কিংবদন্তি ব্রুস লির স্বপ্ন পূরণ করলেন মেয়ে শ্যারন

bl.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(৫ আগস্ট) :: ব্রুস লি মারা যান ৩২ বছর বয়সে। তার মেয়ে শ্যানন লির বয়স তখন মাত্র চার। বাবাকে খুব বেশি দিন জড়িয়ে ধরতে না পারলেও শ্যানন বড় হয়েছেন তার কিংবদন্তির সঙ্গে। ১৯৭১ সালে হলিউডে ব্রুস লির কুং ফু খ্যাতি আকাশ ছুঁয়েছিল। সে সময় ব্রুস লি দ্য ওয়ারিয়র নামে একটা টিভি শো করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। গল্পটা ছিল একজন মার্শাল আর্ট জানা চীনা অভিবাসীর, যে ১৮ শতকের শেষভাগে টং যুদ্ধের মাঝে আটকে গিয়েছিল। এটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে চায়না টাউনগুলোয় বিভিন্ন দলের মধ্যে সংঘাত। গল্পের নায়ক এসব অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।

দ্য ওয়ারিয়র-এর মুখ্য চরিত্রটি নিজেই করার সিদ্ধান্ত নেন লি। যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্টুডিওর সঙ্গে কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু স্টুডিওটি তাকে জানায় আমেরিকানরা কোনো এশীয়কে মুখ্য চরিত্রে দেখতে প্রস্তুত নয়। এক বছর পর ওয়ার্নার ব্রস কুং ফু সিরিজ মুক্তি দেয়, যেখানে মার্শাল আর্টে দক্ষ একজন শাওলিন সন্ন্যাসী বুনো পশ্চিমে সফর করছেন। শাওলিন সন্ন্যাসীর চরিত্রটি করেছিলেন শ্বেতাঙ্গ অভিনেতা ডেভিড ক্যারাডাইন।

এসব দেখে বিরক্ত ব্রুস লি হলিউড ছেড়ে হংকংয়ে ফিরে আসেন। এরপর তিনি নির্মাণ করেন ফিস্ট অব ফিউরি, ওয়ে অব দ্য ড্রাগন ও এন্টার দ্য ড্রাগন। এ তিনটি ছবি ব্রুস লির কিংবদন্তিকে প্রতিষ্ঠা করে দেয়। এসব ছবিতে তার বিভিন্ন অ্যাকশন দৃশ্যের পোস্টার দুনিয়াজুড়ে কিশোর-তরুণদের কক্ষে শোভা পেতে থাকে। ১৯৭৩ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে হঠাৎ করেই মারা যান ব্রুস লি। এরপর তার জনপ্রিয়তা ও কিংবদন্তি দুটোই বাড়তে থাকে।

শ্যানন লি বলেন, ‘আমরা এসব গল্প শুনে বড় হয়েছি। এ শো আমার বাবার পরিকল্পনায় ছিল, কিন্তু তাকে বলা হয়েছিল তিনি এতে অভিনয় করতে পারবেন না, কারণ আমেরিকান দর্শকরা কোনো চীনাকে মুখ্য চরিত্রে দেখতে পছন্দ করবে না। এখন আপনি যদি ওয়ার্নার ব্রসকে জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে নিশ্চিতভাবে তাদের জবাব হবে, তারা আমার বাবার আগেই কুং ফুর ধারণা মাথায় নিয়ে ঘুরছিল…’

শ্যানন লির বয়স এখন ৫০। মধ্য তিরিশে তিনি তার বাবার সেই অসমাপ্ত শো নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেন। শ্যানন জানিয়েছেন, ২০০২ সালের শেষ দিকে তিনি তার মায়ের কাছ থেকে বাবার কিংবদন্তি রক্ষার দায়িত্ব বুঝে নেন। ‘২০০২-এর শেষ দিকে মা লস অ্যাঞ্জেলেসে আমার কাছে বাবার সব স্মৃতিস্মারক পাঠিয়ে দেন। এগুলোর মধ্যে ছিল বাবার গাদা গাদা লেখপত্র। সেগুলোর মধ্যে আমি দ্য ওয়ারিয়র সংক্রান্ত লেখাজোখা খুঁজে পাই। সেটা ছিল এক বিস্ময়ভরা মুহূর্ত, সত্যিই তো এটা ছিল!’

কিন্তু তখন বাবার পরিকল্পিত সিরিজটি তৈরির সামর্থ্য শ্যাননের ছিল না। তাই লেখাগুলো তিনি আবার বাক্সে ভরে রাখেন। তারপর হঠাৎই আসে এক অদ্ভুত সুযোগ। শ্যাননের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াসের পরিচালক জাস্টিন লিন। তিনি শ্যাননকে বলেন, ‘আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই—আমি সবসময় শুনে আসছি আপনার বাবা একটি টেলিভিশন শোর পরিকল্পনা করেছিলেন। আপনি কি জানেন সেই শোর পরিণতি কি হয়েছিল?’ স্বভাবতই জাস্টিনের এ প্রশ্ন শুনে শ্যানন যুগপৎ আনন্দিত ও বিস্মিত হয়েছিলেন। ‘হ্যাঁ, বাবার সেই সিরিজের সবকিছু আমার কাছেই আছে।’

ব্রুস লির সেই কাহিনী থেকে সিরিজ তৈরির সিদ্ধান্ত নেন জাস্টিন। চিত্রনাট্য তৈরি করতে নেন জোনাথন ট্রপারকে। তিনি ব্রুস লির মূল গল্পকে ১০ পর্বের সিরিজে পরিণত করেন। সিরিজটির মুখ্য চরিত্র শমের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ অভিনেতা অ্যান্ড্রু কোজি। নিজের বোনকে খুঁজতে তিনি সান ফ্রান্সিসকোয় হাজির হন। কিন্তু এখানে আটকে যান বিভিন্ন দলের লড়াইয়ের মধ্যে। সিরিজটির নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে আছেন শ্যানন লি। তার মতে, এ সিরিজের মাধ্যমে ব্রুস লির স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে।

অ্যান্ড্রু কোজি জানিয়েছেন তিনি নিজে ব্রুস লির দর্শনে প্রভাবিত—‘আমি স্বাস্থ্যবান ও ফ্যান্সি, তাই দেখতে সুন্দর এমন ধারণাকে ব্রুস লি শূন্য ও ফাঁকা মস্তিষ্কপ্রসূত বলে মনে করতেন।’

শ্যানন মনে করেন জাস্টিন লিনের এ সিরিজ পুরনো একটি ভুলকে ঠিক করল। একজন এশীয় অভিনেতা কোজিকে সিরিজের মুখ্য চরিত্রটি দেয়ার মাধ্যমে সেই পুরনো শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য ধারণার প্রায়শ্চিত্ত করা হয়েছে।

শ্যারন লি ২০০২ সালে ব্রুস লি ফাউন্ডেশন তৈরি করেন। প্রতিষ্ঠানটি ব্রুস লির স্মৃতি ও বিভিন্ন দর্শনকে প্রচার করে। ‘আমার বাবা ছিলেন স্বশিক্ষিত মানুষ। তার নিজস্ব শক্তি ছিল।’ ব্রুস লির নিজস্ব জীবন দর্শন ছিল। শাকসবজিনির্ভর ছিল তার ডায়েট। মাংস খেতেন না একেবারেই। ‘নিজেকে প্রদর্শন করা হচ্ছে গর্দভের গৌরব’ কিংবা ‘জীবনকে ভালোবাসলে সময় অপচয় করো না, কারণ জীবন সময় দিয়েই গঠিত’—ব্রুস লির এমন অনেক প্রেরণাদায়ী কথা এখন ইন্টারনেটে জনপ্রিয়।

কয়েক পর্ব প্রচারিত হতে না হতেই দ্য ওয়ারিয়র দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এরই মধ্যে দ্বিতীয় সিজনের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। এ সিরিজ নিয়ে সবচেয়ে খুশি ব্রুস লির মেয়ে শ্যারন। অনেকেই টিভিতে পর্বগুলো দেখে শ্যারনকে বলেছেন, এতে তার বাবার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। শ্যারনও তাই মনে করেন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Share this post

PinIt
scroll to top
bahis siteleri