২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হোঁচট : ঘাটতি ৫৪ হাজার কোটি টাকা

nbr-bujet-short.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(১৫ জুলাই) :: বিদায়ী অর্থবছরে রাজস্বের বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হোঁচট খেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আহরণের মধ্য দিয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষ করেছে সংস্থাটি। রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধিও দুই অংক ছুঁতে পারেনি। গত অর্থবছর রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ, গত পাঁচ বছরের মধ্যে যা সর্বনিম্ন।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে এনবিআরকে ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়। রাজস্ব আহরণের গতি সন্তোষজনক না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ২ লাখ ৮০ হাজার ২৬৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এনবিআরের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরের পুরো সময়ে সংস্থাটি রাজস্ব আহরণ করতে পেরেছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫৩ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা পিছিয়ে আছে রাজস্ব আহরণকারী সংস্থাটি।

লক্ষ্যমাত্রা বেশি হওয়ায় রাজস্ব ঘাটতি বড় দেখাচ্ছে বলে দাবি এনবিআর কর্মকর্তাদের। নির্বাচনের বছর হওয়ায় রাজস্ব আহরণে নজরদারি কম হওয়াকে এর কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া বলেন, গত অর্থবছর আমরা রাজস্ব আহরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। যে পরিমাণ রাজস্ব আহরণ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি আহরণ করা সম্ভব ছিল না। তবে এখনো রাজস্ব আহরণের পূর্ণাঙ্গ তথ্য আসেনি। আমাদের অফিসগুলো এ নিয়ে কাজ করছে। বিশেষ করে উেস কর ও অগ্রিম কর সমন্বয়ের পর রাজস্ব আদায় আরো ৮-১০ হাজার কোটি টাকা বাড়বে বলে মনে করছি।

এনবিআরের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে শুল্ক থেকে এনবিআরের রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা কম হয়েছে। আলোচ্য অর্থবছরে এ খাত থেকে ৭৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৬৪ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শুল্ক থেকে রাজস্ব এসেছিল ৬১ হাজার ৮১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এ হিসাবে গত অর্থবছর শুল্ক থেকে রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। যদিও ২০১৭-১৮ অর্থবছর এ খাতে ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছিল এনবিআর।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে শুল্ক বাবদ সবচেয়ে বেশি ৪২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব এসেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে। শুল্ক বাবদ আহরিত রাজস্বের ৬৫ শতাংশই জোগান দিয়েছে তারা। তার পরও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। গত অর্থবছর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের শুল্ক আহরণের লক্ষ্য ছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

রাজস্বের সবচেয়ে বড় খাত মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট। এনবিআরের সাময়িক হিসাবে, ১ লাখ ৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ভ্যাট থেকে রাজস্ব এসেছে ৮৭ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাতে এনবিআরের ঘাটতি রয়েছে ১৬ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে ভ্যাট থেকে রাজস্ব এসেছিল ৭৮ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে ভ্যাট থেকে গত অর্থবছর এনবিআরের রাজস্ব বেড়েছে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। যদিও ২০১৭-১৮ অর্থবছর এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৪ শতাংশ।

২০১৮-১৯ অর্থবছর সবচেয়ে বেশি ভ্যাট এসেছে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (ভ্যাট) থেকে। তারা মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট আহরণ করেছে। এর বেশির ভাগই এসেছে সিগারেট ও সেলফোন অপারেটরগুলোর কাছ থেকে।

রাজস্বের আরেক খাত আয়কর থেকে গত অর্থবছর এনবিআরের রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৭৪ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। ৯৬ হাজার ৬৩২ কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয়কর থেকে এ পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করতে পেরেছে সংস্থাটি। এ হিসাবে আয়করে এনবিআরের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। আয়করে এনবিআরের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ শতাংশ। এর আগের অর্থবছর আয়কর আহরণ হয়েছিল ৬৫ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ও প্রবৃদ্ধি ছিল ২২ শতাংশ।

বিদায়ী অর্থবছর মোট আয়করের ৫৩ শতাংশ এসেছে ঢাকার আয়কর অঞ্চল-২ থেকে। এখান থেকে মোট আয়কর এসেছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। আয়কর অঞ্চল-২ এর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে বৃহৎ করদাতা ইউনিট থেকে অর্থাৎ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আয়কর আদায় আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯২৫ কোটি টাকা।

মূলত তিন কারণে রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রথমত, এনবিআরের সক্ষমতা যাচাই না করেই রাজস্ব আহরণের বড় লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হচ্ছে। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। দ্বিতীয়ত, যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখানো হচ্ছে তা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ জিডিপি প্রবৃদ্ধি উচ্চ হলে রাজস্ব আহরণে এর প্রভাব পড়ত। রাজস্ব আহরণ বাড়লেও জিডিপির সঙ্গে এর প্রবৃদ্ধির কোনো সামঞ্জস্য নেই। তৃতীয় কারণটি হলো, কোম্পানি ও ব্যক্তি করদাতাদের মধ্যে রাজস্ব ফাঁকির প্রবণতা, এনবিআর কর্মকর্তাদের দুর্নীতি এবং কাস্টমস বিভাগে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি। এসব কারণে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

বিদায়ী অর্থবছরের বড় ঘাটতি সত্ত্বেও চলতি অর্থবছর এনবিআরকে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৭২ কোটি, আয়করে ১ লাখ ১৫ হাজার ৫৮৮ কোটি ও শুল্কে ৯২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা।

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri