রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আবারও ব্যর্থ হওয়ায় খুশি ইউএন সংস্থা ও এনজিওরা : ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা

rohingya-camp-bd-ngo-ingo.jpg

কক্সবাংলা রিপোর্ট(২৩ আগস্ট) :: ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিযে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবতার মা হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন।আর রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি বিশ্বের সব রাষ্ট্রের কাছে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির জন্য প্রতিনিয়ত আহ্বান জানিয়ে আসছেন।এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ নভেম্বর প্রথম দফা এবং ২২ আগস্ট দ্বিতীয় দফা দিনক্ষণ ঠিক করে বহু প্রতীক্ষিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করেও রোহিঙ্গারা যেতে রাজি না হওয়ায় শুরু করা যায়নি।আর এর জন্য কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কার্যক্রম চালানো ইউএন সংস্থা ও দেশী-বিদেশি এনজিওগুলোর প্ররোচনার কারণেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বারবার ভেস্তে যাচ্ছে বলে মনে করছে সরকারী মহল ও স্থানীয়রা।

তারা বলছেন, মিয়ানমার জানত যে প্রত্যাবাসন হবে না।তাই তারা আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে প্রত্যাবাসন নাটক সাজায়। আর এতে দেশি-বিদেশী এনজিওগুলো সহযোগিতা করেছে।

বিশেষ করে প্রত্যাবাসন শুরুর নির্ধারিত দিনের আগে ৬১টি দেশি-বিদেশি এনজিও যেভাবে যুক্ত বিবৃতি দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরুৎসাহিত করেছে তা নজিরবিহীন। এছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না চাওয়া একটি বিদ্রোহী সংগঠনও প্রত্যাবাসনকে বাধাগ্রস্ত করতে সক্রিয় ছিল। অনেক স্বচ্ছল রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরতে রাজি থাকলেও ওই সংগঠনটির হুমকির কারণে শেষ পর্যন্ত ফিরতে পারেনি।

এদিকে সব সহযোগিতা করা এবং রোহিঙ্গাদের জোড় না করা সহ কোন কাজে কোনোধরনের হস্তক্ষেপ না করার পরও প্রত্যাবাসন না শুরু হওয়ায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ সরকার। এনিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ২২ আগস্ট দুপুরে তার দপ্তরে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করে জানান, তাদের তরফে গাফিলতি ছিল না। তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কার্যক্রম চালানো এনজিওগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, যারা রোহিঙ্গাদের না যেতে প্ররোচিত করছে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কার্যক্রম চালানো এনজিওগুলোর ওপর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।

অপরদিকে দুই দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ভণ্ডুল হওয়ায় কক্সবাজারের বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ প্রকাশ করেছে। রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারী কর্মকর্তাদেরও গাফিলতি আছে কি না তা তারা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ,কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে কর্মরত দেশি-বিদেশি এনজিওদের প্রত্যাবাসন বিরোধী গোপন তৎপরতার কারণে তারা প্রতিবারই নিরুৎসাহিত হয়েছে। এনজিওগুলো কখনই চায় না সহসাই রোহিঙ্গারা ফিরে যাক। রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে তাদের কাজকর্মের অসুবিধা হবে।কারণ রোহিঙ্গাদের জন্য আসা বিদেশি সাহায্য বিলি-বণ্টনের নামে লুটপাট,এনজিওগুলোর কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মসংস্থান এবং আরাম-আয়েশ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে যতই দিন যাচ্ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সুদূর হয়ে উঠছে।

সরেজমিন দেখা যায়,২২ আগস্ট টেকনাফের শালবন ক্যাম্পে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) প্রেস ব্রিফিংয়ে আপাতত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার কথা ঘোষণা দেওয়ার পরপর আশ্রয় শিবিরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেশী-বিদেশী কিছু এনজিও কর্মীরা উল্লাস প্রকাশ করে।বিশেষ করে অক্সফামের কর্মীদের চোখেমুখে ছিল আত্বতৃপ্তি আর হাসির ঝিলিক।পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উল্লাস প্রকাশকারী এসব কর্মী শালবন ক্যাম্পে তালিকাভূক্ত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসনে নিরুৎসাহিত করতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। কারণ তাদের বড় প্রযেক্ট পরিচালিত হচ্ছে এ ক্যাম্পে।আর রোহিঙ্গা চলে গেলে তাদের পযেক্টও গুটিয়ে যেত । শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবাসন না হওয়ায় রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি তারাও আনন্দের বহি:প্রকাশ করে।

অভিযোগ আছে, জাতিসংঘের দাতা সংস্থা থেকে শুরু করে এমন কোন এনজিও নেই যারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চায়।কারণ যেসব সংস্থা ও এনজিওরা বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে আসার ইন্দন দিয়েছে মূলত তারাই এখন ফেরত না যেতে উৎসাহিত করছে এমন অভিযোগও আছে। এনজিওগুলোর মোড়লরাই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত না যেতে উৎসাহিত করছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি এনজিওতে কর্মরত একব্যক্তি (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানান,দেশী আর বিদেশী যাই বলেন সব এনজিওগুলোই রোহিঙ্গাদের না যাওয়ার বিষয়ে বেশি উৎসাহিত করে। তাদেরকে (রোহিঙ্গা) কখনোই বুঝায় না যে, এক সময় তাদেরকে স্বদেশে ফেরত যেতে হবে। তিনি আরও জানান, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি অস্থায়ী ক্যাম্পে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার অবস্থানে অত্যন্ত খুশি সব এনজিও ও রোহিঙ্গা নেতারা। কারণ রোহিঙ্গাদের খাদ্য,স্বাস্থ্যসেবা,পানি, চাল-ডাল, কাপড়-চোপড় সবকিছু দিয়ে তাদের উৎসাহ দিয়ে রেখেছে এনজিওরা। ফলে বিনা পরিশ্রমে সুবিধাভোগী কর্মহীন রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসন নিয়ে আপাতত ভাবছেনই না।

জানা যায়,২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে কক্সবাজারের টেকনাফে উখিয়া সীমান্তে অবস্থান করা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে দেশি-বিদেশি শতাধিক বেসরকারি সংস্থা। এদের মধ্যে ১শ টির অধিক দেশি আর প্রায় ৫০টি বিদেশি। মূলত রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, বিনোদন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমসহ ইতোমধ্যে হাজার কোটি টাকার ৭৮০টি প্রকল্প গ্রহণ করেছে এই সংস্থাগুলো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে পেছনের সারিতে থাকা স্থানীয় এনজিওগুলোও এখন আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে গেছে। এসব এনজিও বিদেশি ডোনার এজেন্সির পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তারাও বিদেশি এনজিওগুলোর মত রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত না যাওয়ার বিষয়ে প্রলুব্ধ করছে।আবার রোহিঙ্গাদের কেন্দ্র করে এমনও এনজিও সংস্থার আবির্ভাব হয়েছে, যেগুলোর আগে নাম পর্যন্তও শোনেনি কেউ।আর এসব অতিলোভী এনজিওরা মানবতার সেবার নামে চরম নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনার কবলে পড়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ কক্সবাজার শরনার্থী শিবির।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিওর তৎপরতার ওপর আপত্তি দিয়ে ৪১টি এনজিওর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে এনজিও ব্যুরোতে চিঠি পাঠানো হয়।

নিষিদ্ধ ঘোষিত এসব এনজিওগুলোর মধ্যে ছিল-ফ্রেন্ডশিপ, এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ, আল মারকাজুল ইসলাম, স্মল কাইন্ডনেস বাংলাদেশ, ঢাকা আহ্‌ছানিয়া মিশন, গ্রামীণ কল্যাণ, অগ্রযাত্রা, নেটওয়ার্ক ফর ইউনিভার্সাল সার্ভিসেস অ্যান্ড রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট, আল্লামা আবুল খায়ের ফাউন্ডেশন, ঘরনী, ইউনাইটেড সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট, পালস, মুক্তি, বুরো-বাংলাদেশ, এসএআর, আসিয়াব, এসিএলএবি, এসডব্লিউএবি, ন্যাকম, এফডিএসআর, জমজম বাংলাদেশ, আমান, ওব্যাট হেলপার্স, হেল্প কক্সবাজার, শাহবাগ জামেয়া মাদানিয়া কাসিমুল উলুম অরফানেজ, ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান অ্যাফেয়ার্স, লিডার্স, লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন, অ্যাসোসিয়েশন অব জোনাল অ্যাপ্রোচ ডেভেলপমেন্ট, হিউম্যান এইড অ্যান্ড রিলিফ অর্গানাইজেশন, বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিশ, হোপ ফাউন্ডেশন, ক্যাপ আনামুর, টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইনকরপোরেশন, গরীব, এতিম ট্রাস্ট ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি এনজিও।

এরআগে ২০১৮ সালে ১লা মার্চ ষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে কক্সবাজারে টেকনাফ এবং উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির ভিত্তিক ১২টি এনজিও’র কার্যক্রম বন্ধ করে সরকার।এনজিও ব্যুরোর কোন রকম অনুমোদন ছাড়াই এনজিওগুলো আশ্রয় শিবিরে সন্দেহজনক কার্যক্রম পরিচালনা করছে এমন গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এসব এনজিও হচ্ছে সাফজ, কালব, ওফকা, জাগরণ, এমপিডিআর, মানবাধিকার, শেড ওয়াশ, টাই বিডি, এসআরপিবি, গ্রামীণ ব্যাংক, লাচুন ও শিলাফ।

আর একই বছরের ৩০ মার্চ সরকারী বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহজনক লেনদেন এবং কর্মকাণ্ডের জন্য ইসলামিক এইড, ইসলামিক রিলিফ, মুসলিম এইড, নোমিজান অফতাবী ফাউন্ডেশন, চাষী কল্যাণ, স্মল কাইন্ডনেস বাংলাদেশের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এনজিও ব্যুরো।এছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে এনজিও ব্যুরোতে সেভ দ্যা চিল্ড্রেনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।

এনজিও ব্যুরো সূত্রে জানা যায়, এনজিওগুলোর জন্য প্রযোজ্য বিদেশি অনুদান রেগুলেশন আইনে বলা হয়েছে- ‘কোনো এনজিও বা ব্যক্তি এই আইন বা ইহার অধীন প্রণীত কোনো বিধি বা আদেশের লঙ্ঘন করিলে উহা এই আইনের অধীন এবং সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক ও অশালীন কোনো মন্তব্য করিলে বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড করিলে বা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন, পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা সহায়তা করিলে অথবা নারী ও শিশু পাচার বা মাদক ও অস্ত্র পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকিলে উহা দেশে প্রচলিত আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে।’

এ ব্যাপারে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান জানান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরকারি নির্দেশনা অমান্য ও বিভিন্ন অনৈতিক কার্যক্রমের কারণে ইতোমধ্যে অসংখ্য এনজিওর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা কঠোর নজরদারি রেখেছি। এরপরও কিছু কিছু এনজিও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের উসকে দেওয়ার কথা শুনেছি। আমরা এসব এনজিও’র বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তিনি অভিযোগ করেন, ক্যাম্পে কর্মরত এনজিওগুলোতে দায়িত্বরত বিদেশিদের সনাক্তকরণ ও তাদের বৈধতা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য প্রতি মাসে একটি করে এনজিও মাসিক সমন্বয় সভার আয়োজন করা হলেও ওই সভায় বিদেশিরা উপস্থিত থাকেন না।

এদিকে দুই দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ভণ্ডুল হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কক্সবাজারের সুশীল সমাজ ও স্থানীয়রা। রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে ক্যাম্পে দায়িত্বরত বাংলাদেশি সরকারী কর্মকর্তাদের গাফিলতি ছিল কি না তা তারা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে তারা।

অভিযোগ উঠেছে, ইউএনএইসসিআর, ডাব্লিউএফপি, ইউনিসেফ, আইএসসিজি,এনজিও প্লাটফরম,এমএসএফ সহ কিছু দেশী এনজিও লাগামহীন কর্কান্ডের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশে সুকৌশলে অবস্থান করানোর চক্রান্ত করে চলেছে।আর দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনায় একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা(সিআইসি) কাজ করছেন। আর উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি শিবির তাঁরাই দেখাশোনা করে থাকেন। কিন্তু তাঁদের ভূমিকা ও দেশী-বিদেশী এনজিওগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও অতি ঘণিষ্টতা নিয়েও স্থানীয় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন আছে।সঙ্গে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সাথে আরআরআরসি দপ্তরের সমন্কিত কাজে ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।

এ প্রসঙ্গে উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের অবস্থান এখন বেশ শক্ত। তারা খাবার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাটসহ যে নাগরিক সুবিধা পাচ্ছে তেমনটা স্থানীয়রাও পাচ্ছে না। অর্থনৈতিকভাবেও রোহিঙ্গারা এখন এগিয়ে। প্রতিটি ক্যাম্পে বড় বড় বাজার গড়ে উঠেছে। এখানে তারা নিজস্ব সমাজব্যবস্থাও চালু করেছে। ফলে এমন জীবন ছেড়ে কেউ অনিশ্চিত জীবনে যেতে চাচ্ছে না। মূলত এ কারণেই রোহিঙ্গাদের ফেরানো যাচ্ছে না।

টেকনাফ-উখিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেছেন, আমরা রোহিঙ্গাদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আশ্রয় দিয়েছিলাম। রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়েছে। তারা মিয়ানমার ফিরে গিয়ে তাদের দাবিগুলো পেশ করতে পারত। এভাবে হলে আর তাদের ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিরোধীরা খুবই শক্তিশালী। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ নাগরিক সমাজকে এর বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে হবে। রোহিঙ্গাদের এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে।

উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, আমরা শুরু থেকে বলে আসছি, রোহিঙ্গাদের বেশি প্রশ্রয় না দিতে। কিন্তু কিছু এনজিও তাদের চাকরি দিয়ে, বিপুল পরিমাণ ভাতা দিয়ে, নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মিছিল-মিটিং করার অনুমতি দিয়ে লোভী করে তুলেছে। যে কারণে রোহিঙ্গারা শিগগির ফিরতে রাজি হচ্ছে না। এ ছাড়া তারা যে দাবি করছে, সেটা তাদের দেশের নিজস্ব সাংবিধানিক বিষয়। হয়তো সব দাবি একসঙ্গে পূরণ না-ও হতে পারে। এখন তারা যদি সব দাবি এখানে থেকে পূরণ করতে চায়, সেটা কোনো দিনও হবে না। আর প্রত্যাবাসনও শুরু করা যাবে না।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ও সাবেক উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারে ফিরে না যেতে কিছু দেশী-কিদেশী এনজিও কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের উসকানি দিচ্ছে।নিজেদের স্বার্থে রোহিঙ্গাদের দিয়ে করাচ্ছে।এসব এনজিও সরকার বিরোধী বিভিন্ন কর্মকান্ডেও লিপ্ত রয়েছে। তাই উসকানিদাতা এনজিওদের বিরুদ্ধে নজরদারী ও ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানান।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির ইঞ্জিনিয়ার কে পল জানান,বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী গত ২২ জানুয়ারি প্রথম দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করার কথা থাকলেও ধূম্রজালে আটকা পড়ে তা। তারা জানেন না মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক হওয়ার পরও কেন এখনো রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কোনো হদিস নেই। তিনি আরও জানান,রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সময় আসলেই তা বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায়।আর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্দিন জিইয়ে রাখতে চলছে স্বার্থান্বেষী মহলের অপতৎপরতা।

উল্লেখ্য,২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার ঘটনার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। তাদের সঙ্গে রয়েছেন ১৯৮২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নানা অজুহাতে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্যে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া আরও অন্তত সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলে বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছরের ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে আবারও হামলার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানানোয় ব্যর্থ হয় ওই উদ্যোগ। সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাই মাসে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে নতুন করে উদ্যোগের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল। ১৫ সদস্যের দলটি দুই দিন ধরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠক করে। এসব বৈঠকে রোহিঙ্গাদের তরফে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ও চলাফেরায় স্বাধীনতার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দ্বিতীয় দফা ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের দিন ধার্য করে ৩৪৫৫ রোহিঙ্গা নাগরিকের তালিকা পাঠায় মিয়ানমার সরকার। প্রত্যাবাসনের তালিকাভুক্তরা ছিল টেকনাফের ২৩, ২৪, ২৬ ও ২৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১০৩৭টি পরিবারের। তাদের মধ্যে ২৬ নম্বর শালবাগান ক্যাম্প থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রোহিঙ্গার নাম ছিল তালিকায়। আর ১৯ থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত তিনদিনে ৩১৬ রোহিঙ্গা পরিবারের মতামত নেওয়া হয়।কিন্তু ৫টি দাবী না মানা পর্যন্ত মিয়ানমারে ফেরার ব্যাপারে কোনও আগ্রহ দেখা যায়নি তাদের মধ্যে। সাক্ষাৎকারদাতারা জানান, রোহিঙ্গা স্বীকৃতি ও ভিটেমাটি ফিরে না পেলে ফেরত যাবেন না তারা।

Share this post

PinIt
scroll to top
bahis siteleri