কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ঢলের দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে হঠাৎ ‘প্রত্যাবাসন’ নাটক !

rohingya-myanmar-logo-1.jpg

কক্সবাংলা রিপোর্ট(১৬ আগস্ট) :: ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর বর্বর দমন পীড়নে কক্সবাজার সীমান্তে রোহিঙ্গা ঢলের দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে নতুন প্রচেষ্টা শুরু করছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। এর অংশ হিসেবে আগামী ২২ আগস্ট ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের কর্মকর্তারাই বলেছেন যে মিয়ানমার তিন হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে স্বীকার করেছে। মিয়ানমার তাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত আছে। আগামী সপ্তাহেই রোহিঙ্গাদের প্রথম দল মিয়ানমারে ফিরতে পারে।এর আগে বাংলাদেশ কয়েক দফায় প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গার পরিচয় যাচাইয়ের জন্য তাদের নাম ও তথ্য মিয়ানমারকে দিয়েছে।

জানা যায়, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছরের ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যর্পণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে আবারও হামলার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানানোয় ব্যর্থ হয় ওই উদ্যোগ।এরই ফলশ্রুতিতে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে চলতি বছরের ২৭ ও ২৮ জুলাই মিয়ানমারের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল কক্সবাজার সফরে রোহিঙ্গাদের এনভিসি (ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড) বিষয়ে প্রচারপত্র দেয়। তবে রোহিঙ্গারা এনভিসি’র প্রচারপত্র ছিড়ে ফেলে তা প্রত্যাখ্যান করে।মিয়ানমারের প্রতিনিধিদের এই সফরে নাগরিকত্ব অধিকারের বদলে এনভিসি কার্ডের ঘটনাকে রোহিঙ্গা প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞসহ সকলেই নাটক বলে উল্লেখ করেছে। তারা বলছে, এটা হচ্ছে আর্ন্তজাতিক চাপ থেকে বাঁচতে মিয়ানমারের একটি অপ-কৌশল এবং সময়ক্ষেপন।তবে ঢাকা বলেছে, নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত বিষয় রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমার সরকারের বিষয়, এর মধ্যে বাংলাদেশ ঢুকতে চায় না। বাংলাদেশ চায় স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং সম্মানজনকভাবে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাক।

এনিয়ে শুক্রবার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত সরকারী কর্মকর্তা ও বেসরকারী সংস্থার লোকদের সাথে কথা বলে জানা যায়,হঠাৎ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের খবরে তারাও আশ্চর্য্য হয়ে গেছেন। কারণ সবাই কোরবানী ঈদের ছুটির আমেজে রয়েছেন।এমনকি যে চারটি শিবিরের তিন হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সম্মতি জানিয়েছে তারা আদও যাবে কিনা বা তাদের মতামতও এখনো স্পষ্ট নয়। তারা মনে করেন গতবছরের ন্যায় এবারও যদি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হয় তাহলে এটি হাস্যকর ব্যাপারে পরিণত হবে।

এদিকে কক্সবাজারের একটি শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গানা বলছেন, ‘গত মাসে মিয়ানমার প্রতিনিধিদের কক্সবাজার সফর ছিল একটি নতুন অপ-কৌশল। এই সফরের মধ্য দিয়ে তারা আর্ন্তজাতিক বিশ্বকে ফাঁকি দেওয়ার কৌশল করেছে। যাতে এই ইস্যুতে তাদের ওপর থেকে চাপ কমে। মূলত এভাবে তারা সময়ক্ষেপন করছে।’ তারা আরও বলেন, প্রত্যাবাসন বিষয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। প্রত্যাবাসন শুরুর আগে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের মূল দাবিগুলো মানার ব্যাপারে রাজি হওয়া উচিত।

অপরদিকে জাতিসংঘ বলেছে, মিয়ানমার বাহিনীর অভিযানে ‘জেনোসাইডের’ আলামত রয়েছে। নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় রোহিঙ্গাদের অনেকে এখনই ফিরে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো অনুকূল পরিবেশ রাখাইনে এখনো সৃষ্টি হয়নি। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াই করছে। গত জুলাই মাসে জাতিসংঘের একজন তদন্তকারী মিয়ানমার বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের অভিযোগ করেছেন।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘসহ মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোকে রাখাইনে সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে যেতে দিচ্ছে না।

গত মাসে অস্ট্রেলিয়ার একটি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে বলেছিল, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার মতো ন্যূনতম প্রস্তুতিও মিয়ানমারের নেই। মিয়ানমারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক মিন থেইন বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ট্রানজিট ক্যাম্পগুলোয় প্রস্তুতি চলছে।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্স বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশের হস্তান্তর করা ২২ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ৩ হাজার ৫৪০ জনকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার।

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মিয়ান্ট থো জানিয়েছেন, আগামী ২২ আগস্ট এসব রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন তারা।

বাংলাদেশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, ছোট পরিসরে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছা, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন ছাড়া বাংলাদেশ কিছুই চায় না।

এদিকে আরেক দফা প্রত্যাবাসনের কাজও যাতে ভণ্ডুল হয়ে যায় সে জন্য গোপনে তৎপরতা চলছে। একদিকে দেশি-বিদেশি এনজিওগুলো যেমন তৎপর, তেমনি তৎপর রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতর প্রত্যাবাসনবিরোধী গোষ্ঠী। এনজিওগুলোর ভূমিকা নিয়েও নানা অভিযোগ আছে।কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশি-বিদেশিএনজিওসহ কিছু সংস্থার লোকজন কোনোভাবেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চায় না। এমনকি যখনই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তোড়জোড় শুরু হয় তখনই সমানতালে প্রত্যাবাসনবিরোধী অপতৎপরতা চলে। প্রত্যাবাসনবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কিছু এনজিও শিবিরের ভেতর ‘আল ইয়াকিন’ নামে পরিচিত কিছু উগ্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে উসকানি দিয়ে আসছে। এসব উসকানিতে আল ইয়াকিন নামের উগ্রবাদী রোহিঙ্গারা গত কদিন ধরেই শিবিরগুলোতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সন্ধ্যার পরপরই আবারও নেমে পড়ে। তারা দেশে ফিরতে ইচ্ছুক সাধারণ রোহিঙ্গাদের হুমকি প্রদর্শন করে আসছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কয়েকটি নিরাপত্তাচৌকিতে হামলার জেরে সেখানে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। এরপর হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের সীমান্ত জেলা কক্সবাজারে আশ্রয় নিতে শুরু করে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২৮ নভেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় ছয় লাখ ৯৩ হাজার ১৪ রোহিঙ্গা। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫৯ জন রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৪১৭ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এরমধ্যে আশ্রয়প্রার্থী এতিম শিশু রয়েছে ৩৯ হাজার ৮৪১ জন। নিবন্ধনকৃত আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন। বাংলাদেশে অবস্থানের পর আরও লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় বসতি স্থাপন করেছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর ৩০ জুনের (২০১৯) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা পরিবারের সংখ্যা এক লাখ ৭৩ হাজার ৪৪টি। এসব পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাত লাখ ৪১ হাজার ৯৪৭ জন।

জাতিসংঘ দেশটিতে রোহিঙ্গাবিরোধী সামরিক অভিযানকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri