শেয়ারবাজার বাজারমূলধন হারিয়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা

dse-cse-down.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(২ নভেম্বর) :: নিস্তেজ শেয়ারবাজার। কোনো ওষুধেই সারছে না ব্যাধি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক নানা প্রণোদনা দিচ্ছে। এরপরও নিম্নমুখী বাজার। সাত মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজারমূলধন হারিয়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে লাখো বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছে। শুধু বিনিয়োগকারী নয়, শেয়ারবাজারে ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণে সর্বস্তরের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার লুটেরাদের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের আওতায় এনে শক্ত হাতে দমনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট কয়েকটি কারণে ভয়াবহ এই সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ও সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতের সুশাসনের অভাব, আইপিওতে দুর্বল কোম্পানি আসা, বেপরোয়া পেসমেন্ট বাণিজ্য, বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও তারল্য সংকট, তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ কোম্পানির আয় কমে যাওয়া, সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবির নিষ্ক্রিয়তা, কারসাজি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়া এবং সম্প্রতি নেয়া পদক্ষেপগুলো সময় উপযোগী ও কার্যকর না হওয়া।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারের সংকট একদিনের নয়। অনেক দিন থেকে চলে আসছে। তিনি বলেন, যে যেভাবেই বিশ্লেষণ করুক, মূল সমস্যা হল এই বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। এই আস্থা ফিরে আনতে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিচার করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের নিশ্চয়তা দিতে হবে, কারসাজির মাধ্যমে কেউ তার পুঁজি হাতিয়ে নিলে এর বিচার হবে। এছাড়া দুর্বল তালিকাভুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমান বলেন, বাজার পরিস্থিতি একটু অস্বাভাবিক লাগছে। কারণ বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে। মূল্যস্তর বিবেচনায় বিনিয়োগের জন্য এখন আকর্ষণীয় সময়। এরপরও বাজার নিম্নমুখী। তিনি বলেন, পরিস্থিতি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।

চলতি বছরের ১৪ মার্চ ডিএসইর বাজারমূলধন ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তা কমে ৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। এ হিসাবে আলোচ্য সময়ে ডিএসইর বাজারমূলধন কমেছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। ৫০ টাকার শেয়ারের দাম নেমে এসেছে ২ টাকায়। এর মধ্যে যারা মার্জিন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছে, তারা পুঁজি হারানোর পরও বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ঋণগ্রস্ত। শুধু ব্যক্তি বিনিয়োগকারী নন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও রয়েছেন এ সমস্যায়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের ইকুইটি নেতিবাচক। আর এ সমস্যা থেকে উত্তরণের আপাতত কোনো সুখবর নেই। ফলে আর্থিক সংকটে স্টক এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ হাউসে প্রতিনিয়ত জনবল ছাঁটাই হচ্ছে। বেশ কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউস বন্ধ হওয়ার পথে। সবমিলিয়ে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে সংকটে শেয়ারবাজার।

গত কয়েক বছরে বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে এমন ৫০টি কোম্পানির শেয়ার নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির পর প্রথমদিনে যে শেয়ারমূল্য ছিল, মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৫ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। ২০১৩ সালে বাজারে তালিকাভুক্ত হয় ফ্যামিলি টেক্সটাইল। লেনদেন শুরুর দিন প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ দাম ছিল ৪৮ দশমিক ৫০ টাকা।

বৃহস্পতিবার তা ২ টাকায় নেমে এসেছে। ২০১৫ সালে তালিকাভুক্ত হয় সিএনএ টেক্সটাইল। শুরুর দিন প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ছিল ২২ টাকা। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তা ১ টাকায় নেমে এসেছে। পদ্মা লাইফ ১৬৩ টাকা থেকে ১৫ টাকায়, দেশবন্ধু পলিমার ৭৪ টাকা থেকে ১২ টাকায়, সলভো কেমিক্যাল ৬৯ থেকে ৮ টাকায়, ফার কেমিক্যাল ৫৩ থেকে ৮ টাকায়, মোজাফফর স্পিনিং ৪৬ থেকে ৭ টাকা, সাইফ পাওয়ার ৭২ থেকে ১৪ টাকায়, ন্যাশনাল ফিড ৪৩ থেকে ৬ টাকায়, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ৬৩ থেকে ১২ টাকায়, এমারেল্ড ওয়েল ৫০ থেকে ১৪ টাকা, ওয়াইমেক্স ১১২ থেকে ১২ টাকা, সেন্ট্রাল ফার্মা ৩৮ থেকে ৭, আর্গন ডেনিম ৮২ থেকে ১৭, জিএসপি ফাইন্যান্স ৫৩ থেকে ১৪, ফারইস্ট নিটিং ৪৬ থেকে ১১, সান লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৮৩ থেকে ১৪, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং ৩৮ থেকে ১৪, হামিদ ফেব্রিক্স ৫৭ থেকে ১৬, আরডি ফুড ৩৮ থেকে ১১, আমরা নেটওয়ার্ক ১৩৯ থেকে ৪২, ইয়াকিন পলিমার ৩২ থেকে ৭, গ্লোবাল হেভিকেমিক্যাল ১০০ থেকে ২৯, বারাকা পাওয়ার ৭৩ থেকে ২৫, গোল্ডেন হারভেস্ট ৭৭ থেকে ২৩, আমান ফিড ৯৯ থেকে ২৯, ওরিয়ন ফার্মা ৭৫ থেকে ২৮, এএফসি অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ৬৫ থেকে ২১, ইন্ট্রাকো রিফিউলিং স্টেশন ৪৬ থেকে ১৫, বেঙ্গল উইনসোর ৫৫ থেকে ১৯, জিপিএইচ ইস্পাত ৭৩ থেকে ৩১, আমান কটন ৭৫ থেকে ২৯, এমআই সিমেন্ট ১৩৩ থেকে ৪১, এসএস স্টিল ৫১ থেকে ৩৩, ইন্দোবাংলা ফার্মা ৪৫ থেকে ১৬, বসুন্ধরা পেপার মিল ১৩১ থেকে ৪৫, তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ ৩৬ থেকে ১১, এনভয় টেক্সটাইল ৬২ থেকে ২৭, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেম ৪৮ থেকে ১৮, আরএসআরএম স্টিল ৭৮ থেকে ৩০, প্যাসেফিক ডেনিম ২৭ থেকে ১১, ইভিন্স টেক্সটাইল ২২ থেকে ৯ এবং নাহি অ্যালুমিনিয়ামের শেয়ারের দাম ৮২ থেকে ৪০ টাকায় নেমে এসেছে।

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri