যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী তাড়াতে ধরপাকড় শুরু : আতঙ্কে আনডক্যুমেন্টেড বাংলাদেশিরা

usa-nypd-bd-flag.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(৭ জুলাই) :: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, দেশটিতে আসা অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে শিগগিরই অভিযান শুরু হবে। তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। অন্যদিকে, অবৈধদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। যদিও গত ৪ জুলাই রাত ১২টার পর থেকে ফের অবৈধ অভিবাসীদের ধরপাকড় শুরু করেছে ইমিগ্রেশন এন্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টট-আইস। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিসহ আনডক্যুমেন্টেড অভিবাসীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশিদের কোনো সঠিক সংখ্যা নেই। তবে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে  অবৈধ বাংলাদেশিদের সংখ্যা প্রায় এক লাখের মতো। এর মধ্যে শুধু নিউইয়র্কেই বসবাস করছে ৫০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশি। আর বাকি ৫০ হাজার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, শিকাগো, জর্জিয়া, নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে রয়েছে প্রচুর অবৈধ বাংলাদেশি।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি জানান, ‘কিছুদিন আগে সাত মুসলিমপ্রধান দেশের অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত বন্ধ করার ঘোষণা শুনেই বাংলাদেশিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন আইনজীবীকে নিয়ে সোসাইটির উদ্যোগে তাত্ক্ষণিক একটি সেমিনার করে বাংলাদেশি প্রবাসীদের আইনি পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। বর্তমান নতুন আইন জারির পর বাংলাদেশিদের মধ্যে নানা ধরনের ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এদিকে, বৃহস্পতিবার স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ভুল বক্তব্য দিয়ে ফের উপহাসের পাত্র হয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ১৭৭৫ সালের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ব্রিটিশদের কাছ থেকে বিমানবন্দর দখল নিয়েছিল। যদিও সে সময় কোনো বিমান ও বিমানবন্দর ছিল না। অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জো বাইডেন ট্রাম্পকে একজন ‘বুলি’ বা ‘খুদে গুণ্ডা’ বলেছেন।

অভিবাসন বিষয়ে কট্টর অবস্থানের জন্য পরিচিত ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টকাল এবং তার ২০২০ সালের নির্বাচনী প্রচারণাতেও অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা অবৈধদের তাড়াতে গত মাসেই অভিযানের পরিকল্পনা করলেও দিনক্ষণ ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পরে তা স্থগিত করে।

শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, শিগগিরই এটা শুরু হবে, আমি একে অভিযান বলতে চাই না। বছরের পর বছর যারা অবৈধভাবে এসেছে, আমরা তাদের সরাতে চাই।

এর আগে গত বুধবার এক টুইটে ট্রাম্প বলেছেন, আটক কেন্দ্রগুলোর অবস্থা নিয়ে যে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা অসুখী, তাদের বলে দেওয়া উচিত- ‘তোমরা এসো না।’

এদিকে, শুক্রবার অভিবাসনপ্রত্যাশী আটক কেন্দ্রগুলোর অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন ডেমোক্রেটিক আইনপ্রণেতা এবং নাগরিক অধিকার কর্মীরা। তাদের অনেকে সম্প্রতি অভিবাসনপ্রত্যাশীর ভিড়ে ঠাসা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের আটক কেন্দ্রগুলো সফর করে এসেছেন। সেখানকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, খাদ্য, পানি ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদার সংকটকে এককথায় দুর্বিষহ বলে মন্তব্য করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) বিভাগের মহাপরিদর্শক গত মঙ্গলবার টেক্সাসের রিও গ্র্যান্ডে অভিবাসনপ্রত্যাশী আটক কেন্দ্রগুলোর কিছু ছবি প্রকাশ করেছেন। ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ অভিবাসী নিয়ে হিমশিম খাওয়া আটক কেন্দ্রগুলোর ছবি বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছে।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কয়েক মাসের মধ্যে প্রবেশ করা কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছিল। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে চাওয়া মধ্য আমেরিকান দেশগুলোর বাসিন্দাদের নিরুৎসাহিত করতেই অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এক বিবৃতিতে আইসিই জানায়, অপরাধের সঙ্গে জড়িত এমন লোকদের গ্রেফতারই তাদের নজর থাকবে।

তবে কোনো অভিবাসী যদি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আইন লঙ্ঘন করে, তবে তাকেও গ্রেফতার করা হবে। অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো চলতি সপ্তাহে আইসিইর আগের অভিযানে কাদের বেশি গ্রেফতার করা হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারি নথি প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, কর্মকর্তারা কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের গ্রেফতারেই বেশ আগ্রহী।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ অভিবাসী আছেন কাগজপত্রহীন। অন্যদিকে, এইচ-৪ ভিসা নিয়েও সমস্যা কাটেনি এখনও। এইচ১-বি ভিসায় যাঁরা আমেরিকায় আসেন, তাঁদের সঙ্গে স্বামী বা স্ত্রী এইচ-৪ ভিসা নিয়ে আমেরিকায় কাজ করতে পারেন। সে ব্যাপারে কিছু দিন আগেই ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছিল, এইচ১-বি ভিসা পাওয়া যেমন কঠিন করেছে, এইচ-৪ ভিসা পেতেও কষ্ট করতে হবে ভারতীয়দের।

আইসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২০ জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত আড়াই লাখ অবৈধ অভিবাসীকে আমেরিকা থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা কয়েক শ হতে পারে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের আতঙ্কে আরও ৫-৬ হাজার বাংলাদেশি স্বেচ্ছায় আমেরিকা ত্যাগ করেছেন। এঁদের অনেকেই পাড়ি দিয়েছেন কানাডায়।

বাংলাদেশ থেকে ভয়ংকর আমেরিকা অভিযাত্রা

এঁদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি মানুষও আছে। বয়স ১৮ বছরের নিচে—এমন শতাধিক অপ্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি আমেরিকা অভিযাত্রীর বয়স নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে খোদ আমেরিকায়।

সাধারণত যাদের বয়স ১৮ বছরের কম, তাদের ফেডারেল সরকার অফিস অব রিফিউজি সেটেলমেন্টের (ওআরএস) হেফাজতে রাখে। ওআরএসের কাজ হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের দেখাশোনা করা। পরবর্তী সময়ে যেন তারা পরিবারের সঙ্গে মিলিত হতে পারে, তা নিশ্চিত করা। আর যেসব অভিবাসীর বয়স ১৮ বছরের বেশি, তাঁদের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইস) কারাগারে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে কারাবন্দী রাখা হয়।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর অভিবাসী কমাতে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে আমেরিকার ফেডারেল সরকার দাঁত পরীক্ষা এবং হাড়ের এক্স-রে করে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বয়স নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে। ফলে, বাংলাদেশ থেকে আসা অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীর আইসের কারাগারে হস্তান্তর করা হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে।

ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের তথ্যমতে, গত বছর আমেরিকার বর্ডার পুলিশ সর্বমোট ১ হাজার ২০৩ জন বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটক করে। এঁদের মধ্যে ১৫০ জন নিজেদের অপ্রাপ্তবয়স্ক দাবি করেছে। কিন্তু ফেডারেল সরকার সে দাবির তোয়াক্কা না করে দাঁতের পরীক্ষা ও হাড়ের এক্স-রে করে বয়স নির্ধারণ করে আইসের কারাগারে সমর্পণ করেছে। এ কারণে অনেকেই কারাগারে মাসের পর মাস মানবেতর জীবনযাপন করছে।

আমেরিকার ফেডারেল আইনে শুধু দন্ত পরীক্ষা ও হাড়ের এক্স-রে করে বয়স নির্ধারণ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু সে আইন এসব বাংলাদেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীর ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। ফরেনসিক পরীক্ষা করে বয়স নির্ধারণ করা সন্দেহাতীত নয়। মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মতে, দাঁতের পরীক্ষা এবং হাড়ের এক্স-রে করে নির্ভুলভাবে বয়স নির্ধারণ করা যায় না।

ইউটি হেলথ স্যান অ্যান্টোনিয়োর ডিরেক্টর অব দ্য সেন্টার ফর এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ড. ডেভিড সিন বলেছেন, ‘ফরেনসিক পরীক্ষা করে সঠিক বয়স নির্ধারণ করা অসম্ভব। আমরা শুধু আগের পরিসংখ্যান বিচার করে একটি ধারণার কথা বলি।’

অপ্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশিদের কারাবাস, সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশিদের মরণপণ অভিযাত্রা এসব নিয়ে এলএ টাইমস সম্প্রতি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বাংলাদেশিদের জন্মসনদ থেকে শুরু করে আদম পাচারকারী, ভুয়া পাসপোর্ট—এসবের কথাও বলা হয়েছে।

আমেরিকায় বসবাসরত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আলী রীয়াজ এলএ টাইমসকে বলেন, বাংলাদেশিরা নানা কারণে দেশ ছাড়ছে। এর মধ্যে জনসংখ্যার আধিক্য, যুব কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক বেকারত্ব, রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি এবং উন্নত জীবনের প্রত্যাশাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন আলী রীয়াজ।

দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে আমেরিকায় ঢোকার অপেক্ষায় আছেন বাংলাদেশি শিরিল আলম (২৪)। তিন মাস আগে দালালের মাধ্যমে তিনি ব্রাজিল থেকে আমেরিকায় আসার অভিযানে নেমেছেন। নানা বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে শিরিল পানামা থেকে যোগাযোগ করেছেন। জানিয়েছেন, ভয়ংকর যাত্রাপথে অনেককেই মারা যেতে দেখেছেন। বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে এসেছেন। এসব দালাল দেশের পর দেশে হাতবদল করছে। সর্বত্র মৃত্যুর ভয়, গ্রেপ্তারের ভয়। দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশের কারাগারে বহু আমেরিকা অভিযাত্রী আছেন বলে শিরিল জানালেন। দালাল বলেছেন, আমেরিকা সীমান্তে আসার পরই তিনি গ্রেপ্তার হবেন এবং সেখানে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে পারবেন।

দেশে যেমন আমেরিকা অভিযাত্রী লোকজনকে ঠেকানোর কোনো উদ্যোগ নেই, তেমনি বন্ধুর যাত্রাপথে জীবন–মরণ সংকটে পড়া ব্যক্তিদেরও খোঁজ করার কেউ নেই। ভাগ্যবিড়ম্বিত এসব অভিযাত্রী মারা পড়ছেন নদীতে ডুবে, পুলিশ-সীমান্তরক্ষীর তাড়া খেয়ে। আমেরিকার ডিটেনশন কেন্দ্রে থাকা অপ্রাপ্তবয়স্কদেরও আইনগত সহযোগিতা দেওয়ার কেউ নেই।

এ নিয়ে নিউইয়র্কে নাগরিক সংগঠন ড্রামের অন্যতম পরিচালক কাজী ফৌজিয়া বলেন, ‘আমরা বারবার বলে আসছি, দেশের যেসব এলাকা থেকে দালালেরা এসব লোককে স্বপ্নের দেশে নিয়ে আসার প্রলোভন দেখাচ্ছেন, তাঁদের দমন করতে হবে। আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

Share this post

PinIt
scroll to top
alsancak escort bornova escort gaziemir escort izmir escort buca escort karsiyaka escort cesme escort ucyol escort gaziemir escort mavisehir escort buca escort izmir escort alsancak escort manisa escort buca escort buca escort bornova escort gaziemir escort alsancak escort karsiyaka escort bornova escort gaziemir escort buca escort porno