রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা

rohingya-myanmar-logo.jpg

এ কে এম শামসুদ্দিন(১ আগস্ট) :: যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংসহ শীর্ষ চার সামরিক কর্মকর্তার সেদেশে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বাকি তিন শীর্ষ কর্মকর্তা হলেন সেনাবাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার ইন চিফ সোয়ে উইন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অং অং এবং থান উ।

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেনাপ্র্রধান রোহিঙ্গাবিরোধী প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে, তার জবাবদিহিও করতে হবে মিয়ানমারকে। ইতিপূর্বে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া মিয়ানমারের সাত সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তার তাদের দেশে ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইতিপূর্বে রোহিঙ্গা গণহত্যায় ১৩ শীর্ষ কর্মকর্তার সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থা জানায়, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনের আর্টিকেল ৭-এর তালিকাভুক্ত মানবতাবিরোধী ১১ অপরাধের মধ্যে ৯টি অপরাধ সংঘটিত করেছে।

তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত করেছে। জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশন মানবতাবিরোধী এসব অপরাধের অভিযোগে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ অন্য জেনারেলদের বিরুদ্ধে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের (আইসিসি) মাধ্যমে বিচারের সুপারিশ করেছিল।

সাধারণত কোথাও কোনো গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধনের উদ্দেশ্যে নৃশংস অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ড এবং বাস্তুভিটা থেকে বিতাড়িত করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উত্থাপিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচারের জন্য আইসিসির কৌঁসুলি দফতর তদন্ত শুরু করে।

তদন্তের অংশ হিসেবে শুরুতেই মাঠ পর্যায়ে তথ্যানুসন্ধানে গিয়ে দেখা হয় তদন্ত চালানোর জন্য যৌক্তিক কারণ বা উপাদান আছে কিনা। অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত উপাদান খুঁজে পাওয়ার পর আসল তদন্ত শুরু হয়।

অতঃপর তদন্ত পরিচালনার জন্য আইসিসি নির্দিষ্ট দেশে একটি প্রতিনিধি দল পাঠায়। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে ভুক্তভোগী মানুষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নেন। তদন্তকালে আইসিসি রোম সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ ও সেদেশের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নিয়ে থাকে।

তদন্ত শেষে অভিযোগের বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়ার পর কৌঁসুলিরা বিচারকের কাছে অভিযুক্তদের আদালতে হাজির হওয়া অথবা তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির অনুরোধ জানায়।

অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক তদন্ত প্রতিবেদন বিচার-বিশ্লেষণ করে যদি মনে করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি সত্যিই মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন এবং এ বিষয়ে তদন্ত রিপোর্টে যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তাহলে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন।

উল্লেখ্য, আইসিসির বিচারকার্যের বেশকিছু পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। তদন্তের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধানের কাজটি গত বছরই সম্পন্ন হয়ে গেছে, যার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিতও হয়েছে।

বর্তমানে আইসিসি রোহিঙ্গা গণহত্যার মূল তদন্তের প্রাথমিক পর্বের কাজের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে দাফতরিক কাজ শুরু করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে অনুযায়ী আইসিসির উপকৌঁসুলি জেমস স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গত ১৬-২১ জুলাই বাংলাদেশের আইন, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

এছাড়াও তারা জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এ সফরে আইসিসির প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা করে পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজও নিয়েছেন।

আইসিসির মূল তদন্তের কাজ তো শুরু হল, তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে অপরাধীদের শাস্তিও হয়তো নির্ধারিত হয়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হল, তাতে বাংলাদেশের কী লাভ হবে? ১১ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর মিয়ানমারের ফিরে যাওয়া কি নিশ্চিত হবে?

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা পর্যালোচনা করলে সে সম্ভাবনা আপাতত নেই বলেই মনে হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া শুরু হবে বলে বক্তব্য দিলেও প্রত্যাবাসনের যে শর্তাবলী নির্ধারিত হয়েছিল, মিয়ানমার সেসব শর্ত পূরণে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

গত নভেম্বরেও এরকম একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেও একই কারণে তা শুরু করা সম্ভব হয়নি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তির অন্যতম শর্ত হল, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান। আমার বিশ্বাস এ ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থানও বেশ শক্ত।

রোহিঙ্গারা নাগরিকত্বের স্বীকৃতি ছাড়া যে সেদেশে ফিরে যাবে না তা তারা গত মাসের গোড়ার দিকে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূতের উদ্বাস্তু শিবির সফরকালে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।

চীনের সহযোগিতা ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান যে সম্ভব নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সে কথা বিবেচনা করে চীনের রাষ্ট্রদূতের রোহিঙ্গা শিবির সফর গুরুত্ব বহন করে বৈকি।

সফরকালে মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি কিনা চীনা রাষ্ট্রদূতের এমন প্রশ্নের জবাবে রোহিঙ্গারা শর্তপূরণ সাপেক্ষে যে কোনো মুহূর্তে রাখাইন রাজ্যে ফিরে যেতে প্রস্তুত আছে বলে জানায়।

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে চীনা রাষ্ট্রদূত যে বার্তা পেয়েছেন তা নিশ্চয়ই তিনি কূটনৈতিক নোটে তার দেশের সরকারের কাছে পাঠিয়েছেন। অপরদিকে সাম্প্রতিক চীন সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করলে চীন তাদের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে।

চীন বরাবরই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার কথা বললেও এ যাবৎ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে শুনিনি। মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এর অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশেও চীনের ব্যাপক বাণিজ্যিক বিনিয়োগ আছে। ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশের ব্যাপারে বেশ আগ্রহী। এছাড়া স্বাধীনতার পর থেকেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাপক সামরিক সহযোগিতা আদান-প্রদান হয়ে আসছে। তারপরও রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে চীনের এমন অবস্থান বাংলাদেশের জন্য হতাশাব্যঞ্জক।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভারতের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা আমরা পাচ্ছি না। এর কারণও একই। মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের মতো ভারতের বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ নিহিত।

অপরদিকে রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণে জাতিসংঘের ভূমিকা আশাপ্রদ নয়। বিশেষ করে মিয়ানমারে কর্মরত জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জাতিসংঘের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে গণহত্যা বন্ধে তাদের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হামলার আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া সত্ত্বেও গুরুত্বের সঙ্গে না নেয়া এবং কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংস নিপীড়নের বিষয়টি তারা এড়িয়ে গেছেন।

প্রতিবেদনে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের (অং সান সু চির দলের ক্ষমতা গ্রহণ) বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অতি উৎসাহও একটি কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে জাতিসংঘ জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে ওরা আন্তরিকভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। মিয়ানমার বর্তমানে কিছুটা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে যে পড়েছে তা অনুমান করা যায়। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে।

গত অধিবেশনে বাংলাদেশ কর্তৃক রোহিঙ্গা ইস্যু উত্থাপনের পর মিয়ানমারের ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশ যে একই ইস্যু নিয়ে সোচ্চার হবে তা মাথায় রেখেই মিয়ানমার কাজ করে যাচ্ছে।

সে লক্ষ্যেই মিয়ানমার সরকারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গাদের বুঝিয়ে বাস্তুভিটায় ফিরিয়ে নেয়ার জন্য উদ্বাস্তু শিবির পরিদর্শনে এসেছে। গত বছরও আমরা এমন একটি প্রতিনিধি দলের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন দেখেছি।

শোনা যাচ্ছে, প্রত্যাবাসনের পর পুনর্বাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলো রোহিঙ্গাদের অবগত করে তাদের ফিরে যেতে উৎসাহিত করতে প্রতিনিধি দলের এ সফরের আয়োজন করা হয়েছে।

বোঝা যাচ্ছে, প্রত্যাবাসনের শর্ত পূরণে মিয়ানমার আগের অবস্থানেই আছে। আলোচনাকালে রোহিঙ্গা নেতারা তাদের মৌলিক অধিকারগুলো ফিরিয়ে দিতে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। আলোচনা শেষে একজন রোহিঙ্গা নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মিয়ানমার আমাদের কোনো দিন ফিরিয়ে নেবে না। এটা শুভঙ্করের ফাঁকি।

আন্তর্জাতিকভাবে যখন মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়, তখনই নানা ফন্দি শুরু করে মিয়ানমার সরকার। রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে আলোচনাকালে ১৯৮২ সালের নাগরিক আইন ও ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজ হাজির করা সাপেক্ষে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে বলে প্রতিনিধি দল জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনে বলা হয়েছে, যারা এ আইন কার্যকর হওয়ার আগে নাগরিক ছিল তাদের নাগরিকত্ব বহাল থাকবে। কিন্তু এ আইন কার্যকর করার প্রক্রিয়ার কারণে ধীরে ধীরে রাখাইনের মুসলিমদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ উল্লেখযোগ্যহারে সংকুচিত হয়েছে।

১৯৮৯ সালে পুরো মিয়ানমারে নাগরিকত্ব নিরীক্ষণ প্রক্রিয়া চালানো হয়। যারা নতুন শর্তাবলি পূরণ করতে পারছে বলে মনে হয়েছে, তাদের ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন কার্ড (এনআরসি) বদলে সিটিজেনশিপ স্ক্রুটিনি কার্ড (সিএসসি) দেয়া হয়।

রাখাইনের এনআরসিধারী বেশিরভাগ মুসলিম কার্ড জমা দেয়। কিন্তু তাদের কখনই সিএসসি দেয়া হয়নি, ফলে এনভিসি অনুযায়ী রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রয়োজনীয় কাগজ হাজির করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ কারণে কার্যত তারা রাষ্ট্রহীন নাগরিকে পরিণত হয়েছে।

যদিও প্রতিনিধি দলের নেতা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরও আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন; রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়া ছাড়া কোনো আলোচনাই আলোর মুখ দেখবে বলে মনে হয় না।

প্রতিনিধি দলটি হিন্দু রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করেছে এবং পরিদর্শন শেষে হিন্দু রোহিঙ্গারা নাগরিকত্বের দাবি পূরণ ছাড়াই মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি আছে বলে তারা জানান।

হিন্দুদের এভাবে ফিরে যেতে রাজি হওয়ার পেছনে আমাদের দেশে সক্রিয় একটি ‘বিশেষ সংস্থা’ কাজ করেছে বলে অনেকের ধারণা। মিয়ানমার হিন্দু ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে এ যাত্রায় আপাতত মুখ রক্ষার চেষ্টা করছে বলে মনে হয়।

রোহিঙ্গা জনগণ পৃথিবীর নিগৃহীত রাষ্ট্রহীন একটি জনগোষ্ঠী। এ জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত অত্যাচার ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক আমাদের দেশে গণহত্যার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

যে ব্যক্তির ন্যূনতম মমত্ববোধ আছে, সে ব্যক্তি পৃথিবীর যে কোনো অত্যাচারিত মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন, তাদের পাশে দাঁড়াবেন এটাই স্বাভাবিক। মানুষের এ স্বাভাবিক আচরণকে আমরা মানবতাবোধ বলি।

যুগের পর যুগ ধরে নাগরিক অধিকারবঞ্চিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশও সেই মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও অনেকেই আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গণহত্যার পাশাপাশি আমাদের মা-বোনরাও নির্যাতিত হয়েছিলেন।

স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তাদের প্রতি তিনি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি তাদের শ্রদ্ধার চোখেও দেখতেন। ১৯৭১ সালের মতোই রাখাইনে রোহিঙ্গা মা-বোনদের ওপর নির্যাতন হয়েছে। ফলস্বরূপ রোহিঙ্গা শিবিরে অনেক ‘যুদ্ধ শিশু’ও জন্মগ্রহণ করেছে।

এ কারণে শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। যে কোনো বিচারে এটা কারও জন্যই ভালো খবর নয়। তাদের এ পরিণতিতে আমাদের সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। তাদের প্রতি আমাদের আচরণ শোভনীয় হবে এটাই প্রত্যাশিত।

অথচ এ নিয়ে আমরা মাঝেমধ্যেই কাণ্ডজ্ঞাহীনের মতো আচরণ করে ফেলি। সম্প্রতি দায়িত্বশীল পজিশনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের এ ধরনের আচরণ আমাদের আহত করেছে। এসব ব্যক্তিত্ব যখন এমন ‘অসৌজন্যপূর্ণ’ কথা বলেন, তখন তার প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা থাকে কোথায়?

রোহিঙ্গা শিবিরের জন্মহারের তুলনা করে তিনি যখন অশোভনীয় মন্তব্যটি করলেন, তখন কি একবারও ভেবে দেখেছেন উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে স্বাভাবিক শিশুর জন্মের পাশাপাশি ‘যুদ্ধ শিশু’ও জন্মগ্রহণ করেছে?

একথা সত্য, রোহিঙ্গারা আমাদের দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কিছুটা হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও বলব, তাদের প্রতি সহানুভূতি, সহযোগিতা ও সৌজন্যবোধ বজায় রেখেই এ বৃহত্তর সমস্যার সমাধান আমাদের করতে হবে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) একেএম শামসুদ্দিন : সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri