যত কষ্ট মধ্যবিত্তদের

midle-class.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(২৪ নভেম্বর) :: যত কষ্ট মধ্যবিত্তদের। কেমন আছেন তারা। কিভাবে চলছে তাদের সাধারণ জীবন। প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার সংগ্রাম তারা করে যাচ্ছেন। অথচ মধ্যবিত্তদের এদের দেখার কেউ নেই।

একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন মাহিদুর রহমান। মাসে সর্বসাকল্যে বেতন পান ৩৬ হাজার টাকা। দুই সন্তান নিয়ে থাকেন রাজধানীর গোলাপবাগের একটি ভাড়া বাড়িতে। ১৪ হাজার টাকা বাসা ভাড়া গুনতে হয় তাকে। দুই সন্তানের স্কুলের খরচ লাগে অন্তত ৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া নিজের ও সন্তানদের যাতায়াতের খরচ হয় আরো অন্তত ৪ হাজার টাকা। বাকি ৯ হাজার টাকায় পুরো মাসের খরচ চালাতে হয়। জরুরি কোনো প্রয়োজন হলে ধার করতে হয়। বছর শেষে বাড়ি ভাড়া অন্তত ৫০০ টাকা বাড়ে। সন্তানদের স্কুলে প্রতিবছরই বেতন বাড়ায়। এর মধ্যে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। এ অবস্থায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে তার। মাহিদুরের মতো চতুর্মুখী ব্যয় বৃদ্ধির চাপে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।

মাহিদুর জানালেন, পেঁয়াজের দামের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অন্য জিনিসপত্রের দামও বাড়ছে। বিশেষ করে সবজির দামও চড়া। চালও কিনতে হচ্ছে ৩ থেকে ৫ টাকা কেজিতে বেশি দিয়ে। আমার যে বেতন তাতে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। এ মাসে খুব কাছের এক আত্মীয়ের বিয়ের দাওয়াত ছিল। যেতে পারিনি। কারণ একটু বেশি খরচ করার কথা ভাবলেই মাথা ঘুরে যায়। দিনে দিনে আমাদের জন্য জীবনযাপন খুব কঠিন হয়ে পড়ছে। আমার যা আয় তার হিসাব করলে গত এক মাসে ৩০ ভাগ ব্যয় বেড়ে গেছে এই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে।

মগবাজারে থাকেন পলাশ সকাল। নিজে ব্যবসা করেন। ছোটখাটো একটা কোম্পানির সিইও তিনি। সব কিছুতেই হিসাব করে চলতে হচ্ছে। আগে চাইলে একটার জায়গায় ২টা ডিম খেতাম। এখন একটা ডিম ২ জনে ভাগ করে খেতে হয়। মানুষের জীবনযাপনের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। ঠিক এক মাস আগেই প্রতি সপ্তাহে একবার বাইরে খেতে যেতাম। গত ২ সপ্তাহ ধরে একবারও বাইরে খেতে যাইনি। বাইরে খেতে যেতে যে টাকা লাগবে তা অন্য কোনো খাতে ব্যয় করতে হচ্ছে। পলাশও জানালেন, ২৫ থেকে ৩০ ভাগ ব্যয় বেশি হচ্ছে আমার।

মোহাম্মদপুরে শেখের টেকে থাকেন সুলতানা পারভীন। তিনি আরো বলেন, সব মধ্যবিত্তের মতোই চলছে প্রতিদিনের সংগ্রাম। গত কয়েক মাস ধরে টাকা জমাতে পারছি না। তাই বাইরে ঘোরা খাওয়া-দাওয়া, শপিং করা কমে গেছে অনেক হিসাব করে চলতে হচ্ছে এখন।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, খাদ্যসামগ্রীসহ অন্যান্য সব জিনিসের মূল্যস্ফীতির অঙ্কটা হয়ে গেছে দ্বিগুণ। যা অদূর ভবিষ্যতে কমার কোনো সম্ভাবনাও আমি দেখছি না। যার প্রভাব পড়ছে মধ্যবিত্ত সমাজে। সমাজ কাঠামোই ধরে রাখে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কিন্তু গত ৬ মাসের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের বাড়ার যে প্রতিযোগিতা দেখছি তা আমাদের জন্য মোটেও সুখকর নয়।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারাকাত বলেন, নিত্যপণ্যের দাম, বাড়ি ভাড়া, সাংসারিক খরচ সব মিলিয়ে সীমিত আয়ের মানুষদের নাভিশ্বাস উঠছে। আমি কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি, মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় ব্যয়ের মধ্যে ভারসম্য নেই। আয়ের চেয়ে ব্যয়ের অংক বেশি। যারা একটু ভালোভাবে চলাফেরা করতে পারতেন তারাও এখন হিসাব করে চলছেন। যা ৬ মাস আগেও ছিল না। উপরের কেস স্টাডি থেকে দেখা গেছে, বর্তমান বাজার দরে মধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রায় এসেছে নানা পরিবর্তন। তাদের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে বিস্তার ফারাক। ৩০ হাজার টাকার মাসিক বেতনের চাকরি যারা করেন তাদের ওপর একটি জরিপ করে নির্দিষ্ট আয়ের চেয়ে ব্যয়ের খাতের একটি জরিপে দেখা গেছে, বাসা ভাড়া বেড়েছে ২০.৫%, যাতায়াত ভাড়া বেড়েছে ১৩.৩%,বাজার খরচ বেড়েছে ৩৯.৯%, বিনোদন আর স্বাস্থ্য খাতে বেড়েছে ৭.৯% ।

আইডিএসের গবেষণায় বলা হয়েছে- বাংলাদেশে যত মধ্যবিত্ত রয়েছেন, এর ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ বা প্রায় অর্ধেকই বেসরকারি চাকরি করেন। আর ২০ শতাংশের বেশি সরকারি চাকরি করেন। মধ্যবিত্তদের মাত্র ২২ শতাংশ ব্যবসা করেন। নিম্নমধ্যবিত্তের মধ্যে ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ বেসরকারি চাকরি করেন। আর ব্যবসায় সম্পৃক্ত মাত্র ১৭ শতাংশ। এক সময় ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করাটা শুধু উচ্চবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও এখন ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যবিত্তের বিকাশে জরুরি প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহে সরকারের মনোযোগ কম। তা না হলে পাল্লা দিয়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়ত না। মধ্যবিত্ত সমাজে সীমিত জীবনযাত্রার ব্যয়, সন্তানের জন্য শিক্ষার সুব্যবস্থা এবং শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- দেশে ভোগবাদী আর নিম্নবিত্তের অবারিত সুযোগ-সুবিধায় অনেকটা কোণঠাসা হয়ে না ঘরকা, না ঘাটকা অবস্থায় ঝিম মেরে আছে মধ্যবিত্ত সমাজ।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বমূল্যের সঙ্গে তারা পেরে উঠছেন না। সন্তানের শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। বছর শুরুতে বাড়ে বাড়ি ভাড়া। চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় কোথায় যাবেন মধ্যবিত্তরা?

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri