সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ আশংকাজনকভাবে বাড়ছে

bank-loan-bd-gov.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(৬ জুলাই) :: সঞ্চয়পত্র হলো গ্রহীতা নাগরিকদের কাছে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণত সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়লে সরকারের ব্যাংকঋণ কমে। গত এক দশকে এ চিত্রই ছিল দেশে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সঞ্চয়পত্র ও সরকারের ব্যাংকঋণ প্রবৃদ্ধি দুটোই বাড়ছে সমান্তরালে।

বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে গত অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়ে ছে। আর গত এপ্রিল শেষে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮১ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকিং খাত থেকেও ঋণ বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে। ২০১৮ সালের মে মাস শেষে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৯৬ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। চলতি বছরের মে মাস শেষে এর পরিমাণ ১ লাখ ৩৭ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরেই সরকারের ব্যাংকঋণ বেড়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা বা ৪২ শতাংশ। সরকারের ব্যাংকঋণের এ প্রবৃদ্ধি গত এক যুগে সর্বোচ্চ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সঞ্চয়পত্র বা দেশের ব্যাংকঋণের জন্য উচ্চহারে সুদ পরিশোধ করতে হবে। এতে সরকারের ব্যয়ও অনেক বাড়বে। এ থেকে উত্তরণে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈদেশিক উৎস থেকে সহজ শর্তের ঋণ গ্রহণে জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১০ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৯ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। ২০১১ সালের জুন শেষে এ ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকায়। এ হিসাবে ২০১০-১১ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ে ৩৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এর পর থেকে সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়লেও এর হার ছিল নিম্নমুখী। ২০১২ সালের জুনে এসে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৭ হাজার ৭১ কোটি টাকায়। ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে ২০১৩ সাল থেকেই সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ বেড়ে যায়। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হওয়ায় সরকার ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়ে। ২০১৪ সালের জুনে এসে সরকারের ব্যাংকঋণ বেড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার ২৬৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তার পর থেকে ওঠানামার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ। ২০১৮ সালের জুন শেষে সরকারের ব্যাংকঋণ ১ লাখ ১৪ হাজার ৯৫ কোটি টাকায় নেমে আসে। কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই ব্যাংকিং খাত থেকে রেকর্ড ২৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। গত জুন ও চলতি জুলাইয়েও সরকারের এ ঋণ গ্রহণের প্রবণতা ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

সাম্প্রতিক সময়ে বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র নির্ভরতাও বাড়িয়েছে সরকার। গত এপ্রিল শেষে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮১ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। যদিও এক দশক আগে ২০০৯ সালের জুন শেষে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। এ হিসাবে এক দশকের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের ঋণ প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে।

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ না বাড়িয়ে সরকারকে বিদেশ থেকে সহজ শর্তের ঋণ বাড়াতে হবে বলে মনে করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে সরকার প্রধানত তিনটি উৎস ব্যবহার করে। এগুলো হলো বৈদেশিক উৎস ও অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি। এর মধ্যে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ হলো সহজ শর্তে দাতা সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ। যদিও সরকার এ মুহূর্তে ব্যাংকিং খাত ও সঞ্চয়পত্রনির্ভর হয়ে পড়েছে। এতে সরকারের সুদ ব্যয়ও অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্যই সরকারকে নতুন ঋণ নিতে হবে।

বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে বৈদেশিক উৎস থেকে সাহায্য ও ঋণ নেয়ার তাগিদ দিয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ঋণের অর্থ যাতে যথাযথভাবে ব্যয় হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অপব্যয় ও দুর্নীতি রোধ করতে না পারলে অর্থনীতিতে শুধু বোঝাই বাড়বে। বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।

এদিকে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। ২০০৯ সালের জুন শেষে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৫০ হাজার কোটি টাকার নিচে। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল শেষে এ খাতে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮১ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। গত তিন অর্থবছরে গড়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে রেকর্ড ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ২৮ হাজার ৭৩২ কোটি টাকার। ওই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর পর থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টানা যাচ্ছে না। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩২ শতাংশ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৭ দশমিক ৭৫ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে।

তবে সঞ্চয়পত্র থেকে গৃহীত ঋণকে সরকারের শুধু দায় হিসেবে দেখেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্র হলো বিশেষ শ্রেণীর নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। যদিও সঞ্চয়পত্র বিক্রির ক্ষেত্রে বেশকিছু অনিয়ম হচ্ছে। ২ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্রের মধ্যে একটি বড় অংশ ধনিক শ্রেণীর। একই পরিবারে সর্বোচ্চ ১ কোটি এবং একক ব্যক্তির ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র কেনার সীমা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা গেলে ১ লাখ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র কমে যাবে।

ঘাটতি বাজেটে ভয়ের কিছু নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ ধরনের বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সক্ষমতা বাড়ে। রাজস্ব ঘাটতির কারণেই সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু এটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়। টেকসই সমাধান করতে হলে রাজস্ব আহরণে এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেটির সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে বাড়াতে হবে বিদেশী বিনিয়োগ ও বৈদেশিক উৎস থেকে সহজ শর্তের ঋণ।

সরকারের অতিমাত্রায় ব্যাংকঋণনির্ভরতায় ভেস্তে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রাও। বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুদ্রানীতি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদ্রানীতির অন্যতম দুটি উপাদান হলো সরকারি এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন। মুদ্রাবাজারে অর্থের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয় এ দুটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, মুদ্রানীতির এ দুটি উপাদানই ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে ব্যাপক মুদ্রা (ব্রড মানি) জোগানের লক্ষ্যমাত্রাও।

সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল মুদ্রানীতিতে। অর্থবছরের মাঝপথে এসে সে লক্ষ্য কমিয়ে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও অর্থবছর শেষে পুনর্নির্ধারিত লক্ষ্যও অধরাই থাকছে। ২০১৮ সালের মে থেকে ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত এক বছরের হিসাবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১২ দশমিক শূন্য ১৬ শতাংশ। গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে বেসরকারি খাতে এটিই সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি।

এর বিপরীত পরিস্থিতি সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে। বিদায়ী অর্থবছরে প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সরকারের ঋণের চাহিদার কথা বিবেচনা করে দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে তা বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। যদিও বাস্তবে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চার গুণেরও বেশি। ২০১৮ সালের মে থেকে ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত এক বছরে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪২ দশমিক ১৬ শতাংশ। যদিও আগের অর্থবছরের একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল।

২০১৯-২০ অর্থবছরে ঘাটতি বাজেট মেটাতে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরো বাড়বে। এরই মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অংকের ঋণ নেয়াও শুরু করেছে সরকার। এতে দেশের ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান তারল্য সংকট আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যমান তারল্য সংকটের সময় সরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা বাজার পরিস্থিতিকে আরো উসকে দিতে পারে বলে মনে করেন ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, মে পর্যন্ত বেসরকারি খাতে যে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা হতাশাজনক। জুন যোগ করেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। সরকারি খাতে লক্ষ্যমাত্রার চার গুণের বেশি ঋণ প্রবৃদ্ধি অবশ্যই শঙ্কার।

Share this post

PinIt
scroll to top
alsancak escort bornova escort gaziemir escort izmir escort buca escort karsiyaka escort cesme escort ucyol escort gaziemir escort mavisehir escort buca escort izmir escort alsancak escort manisa escort buca escort buca escort bornova escort gaziemir escort alsancak escort karsiyaka escort bornova escort gaziemir escort buca escort porno