বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদ কাজে লাগানোর জন্য ২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

bd-blue.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(১৪ অক্টোবর) :: দেশের অর্থনীতিতে সামুদ্রিক অর্থনীতির ভূমিকা অনেক। বাংলাদেশের ভূখণ্ড বাদ দিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের কাছ থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার নতুন সীমানা বাংলাদেশের জলসীমায় সংযুক্ত হয়েছে, সেটার সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো যায়নি অর্থনীতির কোনো সমীকরণে।

তবে দেশের নীল অর্থনীতি হিসেবে খ্যাত এ সামুদ্রিক সম্পদ কাজে লাগানোর জন্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ শুরু হয়েছে ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ (সিজিএমএফ) প্রকল্প। এ প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চলে মত্স্য জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে চিংড়ি, তলদেশীয় ও ভাসমান প্রজাতির মত্স্য মজুদ নিরূপণসহ সম্পূর্ণ জলসীমার সঠিক ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

প্রকল্পের বাজেট সম্পর্কে বলা হয়েছে, বিশাল সমুদ্র থেকে দেশের অর্থনীতি উন্নয়নে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২২১ মিলিয়ন ডলার বা ১ হাজার ৮৬৮ কোটি ৮৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকার সিজিএমএফ একনেকে পাস করা হয়। প্রকল্পের মধ্যে বিশ্বব্যাংক ১ হাজার ৫৮৮ কোটি ৩৯ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ২৮০ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে চারটি ভাগে ভাগ হয়ে বাস্তবায়ন করা হবে প্রকল্পটি।

সিজিএমএফ প্রকল্প পরিচালক হাসান আহমেদ চৌধুরী বলেন, সামুদ্রিক অর্থনীতি এবং মত্স্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে প্রকল্পটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সমুদ্রে বড় জাহাজগুলো কী মাছ ধরছে, সে মাছ নিয়ে দেশে ফিরছে কিনা, নাকি বিদেশে সেগুলো বিক্রি করে দিচ্ছে, সামুদ্রিক মাছের মজুদ কী অবস্থায় আছে, তীরবর্তী এলাকায় ওভার ফিশিং হচ্ছে কিনা ইত্যাদি মনিটরিং করা হবে।

সামুদ্রিক অর্থনীতির পরিবর্তন সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক জানান, আমাদের জেলেরা যে মাছ আহরণ করেন, সেগুলোর বেশির ভাগ সমুদ্রের তীরবর্তী এলাকার। এজন্য জেলেরা যাতে গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরতে পারেন, সেগুলো এ প্রকল্পের আওতায় করা হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা জেলেদের দূর সাগরে অন্তত ১৫০ মিটার গভীরতায় গিয়ে মাছ ধরতে উৎসাহিত করা হবে। কারণ সবাই যদি সমুদ্রের তীরবর্তী এলাকায় মাছ ধরেন, তাহলে মাছের সংকট দেখা যাবে। তাছাড়া এ প্রকল্পের মাধ্যমে কোন সময় কোন প্রজাতির মাছ ধরতে হবে, এমন নির্দেশনাও থাকবে।

জানা গেছে, এ প্রকল্পটি মূলত চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ভাগে করা হবে মত্স্য খাতে টেকসই বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষমতা বৃদ্ধি। সামুদ্রিক মত্স্যসম্পদের মজুদ নির্ণয় এবং জাতীয় ফিশারিজ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা হবে। এ ধাপে ১০০টি বাণিজ্যিক ট্রলার ও ১০ হাজার যান্ত্রিক নৌকায় জিপিএস ট্রাকার লাগানো হবে। যাতে করে এ সিস্টেমের মাধ্যমে জাহাজ ও নৌকার লোকেশন মনিটরিং করা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে; মত্স্যজীবীরা দেশের সীমানার কত দূরে গিয়ে মত্স্য শিকার করছেন, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যাবে। এছাড়া এ ধাপে চিংড়ি উৎপাদনে ক্লাস্টার ব্যবস্থা চালু করা, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রান্তিক চাষীদের (৬০০টি ক্লাস্টারের) চিংড়ি চাষে নতুন পদ্ধতিতে আনয়নসহ গড়ে ২০ শতাংশ বেশি উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে কাজ করতে হবে।

দ্বিতীয় ভাগে সমুদ্রের তীরবর্তী অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামুদ্রিক সম্পদের উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়নমূলক কাজ করা হবে। প্রকল্পের এ ভাগে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ১৬টি করে মেরিন ফিশারিজ সার্ভিলেন্স চেকপোস্ট নির্মাণ ও সার্ভিল্যান্স প্লাটুুন স্থাপন, ১৮টি ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার ফিশ হারবার ও ফিশ মার্কেট নির্মাণ করা হবে।

তৃতীয় ভাগে মত্স্যজীবীদের ক্ষমতায়ন ও জীবিকায়নে বিকল্প পেশায় রূপান্তরে কাজ করা হবে। এ প্রকল্পের আওতায় উপকূলীয় ৪৫০টি মত্স্যগ্রামে কমিউনিটি সেভিংস গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১০০টি মডেল গ্রাম এবং এখান থেকে ৬০ শতাংশ সুবিধাভোগীকে অর্থ সহায়তা করা হবে।

প্রকল্পটির উপপ্রকল্প পরিচালক অধীর চন্দ্র দাস বণিক বার্তাকে বলেন, এ প্রকল্পটির মাধ্যমে সামুদ্রিক মাছের মজুদের সঠিক পরিসংখ্যান আমরা তুলে ধরতে পারব।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, এ প্রকল্পটি জুলাই ২০১৮ থেকে জুলাই ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদ থাকলেও প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে চলতি বছরের মে মাসে। এটি এ খাতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রকল্প। তবে প্রকল্পের কাজ বড় হওয়ার কারণে ২০২৩ সালের মধ্যে তা শেষ করা সম্ভব হবে না। যার কারণে প্রকল্পটির মেয়াদ আরো সাত বছর বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত করা হবে।

সামুদ্রিক অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের ফিশারিজ সিস্টেম এবং বাংলাদেশের সিস্টেম সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। এ প্রকল্পটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির জন্য অনেকটা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে যে ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার নির্মাণ, ল্যাব নির্মাণ কিংবা সার্ভিল্যান্স সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে মাছের কোয়ালিটি, অবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ ইত্যাদি জানা যাবে। যেটা বাংলাদেশে আগে ছিল না। তাছাড়া এ প্রকল্পে দেশের ফিশারিজ আইনের পরিবর্তন, লোকবল ঘাটতি পূরণ, মত্স্য কর্মকর্তাদের দক্ষতা অর্জনসহ অনেক বাস্তবমুখী কাজ করা হবে, যেটা দেশের ব্লু-ইকোনমিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

তবে নীল অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রকল্পটিতে আসলে যে অর্থ সংস্থান করা হয়েছে, সেটা পর্যাপ্ত নয়।

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri