সামাজিক সংকট এবং প্রতিরোধের দায়ভার

social-issues-bishojeet-sen-coxbangla.jpg

বিশ্বজিত সেন(১৭ সেপ্টেম্বর) :: .১. মাদকের ভয়াবহতা

আমাদের দেশে অপরাধ করাটা সমাজ জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এসব অপরাধের সাথে সবচাইতে মারাত্মক সংকট হচ্ছে যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয়। একটি দুর্নীতিজনিত সমাজে নেশা করা সম্পূরক শক্তি হিসাবে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ খারাপের সংকটে চলছে বাংলাদেশ। মাদকের প্রভাব গ্রামে গঞ্জে সহ সব জায়গায় প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে আজ মাদকদ্রব্য সেবন একটি প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানী অর্থাৎ বাংলাদেশের সকল অঞ্চলে এই নীল বিষ ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের এক বৃহত্তর তরুণ, যুব সমাজ মাদকাশক্তিতে আক্রান্ত। আমাদের দেশে মাদক দ্রব্যের ব্যবহার এতবেশী ছড়িয়েছে যে, অনেক এলাকায় মহিলারা পর্যন্ত মাদক সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আর এই মাদক সেবন কোন ক্রমেই কমছেনা, বরঞ্চ দিন দিন বেড়েই চলেছে। আজকাল মাদক ব্যবহারের কোন চিহ্নিত জায়গা নেই, বা মাদক বিক্রির কোন দোকান নির্দিষ্ট নেই, মাদক ব্যবসা এতই বেড়ে গেছে যে, ছোটখাট পানের দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় দোকানেও এখন মাদক দ্রব্যে সয়লাব হয়ে গেছে। আর প্রতিদিন সীমান্ত পথে আসছে ব্যাপকভাবে নানান ধরনের মাদকদ্রব্য। আজ নীল নেশার কবলে সারা বাংলাদেশ। যে পরিবারে একজন মাদকসেবী আছে সে পরিবার জানে মাদকের সর্বনাশা ভয়াবহতা। একজন মাদক সেবীর জন্য একটি পরিবার ভেঙ্গে যায়। আজ বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় মাদকদ্রব্য বড় ধরনের সামাজিক অবক্ষয় ডেকে এনেছে। আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে যে ভয়াবহভাবে মাদক ছড়িয়ে গেছে, এটা সারাজাতিকে অশুভ বিপদে গ্রাস করছে। চীন যেমন এক সময় আফিম সেবনের শেষ পর্যায়ে গিয়ে সার্বিকভাবে অনেককাল নেশাগ্রস্ত জাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল, সে রকম বাংলাদেশের কপালে সেই বিপদটা ধেয়ে আসছে। বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের ব্যাপারে অনেক আইন আছে, কিন্তু সে আইনের প্রয়োগ করেও মাদক দ্রব্যের ব্যবহার কমানো যাচ্ছেনা। দিন দিন আশংকাজনকভাবে এই অশুভ নেশা আরো বেড়ে যাচ্ছে। মাদকদ্রব্য যেহারে বেড়ে গেছে, তখন আর শুধু আইনের প্রয়োগ নয়, আজ সারা জাতিকে এর বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই সামাজিক আন্দোলনে ধর্মীয় শ্রেণী থেকে শুরু সকল স্তরের সচেতন মানুষকে অংশ গ্রহণ করতে হবে। তাতেই মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে একটি যুগান্তকারী সামাজিক সিদ্ধান্ত বের হয়ে আসবে।আজ নতুন প্রজন্মকে বাঁচানোর জন্য দেশের সার্বিক অবক্ষয় রোধ করার জন্য সর্বনাশা মাদকের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।

২. বখাটেদের দমন

কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার স্কুল কলেজের ছাত্রীদেরকে উৎপাত করার বিষয়টি এখন অন্যতম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। যেখানেই ছাত্রীরা আছে-তারা স্কুল কলেজের যাওয়ার সময় প্রতিনিয়ত বখাটেদের উৎপাতের শিকার হতে হচ্ছে। যেদিকে বখাটেরা যেমনভাবে পারছে তারা ছাত্রীদেরকে উত্যক্ত করছে। ছাত্রীরা এসব বখাটেদের অত্যাচারে অত্যক্ত অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। কক্সবাজার জেলার কলেজ, বিদ্যালয়সহ ছাত্র-৩৪ ছাত্রীদের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বখাটেদের উৎপাতের খপ্পরে পড়ছে। এমনকি দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা যাওয়া আসার সময় তারা বখাটেদের দ্বারা অপমানিত হচ্ছে। আমাদের সমাজে নারীদের মর্যাদা সবসময় বেশি বেশি করে উচ্চারিত হয়। বিশ্ব নারী দিবসসহ বিভিন্ন সময়ে দেখা যায় নারীদের মর্যাদা স্বাধীনতার কথা বলা হয়। আমাদের সামাজিক অবস্থায় এসব কথা হচ্ছে মূলত মুখরোচক কথা। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, স্কুল কলেজের ছাত্রীরা এখন প্রতিনিয়ত খারাপ দৃষ্টিভঙ্গির, অপমানের শিকার হচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে ছাত্রীরা শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে যাবার সময় এই অপমানের শিকার হচ্ছে। বখাটেরা এককভাবে অথবা দলবদ্ধভাবে ছাত্রীদেরকে উত্যক্ত করে। অনেক সময় দেখা যায় মাদকাসক্ত হয়ে বখাটেরা গর্হিত এবং ঘৃণিত কাজগুলো করায় ব্যস্ত থাকে। ছাত্রীরা দিন দিন যে উত্যক্ততার শিকার হচ্ছে সে ব্যাপারে কারো যেন মাথাব্যথা নেই। অথচ এসব ছাত্রীরা কারো না কারো ঘরের সন্তান। অনেকে এ বিষয়ের জানার পরও এখনো কার্যকরভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। আমাদের দেশে পুলিশ আছে বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলার রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যবৃন্দ আছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিশেষভাবে কেউ এ বিষয়ে এ্যাকশনে যায় নাই। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম দায়িত্ব আছে ছাত্রীদেরকে সকল প্রকার অপমানের হাত থেকে বাঁচানো। তাদেরকে সে বিষয়ে এখন বেশি সোচ্চার হতে হবে। আমাদের সমাজের নাগরিকদের এখন মৌলিক দায়িত্ব এসেছে। যেসব ছাত্রীরা অপমানিত হচ্ছে, উত্তক্ত হচ্ছে তাদের সাথে নাগরিক সমাজের সম্পর্ক রয়েছে। জেলায় যার যার এলাকার নাগরিকদের সংঘবদ্ধ হয়ে ছাত্রীদের উত্তক্ত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। ছাত্রীদের নিরাপত্তা দেয়া সকল নাগরিকের কর্তব্য। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ছাত্রীদের উত্যক্ত করার বিষয়টিকে অন্যতম সমস্যা হিসেবে আমলে নিয়ে এসব ঘৃণ্য অপরাধীদের গ্রেফতারসহ কঠোর সাজা দিতে হবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে অপরাধীদের দমন করা। আমরা নাগরিক সমাজ আশা করছি এ ব্যাপারে তাঁরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ছাত্রীদেরকে অপমানিত এবং উত্যক্ত করার বিষয়টি প্রতিরোধ করা এখন খুবই জরুরি।

৩.অপরাধ দমনে কঠোরতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে অভাব এবং সামাজিক অপরাধ অভিশাপ হিসেবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এই দুটোর পরিধি এবং বিস্তৃতি কতই বেড়েছে-এটা আর নতুন করে বলতে হয় না। আমাদের সামনে এমন সময় এসেছে যে- কিশোর-তরুণরাও অভাব এবং অপরাধকে দেশ সমাজ-রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে চিনতে শুরু করছে। প্রথম বিশ্বের তথা সমৃদ্ধ অর্থনীতির বিশ্বের অনেক দেশেও বড় বড় অপরাধ সংগঠিত হয় যেটা কোন অপরিচিত বিষয় নয়। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র শাসনের সাথে ইউরোপ, আমেরিকা সহ উন্নতমানের গণতান্ত্রিক বিশ্বের কথা তুলনা করা যায় না। অপরাধ ঘটতে পারে, তবে সে অপরাধ থেকে অপরাধীর পার পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। এদেশে অর্থ থাকলেই অপরাধ করা যায় এবং কোন দায়ভার বা শান্তি থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এটা প্রচলিত কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনিতে আইনের ফাঁক ফোকড় আছে, তার উপর অর্থের কারাগারে বিচার বন্দী থাকে সে সমাজ আর কিভাবে অপরাধ মুক্ত থাকতে পারে? আমাদের দেশে অভাব অপরাধের সন্ত্রাসের পরিধি বেড়েছে অনেকটা রাজনীতির প্রশ্রয়ে। সরকারী দল করলে অপরাধ করা অতি সহজ, কোন কারণে ধরা পড়লেও মুক্তি পাওয়া অতি সহজ। বিষয়টা এই সমাজে বাস্তবতায় রূপ পেয়েছে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাকে নির্ভর করে সন্ত্রাসীরা অপরাধ করে যাবে এটা এখন সাধারণ ব্যাপার। দেখা যায় যে কোন সরকারের আমলে নতুন নতুন সন্ত্রাসীর তৎপরতায় দেশের জনপদ প্রকম্পিত হয়। আর সরকার এবং রাজনৈতিক নেতারা এ ব্যাপারে থাকে নিস্পৃহ এবং গা ছাড়া গাছাড়া ভাব। এসবের সাথে সাথে দেখা যাচ্ছে সারা দেশে আইন শৃঙ্খলার যে অবনতি হয়েছে তা দেশের সার্বিক পরিস্থিতিকে আরো সংকটময় করে তুলেছে। এ ধরনের অবস্থা যদি অব্যাহতভাবে চলতে থাকে বাংলাদেশ এক খারাপ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাবে। গণতন্ত্র ও জনগনের স্বার্থে যুগোপযোগী কঠোর আইন প্রনয়ন এবং রাজনীতি, সরকার, দল থেকে সন্ত্রাসী, সন্ত্রাসকে মুক্ত করতে হবে। তাছাড়া অভাব মুক্ত করতে সবাইকে গণমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। এই উদ্যোগ এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা এখন সকলকে করতে হবে । আমাদের সামাজিক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক শৃঙ্খলা যে কোন ভাবেই ফিরিয়ে আনতে হবে। মানুষ সবসময় কামনা করে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্য। গণতন্ত্র যদি পদদলিত হয়, তখন সমাজে নৈরাশ্য চলে আসে, অপশক্তি জাতির কাঁধে ভর করে। আজকে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে এবং বিভিন্ন বিতর্ক চারিদিকে চলছে, তার দ্রুত অবসান ঘটাতে হবে। গণতান্ত্রিক শাসন, তথা জনগণের শাসন বজায় রাখা এ মুহূর্তে জরুরি। ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দল মিলে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে, তাহলে আমরা আকাঙ্খিত গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারবো।

লেখক : সাংবাদিক, গবেষক, পরিবেশবিদ।

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri