রাখাইন হবে বাংলাদেশের’!

image-mk.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(৪ জুলাই) ::  রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান প্রচেষ্টা হঠাৎ দমকা গতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় তিনি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে জাপান সরকারের সহায়তা চেয়েছেন। জাপান সরকার সহায়তার আশ্বাস দিয়ে দ্রুত জাপানস্থ মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে প্রত্যাবাসন বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী ওআইসির সহায়তা চাইলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত আইসিসিতে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওআইসি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন রাশিয়া সফর করে দেশটির সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় দফা শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দেশটির সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন।

এদিকে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সোচ্চার হয়েছেন। জাতিসংঘ মিয়ানমারে ত্রাণ বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিশ্চিত ও প্রত্যাবাসনের আগে সে দেশে বিনিয়োগ না করতে আহ্বান জানিয়েছে জাপান টাইমস। এই দৈনিকটি তাদের সম্পাদকীয়তে বলেছে, শুধু অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গা সংকটকে পাশ কাটিয়ে রাখাইনে জাপানের বিনিয়োগ করা উচিত হবে না। তাদের অবশ্যই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান খুঁজতে চীনের দ্বারস্থ হয়েছেন।

তবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চমকে যাওয়ার মতো সমাধানসূত্র দিয়েছেন মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের এশিয়া প্রশান্ত-মহাসাগরীয় উপ-কমিটির চেয়ারম্যান ব্রাড শেরম্যান। তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারের মানচিত্রটাই বদলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে দেশটি থেকে আলাদা করে দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথা বিবেচনার জন্য পররাষ্ট্র দফতরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ১৩ জুন অনুষ্ঠিত মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়ার বাজেট বিষয়ক এক শুনানিতে সূচনা বক্তব্যে ব্রাড শেরম্যান বলেন, সুদান থেকে দক্ষিণ সুদানকে আলাদা করে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে যুক্তরাষ্ট্র যদি সমর্থন করতে পারে, তাহলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কেন একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না? শেরম্যানের এমন বক্তব্যের পেছনে তিনটি কারণ থাকতে পারে–

এক. এ গ্রহের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা। সমসাময়িক বিশ্বের বর্বরতম সেনাবাহিনী ও মগদের বংশধরদের দ্বারা রোহিঙ্গারা গত কয়েক দশক ধরে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হয়েছে। ধর্ষিতা রোহিঙ্গা নারীদের আর্তচিৎকারে মগের মুল্লুক মিয়ানমারের আকাশ-বাতাস-নদী-সাগর বেদনায় নীলকণ্ঠ হয়ে উঠেছে। জবরদস্তি নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে নিজভূমে পরবাসী করেছে। অবশেষে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের নিজ জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। মানবগোষ্ঠীর একজন সদস্য হিসেবে শেরম্যান রোহিঙ্গা মানবতার প্রতি নৃশংসতায় আবেগে, দুঃখে-কষ্টে রোহিঙ্গাদের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে রাখাইন (সাবেক নাম আরাকান) রাজ্যকে বাংলাদেশে যুক্ত করার প্রস্তাব করে থাকতে পারেন।

দুই. ‘ঝি-কে মেরে বৌ-কে শেখানো’র মতো চীন-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান দ্বৈরথে ক্ষুব্ধ শেরম্যান চীনের ঘনিষ্ঠতম মিত্র মিয়ানমারের ওপর প্রতিশোধ নিতে এমন প্রস্তাব করে থাকতে পারেন।

তিন. যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নজর বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন দ্বীপের ওপর। সেন্টমার্টিনের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র কিংবা কৌশলের অংশ হিসেবে কংগ্রেসম্যান এমন প্রস্তাব করে থাকতে পারেন।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ব্রাড শেরম্যানের এমন প্রস্তাবের পক্ষে কোনও আইনগত, ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে, নাকি এটি নিছকই আবেগ-ক্ষোভ, কৌশল-ষড়যন্ত্রের অংশ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে কয়েক শতক ধরে বসবাস করে আসছে। রোহিঙ্গা ইতিহাসবিদদের মতে, আরবি শব্দ ‘রহম’ (যার অর্থ ‘দয়া করা’) থেকে রোহিঙ্গা শব্দের উদ্ভব। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে আরবের বাণিজ্য জাহাজ রামব্রি দ্বীপের তীরে এক সংঘর্ষে ভেঙে পড়ে। জাহাজের আরবীয় মুসলমানরা ভাসতে ভাসতে কূলে ভিড়লে ‘রহম’, ‘রহম’ ধ্বনি দিয়ে স্থানীয় জনগণের সাহায্য কামনা করতে থাকে। রহম শব্দই বিকৃত হয়ে রোয়াং হয়েছে বলে রোহিঙ্গারা মনে করে থাকে। অনেকেই মনে করে, এরা রহম জাতির লোক। জাপানের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক Kei Nemote রোহিঙ্গা ইতিহাসবিদদের সঙ্গে সহমত পোষণ করে মনে করেন, রোহিঙ্গারা অষ্টম শতাব্দী থেকে রাখাইন রাজ্যে বাস করে আসছে। ইতিহাসবিদ Harvey, G E তার History of Burma গ্রন্থে লিখেছেন, আরাকানের মুসলিমরা বার্মিজ মগদের অনেক আগে আরাকানে বসতি স্থাপন করে। তার মতে, মগরা দশম বা দ্বাদশ শতাব্দীতে আরাকানে আসে। জাপানের কান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ের অধ্যাপক Aye Chan নিশ্চিত করে বলেন, অষ্টম শতাব্দীতে আরবীয়দের বার্মায় আগমনের সময় থেকেই বার্মায় মুসলিম বসতি ছিল।

তবে তিনি মনে করেন, রোহিঙ্গা শব্দের উদ্ভব মুসলিম বসতির মতো প্রাচীন নয়। তার মতে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বার্মায় অভিবাসী হিসেবে বসতি স্থাপনকারীদের বংশধররা রোহিঙ্গা শব্দের ব্যবহার শুরু করে। কিছু ঐতিহাসিক মনে করে থাকেন, ‘আরাকানের পূর্বতন রাজধানী ম্রোহং শব্দটি বিকৃত হয়ে রোয়াং, রোহাঙ্গ, রোসাঙ্গ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।’ অনেকেই মনে করে, রোঁয়াই, রোহিঙ্গা ও রোসাঙ্গ শব্দগুলো পরিমার্জিত হয়ে বাঙালি কবিদের কাছে রোসাঙ্গ হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের কাছে রোয়াং হিসেবে পরিচিত হয়েছে। ত্রিপুরা ক্রনিকলস রাজমালায় আরাকানকে রোসাং হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গঙ্গানাথ ঝা’র মতে, আরাকানের প্রাচীন নাম রোহাং থেকে রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি। তার মতে, আরাকানের মুসলিমরা তাদের দেশকে রোহাং বা রোয়াং বলে ডাকতো আর নিজেদের রোহিঙ্গা বলে পরিচয় দিতো, যার অর্থ রোহাং বা রোয়াং-এর স্থানীয় অধিবাসী।  মধ্যযুগের কবি কাজী দৌলত, মর্দন, শমসের আলী, কুরায়েশি মাগন, আইনুদ্দিন, আব্দুল গণি, আলাওলসহ অনেক কবি আরাকানকে রোসাং, রোসাংগ, রোসাংগ সার, রোসাঙ্গ দেশ নামে উল্লেখ করেছেন। মহাকবি আলাওল ‘পদ্মাবতী’ কাব্যে রোসাঙ্গের জনগোষ্ঠীর একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়েছেন,

‘নানা দেশি নানা লোক শুনিয়া রোসাঙ্গ ভোগ আইসন্ত নৃপ ছায়াতলে।

আরবি, মিসরি, সামি, তুর্কি, হাবসি ও রুমি, খোরসানি, উজবেগি সকলে।

লাহোরি, মুলতানি, সিন্ধি, কাশ্মীরি, দক্ষিণি, হিন্দি, কামরূপী আর বঙ্গদেশি।

বহু শেখ, সৈয়দজাদা, মোগল, পাঠান যোদ্ধা রাজপুত হিন্দু নানা জাতি।’

সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানিদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরে চাঁটগাইয়া, রাখাইন, আরাকানি, বার্মিজ, বাঙালি, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষদের মিশ্রণে উদ্ভূত এই শংকর জাতি ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত আরাকানে রোহিঙ্গাদের নিজেদের রাজ্য ছিল। ৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে সুপ্রসিদ্ধ আরব ভৌগোলিক সুলায়মান তার রচিত ‘সিলসিলাত উত তাওয়ারীখ’ নামক গ্রন্থে বঙ্গোপসাগরের তীরে রুহমি নামক একটি দেশের পরিচয় দিয়েছেন, যাকে আরাকানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত মুসলিম রাজ্য বলে মনে করা হয়। আরেক আরব ভৌগোলিক রশিদউদ্দিন ১৩১০ সালে আরাকানকে Raham হিসাবে উল্লেখ করেছেন। একটি গবেষণা দাবি করছে, আরাকানের তৎকালীন রাহমী রাজা রাসূল (স.)-এর জন্য এক কলস আদা উপঢৌকন হিসাবে পাঠিয়েছিলেন যা তিনি সাহাবিদের মধ্যে বণ্টন করে দেন (মুস্তাদারেক হাকেম, হাদিস/৭১৯০)। ‘ভারত রত্ন’ উপাধিপ্রাপ্ত ঐতিহাসিক কাযী আতহার মুবারকপুরী বলেন, সম্ভবত এই রাজা ছিলেন রাহমী রাজবংশের। যারা বাংলাদেশে রাজত্ব করতেন। এই বংশের রাজাগণ প্রতিবেশী রাজাদের কাছে বিভিন্ন উপঢৌকন পাঠাতেন। বিশেষ করে আদার উপঢৌকন’।(আল-ইক্বদুছ ছামিন, ২৪ পৃ.)।

আরাকান হলো টেকনাফের পূর্বে উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১০০ মাইল দীর্ঘ নাফ নদীর পূর্ব পাড়ে ৭২ মাইল দীর্ঘ দুর্লঙ্ঘ্য ও সুউচ্চ ইয়োমা (Yoma) পর্বতমালাবেষ্টিত বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী প্রায় ২২ হাজার বর্গমাইলব্যাপী একটি বৃহৎ সমতল ভূমি। আরাকানি মুসলমানদের সহযোগিতায় বর্মী মগদস্যুদের হাত থেকে মাত্র ৩৬ ঘণ্টায় শায়েস্তা খান কর্তৃক ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম দখলের আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকান রাজ্যভুক্ত ছিল। এছাড়া প্রাকৃতিক দিক দিয়ে দুর্গম ইয়োমা পর্বতমালা আরাকানকে বার্মা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সাড়ে তিনশ’ বছরের অধিক কাল যাবৎ আরাকান ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য এবং এর রাজধানী ছিল রোসাঙ্গ। এখানকার মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি ছিল মুসলমান। আর মুসলিমদের শতকরা ৯২ জন ছিল রোহিঙ্গা। ১৪৩৪ থেকে ১৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দু’শো বছরের বেশি সময় ধরে কলিমা শাহ, সুলতান শাহ, সিকান্দার শাহ, সলীম শাহ, হুসায়েন শাহ প্রমুখ ১৭ জন মুসলিম রাজা স্বাধীন আরাকান রাজ্য শাসন করেন। তাদের মুদ্রার এক পিঠে কালেমা ত্বাইয়িবা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও অন্য পিঠে রাজার নাম ও সাল ফারসিতে লেখা থাকত। স্বাধীন রাজ্য আরাকানে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে ১৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দে। সেখান থেকেই শুরু আরাকানি মুসলমান তথা রোহিঙ্গাদের ভাগ্য বিপর্যয়ের।

এরপর ১৭৮৪ সালে আরাকান স্বাধীনতা হারায়। বর্মি রাজা বোধাপোয়া আরাকান দখল করে নেন। ঘোর মুসলিমবিরোধী রাজা বোধাপোয়াও অসংখ্য মুসলমানকে হত্যা করেন। ১৮২৫ সালে ব্রিটিশরা মিয়ানমার অধিকার করলে আরাকান বার্মার একটি প্রদেশ হিসেবে ব্রিটিশ শাসনের অধিকারভুক্ত হয়। মিয়ানমারে ব্রিটিশ শাসনের অব্যবহিত পরেই ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব অঙ্কুরিত হতে থাকে। ১৯০৬ সালে রেঙ্গুন কলেজের শিক্ষার্থীরা ব্রিটিশবিরোধী ইয়াং মেনস বুড্ডিস্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীকালে এটি জেনারেল কাউন্সিল অব বার্মিজ অ্যাসোসিয়েশন (জিসিবিএ) নাম ধারণ করে। জিসিবিএর পাশাপাশি বর্মি বিশুদ্ধবাদিতার স্লোগান তুলে ‘দো বা মা’ (আমাদের বর্মি সংগঠন) নামে আরও একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এরা নিজেদের থাকিন (মাস্টার) বলে পরিচয় দিতে থাকে। থাকিনরা ‘বিদেশি খেদাও’ আন্দোলনের নামে মিয়ানমারে বসবাসরত ভারতীয়দের বিরুদ্ধে প্রচারণার সূচনা করে তা ছড়িয়ে দেয়। ভারতীয়বিরোধী মনোভাবের এই ঢেউ আরাকানেও এসে পৌঁছে।

শত শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় আরাকানে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদেরও দুর্ভাগ্যবশত ভারতীয় হিসেবে পরিগণিত করা হয়। থাকিনদের নেতা অং সান সু চি’র বাবা অং সান বার্মার স্বাধীনতার লক্ষ্যে বর্মিদের সংগঠিত করতে থাকেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে অং সান জাপান চলে যান এবং জাপানের সহায়তায় স্বাধীনতা লাভের উদ্দেশ্যে সেখানে বার্মিজ ইনডিপেনডেন্ট আর্মি (বিআইএ) গঠন করেন। ১৯৪২ সালে আকিয়াবে জাপানি আক্রমণ শুরু হলে ব্রিটিশরা আকিয়াব ত্যাগ করে, আর এ সুযোগে থাকিনরা আরাকানকে রোহিঙ্গামুক্ত করার পরিকল্পনা আঁটে। তারা নির্দেশ দেয়, যেসব মুসলমানের অবয়ব রাখাইনদের মতো নয়, বাঙালিদের মতো, তাদের অবিলম্বে আরাকান ত্যাগ করতে হবে। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ বিআইএর নেতৃত্বে আরাকানি থাকিনরা নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে বহু রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করা হয়, গ্রামের পর গ্রাম আগুন জ্বালিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়, অসংখ্য নারী ধর্ষণের শিকার হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে অং সান জাপানের সহায়তায় বার্মার স্বাধীনতার লক্ষ্যে যে বিআইএ গঠন করেছিলেন তাতে বার্মিজ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী ব্যাপক সাড়া দিলেও রোহিঙ্গারা ইংরেজদের সমর্থন ও সহায়তা দিয়েছিল। বিনিময়ে ব্রিটিশ সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য স্বাধীন আরাকান প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এ বিষয়টি বার্মিজ ও রাখাইনদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে। কিন্তু মিত্রশক্তি যুদ্ধে জয়লাভ করতে যাচ্ছে অনুধাবন করে অং সান জাপানের পক্ষ বদল করে ব্রিটিশদের পক্ষ অবলম্বন করেন। এ সময় অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট পিপলস ফ্রিডম লিগ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে রোহিঙ্গাদের মতো তিনিও মিত্রশক্তি ইংরেজদের সমর্থন দেন। যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার প্রশ্নে অং সানের সঙ্গে ব্রিটিশদের আলোচনা শুরু হয়। বার্মায় বর্মি ছাড়াও শান, কাচিন, চীন, কারেন ইত্যাদি আরো বহু জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রয়েছে। ফলে অং সানকে বর্মি বিশুদ্ধবাদীতার থাকিন আন্দোলনের সঙ্গে আপস করে অন্য জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গেও সমঝোতায় আসতে হয়। কিন্তু আরাকানি রাখাইনদের প্রবল বিরোধিতার কারণে রোহিঙ্গা মুসলমানদের আলাদা জাতিসত্তা হিসেবে আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

স্বাধীন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিশ্চিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে জেনে ১৯৪৬ সালে রোহিঙ্গাদের একটি দল মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করে মুসলিম অধ্যুষিত উত্তর আরাকানকে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করে। জিন্নাহ একে ননসেন্স বলে উড়িয়ে দেন। আর অং সান জিন্নাহকে আশ্বস্ত করেন যে স্বাধীন বার্মা সব মুসলমানের প্রতি সাংবিধানিকভাবে সমতা ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করবে। ফলে জিন্নাহ এ বিষয়ে আর কোনও আগ্রহ দেখাননি। অং সান মোটামুটি ন্যায্যতার ভিত্তিতেই রোহিঙ্গা ইস্যুটি সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু বার্মার স্বাধীনতা লাভের আগেই তার মৃত্যু হলে বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে এবং অং সানের মৃত্যুজনিত কারণে উ নু বার্মার ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

যেমন অনুমান করা হয়েছিল, বার্মা স্বাধীনতা লাভের পরও রোহিঙ্গদের ভাগ্যবিড়ম্বনার শেষ হয়নি। বার্মার স্বাধীনতা লাভের সময় শান, কারেন, মন, চীন, কাচিন ইত্যাদি জাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের জনগণ স্ব স্ব জাতির জন্য আলাদা স্টেট বা রাজ্য লাভ করলেও আরাকান স্টেটের মর্যদা পায়নি, বরং এটিকে আরাকান ডিভিশন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সব কিছু ভেস্তে যায় ১৯৬২ সালে, যখন জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখল করেন এবং দেশে সামরিক আইন জারি করেন। জান্তা সরকার ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বও বাতিল করে দেয়। নাগরিকত্ব বাতিল করার সঙ্গে সঙ্গে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের মানুষ হিসাবে স্বীকৃতিও বাতিল করে দেয়। জিন্নাহর ভুল আর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রতিশ্রিুতি ভঙ্গের কারণে রোহিঙ্গারা আজ এ গ্রহের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। হত্যা-ধর্ষণের শিকার হওয়াই তাদের নিয়তি। রোহিঙ্গা হিসাবে জন্ম নেওয়াই আজন্ম পাপ।

তাই কংগ্রেসের শুনানিতে ব্র্যাডলি শেরম্যান পরামর্শ দেন, যদি মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নিতে না পারে তাহলে রাখাইনকে বাংলাদেশের সীমান্তে অন্তর্ভুক্ত করাই যৌক্তিক। কারণ, বাংলাদেশই নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নিচ্ছে।

যত উদ্যোগই নেওয়া হোক না কেন রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের মূল চাবিকাঠি চীনের হাতে। চীন উত্তর আরাকানে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। চীনকে অনুধাবন করতে হবে রোহিঙ্গাদের নির্যাতিত রেখে চীনের বিশাল বিনিয়োগ আর বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ তথা BRI নামের মহাপরিকল্পনা নিরাপদ থাকতে পারে না। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবসিত করা না গেলে রাখাইনে চীনের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে চীন সরকারকে এ বার্তা দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের আন্তরিক ও কার্যকর সহযোগিতা চাইতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করছেন। চীন সরকারকে বুঝতে হবে কংগ্রেসম্যানের প্রস্তাব তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি রোহিঙ্গাদের অস্ত্র, অর্থ দিয়ে স্বাধীন আরাকান প্রতিষ্ঠায় মদদ জোগায় সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশেরও নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ থাকবে কি?

আরাকানকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার মার্কিন প্রস্তাব বাংলাদেশ কখনোই সমর্থন করে না। তবে রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সরকারকে সম্মত করাতে চীন বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে–এ প্রত্যাশা বিশ্বের মানবতাবাদী প্রতিটি মানুষের। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কোন পথে হাঁটবে, অনেক রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুতার কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক মো. জাকির হোসেন : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: zhossain1965@gmail.com

Share this post

PinIt
scroll to top
alsancak escort bornova escort gaziemir escort izmir escort buca escort karsiyaka escort cesme escort ucyol escort gaziemir escort mavisehir escort buca escort izmir escort alsancak escort manisa escort buca escort buca escort bornova escort gaziemir escort alsancak escort karsiyaka escort bornova escort gaziemir escort buca escort porno