কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুই বছরে খুনোখুনি ও বন্দুকযুদ্ধে নিহত-৫৬ : মামলা ৫ শতাধিক

rh-kabor.jpeg

কক্সবাংলা রিপোর্ট(৮ নভেম্বর) :: কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের শরনাথী ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের মধ্যে অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব-সংঘাত-খুনোখুনি ক্রমাগত বেড়েই চলছে।গত দুই বছরের অধিক সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-খুনোখুনি ও বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ গেছে ৫৬ রোহিঙ্গার। পুলিশের খাতায় উঠেছে ৫ শতাধিক মামলা। এসব অপরাধের কারণে শঙ্কিত স্থানীয়রা। নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসকও। তবে পুলিশ বলছে, এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণে তৎপর তারা।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে ২০১৯ সালের ৩১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্যাম্পে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও অপরাধপ্রবণতায় ৫০৯টি মামলা হয়। আসামি করা হয় ১ হাজার ১৫৯ জনকে। এর মধ্যে অস্ত্র মামলার সংখ্যা ৩৮, ধর্ষণ/ধর্ষণের চেষ্টায় ৩৩, ফরেনার্স অ্যাক্টে ৩৭, অপহরণ ১৫, বিশেষ ক্ষমতা আইনে ২৩, পুলিশ আক্রান্তে ১, ডাকাতি ও ডাকাতি প্রস্তুতিতে ৯, খুনোখুনিতে ৪৪, মানবপাচারের ঘটনায় ২৪টি। ।আর ক্যাম্পে আন্তঃকোন্দল বা সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্রের হাতে নিহত হয়েছেন ৭ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। এর বাইরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ৪৯ রোহিঙ্গা সদস্য।

কক্সবাজারে এখন নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সবমিলে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। এখন, ক্যাম্পে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রোহিঙ্গাদের মোটিভেশনের পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদার না হলে এ অঞ্চলে নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে বলেও মত সংশ্লিষ্টদের।

ক্যাম্প সূত্রে জানা যায়,কক্সবাজারের উখিয়া ই-ব্লকের রোজিনা আক্তারের সঙ্গে সি-ব্লকের হাফেজ মোহাম্মদ ইউনুছের বিয়ে পারিবারিকভাবে পাকাপাকি। মোহরানা হিসেবে মেয়ে পক্ষের দাবি দুই টিকল স্বর্ণ। এক টিকলে অনড় অবস্থানে ছেলের বাবা। স্বর্ণ উপহার কষাকষিতে আটকে যায় শুভক্ষণ। বিবাদে জড়িয়ে পড়ে উখিয়া লম্বাশিয়ার ক্যাম্প ১-এ আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমার আকিয়াবের দুই রোহিঙ্গা পরিবার।

তবে বয়োজ্যেষ্ঠদের বাগ্যুদ্ধের মধ্যেও কনেতে মুগ্ধ হাফেজ ইউনুছ গোপনে গত ১৪ সেপ্টেম্বর পাত্রীপক্ষের সঙ্গে দেখা করতে যান ই-ব্লকে। মেয়ের সঙ্গে দেখা করার নামে ইউনুছকে অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে মেয়ে পক্ষের বিরুদ্ধে। নিহতের ভাই মোহাম্মদ ইউসুফ বাদী হয়ে পরদিন উখিয়া থানায় একটি হত্যামামলা করেন। আসামি কনের দুই ভাই-বাবাসহ ৫ জন।

মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী স্বর্ণ দিয়ে বিয়েতে রাজি ছিলাম, যৌতুকও চাইনি। কিন্তু সামান্য অমিলের ঘটনায় হত্যা করা হয় ভাইকে।ওই হত্যাকা-ের পর পুলিশ মেয়ের ভাই ফয়সালকে গ্রেপ্তার করে। অন্যরা ওই ক্যাম্প থেকে পালিয়েছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মধুরছড়া পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মাহবুব আলম খান বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে যেসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত হচ্ছে তার বেশিরভাগই এমন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। প্রতিটি ঘটনায় আসামিরা দ্রুত পালিয়ে ক্যাম্প বদল করায় তাদের গ্রেপ্তার সহজ হচ্ছে না।

পুলিশ-প্রশাসন বলছে, রোজিনা-ইউনুছের মতো বিয়ের মোহরানা বা অন্য তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বেড়ে চলছে। সামান্য ঘটনা খুনোখুনিতে গড়াচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী-মগ জনগোষ্ঠীর নির্যাতনে বিতাড়িত কিংবা স্বজনদের লাশের দৃশ্য দেখে আসা শরণার্থীরা।

কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ক্যাম্পে মাসে গড়ে ১৯ মামলা হচ্ছে। অথচ সাড়ে ৫ লাখ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিমাসে মামলা হয় ১৫০-১৬০টি। সে হিসেবে ঘিঞ্জি শরণার্থী ক্যাম্পে অপরাধপ্রবণতা কম। কিন্তু বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত একজন শরণার্থীও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে অপরাধপ্রবণ হলে চিন্তার বিষয়। আমরা চাচ্ছি আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি কাউন্সেলিংয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা সংঘবদ্ধ অপরাধ কর্মকা- জিরো লেভেলে নামিয়ে আনতে।

ক্যাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাদা চোখে রোহিঙ্গা ক্যাম্প শান্ত মনে হলেও রাতের দৃশ্য ভিন্ন। শরণার্থী সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনের কারণে রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অনুপস্থিত থাকেন। আবার গোপন তথ্যে অপরাধ সংঘটনের খবর পেলেও সময়মতো পুলিশ দুর্গম পাহাড়ে পৌঁছতে পারে না। এ সময় কিছু সন্ত্রাসী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এরা ডাকাতিসহ নিজেদের মধ্যে বিয়ে-পরকীয়া, নেতৃত্ব (হেডমাঝি/মাঝি/চেয়ারম্যান) নির্বাচনের দ্বন্দ্বে আইন হাতে তুলে নেয়। পারিবারিক/প্রতিবেশীর সঙ্গে ঠুনকো বিবাদকে এরাই খুনোখুনি পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। এমন ১৪টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যরা পাহাড়ে ঘাপটি মেরে থাকে।

পুলিশ এ-ও বলছে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে নগণ্য একটা অংশ খুন, চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, ইয়াবা-মানবপাচারসহ ১৭ ধরনের অপরাধে জড়িত। তবে পুলিশের খাতায় থাকা আসামিরা পলাতক।

লম্বাশিয়া ক্যাম্প ১-এর মাঝি আলী হোসেন বলেন, ক্যাম্পে যত সংখ্যক শরণার্থী আছে, সে হিসেবে অপরাধ খুবই কম। তবে যেসব কারণে খুনোখুনি হচ্ছে তা-ও তুচ্ছ। কারও মধ্যে দ্বন্দ্বের খবর পেলে আমরা নিজ উদ্যোগে মীমাংসা ও বোঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু এর পরও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে।

মংডুর আকিয়াব চিকনছড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে উখিয়ার কুতুপালং হিন্দুপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেন রবীন্দ্র পাল পরিবার। সহায়-সম্বল ফেলে আসেন ২৪টি গরু ও ১১ মহিষ নিয়ে। দুই বছর পর পশুগুলো বিক্রিতে ৬ লাখ টাকা চুক্তিবদ্ধ হন মিয়ানমারের প্রতিবেশী ইমাম হোসেনের সঙ্গে। কথামতো গত ১৭ আগস্ট ৩৫টি গবাদিপশু নিয়ে লম্বাশিয়া ক্যাম্পে হোসেনের ঘরের সামনে হাজির হন রবীদ্র পালের পরিবার। কিন্তু ওত পেতে থাকা ব্যক্তিরা এলোপাতাড়ি লাঠিপেটা ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতের পর তাদের বেঁধে পাহাড়ে ফেলে আসে। ছিনিয়ে নেয় গরু-মহিষ।

ওই ঘটনায় ইমান হোসেন পরিবারের ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন রবীদ্র পালের ছেলে জগদীশ পাল। জগদীশ পাল বলেন, আসামিরা ডাকাতিতে যুক্ত। এখনো পুলিশকে আড়াল করে ক্যাম্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

উখিয়ার বালুখালী ইউপি সদস্য নুরুল আবছার বলেন, রোহিঙ্গারা দিন দিন হিংস্র হয়ে উঠছে। প্রতি মুহূর্তে তাদের রূপ বদলে যাচ্ছে। শরণার্থী শিবিরসংলগ্ন এলাকাগুলোয় স্থানীয়রা গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করতে পারছে না। কোনো শাক-সবজি চাষ করতে পারছে না। চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে তারা। ক্যাম্পে এত লোক, কাকে সন্দেহ করা যায়? স্থানীয়রা এসব কারণে কোনো ক্ষতির প্রতিবাদ করতে গেলেই রোহিঙ্গারা সংঘবদ্ধ হয়ে তেড়ে আসে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস-বিস) মহাপরিচালক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল একেএম আবদুর রহমান বলেন, বিশ্বব্যাপীই শরণার্থীরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র তাদের আর্থিক প্রলোভন বা মোটিভেটের মাধ্যমে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে পরিণত করে। তবে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেওয়া দেশটির অপরাধের ধরন/ভূতাত্ত্বিক গঠনের সঙ্গে মিল রেখে তারা অপরাধে জড়ায়। কক্সবাজারেও তেমনটি হয়েছে। তাদের অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব না হলেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কাউন্সেলিং করাতে হবে।

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri