হলি আর্টিজান মামলার রায় : ৭ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড, একজন খালাস

Capture22upB-20191127070335.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(২৭ নভেম্বর) :: রাজধানীর হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার মামলার আসামিদের ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বুধবার (২৭ নভেম্বর) ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৭ জঙ্গি হলো – জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, রাকিবুল হাসান রিগান, রাশেদুল ইসলাম ওরফে র‌্যাশ, সোহেল মাহফুজ, হাদিসুর রহমান সাগর, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ রিপন।মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে।

অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় এ মামলায় বিচারের মুখোমুখি করা আরেক আসামি মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

ফাঁসির রায়ে আসামিদের কাউকে বিচলিত হতে দেখা যায়নি। তারা অনুতপ্ত হয়নি, সবাই ভাবলেশহীন ছিল।তারা উচ্চস্বরে বলছিল, ‘আল্লাহু আকবর, আমরা কোনো অন্যায় করিনি।’ আদালত কক্ষে একজন আসামি আইএসের টুপি মাথায় দিয়ে উপস্থিত হয়। ফাঁসির রায়ের পর সে জয়সূচক ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়েছে।

খালাসের রায় শুনে মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আইএসের ব্যানারে এই হামলা চালানো হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর প্রিজনভ্যানে করে আসামিদের কারাগারে ফিরিয়ে নেয়া হয়।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ৮ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে তাদের ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে নেয়া হয়।

আইএস’র টুপি পরে আদালতে,

হলি আর্টিজান হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাকিবুল হাসান রিগ্যান আইএসের টুপি পরে আদালতে হাজির হয়েছিল। পুলিশি হেফাজতে থাকার পর সে কীভাবে এ টুপি পেলো, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা সমালোচনা। পুলিশ এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। এছাড়া রায় ঘোষণার পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামিরা ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর’ বলে ওঠে। এরপর আসামিরা আদালতে উপস্থিত আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলে, ‘আমাদের বিজয় খুব শিগগিরই।’

সকালে আদালতে আনার সময় রিগ্যানের মাথায় এই টুপি ছিল না। রায় ঘোষণা শেষে সে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাথায় আইএসের একটি টুপি পরে। এরপরই উপস্থিত আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের নজরে আসে বিষয়টি। টুপি কোথায় থেকে পেলো—এমন প্রশ্নের জবাবে রিগ্যান বলে, ‘কারাগার থেকে নিয়ে এসেছি।’ এরপরেই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে কাঠগড়া থেকে নামিয়ে প্রিজনভ্যানে উঠিয়ে কারাগারে নিয়ে যায়।

রিগ্যানের আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আসামি চার বছর কারাগারে আছে। এ টুপি সে কোথায় পেলো, এটা তো আমার প্রশ্ন। এ বিষয়ে আমি আমি কিছু জানি না।’

এ বিষয়ে পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার জাফর হোসেন বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নানা মাধ্যমে জানতে পেরেছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি।’

রায় ঘোষণা শেষে অন্য আসামিদের সঙ্গে রিগ্যানও আল্লাহ আকবর বলে চিৎকার করে। আসামি রাজীব গান্ধী বলে, ‘হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়ে তারা কোনও অন্যায় করেনি। তারা এজন্য বেহেশতে যাবে। এই দেশে একদিন খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে বলে চিৎকার করে বলতে থাকে সে।’

রিগ্যানের আইএসের টুপি পরে আদালতে আসার প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবু আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমি বিস্মিত হয়েছি। এই দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। তারা দায়িত্ব এড়াতে পারে না। এ নিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার।’

তিনি আরও বলেন, রায় ঘোষণার সময় আসামিরা খুবই উদ্ধত আচরণ করেছে।

লক্ষ্য ছিল আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ

মূল পরিকল্পনাকারী তামিম

মূল পরিকল্পনাকারী তামিম 

রাজধানীর হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা মামলার রায়ে আদালত মূল পরিকল্পনা ও হামলাকারীদের লক্ষ্য নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। বুধবার (২৭ নভেম্বর) রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়।

পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, হলি আর্টিজান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়কারী ছিল তামিম চৌধুরী। আসামি আসলাম হোসেন র‌্যাশ তার দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, ‘আমি তখন তামিম ভাইয়ের কাছে গুলশান বা কোনো কূটনৈতিক এলাকায় আক্রমণের উদ্দেশ্য জানতে চাই। তামিম ভাই বলেন যে, আমাদের সংগঠন নব্য জেএমবি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস দ্বারা অনুপ্রাণিত। আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় হামলা করা প্রয়োজন।”

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘কাজেই এটা প্রতিষ্ঠিত যে, তামিম চৌধুরীর নেতৃত্বে হলি আর্টিজান হামলা সংঘটিত হয়। বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদ কায়েমের লক্ষ্যে জননিরাপত্তা বিপন্ন করার জন্য জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য তামিম চৌধুরীর পরিকল্পনায় নব্য জেএমবির সদস্যরা গুলশান হলি আর্টিজানে হামলা করে। নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে গ্রেনেড, আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো চাপাতি দিয়ে ১৭ জন বিদেশি ও ৪জন বাংলাদেশি নাগরিক ও দুজন পুলিশ অফিসারকে হত্যা করে এবং অনেককে গুরুতর আহত ও জিম্মি করে।’

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। তাদের গুলিতে দুই পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন। পরে অভিযানে ৫ হামলাকারী মারা যায়। ওই ঘটনায় পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় একটি মামলা করে পুলিশ।

গত ১৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণা জন্য আজ ২৭ নভেম্বর (বুধবার) দিন ধার্য করেন।

মামলা করার পর ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই ৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) পরিদর্শক হুমায়ুন কবির। একই বছর ২৬ নভেম্বর ৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

এছাড়া বিভিন্ন অভিযানে ১৩ জন নিহত হওয়ায় মামলা থেকে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরে মামলা থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়া হয়।

হলি আর্টিজানে সেনাবাহিনীর অপারেশন থান্ডার বোল্টে নিহত ৫ হামলাকারী হলেন- রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।

এছাড়া এ মামলায় আসামিদের মধ্যে বিভিন্ন ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযানে ৮ জন নিহত হয়েছে। তারা হচ্ছে- তামিম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ান জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান।

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri