু করতে হবে এবং কোন্ কোন্ রাস্তার পাশে গাছ লাগানো যাবে, আর কোথায় সাইক্লোন শেল্টার করতে হবে আর কোন্ কোন্ সাইক্লোন শেল্টারের সংস্কার করতে হবে বা তাতে ্িটবওয়েল স্থাপন করতে হবে তা নিয়ে ভাবুন এবং বাজেট তৈরি করার আগেই ভালোভাবে চিন্তাভাবনা করে আসন্ন বাজেট তৈরি করুন। তিনি বলেন, টেকনাফ উপজেলার সকল ইউনিয়ন পরিষদকে প্রকাশ্যভাবে ও আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেট ঘোষণা করতে হবে।

ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট তৈরি প্রসঙ্গে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট তৈরির আগে বা বাজেট তৈরির সময় যদি কোস্ট ট্রাস্ট টেকনাফ উপজেলার চেয়াম্যানদেরকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা সংক্রান্ত বিষয়ে ওরিয়েন্ট করতে পারে এবং তা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করে বাজেট তৈরিতে সহায়তা করতে পারে তা হলে ইউনিয়ন পরিষদগুলি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা বিষয়টি বাজেটে ভালো ভাবে আনতে পারতো এবং বাজেট তৈরিতে সহায়ক হতো।

ছবি: কোস্ট আয়োজিত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে মতবিনিময় সভার অংশগ্রহণকারী

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরো বলেন, আগামী বিশ্ব পরিবেশ দিবস মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় উদ্বোধন করবেন। আমরাও এখানে দিবসটি গুরুত্বসহকারে পালন করবো। তিনি সভায় উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা যে সকল ফল খাই তার বীজগুলি ফেলে দেই। এখন থেকে ফলের বীজগুলি ফেলে না দিয়ে তা যদি বাড়ির আশেপাশে ও রাস্তার দুপাশে লাগাই তা হলে আমরা অনেক ফলের গাছ পাবো এবং গাছ পাওয়ার সাথে সাথে ফলও খেতে পারবো। আমরা সবাই শুধু ইউকিলিপটাস গাছ লাগাই, যা পরিবেশের সহায়ক নয়। তিনি বলেন, আমি সকলকে অনুরোধ করবো ফলের বীজ ফেলে না দিয়ে সংরক্ষণ করে তা মাটিতে পুঁতে দিতে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদ্যাপন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চেয়ারম্যানগণ তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় যে সকল রাস্তা বা মহাসড়ক বা বাঁধ রয়েছে তাতে সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তিদের সাথে চুক্তি করে গাছ লাগাতে পারেন এবং সকল রাস্তার দুপাশে বৃক্ষরোপন করার জন্য বৃক্ষরোপন অভিযান পরিচালনা করুন। তিনি বলেন, গাছ লাগানো এবং তা সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি হলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার সবচেয়ে বড় উপায়।

সভার প্রধান অতিথি টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব নুরুল আলম বলেন, টেকনাফ এলাকায় রোহিঙ্গা আসার ফলে আমাদের পরিবেশের এবং বনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আমাদের সকলকে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন এ ব্যাপারে টেকনাফ উপজেলার সকল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নিয়ে কোস্ট যদি একটা সভা করতে পারে তা হলে সবচেয়ে ভালো হতো। তিনি বলেন, ইউপি চেয়ারম্যানদের সাথে পরিকল্পনা করে রাস্তার দু পাশে গাছ লাগাতে হবে।

সভার বিশেষ অতিথি টেকনাফ উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান মৌলানা ফেরদৌস আহমদ জমিরীবলেন, আমরা হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ বৃক্ষ নিধন করেছি। এ ব্যাপরে গাছ না কাটার জন্য গণ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি বলেন আমাদের মসজিদগুলোতে প্রতিদিন ইমামগণের মাধ্যমে মুসল্লীদের সামনে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ সম্পর্কে ও গাছের প্রয়োজনীয়তা এবং তার সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরার ব্যবস্থা করতে পারি। তিনি বলেন, আমি শেখ হাসিনাকে আমি ধন্যবাদ জানাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দেশে ও বিদেশে ভূমিকা রাখার জন্য।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান জনাব তাহেরা আক্তার মিলি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে আমাদের সকলের সংশ্লিষ্টতা ও করণীয় রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার বিষয়টি আমাদের সকলের ভালোভাবে বোঝা ও তার গুরুত্ব অনুধাবনের বিষয় রয়েছে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার কাজে আমরা কোস্ট ট্রাস্টকে সহায়তা দিয়ে যাবো।

বিশেষ অতিথি হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব নূর আহমদ আনোয়ারী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, আমি যখন ২০০৩ সালে প্রথম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই তখন কোস্ট ট্রাস্ট চেয়াম্যানদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য কুমিল্লা বার্ডে নিয়ে যায়, আমি তাতে অংশগ্রহণ করি। তিনি বৃক্ষ রোপন প্রসঙ্গে বলেন, রোহিঙ্গা আগমনের ফলে বন ধ্বংস হয়েছে সত্য কিন্তু এখনও যে সকল পাহাড় এখানে রয়েছে তাতেও যদি গাছ সঠিকভাবে লাগোনো যায় তাতেও অনেক গাছ লাগানো যাবে। টেকনাফে এখনও বন সৃজনের অনেক স্থান রয়েছে। তিনি সামাজিক বনায়নের গুরুত্ব সভায় তুলে ধরেন।

উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো: এমদাদ হোসাইন বলেন, আমরা সবসময় ময়লা-আবর্জনা পোড়াই তাতে যে ধোঁয়া বের হয় তাতে কার্বন নির্গত হয়। আমরা সকলে যদি যখন-তখন ময়লা-আবর্জনা না পুড়িয়ে মাটির মধ্যে পুঁতে ফেলি তাতে কার্বন নির্গত হবার আর সুযোগ থাকে না। মাটিতে ময়লা-আবর্জনা পুঁতে ফেললে তা সারে পরিণত হয়। তাতে আমাদের লাভ হয়। তিনি বলেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এখন থেকে আমি শিক্ষকদের ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বক্তব্যটি প্রচার করবো।

এজাহার সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাংবাদিক আশিক এলাহী ফারুকী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, বেশি পরিমান বনায়ন সৃষ্টিতে গুরুত্ব দিতে হবে, আমাদের পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে গাছ লাগিয়ে তাকে সবুজে মুড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তিনি বলেন, আমরা নির্বিচারে পাহাড় কেটেছি, এখন প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা আসার ফলে অনেক বন ধ্বংস হয়েছে তা পূরণের জন্য সামজিক বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে এবং তার সাথে প্যারাবন সৃজন ও বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি তালগাছ লাগানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন যত্রতত্র ঈটেরভাটা কার্বন নির্গমন ত্বরান্বিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা কর্মসূচিকে সফল করতে হলে সেই সকল ঈটভাটা বন্ধ করতে হবে, কারন তাতে প্রচুর গাছ কেটে লাকড়ি যোগান দিতে হয়। তিনি জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য নদীনালা খনন করতে পরামর্শ দেন।

লোকাল গভর্নমেন্ট ডিভিশনের উপজেলা ডেভেলপমেন্ট ফ্যাসিলিটেটর জনাব ত্রিপন চাকমাতাঁর বক্তৃতায় বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্য শুধু আমাদের একার নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদেরকে যে ভুগতে হচ্ছে তার প্রমান গত বছর রাঙ্গামাটিতে ১০০ জনের বেশি মানুষ পাহাড় ধ্বসে মারা পড়েছেন। এটা আগে কখনও ঘটে নি। তিনি বলেন, কোনো পরিবারে যদি কেই মাদকাসক্ত হয় তখন সেই পরিবারই শুধু ভুক্তভোগী হয় কিন্তু এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের সকলকে দুর্ভোগ পেহাতে হবে। এ জন্য সকলকে এখনই সতর্ক হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

উপজেলা সমবায় অফিসার জনাব নজরুল ইসলাম তাঁর বক্তৃতায় বলেন, সমবায় অফিসের তত্ত্বাবধানে সেন্ট মার্টিনসহ টেকনাফে ২৪টি গ্রুপ তৈরি করা হয়েছিল যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করতো। বর্তমানে তারা সক্রিয় নেই, কোস্ট ট্রাস্ট তাদের নিয়ে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার কাজ করতে পারে।

সভার সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব মো: রবিউল হাসান বিভিন্ন এলাকা থেকে এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে যারা কোস্টের আয়োজিত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেছেন তাদেরকে ধন্যাবাদ জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

সভাটির আয়োজনে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেন টেকনাফ জলবায়ু ফোরাম সদস্য নুরুল হোসাইন, সিএফটিএম প্রকল্পের প্রোগ্রাম অফিসার মং এথেন, কক্সবাজার জলবায়ু ফোরাম সদস্য রফিকুল ইসলাম, কোস্ট-এর একুয়াকালচার প্রকল্পের উপজেলা সমন্বয়কারী মাহবুব আলম প্রমুখ।

Share this post

PinIt
scroll to top
alsancak escort bornova escort gaziemir escort izmir escort buca escort karsiyaka escort cesme escort ucyol escort gaziemir escort mavisehir escort buca escort izmir escort alsancak escort manisa escort buca escort buca escort bornova escort gaziemir escort alsancak escort karsiyaka escort bornova escort gaziemir escort buca escort porno